ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের মধ্যকার সাম্প্রতিক শীর্ষ বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলটি এমন একটি বিষয়, যা আমরা সম্ভবত কখনোই জানতে পারব না- অথবা জানলেও তা জানতে অনেক সময় লেগে যাবে।
এর সাথে কোনো যৌথ বিবৃতি প্রকাশে প্রতিনিধিদলগুলোর ব্যর্থতা কিংবা বৈঠক সম্পর্কে উভয়পক্ষের দেওয়া বিবরণের মধ্যে বিশাল পার্থক্যের কোন সম্পর্ক নেই। বরং বিষয়টি হলো সেই ব্যক্তিগত উপলব্ধির, যা সি তার সফরের শেষে দুটি সম্পর্কিত প্রশ্নের বিষয়ে নিশ্চয়ই তৈরি করেছিলেন: ট্রাম্প আসলে মানুষটি কেমন এবং বর্তমান বিশ্বের মহাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা সম্পর্কে তার (ট্রাম্পের) প্রেসিডেন্সি কী বার্তা দেয়?
এ ধরনের কলাম স্বভাবতই কিছুটা অনুমাননির্ভর হয়ে থাকে, তাই আমিও আমার সেরা অনুমানগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছি। প্রথম বিষয়টি সবচেয়ে সহজ: সি-কে ‘লাল গালিচা’ সংবর্ধনা দেওয়া এবং প্রতিটি পদক্ষেপে তোষামোদ করার ক্ষেত্রে ট্রাম্প যে অস্বাভাবিক রকমের চাটুকারিতাপূর্ণ আচরণ করেছেন, তা তাদের দুজনকে প্রকৃত বন্ধুতে পরিণত করার কোন সম্ভাবনাই রাখে না- যদিও ট্রাম্প প্রায়শই এমনটা বিশ্বাস করেন বলে মনে হয়।
যেকোন দেশের মতোই চীনও গত কয়েক দশকে অনেক ভুল ও ভুল হিসাব-নিকাশের শিকার হয়েছে; তবে মাও-পরবর্তী যুগে তারা একটি সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নীতি নির্ধারণ করে থাকে। এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো চীনের- অথবা অন্ততপক্ষে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি)- স্বার্থের একটি সংযত ও যৌক্তিক মূল্যায়ন করা। সাধারণ বা ব্যক্তিগত পর্যায়ের বন্ধুত্বের সাথে এর খুব একটা সম্পর্ক নেই। এই নীতিটি আমি সি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের নাটকীয়তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে মনে করি। উল্লেখ্য, বেইজিংয়ের কৌশলগত মিত্র হিসেবে কাজ করে পুতিনের মস্কো।
কিছুটা অনুমাননির্ভর একটি ধারণা হলো, কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বের স্বরূপ সম্পর্কে ট্রাম্পের নিজস্ব ব্যাখ্যা বা আচরণ দেখে প্রেসিডেন্ট সি হয়তো বেশ আমোদই পেয়েছিলেন। মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এটি এখন একটি সাধারণ কথায় পরিণত হয়েছে যে, ট্রাম্প রাজার মতো অসীম ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। তার অত্যধিক সোনালি সাজসজ্জার ব্যবহার এবং স্মৃতিস্তম্ভ বা বিশাল স্থাপনা তৈরির বাতিক- বিশেষ করে এমন সব স্থাপনা যা যুগ যুগ ধরে তার নাম বহন করবে- সেগুলোকে আর কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? কিন্তু হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প যখন সি-কে তার হেলিপ্যাড ও নির্মাণাধীন বলরুম ঘুরে দেখাচ্ছিলেন এবং সেগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করছিলেন, তখন মনে হয়েছে সি নিশ্চয়ই তাকে একজন বোকা মানুষ হিসেবেই গণ্য করেছিলেন। কারণ, গত ১৩ বছরেরও বেশি সময়ে সি নিজের হাতে বিপুল ক্ষমতা কুক্ষিগত করলেও, ব্যক্তিগত জাঁকজমক প্রদর্শনের পেছনে তিনি তার শক্তির খুব সামান্যই ব্যয় করেছেন।
ট্রাম্প যখন তাকে এমন একটি প্যাভিলিয়নের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন যার সোনালি মোড়কযুক্ত দেয়ালে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের প্রতিকৃতি শোভা পাচ্ছিল, তখনো সি নিশ্চয়ই তার এই প্রতিপক্ষের বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেছিলেন। সেখানে ছবিগুলো এমনভাবে ক্রমানুসারে সাজানো হয়েছিল যে ট্রাম্পের ছবিটি ছিল সবার ওপরে। বিষয়টি এমনিতেই দৃষ্টিকটু; তার ওপর, ট্রাম্প যখন তার পূর্বসূরি জো বাইডেনের জন্য নির্ধারিত ফ্রেমটির সামনে থামলেন, তখন চীনা নেতাকে বরাবরের মতোই নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। বাইডেনের প্রতিকৃতির পরিবর্তে সেখানে ছিল ‘অটোপেন’ (স্বয়ংক্রিয় স্বাক্ষরকারী যন্ত্র)-এর একটি ছবি- যে যন্ত্রটি বাইডেন প্রায়শই সরকারি নথিপত্রে স্বাক্ষর করার জন্য ব্যবহার করতেন (যেমনটি তার আগের প্রেসিডেন্টরাও করতেন)।
