সুদীপ্ত সালাম

রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির ঘিরে থাকা কিংবদন্তি ও ইতিহাসের চেয়ে এখানকার দুর্গা বিগ্রহের গল্প কম চমকপ্রদ নয়। মন্দিরে দেব-দেবীর স্থায়ী প্রতিমাকেই বিগ্রহ বলে। একটি অষ্টধাতুর তৈরি দশভুজা দুর্গা ঢাকেশ্বরী মন্দিরের বিগ্রহ। এই দুর্গা প্রতিমার দীর্ঘ ইতিহাস তো রয়েছেন, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি।
দেড় ফুট লম্বা দুর্গামূর্তি প্রায় ৮০০ বছরের প্রাচীন। কিন্তু ঢাকার মন্দিরে এখন যে প্রতিমাটি রয়েছে, সেটি তৈরি করা হয়েছিল ১৯৯১ সালে। এটি আসলে রেপ্লিকা বা প্রতিরূপ। সবচেয়ে প্রাচীন দেবী মূর্তিটি নিরাপত্তার জন্য ১৯৪৭ সালে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। আর এখন যে রেপ্লিকাটি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে রয়েছে, সেটিও প্রথম রেপ্লিকা নয়। দেশভাগের সময় মূল দেবী মূর্তিটি কলকাতায় নেওয়ার পর, ১৯৪৮ সালে প্রথম রেপ্লিকা তৈরি করা হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর একটি অংশ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে। সেই ডামাডোলে গভীর রাতে সেনাবাহিনীর পোশাক পরা একদল লোক এসে সেবায়েতদের গানপয়েন্টে রেখে মন্দিরের জিনিসপত্র দুই বস্তায় ভরে চলে যায়।
ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিচালনা কমিটির সদস্য কাজল দেবনাথ চরচাকে জানিয়েছেন, “বংশপরম্পরায় পাওয়া ঢাকেশ্বরী মন্দিরের বিগ্রহটি অষ্টধাতুর তৈরি দুর্গা বিগ্রহ। ১৯৪৭ সালে যখন দেশবিভাগ হয়ে গেল, মন্দিরের যারা ছিলেন তারা ভাবলেন, এই বিগ্রহ, এই মন্দিরই হয়তো রাখতে পারব না। যতদূর জানি, তখন বিগ্রহটি নারায়ণগঞ্জের এক ব্যবসায়ীর (সম্ভবত দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরী) উদ্যোগে বিগ্রহটি কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। এটি নিয়ে যান ঢাকেশ্বরী মন্দিরের সে সময়ের সেবায়েত প্রহ্লাদ মোহন তেওয়ারি এবং হরিহর চক্রবর্তী। কলকাতায় নিয়ে কুমারটুলীতে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেটি এখনো আছে, ওখানে একটি ছোট্ট মন্দির করে, বিগ্রহটি ওখানে রাখা হয়।”
কাজল দেবনাথ জানান, ১৯৪৮ সালে সেবায়েত হেমচন্দ্র চক্রবর্তীর উদ্যোগে যে অষ্টধাতুর রেপ্লিকাটি তৈরি করা হয়েছিল, তা ১৯৫০ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় লুট হয়। ১৯৫১ সালে ভক্তরা মিলে আরেকটি অষ্টধাতুর রেপ্লিকা তৈরি করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর একটি অংশ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে। সেই ডামাডোলে গভীর রাতে সেনাবাহিনীর পোশাক পরা একদল লোক এসে সেবায়েতদের গানপয়েন্টে রেখে মন্দিরের জিনিসপত্র দুই বস্তায় ভরে চলে যায়।
