জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের আসনে উন্নয়ন তদারকি এবং রাজনৈতিক সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিএনপির সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যদের (এমপি)। এতে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী থেকে বেশ কয়েকবার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে।
বিরোধী দল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সমন্বয় নাকি ‘ভিন্ন’ কোন উদ্দেশ্য আছে? বিষয়টিকে বিরোধী দলের এমপিদের ওপর ‘খবরদারি’ হিসেবেই দেখছেন জামায়াতের সংসদ সদস্যরা। তবে বিএনপির সংরক্ষিত এমপিরা বলছেন, কোন ধরনের খবরদারি তাদের উদ্দেশ্য নয়। এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিশ্চিত করতেই তাদের এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
গত জুন মাসে সংসদ ভবনে বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় দলের ৩৬ সংরক্ষিত এমপিকে ৭৯টি আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোট। সর্বশেষ মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর আলোচনায় আসেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের দুই এমপি। সেখানে অবশ্য রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ফলে এ ঘটনা ঘটেনি। তবে ওই এলাকায় বিএনপির সংরক্ষিত এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ঢাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন।
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। ফাইল ছবি
বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মতে, সংরক্ষিত আসনের এমপিদের দায়িত্ব দেওয়ায় কাজে সমন্বয়হীনতা তৈরি হচ্ছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামী সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ওই ঘটনার জন্য বিরোধী সংসদ সদস্যদের আসনে নারী এমপির দায়িত্ব দেওয়ার সমালোচনা করেন। পরওয়ার অভিযোগ করেন, ‘‘এই যে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি হয়েছে, আমরা বলছি, সে কথা। সেখানে এখন মহিলা এমপিরা..., পত্র-পত্রিকা, মিডিয়া, টকশোতে আলোচনা হইতেছে..., যে মহিলা এমপিদের ইন্ধনে ও মদদে মামলা ও ভাঙচুরগুলো হলো। তারা দূর থেকে সেখানে মদদ দিচ্ছে।”
পরওয়ার বলেন, “এটা কোন দিন দেখিনি যে, নির্বাচিত এমপি জনগণ ভোট দিয়েছে, সেখানে অনির্বাচিত সংরক্ষিত সরকার দলীয় মহিলা এমপিদেরকে সেই এমপির ওপর খবরদারি, দারোগাগিরি করতে নিযুক্ত করা হয়েছে। এখন নির্বাচিত এমপির ডিও লেটার খারিজ হয়ে যাচ্ছে, মহিলা এমপির ডিও লেটার দিয়ে তার ইচ্ছা অনুসারে সেখানে বরাদ্দ হইতেছে।”
বিরোধী দল কেন উদ্বিগ্ন?
গত ২৫ আগস্ট বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের বিরোধী দলের আসনগুলোতে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে বসানো সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক বলে মন্তব্য করেন বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘‘সংবিধানের কোথাও সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের বিরোধী দলের আসনগুলোতে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে বসানোর কোন বিধান বা প্রভিশন নেই। অতীতেও বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে এ ধরনের কোন চর্চা ছিল না। এই অসাংবিধানিক পদায়নের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের প্রশ্ন করা হলে তারা একেকজন একেক ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন, যা সরকারের অবস্থানকে আরও অস্পষ্ট করে তুলেছে।”
মেহেরপুর-২ আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজমুল হুদা চরচাকে বলেন, ‘‘বিএনপির নারী সংসদ সদস্যের জন্যও যে বরাদ্দ আমাদের জন্যও সেই বরাদ্দ। তারাও ডিও লেটার দিচ্ছে, আমরাও দিচ্ছি। তবে তারা কীভাবে বরাদ্দ কাজে লাগাচ্ছে সেটা আমাদের জানা নেই।”
