লিওনেল মেসি, শেষবারের মতো আকাশি-সাদায়! জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা তো আরও আগেই দিয়েছেন, বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানাবে আর্জেন্টিনা। আর কয়েক ঘণ্টা পর, বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর পাঁচটায় মেসি আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার নামতে যাচ্ছেন। তার আগে এই চিঠিটা মেসির জন্য, বাংলাদেশ থেকে -
প্রিয় মেসি,
ঢাকার কথা তোমার মনে আছে?
হয়তো। আর্জেন্টিনাকে নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের পাগলামির গল্প-ভিডিও তো ২০২২ বিশ্বকাপের সময়ও ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকার স্মৃতি তোমার সে সময়ে আরেকবার তাজা না হয়ে পারে না। আবার কে জানে, হয়তো সেভাবে মনে নেই তোমার! পৃথিবীর কত শহরে গেছ তুমি। শত স্টেডিয়াম, হাজারো এয়ারপোর্ট, লাখো মানুষের ভিড়। সব মনে রাখা সম্ভব!
কিন্তু দেখ, আমাদের কাছে মেসি নামের অতিমানবের গল্পটাতে ২০১১-র সেই সেপ্টেম্বর সবচেয়ে জ্বলজ্বলে স্মৃতিগুলোর একটি যেন! সেদিন আর্জেন্টিনা এসেছিল ঢাকায়, তুমিও। তোমার বয়স তখন ২৪। ঢাকা স্টেডিয়ামে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনার গোল তিনটির একটিও সেদিন তোমার ছিল না, তবে দুটিতেই তোমার অবদান ছিল। হিগুয়াইনের গোলটাতে শেষ পাস তোমার, দি মারিয়ার গোলটা তো তোমারই হওয়া উচিত ছিল! ইশ, গোলটা তোমারই হলে ‘মেসির ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা গোলগুলোর’ একটির গল্পে ঢুকে যেত ঢাকা।
সেই মেসি আর আজকের এই মেসি–মাঝে কেটে গেছে পনেরোটা বছর। সেদিন তুমি ছিলে আর্জেন্টিনার অনেকটা বর্তমান আর পুরোটা ভবিষ্যৎ। আর আজ? তুমি স্মৃতি হয়ে যাওয়ার পথে। আর্জেন্টিনার জার্সিটা আর তোমাকে পাবে না।
আমাদের কাছে অবশ্য তুমি ঢাকার সেই ম্যাচের আরও অনেক আগ থেকেই অনেক আপন। বাড়ির পাশের ছেলেটা। পরিচয়ের শুরুটা অবশ্য বার্সেলোনাকে দিয়ে। গেতাফের বিপক্ষে মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে এক দৌড়ে পাঁচ-ছয়জনকে কাটানো তোমার সেই গোল…পরের দিনের পত্রিকার ‘মেসির ম্যারাডোনা গোল’ কাটিংটা সম্ভবত এখনো অনেকের ট্রাঙ্কে আছে।
বা এর কদিন পর ২০০৭ কোপা আমেরিকায় মেক্সিকোর বিপক্ষে চোখধাঁধানো চিপে করা গোলটা? রেফারি অযথা হলুদ কার্ড দেখানোয় খেপে গিয়েছিলে তুমি, কয়েক মিনিট পরই রেফারির ওপর রাগ ঢেলে দিলে মেক্সিকোর ওপর। ওই গোলটা মনে নেই–এমন আর্জেন্টিনা সমর্থক বাংলাদেশ কেন, বিশ্বেও তেমন পাবে না।
এমন কত শত গোল, কত শত ড্রিবল…অগণিত রাত। নয়তো ভোর। বার্সেলোনা হোক বা আর্জেন্টিনা, তোমার খেলা দেখার জন্য রাতের ঘুম বিসর্জন দিয়েছে এই বদ্বীপের কোটি আর্জেন্টিনা ভক্ত। কখনো জিতেছ তুমি, কখনো কেঁদেছ… তোমার আবেগের উত্থান-পতনের সঙ্গে তাল মিলেছে এখানকার কোটি হার্টবিটের।
২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে যেমন। জার্মানির সঙ্গে সেই ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনার মতো এই দেশেরও কোটি ভক্ত আশায় ছিল, এবার বুঝি অপেক্ষার শেষ! কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে গোটজের গোল হৃদয় ভেঙে দিল তাদের। আর অল্প কয়েক মিনিট বাকি, তবু তুমি মাঠে আছ বলেই এ দেশের কোটি কোটি চোখ তখনো টিভির দিকে তাকিয়ে। অনেক ডলুনি সহ্য করা চোখগুলো তখন লালচে। কিছুক্ষণ পরই ভোর হবে কিনা!