পরে মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, দুর্গা বিগ্রহ ও স্বর্ণালঙ্কর নেই। তারপর ১৯৮৩ সালে মরণচাঁদ ঘোষের (মরণচাঁদ মিষ্টির প্রতিষ্ঠাতা) ছেলে হরিপদ ঘোষ কলকাতা থেকে একটি অষ্টধাতুর রেপ্লিকা করিয়ে আনেন। তারপর ১৯৯০ সালে মন্দিরে আরো একবার লুট হয়। এরশাদবিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। ভারতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে–এমন অপপ্রচার ছড়িয়ে বাংলাদেশে হিন্দুবিরোধী সহিংসতা শুরু হয়। তখন দুর্গা প্রতিমা, সিংহাসন ও অলঙ্কার লুট হওয়ার পাশাপাশি, পুরো মন্দিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ১৯৯১ সালে ব্যাংকার দিলীপ দাশগুপ্ত প্রতিমা গড়ে দেন। আর তার সিংহাসন বানিয়ে দেন চিকিৎসক অরূপ রতন চৌধুরী। পুরনো বিগ্রহের আদলে এই বিগ্রহটি তৈরি করেছিলেন ভাস্কর শংকর ধর। বিগ্রহটি এখনো ঢাকেশ্বরী মন্দিরের বিরাজমান।

হিন্দু পুরাণ ও কিংবদন্তি অনুযায়ী, ব্রহ্মা-পুত্র দক্ষ প্রজাপতির অসংখ্য কন্যার মধ্যে সতী অন্যতম। ব্রহ্মা ঠিক করলেন সতীর বিয়ে দেবেন শিবের সঙ্গে। কিন্ত পাত্র হিসেবে শিবকে পছন্দ হলো না দক্ষের। ব্রহ্মা তাকে বোঝালেন, সকল জীবের পরম ঈশ্বর শিব, তার মতো পাত্র জগতে দ্বিতীয়টি নেই। দক্ষ মেনে নিলেন, মনে নিলেন না। ব্রহ্মা সতীকে হিমালয়ে নিয়ে শিবের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলেন। শিবকে স্বামী হিসেবে পেয়ে সতীর আনন্দের শেষ নেই। সকল দেবী-দেবতা গেলেন নব বর-বধূকে দেখতে। দক্ষও গেলেন। সেখানে গিয়ে দক্ষ অপমানিত বোধ করলেন। তার মনে হলো তাকে যথাযথ সম্মান করা হচ্ছে না।
একদিন দক্ষ এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করলেন, সেখানে তিনি সব দেবী-দেবতাদের আমন্ত্রণ করলেও নিমন্ত্রণ করলেন না নিজের কন্যা ও জামাতাকে। সতী সেই যজ্ঞে যাওয়ার অগ্রহ প্রকাশ করলে শিব বললেন, নিমন্ত্রণ ছাড়া সেখানে যাওয়া ঠিক হবে না। সতী যুক্তি দিলেন, বাপের বাড়ি যেতে কন্যার নিমন্ত্রণের প্রয়োজন হবে কেন! শিব তাও বললেন, বিনা আমন্ত্রণে সেখানে গিয়ে তুমি অপমানিত হবে। সতী তো আসলে দুর্গা। তিনি তখন শিবকে তার দশমাবিদ্যা রূপ (১০ রূপ) দেখান। এই রূপ দেখে শিব সতীকে যজ্ঞে যাওয়ার অনুমতি দেন।
ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের আঘাতে দেবী সতীর শরীরের ৫১টি টুকরো হয়েছিল। এই টুকরোগুলো যেখানে যেখানে পড়েছিল, সেখানেই একটি করে মন্দির (পীঠস্থান) গড়ে ওঠে। সতীর মুকুটের রত্নটি যেখানে পড়েছিল, সেখানেই স্থাপন করা হয়েছিল আজকের ঢাকেশ্বরী মন্দির।
সতী যজ্ঞে গেলেন এবং শিবের কথাই সত্য হলো। দক্ষ সতীকে অপমান তো করলেনই–শিবকে গালমন্দ করেন। তার কথা হলো, শিব শ্মশানে-মশানে থাকে, ভাঙ খায়, উলঙ্গ, গায়ে ঘোরে, ছাই মাখে, কোন বেশভূষা নেই, মাথায় জটা আর ভূতপ্রেত তার অনুচর। স্বামীর নিন্দা শুনতে না পেরে সতী প্রাণবায়ু রোধ করে যজ্ঞস্থলে প্রাণ দেন। শিব তা জানতে পেরে মহাক্রুদ্ধ হন। তিনি যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হয়ে যজ্ঞ লণ্ডভণ্ড করে দেন। তার ক্রোধ থেকে জন্ম নেওয়া বীরভদ্র দক্ষের মাথা ছিন্ন করেন। পরে অবশ্য ব্রহ্মার অনুরোধে ছাগলের মাথা দক্ষের কাঁধে যুক্ত করে তাকে জীবিত করা হয়।