জামায়াতের এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘‘এটা বোঝা যাচ্ছে যে জাস্ট আমাদের ওপর একটি খবরদারি করার জন্যই এমনটা করা হয়েছে। আমরা হলাম, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। কিন্তু তারা (নারী এমপি) এসে, আমাদের ওপর টেক্কা দিয়ে ডিও লেটার দিচ্ছে, এমন অনেক জায়গা দিচ্ছে।”
এই এমপি বলেন, ‘‘এটা আসলে তাদের পাওয়ার পলিটিক্সের অবস্থা। তারা বোঝাতে চাচ্ছে, তারাই সরকারি দল। এছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একটি প্রভাব তৈরি করতে চাইছে।”
বিষয়টি নিয়ে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে অন্যায় বলে মনে করেন জামায়াতে ইসলামীর আরেক সংসদ সদস্য ও দলের নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি চরচাকে বলেন, ‘‘আমি একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি। আমার ওপরে যদি আরেক জায়গা থেকে এমপি নিয়ে এসে দেন তাহলে সমস্যা তো হতেই পারে। আমরা তো প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যার যার দলের নারী সংসদ সদস্য, তাদের দলীয় আসনেই দায়িত্বে থাকলে সহযোগিতা ও সখ্য থাকে।” এ ঘটনায় ইতোমধ্যেই কয়েকটি এলাকায় বিরোধ হয়েছে বলে জানান তিনি।
মিলন বলেন, ‘‘এটা তো ঠিক না। আমরা বলব, সরকার এ বিষয়ে অন্যায় করতেছে। তাদের উচিত তাদের এমপিকে তাদের আসনে বণ্টন করে দেওয়া আর আমাদের এমপিকে আমাদের সঙ্গে দেওয়া।”
যা বলছে বিএনপির এমপিরা
বিএনপির নারী এমপিরা বলছেন, কোন ধরনের সংঘাত তৈরি হয়নি। বিরোধী দলের এমপিরা তাদের কাজ করছেন আর নারী এমপিরা তাদের কাজ করছেন।
বিএনপি থেকে বলা হয়েছিল, সংরক্ষিত আসনের এমপিরা দলের কেন্দ্র ও স্থানীয় নেতাদের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করবেন এমন চিন্তা থেকেই ওই বিষয়টি করা হয়েছে। এতে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা যেমন হবে তেমনি উন্নয়ন নিয়েও কাজ করবেন সরকারি দলের নারী এমপিরা। আসনগুলোয় সরকারের প্রতিশ্রুতি পূরণের মধ্য দিয়ে জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত আসনেও আগামীতে ভালো ফলাফল সম্ভব হবে।
বিএনপির সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য আরিফা সুলতানা রুমাকে পাবনা-১, ৩ ও ৪ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সমন্বয় কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি চরচাকে বলেন, ‘‘আমরা আমাদের মতো কাজ করছি। উনাদের সঙ্গে আমার দেখাও হয় না।”
বিরোধী দলের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘এখানে দলীয়করণের কিছু নেই। আমাদের দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকে উনারা (বিরোধীরা) মনে করছেন যে আমরা উনাদের বাধা দিচ্ছি। আমরা বাধা দিচ্ছি না। আমাদের কাজ করেই তো আমরা শেষ করতে পারি না। কারণ আমরা তো এত সময় পাই না যে, কাউকে বিরক্ত করব।”
রুমা বলেন, ‘‘আসলে উনারা চায় যে আমরা এলাকায় না যাই। তাদেরও যে বরাদ্দ আমাদেরও একই বরাদ্দ। জামায়াতের নারী সংসদ সদস্যদেরও একই বরাদ্দ। আমরা আমাদের মতো যে বরাদ্দ দেই, দিচ্ছি- এতেই তাদের মাথায় যেন আগুন ধরে যায়, যে আমরা কেন যাচ্ছি।”
স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে প্রভাব তৈরির জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে- এমন অভিযোগ নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের তো পাঁচ বছরের জন্যই দায়িত্ব দিয়েছে। শুধু যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্যই দায়িত্ব দিয়েছে তা তো না। আমরা পাঁচ বছর ধরেই একই রকমভাবে কাজ করে যাব। আমার নিজের এলাকা ছাড়া আমি কোথায় যাব? আমার এলাকায় জামায়াতের এমপি। কিন্তু এটা তো আমারও নিজের এলাকা।”
বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফাহিমা নাসরিন মুন্নিকে ঝিনাইদহ-৩ ও ৪ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই দুটি আসনে নির্বাচিত এমপি জামায়াতের। চরচাকে মুন্নি বলেন, ‘‘আসলে এখানে খবরদারির তো কোন প্রশ্নই নেই। ওই এলাকায় যেহেতু আমাদের নির্বাচিত এমপি নেই, সেহেতু ওখানকার মানুষজনের চাহিদা, বিশেষ করে উন্নয়নমূলক যে কাজগুলো আছে, যেমন- রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, হাট-বাজার এ জায়গাগুলোতে যদি আমরা সাহায্য সহযোগিতা করতে পারি তাহলে তো সমস্যা কিছু নেই। এখানে দ্বন্দ্বের কোন বিষয় নেই।”
এই এমপি আরও বলেন, ‘‘বিরোধী দল উদ্বিগ্ন হতে পারে, কারণ তারা বিরোধী দল। কেবল বিরোধিতার জন্য কেউ যদি বিরোধিতা করে, কোন কিছু সত্যিকার অর্থে হৃদয়ঙ্গম না করে তাহলে সেটা অনাকাঙ্ক্ষিত।”
মুন্নি বলেন, ‘‘জামায়াত আমাদের অ্যালাই ছিল। অতীতে নির্বাচন যেমনই হোক সেখানে তারা ৪ থেকে ১২ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এবার তো তারা আর একটু হলে ফেসবুকে সরকার গঠন করে বসে ছিল, বট বাহিনী দিয়ে।”
প্রধানমন্ত্রী যা বলেছিলেন
বিরোধী দলীয় এমপিদের নির্বাচনী এলাকায় কেন সংরক্ষিত আসনের সরকার দলীয় নারী এমপিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে- জাতীয় সংসদে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১০ জুন সংসদে এ নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, উন্নয়ন বরাদ্দ এবং ডিও লেটারসহ সব ক্ষেত্রে সরকারের যে ‘নিয়ম’ আছে, সে অনুযায়ীই এগোচ্ছেন তারা। সে দিন ঢাকা-১৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেমের (আরমান) এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমাদের দল থেকে এবং আপনাদের দল থেকে যেসব নারীকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে, সংবিধানে বা আইনে নির্দিষ্টভাবে তাদের কোন আসন নেই। আপনার বা আমার যেকোনো নির্দিষ্ট আসন আছে, সে রকম নির্দিষ্ট কোন আসন তাদের নেই। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমরা আমাদের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক যে কাঠামো, তার ভিত্তিতে দলীয় অবস্থান থেকে কিছু জায়গা তাদের জন্য নির্দিষ্ট করেছি, তারা কোথায় কাজ করবেন।”
তারেক রহমান বলেন, ‘‘নির্বাচনী এলাকায় একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে আপনার সম্পূর্ণ হক আছে, আপনি এলাকার উন্নয়নের ব্যাপারে কীভাবে ভূমিকা রাখতে চান? যেহেতু এই সংসদ এই নারী নেত্রীদের বা নারী সংসদ সদস্যদের নির্বাচিত করেছেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই তাদেরও একই রকমভাবে হক আছে। আপনার এলাকার যদি কোন উন্নয়নের বিষয়ে আমার সহযোগিতা করার কিছু থাকলে, জানাবেন।”
অবশ্য সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের এমন দায়িত্ব দেওয়ায় সমস্যা দেখছেন না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। চরচাকে তিনি বলেন, ‘‘সরকারি দল তার প্রতিনিধি দিতেই পারে।” তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘‘যেখানে বিরোধী দল জয়ী হয়েছে সেখানে কি সরকারি দল রাজনীতি করবে না? বিরোধী দলের সংসদ সদস্য তার কাজ করবেন। সরকারি দলের সংসদ সদস্য তার দলের কাজ করবেন। বিএনপি যদি সেখানে নারী সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব দেয়, তাহলে কি নির্বাচিত সংসদ সদস্যের আইনগত অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে?”
তিনি বলেন, ‘‘জামায়াত ও এনসিপি যদি বিএনপিকে তাদের মতো করে কাজ করার জন্য চাপ দেয়, এটা কি সম্ভব? বিএনপি তো বিরোধী দলের আসনে তার প্রার্থীকে পাশ করিয়ে আনার জন্য কাজ করছে।”