ads

বাংলাদেশের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড: যে প্রশ্নের উত্তর জরুরি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড: যে প্রশ্নের উত্তর জরুরি
অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো. মোজাফফর হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্রের ইতিহাসে কিছু ঘটনা কেবল একটি হত্যাকাণ্ড বা একটি অভ্যুত্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেগুলো রাষ্ট্রের চরিত্র, প্রতিষ্ঠান এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, ৩ নভেম্বরের জেলহত্যা, ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড, মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের মৃত্যু, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা এবং ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহ প্রতিটি ঘটনা শুধু জীবনহানির নয়, রাষ্ট্রক্ষমতার পুনর্বিন্যাসেরও গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।

প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর পর সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর মো. মোজাফফর হোসেনের গ্রেপ্তার তাই একটি বিচ্ছিন্ন আইনগত ঘটনা নয়। এটি এমন এক অধ্যায়ের দরজা আবার খুলে দিয়েছে, যার বহু প্রশ্ন এখনো উত্তরহীন। বিচারিক প্রক্রিয়া তার নিজস্ব গতিতে চলবে, কিন্তু ইতিহাসের অনুসন্ধান আদালতের রায়ে শেষ হয় না। বরং ইতিহাসের কাজ হলো ঘটনাগুলোর রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটকে বোঝা।

Advertisement

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মেজর মোজাফফর দীর্ঘ সময় ভারতে অবস্থান করেছিলেন এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় আত্মগোপনে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ এখনো বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তবে তদন্তে যদি সেগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে তা দক্ষিণ এশিয়ার আন্তঃরাষ্ট্র গোয়েন্দা সম্পর্ক, সীমান্ত-রাজনীতি এবং আঞ্চলিক কৌশল নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলবে। আবার যদি অভিযোগ প্রমাণিত না হয়, তবুও রাষ্ট্রের জন্য স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সন্দেহের অবসানও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

১৯৮১ সালের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল শীতল যুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ সময়। যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন এবং ভারত–প্রত্যেকেই দক্ষিণ এশিয়াকে তাদের কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখছিল। বঙ্গোপসাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলাদেশ তখনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আজও আছে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশকে একাধিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের দিকে এগিয়ে নিচ্ছিলেন। তাই তার হত্যাকাণ্ডের সময়কার রাজনৈতিক পরিবেশকে কেবল অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের সংকীর্ণ পরিসরে সীমাবদ্ধ রেখে বিশ্লেষণ করলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া কঠিন।

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ফাইল ছবি
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ফাইল ছবি

এই প্রেক্ষাপটে তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ভূমিকাও ইতিহাসবিদদের আলোচনায় বারবার ফিরে এসেছে। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের আটক ও পরবর্তী মৃত্যু, এবং এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ১৯৮২ সালে এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণ–এসব ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বহু গবেষণা, স্মৃতিকথা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে এটিও গুরুত্বপূর্ণ যে, আদালতের মাধ্যমে জিয়া হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রে তার সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে অভিযোগ ও প্রমাণের মধ্যে এই পার্থক্য বজায় রাখাই ইতিহাসচর্চার মৌলিক শর্ত।

রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘Cui Bono?’; অর্থাৎ, ‘কার লাভ হলো?’ এই প্রশ্ন কাউকে অপরাধী ঘোষণা করে না; বরং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের বিশ্লেষণের একটি পদ্ধতি। ইতিহাসবিদেরা প্রায়ই এই প্রশ্ন ব্যবহার করেন একটি ঘটনার বিস্তৃত প্রভাব বোঝার জন্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে বদলেছে, কোন প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়েছে, কোনটি দুর্বল হয়েছে, এবং দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্র কী মূল্য দিয়েছে।

তবে এখানেই একটি সতর্কতা জরুরি। বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে একটি অভিন্ন আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বা একক পরিকল্পনার অস্তিত্ব রয়েছে–এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো সর্বজনস্বীকৃত প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে নেই। তাই গবেষণার জায়গায় অনুমান বসিয়ে দিলে ইতিহাস দুর্বল হয়। আবার অস্বস্তিকর প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেও ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একটি পরিণত রাষ্ট্রের কাজ হলো অভিযোগকে রাজনৈতিক স্লোগানে রূপান্তর না করে, আবার প্রশ্নকেও নীরবতার আড়ালে চাপা না দিয়ে, দলিল, সাক্ষ্য ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধান করা।

বিশ্বের বহু দেশ তাদের অন্ধকার অতীতের মুখোমুখি হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ‘Truth and Reconciliation Commission’, আর্জেন্টিনায় সামরিক শাসন-পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়া, কিংবা চিলিতে মানবাধিকার তদন্ত–এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, সত্য অনুসন্ধান প্রতিশোধের জন্য নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য।

বাংলাদেশেরও হয়তো সময় এসেছে রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাসকে দলীয় ব্যাখ্যার বাইরে এনে একটি বিস্তৃত জাতীয় পর্যালোচনার আওতায় আনার। কারণ, রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার নাগরিকরা বিশ্বাস করে যে, কোনো প্রশ্নই নিষিদ্ধ নয়, আবার কোনো অভিযোগই প্রমাণ ছাড়া সত্য নয়।

মেজর মোজাফফরের গ্রেপ্তার সেই দীর্ঘ ইতিহাসের শেষ অধ্যায় নয়; বরং আরেকটি নতুন সূচনা। এই সুযোগে যদি বাংলাদেশ তথ্য, দলিল, বিচারিক স্বচ্ছতা এবং গবেষণার মাধ্যমে অতীতের জটিল অধ্যায়গুলোকে পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে, তবে সেটি শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি হবে না; বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।

ইতিহাসের কাছে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রই জবাবদিহি করে। আর যে রাষ্ট্র সত্যকে ভয় পায় না, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তার পক্ষেই সাক্ষ্য দেয়।

সহিদুল আলম স্বপন: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট

সম্পর্কিত