যা হোক, ধ্বংসলীলা শেষে সবাই যজ্ঞস্থল ছেড়ে চলে গেলেন। প্রাণহীন সতীর দেহ নিয়ে থাকলেন শুধু শিব। তিনি সতীকে হারিয়ে পাগলের মতো হয়ে যান। সতীর দেহ কাঁধে তুলে তিনি চলতে শুরু করলেন। এক বছর পূর্ণ হলো–তবুও শিবের শোক শেষ হয় না। এভাবে চলতে থাকল তো সৃষ্টি শেষ হয়ে যাবে–দেবতারা বিষ্ণুর শরণাপন্ন হলেন। বিষ্ণু বুঝলেন, সতীর দেহ বিনষ্ট না করলে শিবকে ফেরানো যাবে না।
ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের আঘাতে দেবী সতীর শরীরের ৫১টি টুকরো হয়েছিল। এই টুকরোগুলো যেখানে যেখানে পড়েছিল, সেখানেই একটি করে মন্দির (পীঠস্থান) গড়ে ওঠে। সতীর মুকুটের রত্নটি যেখানে পড়েছিল, সেখানেই স্থাপন করা হয়েছিল আজকের ঢাকেশ্বরী মন্দির।

দ্বাদশ শতাব্দীতে সেন রাজবংশের বল্লাল সেন এটি তৈরি করেছিলেন। তিনি কেন এই মন্দির তৈরির উদ্যোগ নিলেন, তা নিয়েও একাধিক গল্প প্রচলিত আছে। বিজয় সেনের স্ত্রী নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে পুণ্যস্নানে যান। সেখান থেকে ফেরার পথে বল্লাল সেনের জন্ম হয়। বল্লাল সেন সিংহাসনে বসে জন্মস্থানকে স্মরণীয় করে রাখতে ঢাকেশ্বরী মন্দির স্থাপন করেন। আরও বলা হয়, রাজা বল্লাল সেনও একবার স্বপ্নে দেখেন জঙ্গলে অবহেলা-অযত্নে পড়ে আছেন দেবী। তিনি দেবীকে উদ্ধার করে যে মন্দিরটি গড়ে দেন, তাই ঢাকেশ্বরী মন্দির নামের পরিচিতি পায়।
আমার জানামতে, আমাদের সম্প্রদায়ের তরফ থেকে কলকাতায় থাকা বিগ্রহটি ফেরত আনার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হই নাই।
তবে মন্দিরের বর্তমান রূপটি বেশি প্রাচীন নয়। ২০০ বছর আগে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির এক হিন্দু এজেন্ট মন্দিরটি সংস্কার করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। দুর্গা মন্দির ছাড়াও এখানে রয়েছে ৪টি শিবমন্দির। অনেকের মতে ষোড়শ শতকে রাজা মানসিংহ এগুলো তৈরি করেছিলেন।
১৯৪৭ সালে মূর্তিটি ঢাকা থেকে প্রথমে নেওয়া হয় ব্যবসায়ী দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরীর বাড়িতে। ১৯৫০ সালে তিনিই কুমারটুলিতে একটি মন্দির স্থাপন করেন–যার নাম ‘শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী মাতার মন্দির’। ঢাকেশ্বরী দেবীর প্রাচীন মূর্তিটি আজপর্যন্ত সেখানেই আছে। প্রাচীন বিগ্রহটি ফিরিয়ে আনার কোনো সম্ভাবনা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ ও মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সাবেক সভাপতি কাজল দেবনাথ বলেন, “আমার জানামতে, আমাদের সম্প্রদায়ের তরফ থেকে কলকাতায় থাকা বিগ্রহটি ফেরত আনার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হই নাই। ওই বিগ্রহটিকে আমি আদি বলব না। তার আগে আরো বিগ্রহ ছিল। যার খবর