ট্রাম্প সম্ভবত একটি বিষয় খেয়াল করেননি যে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে সতর্ক পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি- যেমনটি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রচলিত সেই বিখ্যাত প্রবাদটিতে বলা হয়েছে: ‘দেশের সীমানা পেরোলেই অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমাপ্তি ঘটে’। ২০২২ সালের অক্টোবরে সি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন যখন তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় সিসিপি কর্মকর্তাদের কংগ্রেস চলাকালীন তার পূর্বসূরি হু জিনতাওকে সভাকক্ষ থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এটা এমন দেশে হয়েছে যেখানে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ সচরাচর প্রকাশ্যে আসে না, সেখানে এটি ছিল এক বিরল ঘটনা।
কিন্তু বিদেশে অবস্থানকালে নিজের কোন পূর্বসূরির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিরূপ মন্তব্য করার বিষয়টি সি-র ক্ষেত্রে অকল্পনীয়। কারণ, রাষ্ট্রপরিচালনার বিষয়ে সচেতন অন্যান্য দেশের নেতাদের মতোই তিনিও বোঝেন যে, বিদেশে থাকাকালে তার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো নিজের দেশ ও তার শাসনব্যবস্থার একটি ঐক্যবদ্ধ ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা। অন্ততপক্ষে সি নিশ্চয়ই এটা বুঝেছিলেন যে ট্রাম্পের চিন্তা-ভাবনায় গভীর বিভ্রান্তি রয়েছে; বিশেষ করে যখন ট্রাম্প তার উপস্থিতিতেই মার্কিন গণমাধ্যমের সমালোচনা করেন এবং বেইজিংয়ের নির্দেশ অনুযায়ী সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে চীনা গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রতি ঈর্ষা প্রকাশ করেন- যা তিনি খুব একটা গোপনও রাখেননি। ট্রাম্পের ধারণা অনুযায়ী, সরকার-সমর্থক গণমাধ্যম ব্যবস্থা মানেই হলো এমন সব সংবাদমাধ্যমকে নিষিদ্ধ করা যাদের সমালোচনা তাকে ক্ষুব্ধ করে। কিন্তু সি-র বিষয়টি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রয়েছে। মার্কিন ও চীনা সংবাদমাধ্যম ব্যবস্থার মধ্যকার এই পার্থক্যের মূল কারণ নিহিত রয়েছে গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের মৌলিক পার্থক্যের মধ্যে।
তবে এর বাইরে আরও একটি বিষয় রয়েছে: যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে নিশ্চিত করা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দীর্ঘকাল ধরে কেবল আইনি সুরক্ষার বিষয়ই ছিল না, বরং এটি এমন এক ব্যবস্থার গভীর জাতীয় আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন যা নিজের সমালোচকদের ভয় পায় না। এই প্রেক্ষাপটে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে- সি কি এমন কোনো পরিস্থিতি দেখছিলেন যেখানে একজন প্রেসিডেন্ট কেবল হাস্যকর বা ব্যঙ্গাত্মক চরিত্রে পরিণত হচ্ছেন তা নয়, বরং একটি জাতি তার পথ হারিয়ে ফেলছে? সেই সাথে হারিয়ে ফেলছে সেই আত্মবিশ্বাস, যার প্রতি চীনা নেতারা দীর্ঘকাল ধরে শ্রদ্ধা পোষণ করে এসেছেন এবং যা তাদের ঈর্ষারও কারণ ছিল।
তুলনামূলক বিচারে দেখা যায়, সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি শাসনব্যবস্থায় এই দুই নেতা কীভাবে কাজ করেছেন। সির শাসনকে দেখা উচিত প্রায় নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দখলের এক কৌশলগত ও অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ প্রক্রিয়া হিসেবে। কারও কারও মতে, এর সূচনা হয়েছিল ২০১২ সালের শেষের দিকে চীনের নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণের আগেই- সে বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি প্রায় দুই সপ্তাহের জন্য লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গিয়েছিলেন। অনেক ভাষ্যমতে, প্রবীণ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিজের জন্য বাড়তি ক্ষমতা আদায়ের লক্ষ্যে তিনি এই কৌশলটি ব্যবহার করেছিলেন; মাও-পরবর্তী যুগে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য নেতারা যে পরিমাণ ক্ষমতা পেতেন, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতা তিনি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন।