তারপর শেষদিকে আর্জেন্টিনা ফ্রি-কিক পেল। তুমি যখন ফ্রি-কিকটা নিতে যাচ্ছ, ওই কয়েক কোটি জোড়া চোখেরই ঘুম উধাও–হবে কিছু?
হলো না! বলটা উঠল, আর নামল না, গোলবারের অনেক ওপর দিয়ে চলে গেল। তুমি কাঁদলে না। তবে তোমার বিষণ্ন বদনের সামনে কান্নাও হালকাই মনে হতো।
২০১৬-তে কাঁদলে বটে। কোপা আমেরিকার ফাইনাল। ৯০ মিনিট, অতিরিক্ত সময়—গোল নেই। তারপর টাইব্রেকার। তুমি এগিয়ে গেলে। বিশ্বের সেরা ফুটবলার, দলের অধিনায়ক, দেশের সবচেয়ে বড় আশা। কিন্তু তুমি যে শটটা নিলে, সেটা গিয়ে পড়ল গ্যালারিতে। তুমি কাঁদলে। এ দেশে আর্জেন্টিনা ভক্তরা তো হতাশ হলোই, অন্য দলের ভক্তরাও হতভম্ব। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যেন ২০১৪, ২০১৫, ২০১৬–সব হার একসঙ্গে ফিরে এল। তারপর এল আরেক ধাক্কা। তুমি বললে, জাতীয় দলের হয়ে আর নয়।
কিন্তু তোমার গল্প তখনও শেষ হয়নি। বরং সেখান থেকেই হয়তো অন্য মেসির শুরু।
২০১৮ বিশ্বকাপের আগের মেসি আর এর পরের মেসি, বিশেষ করে ২০১৯-এর কোপা আমেরিকার পরের মেসিকে এক মনে হবে না কারওই। ২০১৯ কোপা আমেরিকায় চিলির বিপক্ষে সেই ঝামেলা, গ্যারি মেডেলের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি, তারপর লাল কার্ড। ঘটনাটা নিয়ে বিতর্ক ছিল। কিন্তু আমাদের চোখে অন্য একটা জিনিস ধরা পড়েছিল। তুমি এবার শুধু চুপচাপ মাঠ ছেড়ে যাচ্ছ না। তুমি প্রতিবাদ করছ। দলের হয়ে কথা বলছ। রাগ দেখাচ্ছ। যেন এতদিনের চুপচাপ মানুষটার ভেতর থেকে একজন নেতা বেরিয়ে এসেছে।
তারপর ২০২১-এ তোমার দেশকে কিছু জেতানোর অপেক্ষার শেষ হলো। কোপা আমেরিকা দিয়েই। ব্রাজিলের মারাকানাতেই–সাত বছর আগে যেখানে জার্মানির কারণে তোমার বিষণ্ন বদনের দেখা মিলেছিল।
এরপর এল ২০২২। তোমার অমরত্বের মুহূর্ত।
অথচ শুরুটা হলো কীভাবে? সৌদি আরবের কাছে হার। বিশ্বকাপের শুরুতেই ধাক্কা। আবার সেই পুরোনো প্রশ্ন— এবারও হলো না? মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচে তুমি উত্তরটা দিলে পায়ে। দূর থেকে নিচু শট। গোল। খুব বড় কোনো উদযাপন নয়। শুধু ফিরে দাঁড়ানো। যেন বললে, এখনও শেষ হয়নি। আমি আছি না!