আমরা জানি না। ঐতিহাসিক তথ্য আমার কাছে নেই। আমার ব্যক্তিগত মত, রাজনৈতিক পরম্পরায় যা ঘটে গেছে, সেটি এনে প্রতিষ্ঠা করলেই মা আসবেন, এটা বলছি না। মা তার পীঠস্থানে আছেন।” তিনি আরো বলেন, “পূজা আমরা করি ঘটে, পটে, প্রতিমা বা বিগ্রহে। পীঠস্থানে ঘট আছে, চিরকালই ছিল। লুটপাটের পর আমরা ঘটে পূজা করেছি। ঘটের পেছনে কখনো ছবি দিয়েছি, কখনো বিগ্রহ দিয়েছি। সুতরাং এই পীঠস্থানে, ঢাকার মা হিসেবে মা দুর্গা আছেন, তিনি থাকবেন। বিগ্রহটি একটি প্রতীক।”
অনেকের মতে, দেবী ঢাকেশ্বরীর নাম থেকেই রাজধানী ঢাকার নামকরণ হয়েছে। ঢাকার ঢাকেশ্বরীই হোক কিংবা কলকাতার, এই মূর্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঢাকার ইতিহাস, দেশভাগের বেদনা এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতার উত্তাপ।
তথ্যসূত্র
দ্য স্টেটসম্যান, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২
ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী, মুনতাসীর মামুন
দ্য রোমান্স অব অ্যান ইস্টার্ন ক্যাপিটাল, ফ্রান্সিস ব্র্যাডলি ব্র্যাডলি-বার্ট
পৌরাণিক অভিধান, সুধীরচন্দ্র সরকার
ঈশ্বরের অবতার রহস্য, ভবেশ রায়
শ্রীশ্রীশিবপুরাণ
হিন্দু সম্প্রদায় কেন বাংলাদেশ ত্যাগ করছে, সালাম আজাদ

রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির ঘিরে থাকা কিংবদন্তি ও ইতিহাসের চেয়ে এখানকার দুর্গা বিগ্রহের গল্প কম চমকপ্রদ নয়। মন্দিরে দেব-দেবীর স্থায়ী প্রতিমাকেই বিগ্রহ বলে। একটি অষ্টধাতুর তৈরি দশভুজা দুর্গা ঢাকেশ্বরী মন্দিরের বিগ্রহ। এই দুর্গা প্রতিমার দীর্ঘ ইতিহাস তো রয়েছেন, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি।
দেড় ফুট লম্বা দুর্গামূর্তি প্রায় ৮০০ বছরের প্রাচীন। কিন্তু ঢাকার মন্দিরে এখন যে প্রতিমাটি রয়েছে, সেটি তৈরি করা হয়েছিল ১৯৯১ সালে। এটি আসলে রেপ্লিকা বা প্রতিরূপ। সবচেয়ে প্রাচীন দেবী মূর্তিটি নিরাপত্তার জন্য ১৯৪৭ সালে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। আর এখন যে রেপ্লিকাটি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে রয়েছে, সেটিও প্রথম রেপ্লিকা নয়। দেশভাগের সময় মূল দেবী মূর্তিটি কলকাতায় নেওয়ার পর, ১৯৪৮ সালে প্রথম রেপ্লিকা তৈরি করা হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর একটি অংশ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে। সেই ডামাডোলে গভীর রাতে সেনাবাহিনীর পোশাক পরা একদল লোক এসে সেবায়েতদের গানপয়েন্টে রেখে মন্দিরের জিনিসপত্র দুই বস্তায় ভরে চলে যায়।
ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিচালনা কমিটির সদস্য কাজল দেবনাথ চরচাকে জানিয়েছেন, “বংশপরম্পরায় পাওয়া ঢাকেশ্বরী মন্দিরের বিগ্রহটি অষ্টধাতুর তৈরি দুর্গা বিগ্রহ। ১৯৪৭ সালে যখন দেশবিভাগ হয়ে গেল, মন্দিরের যারা ছিলেন তারা ভাবলেন, এই বিগ্রহ, এই মন্দিরই হয়তো রাখতে পারব না। যতদূর জানি, তখন বিগ্রহটি নারায়ণগঞ্জের এক ব্যবসায়ীর (সম্ভবত দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরী) উদ্যোগে বিগ্রহটি কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। এটি নিয়ে যান ঢাকেশ্বরী মন্দিরের সে সময়ের সেবায়েত প্রহ্লাদ মোহন তেওয়ারি এবং হরিহর চক্রবর্তী। কলকাতায় নিয়ে কুমারটুলীতে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেটি এখনো আছে, ওখানে একটি ছোট্ট মন্দির করে, বিগ্রহটি ওখানে রাখা হয়।”
কাজল দেবনাথ জানান, ১৯৪৮ সালে সেবায়েত হেমচন্দ্র চক্রবর্তীর উদ্যোগে যে অষ্টধাতুর রেপ্লিকাটি তৈরি করা হয়েছিল, তা ১৯৫০ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় লুট হয়। ১৯৫১ সালে ভক্তরা মিলে আরেকটি অষ্টধাতুর রেপ্লিকা তৈরি করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর একটি অংশ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে। সেই ডামাডোলে গভীর রাতে সেনাবাহিনীর পোশাক পরা একদল লোক এসে সেবায়েতদের গানপয়েন্টে রেখে মন্দিরের জিনিসপত্র দুই বস্তায় ভরে চলে যায়।
পরে মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, দুর্গা বিগ্রহ ও স্বর্ণালঙ্কর নেই। তারপর ১৯৮৩ সালে মরণচাঁদ ঘোষের (মরণচাঁদ মিষ্টির প্রতিষ্ঠাতা) ছেলে হরিপদ ঘোষ কলকাতা থেকে একটি অষ্টধাতুর রেপ্লিকা করিয়ে আনেন। তারপর ১৯৯০ সালে মন্দিরে আরো একবার লুট হয়। এরশাদবিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। ভারতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে–এমন অপপ্রচার ছড়িয়ে বাংলাদেশে হিন্দুবিরোধী সহিংসতা শুরু হয়। তখন দুর্গা প্রতিমা, সিংহাসন ও অলঙ্কার লুট হওয়ার পাশাপাশি, পুরো মন্দিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ১৯৯১ সালে ব্যাংকার দিলীপ দাশগুপ্ত প্রতিমা গড়ে দেন। আর তার সিংহাসন বানিয়ে দেন চিকিৎসক অরূপ রতন চৌধুরী। পুরনো বিগ্রহের আদলে এই বিগ্রহটি তৈরি করেছিলেন ভাস্কর শংকর ধর। বিগ্রহটি এখনো ঢাকেশ্বরী মন্দিরের বিরাজমান।

হিন্দু পুরাণ ও কিংবদন্তি অনুযায়ী, ব্রহ্মা-পুত্র দক্ষ প্রজাপতির অসংখ্য কন্যার মধ্যে সতী অন্যতম। ব্রহ্মা ঠিক করলেন সতীর বিয়ে দেবেন শিবের সঙ্গে। কিন্ত পাত্র হিসেবে শিবকে পছন্দ হলো না দক্ষের। ব্রহ্মা তাকে বোঝালেন, সকল জীবের পরম ঈশ্বর শিব, তার মতো পাত্র জগতে দ্বিতীয়টি নেই। দক্ষ মেনে নিলেন, মনে নিলেন না। ব্রহ্মা সতীকে হিমালয়ে নিয়ে শিবের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলেন। শিবকে স্বামী হিসেবে পেয়ে সতীর আনন্দের শেষ নেই। সকল দেবী-দেবতা গেলেন নব বর-বধূকে দেখতে। দক্ষও গেলেন। সেখানে গিয়ে দক্ষ অপমানিত বোধ করলেন। তার মনে হলো তাকে যথাযথ সম্মান করা হচ্ছে না।
