Advertisement Banner

তুরস্ক-ইসরায়েল যুদ্ধের আশঙ্কা এখন সবচেয়ে বেশি বাস্তব

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
তুরস্ক-ইসরায়েল যুদ্ধের আশঙ্কা এখন সবচেয়ে বেশি বাস্তব
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

সম্প্রতি খবর ছড়ায় যে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ইসরায়েলে হামলার হুমকি দিয়েছেন। তবে পরে তুরস্কের পক্ষ থেকে এই ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। বলা হয়, উদ্ধৃতিটি পুরনো এবং প্রসঙ্গের বাইরে নেওয়া হয়েছে। তুর্কি পক্ষ জানায়, এরদোয়ান সরাসরি যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা বলেননি। তবুও তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন, ইসরায়েলকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বলেছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

এই ঘটনার প্রতিক্রিয়াই অনেক কিছু বোঝায়। আঙ্কারা ও পশ্চিম জেরুজালেমের সম্পর্ক এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, ছোট মন্তব্যও বড় সংকেত হয়ে দাঁড়ায়। যেকোনো তীব্র কথা আঞ্চলিক সংঘাতের অংশ হিসেবে দেখা হয়। এই অবস্থা হঠাৎ তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের সম্পর্কের পরিবর্তন এর পেছনে কাজ করেছে।

মস্কোর এইচএসই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং লেকচারার মুরাদ সাদিগজাদে এ বিষয়ে সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম আরটি-তে লিখেছেন, এটি শুধু আবেগের বিস্ফোরণ নয়। এর পেছনে গভীর পরিবর্তন আছে। তুরস্ক ও ইসরায়েল এখন একে অপরকে শুধু আংশিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে না। তারা একে অপরকে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। যখন সম্পর্ক এই পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি ভবিষ্যতের সংঘাতকে স্বাভাবিক হিসেবে ভাবতে শেখায়।

তবে সব সময় এমন ছিল না। এক সময় তাদের সম্পর্ক ভালো ছিল। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি তুরস্ক ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। এটি ছিল প্রথম মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর একটি। স্নায়ুযুদ্ধের সময় দুই দেশ বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখে। ১৯৯০-এর দশকে এই সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়। সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা ছিল ঘনিষ্ঠ। এতে তুরস্ক প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সুবিধা পায়। আর ইসরায়েল একটি বড় মুসলিম দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। ছবি: রয়টার্স
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। ছবি: রয়টার্স

এই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল পিকেকে নেতা আবদুল্লা ওসালানের গ্রেপ্তার। ১৯৯৯ সালে তাকে কেনিয়ায় আটক করা হয়। অনেকেই মনে করেন, এতে ইসরায়েলের সহায়তা ছিল। এই ধারণা এখনো এ অঞ্চলের রাজনৈতিক স্মৃতির অংশ।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সম্পর্ক বদলায়। এরদোয়ান ক্ষমতায় আসার পর নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। তুরস্ক শুধু পশ্চিমা জোটে থাকতে চায়নি, তারা মুসলিম বিশ্বে প্রভাব বাড়াতে চেয়েছে। প্রাক্তন উসমানীয় অঞ্চলেও সক্রিয় হতে চেয়েছে।

২০১০ সালের একটি ঘটনা বড় পরিবর্তন আনে। এ সময় ইসরায়েলি বাহিনী গাজাগামী জাহাজে অভিযান চালায়। এতে তুর্কি নাগরিক নিহত হন। এরপর সম্পর্ক দ্রুত খারাপ হয়, অবিশ্বাস বাড়তে থাকে। পরে সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা হলেও গাজা যুদ্ধ তা আবার ভেঙে দেয়।

বর্তমান উত্তেজনা শুধু ফিলিস্তিন ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। আরও কয়েকটি বড় বিষয় আছে। প্রথমত, সিরিয়া। এখানে তুরস্কের নিরাপত্তা, কুর্দি ইস্যু ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ইসরায়েলের দৃষ্টি ইরান ও হিজবুল্লাহর দিকে। এই স্বার্থগুলো অনেক সময় সংঘর্ষে রূপ নেয়।

দ্বিতীয়ত, পূর্ব ভূমধ্যসাগর। এখানে জ্বালানি ও সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ আছে। তৃতীয়ত, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা। তুরস্ক মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করতে চায়। ইসরায়েল তার সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি ধরে রাখতে চায়।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স

কুর্দি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্ক এটিকে অস্তিত্বের বিষয় হিসেবে দেখে। তারা যেকোনো কুর্দি গোষ্ঠীর বাইরের সমর্থনকে হুমকি মনে করে। তাই ইসরায়েল নিয়ে কোনো সন্দেহও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, এই ধরনের সংঘাত হঠাৎ বড় যুদ্ধ দিয়ে শুরু হয় না। ছোট ছোট সংকট থেকে এটি বাড়ে। ভুল বোঝাবুঝি, শক্তি প্রদর্শন ও ভুল সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে খারাপ করে। এখনো সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়নি। দুই দেশই জানে যুদ্ধের খরচ বড় হবে। তাই কিছুটা সংযম আছে।

কিন্তু সমস্যা হলো, চারপাশের পরিবেশ দ্রুত খারাপ হচ্ছে। বিশ্বাস কমছে, সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত মুরাদ সাদিগজাদে বলেন, বড় বিপদ তাৎক্ষণিক যুদ্ধ নয়। বরং দুই দেশ ধীরে ধীরে একে অপরকে দীর্ঘমেয়াদী হুমকি হিসেবে দেখছে। একবার এই ধারণা তৈরি হলে, বক্তব্য ও রাজনীতি মানুষকে সংঘাতের জন্য প্রস্তুত করে। তখন ভবিষ্যতের যুদ্ধকে স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে।

দুটি শক্তিশালী দেশ ধীরে ধীরে একে অপরকে শুধু কঠিন প্রতিবেশী নয়, ভবিষ্যতের বড় প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শিখছে।

সম্পর্কিত