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তারপর সেই পাস। মলিনা দৌড়াচ্ছেন, কিন্তু পাসটা দেওয়ার আগে যেন তুমি জানতে তিনি কোথায় যাবেন। ডিফেন্সের ফাঁক দিয়ে বল চলে গেল। মলিনা গোল করলেন। আমরা রিপ্লে দেখলাম। আবার দেখলাম। এত বছর মেসি জাদুতে মুগ্ধ চোখও বারবার দেখে বোঝার চেষ্টা করল–কী হলো এখানে! বুঝল না। উপলব্ধি করল–কিছু কিছু পাস আসলে বোঝার ব্যাপার নয়, চুপচাপ দেখে যাওয়ার বিষয়।
আমরা উপলব্ধি করলাম, আরও শতবারের মতো–মেসির মতো প্লেয়ারদের স্কিলের বিশ্লেষণ করতে নেই, করার সাধ্যই নেই। ও শুধু উপভোগ করে যাওয়ার জিনিস।
২০২২-এর ফাইনালটার কথা কীভাবে ভুলি, মেসি? বলো তো!
একটা সময় মনে হচ্ছিল, আর্জেন্টিনা খুব সহজেই জিতে যাবে। ২-০। তারপর হঠাৎ ম্যাচ বদলে গেল। ২-২। অতিরিক্ত সময়। তুমি আবার গোল করলে। ৩-২। মনে হলো, একটু বেশিই রূপকথার হয়ে যাচ্ছে না? কিন্তু তারপর আবার গোল। এমবাপ্পের হ্যাটট্রিক। ৩-৩। টাইব্রেকার। তখন আবার পুরনো প্রশ্ন — এবারও হলো না?
হলো। তুমি টাইব্রেকারে শট নিলে। গোল করলে। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ উঠল তোমার হাতে। যে হাত ২০১৬-তে মুখ ঢেকেছিল, সেই হাতেই কয়েক বছর পর বিশ্বকাপ।
সেদিন মনে হয়েছিল, আকাশি-সাদায় তোমার গল্পটা এখানে শেষ হলেও আর আফসোস নেই।
কিন্তু ২০২৬-এ এসে তুমি আবার আমাদের ভুল প্রমাণ করলে। তোমাকে দেখে একের পর এক মুহূর্তে অবাক হতে হয়েছে। এই লোকটার বয়স ৩৯! বয়সের সঙ্গে তোমার খেলার ধরন বদলেছে, কিন্তু আমাদের খেলা দেখার সেই বিস্ময়টা কেন যেন বদলায়নি। আগের মেসি হয়তো সবাইকে পেছনে ফেলে দৌড়াত। ২০২৬-এ আমরা আরেক দফা অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম, এই বয়সে মেসি গোল করেন, করান। হাঁটেন, কিন্তু এর মধ্যেই প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দিয়ে দেন। কখনো নিজে দৌড়ান, কখনো এক পাসে সতীর্থকে গোলটা একেবারে চামচে উঠিয়ে দেন। কিন্তু ফলটা একই—আমরা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকি। বিস্ময়ে, মুগ্ধতায়!
এটাই হয়তো তোমার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। একসময় তুমি ছিলে দলের সবচেয়ে প্রতিভাবান। প্রতিভায় ভাটা পড়েনি, কিন্তু প্রতিভাকে কাজে লাগানোয় সবচেয়ে বুদ্ধিমান হয়েও দেখা দিলে তুমি। সেই তুমি এক সময় হয়ে গেলে দলের নেতাও।
সেই তোমাকে আর্জেন্টিনা বিদায় দিচ্ছে।
কিন্তু এমন একজনকে কীভাবে বিদায় দেবে আর্জেন্টিনা? বা বাংলাদেশ?