একদিন দক্ষ এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করলেন, সেখানে তিনি সব দেবী-দেবতাদের আমন্ত্রণ করলেও নিমন্ত্রণ করলেন না নিজের কন্যা ও জামাতাকে। সতী সেই যজ্ঞে যাওয়ার অগ্রহ প্রকাশ করলে শিব বললেন, নিমন্ত্রণ ছাড়া সেখানে যাওয়া ঠিক হবে না। সতী যুক্তি দিলেন, বাপের বাড়ি যেতে কন্যার নিমন্ত্রণের প্রয়োজন হবে কেন! শিব তাও বললেন, বিনা আমন্ত্রণে সেখানে গিয়ে তুমি অপমানিত হবে। সতী তো আসলে দুর্গা। তিনি তখন শিবকে তার দশমাবিদ্যা রূপ (১০ রূপ) দেখান। এই রূপ দেখে শিব সতীকে যজ্ঞে যাওয়ার অনুমতি দেন।
ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের আঘাতে দেবী সতীর শরীরের ৫১টি টুকরো হয়েছিল। এই টুকরোগুলো যেখানে যেখানে পড়েছিল, সেখানেই একটি করে মন্দির (পীঠস্থান) গড়ে ওঠে। সতীর মুকুটের রত্নটি যেখানে পড়েছিল, সেখানেই স্থাপন করা হয়েছিল আজকের ঢাকেশ্বরী মন্দির।
সতী যজ্ঞে গেলেন এবং শিবের কথাই সত্য হলো। দক্ষ সতীকে অপমান তো করলেনই–শিবকে গালমন্দ করেন। তার কথা হলো, শিব শ্মশানে-মশানে থাকে, ভাঙ খায়, উলঙ্গ, গায়ে ঘোরে, ছাই মাখে, কোন বেশভূষা নেই, মাথায় জটা আর ভূতপ্রেত তার অনুচর। স্বামীর নিন্দা শুনতে না পেরে সতী প্রাণবায়ু রোধ করে যজ্ঞস্থলে প্রাণ দেন। শিব তা জানতে পেরে মহাক্রুদ্ধ হন। তিনি যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হয়ে যজ্ঞ লণ্ডভণ্ড করে দেন। তার ক্রোধ থেকে জন্ম নেওয়া বীরভদ্র দক্ষের মাথা ছিন্ন করেন। পরে অবশ্য ব্রহ্মার অনুরোধে ছাগলের মাথা দক্ষের কাঁধে যুক্ত করে তাকে জীবিত করা হয়।
যা হোক, ধ্বংসলীলা শেষে সবাই যজ্ঞস্থল ছেড়ে চলে গেলেন। প্রাণহীন সতীর দেহ নিয়ে থাকলেন শুধু শিব। তিনি সতীকে হারিয়ে পাগলের মতো হয়ে যান। সতীর দেহ কাঁধে তুলে তিনি চলতে শুরু করলেন। এক বছর পূর্ণ হলো–তবুও শিবের শোক শেষ হয় না। এভাবে চলতে থাকল তো সৃষ্টি শেষ হয়ে যাবে–দেবতারা বিষ্ণুর শরণাপন্ন হলেন। বিষ্ণু বুঝলেন, সতীর দেহ বিনষ্ট না করলে শিবকে ফেরানো যাবে না।
ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের আঘাতে দেবী সতীর শরীরের ৫১টি টুকরো হয়েছিল। এই টুকরোগুলো যেখানে যেখানে পড়েছিল, সেখানেই একটি করে মন্দির (পীঠস্থান) গড়ে ওঠে। সতীর মুকুটের রত্নটি যেখানে পড়েছিল, সেখানেই স্থাপন করা হয়েছিল আজকের ঢাকেশ্বরী মন্দির।

দ্বাদশ শতাব্দীতে সেন রাজবংশের বল্লাল সেন এটি তৈরি করেছিলেন। তিনি কেন এই মন্দির তৈরির উদ্যোগ নিলেন, তা নিয়েও একাধিক গল্প প্রচলিত আছে। বিজয় সেনের স্ত্রী নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে পুণ্যস্নানে যান। সেখান থেকে ফেরার পথে বল্লাল সেনের জন্ম হয়। বল্লাল সেন সিংহাসনে বসে জন্মস্থানকে স্মরণীয় করে রাখতে ঢাকেশ্বরী মন্দির স্থাপন করেন। আরও বলা হয়, রাজা বল্লাল সেনও একবার স্বপ্নে দেখেন জঙ্গলে অবহেলা-অযত্নে পড়ে আছেন দেবী। তিনি দেবীকে উদ্ধার করে যে মন্দিরটি গড়ে দেন, তাই ঢাকেশ্বরী মন্দির নামের পরিচিতি পায়।
আমার জানামতে, আমাদের সম্প্রদায়ের তরফ থেকে কলকাতায় থাকা বিগ্রহটি ফেরত আনার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হই নাই।