এরপর থেকে সি সুপরিকল্পিতভাবে ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য কেবল দুর্নীতি দমনই ছিল না, বরং দলের যেসব কর্মকর্তার আনুগত্য নিয়ে তার সন্দেহ ছিল, তাদের সরিয়ে দেওয়াও ছিল এর লক্ষ্য। চীনের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও তিনি একই কৌশল অবলম্বন করেছেন; বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাকে হয় কারারুদ্ধ করেছেন, নয়তো বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছেন। অন্যান্য পদক্ষেপের পাশাপাশি এই কৌশলের কারণেই সি অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশ শাসনের সক্ষমতা অর্জন করেছেন এবং মাও-এর সময় থেকে চলে আসা ‘পাঁচ বছর মেয়াদে সর্বোচ্চ দুবার দায়িত্ব পালনের’ প্রথাকে পাশ কাটিয়েছেন। ক্ষমতার ওপর সির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এই পদ্ধতিকে অনেকটা ‘বোয়া কনস্ট্রিক্টর’ (এক ধরনের বিশাল অজগর) সাপের শিকার ধরার কৌশলের সাথে তুলনা করা যেতে পারে- যেখানে ধীরে ধীরে কিন্তু অবিরামভাবে শিকারের ওপর আঁটসাঁট বাঁধন শক্ত করা হয়।
ট্রাম্প যা করেছেন- বিশেষ করে তার দ্বিতীয় মেয়াদে- তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শেষ পর্যন্ত কল্যাণকর হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া কঠিন। আর আমার এই নিরাশার বড় একটি কারণ হলো তার নেতৃত্বের ধরন। সি চিনপিংয়ের তুলনায় ট্রাম্পকে একজন অপটু আনাড়ি বলেই মনে হয়- এমন এক ব্যক্তি যিনি কোন বিষয়ে গভীর অনুসন্ধিৎসা বা সঠিক জ্ঞানের তোয়াক্কা না করে কেবল নিজের সহজাত প্রবৃত্তি ও খেয়ালখুশি অনুযায়ী কাজ করেন; যার মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণের বালাই নেই বললেই চলে এবং যিনি নিজের তথাকথিত মহত্ত্ব, রসবোধ ও প্রজ্ঞার গুণগান গাইতে বা তা উদযাপন করতে পছন্দ করেন।
যাদের কাছে এই মূল্যায়ন কঠোর মনে হতে পারে, তারা রিপাবলিকান পার্টির অন্যতম বড় দাতা ও বিলিয়নেয়ার পিটার থিলের সাম্প্রতিক মন্তব্যটি বিবেচনা করে দেখতে পারেন। থিল উল্লেখ করেছেন যে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসন তার প্রথম মেয়াদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সামাল দিতে গিয়ে অতি-সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে এমন সব ‘আনুগত্যের পরীক্ষা’ চাপিয়ে দিয়েছে, যার ফলে- তার ভাষায়- প্রশাসনটি এখন “খুব একটা বুদ্ধিমান নয়, কিন্তু অনুগত” লোকে পূর্ণ হয়ে গেছে। এই সিদ্ধান্তের কৌশলগত ফলাফল এখন বিশ্বমঞ্চে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে- ইরান ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ইউক্রেন এবং পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত।
এর ফলে, সি চিনপিংয়ের সম্ভাব্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুল হিসাব-নিকাশগুলোর একটি ঘটার আশঙ্কা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। এখন সি হয়তো নিজের ও চীনের সক্ষমতা ও শক্তিকে (যেমন- তাইওয়ান বা জাপানকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে) অতিরঞ্জিত করে দেখার এবং ট্রাম্প-যুগের আত্মঘাতী বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে খাটো করে দেখার প্রবণতা দেখাতে পারেন- অথচ সেই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা কোনভাবেই সহজ কাজ হবে না।
হাওয়ার্ড ডব্লিউ. ফ্রেঞ্চ: ফরেন পলিসির কলাম লেখক।
(ওয়াশিংটনভিত্তিক মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসির সৌজন্যে লেখাটি প্রকাশিত হলো।)