এমন একজনকে কীভাবে বিদায় দিতে হয়, মেসি?
কৃতজ্ঞতায়? নাকি কান্নায়?
বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্টালে বেনিনের বিপক্ষে তুমি হয়তো গোল করবে, হয়তো না। হয়তো দারুণ খেলবে, হয়তো আবেগ তোমাকেও অসাঢ় করে রাখবে। কিন্তু ব্যাপারটা কী জানো, এই ম্যাচে তোমার পারফরম্যান্স নিয়ে কেউ মাথা ঘামালে তাকে নির্ঘাত রোবট বলতে হবে!
তোমার গোল, তোমার অ্যাসিস্ট, তোমার ড্রিবল–ওসব শেষ বেলায় মুগ্ধতার চেয়ে হয়তো আরও অস্থিরই করবে বেশি। তোমার প্রতিটা স্টেপেই যে বিদায়ের সুর বাজবে! আর্জেন্টিনা, নাম্বার টেন, লিওনেল মেসি। শেষবারের মতো এতটুকু বারে বারে দেখেও তো সাধ মিটবে না।
সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পারের বাংলাদেশে কোটি মানুষ ভোরবেলায় অবৈধ পথেও এই ম্যাচ দেখতে উঠে যাবে, নিশ্চিত ধরে রাখো। খেলা দেখবে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলবে! যেন খুব প্রিয় একজন মানুষকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলবে — বিদায়।
তোমার সঙ্গে এই প্রতিটি মানুষের জীবনের একটা সময়ও বিদায় নিচ্ছে! কোনো একদিন, কোনো বাচ্চা যখন জিজ্ঞেস করবে, ‘মেসি কে ছিল?’ এই মানুষগুলো হয়তো কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকবে। কারণ, লিওনেল মেসি অন্য অনেকের কাছে একজন ফুটবলার, গ্রেট ফুটবলারও, কিন্তু এই কোটি মানুষের কাছে? একটা আবেগ, অনেকগুলো রাত, জীবনের একটা অধ্যায়জুড়ে হৃদয়ে জড়িয়ে যাওয়া একটা নাম।
মেসি কেমন খেলোয়াড় ছিলেন, সর্বকালের সেরা তিনি কি না, মেসির জায়গা কে নিতে পারে আর্জেন্টিনায় – সেসব আলোচনা চলবে। চলুক। বাংলাদেশে এতগুলো বছর তাকে দূর থেকে দেখে যাওয়া, ভালোবেসে যাওয়া কোটি হৃদয়ের কাছে মেসি মানেই ছিল আর্জেন্টিনা। হয়তো ফুটবলও। যাঁর পর ফুটবলটাকেও আর একই লাগবে না।
এমন একজনকে বিদায় জানানো সম্ভব?
আর্জেন্টিনা এরপরও খেলবে। বাংলাদেশ থেকে কোটি মানুষ আর্জেন্টিনাকে দেখেই যাবে। ম্যারাডোনার পরও তো দেখেছে। কিন্তু ম্যারাডোনাকে দেখা প্রজন্ম যেমন ম্যারাডোনাকে ভোলেনি, মেসিকে দেখা প্রজন্মের কাছে মেসিও তো তেমনই। হয়তো আরও বেশি কিছুই!
আর্জেন্টিনার নতুন কোনো নাম্বার টেনের খেলা দেখতে দেখতেই হয়তো স্মৃতি ভাসিয়ে নিয়ে যাবে ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার এক মুগ্ধতাজাগানিয়া নামের কাছে। মাঠের মেসি বিদায় নিতে পারেন, স্মৃতির মেসি তো চিরন্তন। যার যার নিজের।
তবে ওই কথাই রইল, মেসি!