তবে মন্দিরের বর্তমান রূপটি বেশি প্রাচীন নয়। ২০০ বছর আগে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির এক হিন্দু এজেন্ট মন্দিরটি সংস্কার করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। দুর্গা মন্দির ছাড়াও এখানে রয়েছে ৪টি শিবমন্দির। অনেকের মতে ষোড়শ শতকে রাজা মানসিংহ এগুলো তৈরি করেছিলেন।
১৯৪৭ সালে মূর্তিটি ঢাকা থেকে প্রথমে নেওয়া হয় ব্যবসায়ী দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরীর বাড়িতে। ১৯৫০ সালে তিনিই কুমারটুলিতে একটি মন্দির স্থাপন করেন–যার নাম ‘শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী মাতার মন্দির’। ঢাকেশ্বরী দেবীর প্রাচীন মূর্তিটি আজপর্যন্ত সেখানেই আছে। প্রাচীন বিগ্রহটি ফিরিয়ে আনার কোনো সম্ভাবনা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ ও মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সাবেক সভাপতি কাজল দেবনাথ বলেন, “আমার জানামতে, আমাদের সম্প্রদায়ের তরফ থেকে কলকাতায় থাকা বিগ্রহটি ফেরত আনার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হই নাই। ওই বিগ্রহটিকে আমি আদি বলব না। তার আগে আরো বিগ্রহ ছিল। যার খবর আমরা জানি না। ঐতিহাসিক তথ্য আমার কাছে নেই। আমার ব্যক্তিগত মত, রাজনৈতিক পরম্পরায় যা ঘটে গেছে, সেটি এনে প্রতিষ্ঠা করলেই মা আসবেন, এটা বলছি না। মা তার পীঠস্থানে আছেন।” তিনি আরো বলেন, “পূজা আমরা করি ঘটে, পটে, প্রতিমা বা বিগ্রহে। পীঠস্থানে ঘট আছে, চিরকালই ছিল। লুটপাটের পর আমরা ঘটে পূজা করেছি। ঘটের পেছনে কখনো ছবি দিয়েছি, কখনো বিগ্রহ দিয়েছি। সুতরাং এই পীঠস্থানে, ঢাকার মা হিসেবে মা দুর্গা আছেন, তিনি থাকবেন। বিগ্রহটি একটি প্রতীক।”
অনেকের মতে, দেবী ঢাকেশ্বরীর নাম থেকেই রাজধানী ঢাকার নামকরণ হয়েছে। ঢাকার ঢাকেশ্বরীই হোক কিংবা কলকাতার, এই মূর্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঢাকার ইতিহাস, দেশভাগের বেদনা এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতার উত্তাপ।
তথ্যসূত্র
দ্য স্টেটসম্যান, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২
ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী, মুনতাসীর মামুন
দ্য রোমান্স অব অ্যান ইস্টার্ন ক্যাপিটাল, ফ্রান্সিস ব্র্যাডলি ব্র্যাডলি-বার্ট
পৌরাণিক অভিধান, সুধীরচন্দ্র সরকার
ঈশ্বরের অবতার রহস্য, ভবেশ রায়
শ্রীশ্রীশিবপুরাণ
হিন্দু সম্প্রদায় কেন বাংলাদেশ ত্যাগ করছে, সালাম আজাদ

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে অস্বস্তিতে ছিলেন। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, এই মন্ত্রণালয়ে পাহাড়ি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পাশাপাশি চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনের সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী ন