
অভিবাসন অপরাধ দমনে সহযোগিতা জোরদারে একমত ঢাকা ও লন্ডন
চুক্তির আওতায় নথি ও ভিসা জালিয়াতিসহ অনিয়মিত অভিবাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অপরাধ শনাক্ত করা, অপরাধী চক্রের কার্যক্রম ব্যাহত করা এবং এসব অপরাধ মোকাবিলায় দুই দেশ আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।

সহিদুল আলম স্বপন

বাংলাদেশের কূটনৈতিক সেবা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা মূলত কোনো একক রাষ্ট্রদূত বা নির্দিষ্ট দেশের মিশনকে ঘিরে নয়। বরং রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের চরিত্র, ভূমিকা ও পেশাগত স্বাধীনতা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের অংশ। রাজনৈতিক পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রসঙ্গ, নির্বাচনী প্রশ্ন, প্রবাসী রাজনীতি এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতির বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের ভূমিকা নিয়ে দেশ-বিদেশে মতবিনিময় হয়েছে। সেই আলোচনার প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে: কূটনীতিকদের ভূমিকা কোথায় রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বে সীমাবদ্ধ থাকবে, আর কোথায় তা সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে?
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রদূতেরা একটি দেশের নীতির বাহক। তারা নির্বাচিত সরকারের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান তুলে ধরেন এবং স্বাগতিক দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করেন। তাই কোনো রাষ্ট্রদূত সম্পূর্ণ রাজনৈতিক শূন্যতায় কাজ করেন না। একই সময়ে কূটনৈতিক পেশার একটি মৌলিক নীতি হলো প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা। অর্থাৎ সরকার পরিবর্তিত হলেও রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে কূটনীতিকের মূল দায়িত্ব অব্যাহত থাকে।
বাংলাদেশে এ প্রশ্ন নতুন নয়। তবে গত দেড় দশকে একক রাজনৈতিক নেতৃত্বের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতির কারণে বিষয়টি আরও দৃশ্যমান হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, কানাডা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত কূটনীতিকদের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে জনপরিসরে বিতর্ক ও আলোচনা দেখা গেছে। এসব আলোচনার প্রকৃতি অবশ্য এক নয়। কোথাও মানবাধিকার ইস্যুতে সরকারের অবস্থান তুলে ধরা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কোথাও প্রবাসী সংগঠনগুলোর সঙ্গে দূতাবাসের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে, আবার কোথাও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষার কৌশল নিয়ে মতভেদ লক্ষ করা গেছে।
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থায় বাংলাদেশের সক্রিয়তা এবং বিভিন্ন বহুপক্ষীয় উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের প্রথম নারী হাইকমিশনার হিসেবে ইতিহাসেরও অংশ। কিন্তু একই সময়ে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় বাংলাদেশি প্রবাসী সমাজের প্রেক্ষাপটে হাইকমিশনের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব আলোচনা মূলত কূটনৈতিক মিশনের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও জনসম্পৃক্ততার সীমারেখাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। এর আগে তিনি থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়ুত্ব পালন করেন।
কানাডায় সাবেক হাইকমিশনার ড. খলিলুর রহমানের সময়েও অনুরূপ বাস্তবতা দেখা যায়। তার দায়িত্বকালে বাংলাদেশ-কানাডা বাণিজ্য, বিমান যোগাযোগ, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত প্রবাসী সমাজে দূতাবাসের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মতও প্রকাশিত হয়েছে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন অনেক ক্ষেত্রেই পর্যবেক্ষকের রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
একইভাবে নাহিদা সোবহান, যিনি জর্ডান, কানাডা ও সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন, বহুপক্ষীয় কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মুখ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আলোচনায় তাকে বাংলাদেশের অবস্থান উপস্থাপন করতে হয়েছে। এই ধরনের দায়িত্বে নিয়োজিত কূটনীতিকদের প্রায়ই এমন বিষয় নিয়ে কথা বলতে হয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। ফলে তাদের বক্তব্যও কখনো কখনো জনআলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
বর্তমানে রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নজরুল ইসলাম দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন ক্যারিয়ার কূটনীতিক। তিনি এর আগে কাতার, ইথিওপিয়া এবং বিভিন্ন বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার কর্মজীবনের বড় অংশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কূটনীতিকে ঘিরে। তার মতো আরও অনেক কূটনীতিককে ঘিরে সরাসরি রাজনৈতিক বিতর্কের চেয়ে বরং পেশাগত অবদানই বেশি আলোচিত হয়েছে। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, পুরো কূটনৈতিক সেবাকে একটি একমাত্রিক রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা সবসময় বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
ফ্রান্সের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ প্রযোজ্য। বর্তমানে প্যারিসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন খন্দকার মোহাম্মাদ তালহা। তিনি একই সঙ্গে ইউনেসকোতে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি। তিনি দীর্ঘদিন ফরেন সার্ভিসে কাজ করেছেন এবং লন্ডন, নিউইয়র্ক ও জেনেভাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ফ্রান্সে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় প্রবাসী বাংলাদেশি সম্প্রদায় থাকলেও বর্তমান রাষ্ট্রদূতকে ঘিরে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত সরকারি তদন্ত বা বিচারিক সিদ্ধান্ত জনসমক্ষে পাওয়া যায় না। তবে তার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেসকোর তালিকায় স্থান পাওয়া নিয়ে বিতর্ক বাজারে চালু আছে।
এখানেই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। কূটনৈতিক অঙ্গনে জনসমালোচনা, রাজনৈতিক অভিযোগ ও প্রমাণিত তথ্য এক বিষয় নয়। কোনো রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ উঠলেই তা প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত হয় না। আবার একইভাবে কূটনৈতিক পদে থাকার ফলে সব কর্মকাণ্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে চলে যায় না। একটি পরিণত গণতান্ত্রিক সমাজে এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই মূল চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বের বহু দেশে সরকার পরিবর্তনের পরও ক্যারিয়ার কূটনীতিকেরা তাদের দায়িত্ব চালিয়ে যান। এর কারণ হলো, তাদের ভূমিকা রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধির নয়; রাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষাকারী পেশাজীবীর। পররাষ্ট্রসেবার শক্তি এখানেই। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা তখনই তৈরি হয়, যখন সেটি সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার মৌলিক চরিত্র হারায় না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই প্রশ্ন এখন নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে পররাষ্ট্রসেবা, প্রশাসন এবং অন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পেশাগত স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। এই আলোচনার ইতিবাচক দিক হলো, এটি ব্যক্তিকে নয়, প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এগোচ্ছে। কারণ কোনো দেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় তার প্রতিষ্ঠান কতটা শক্তিশালী, দক্ষ এবং নিরপেক্ষ তার ওপর।
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্যও এ বিষয়ের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। একটি দূতাবাস বা হাইকমিশন শুধুমাত্র সরকারের কার্যালয় নয়; এটি বিদেশে বসবাসরত প্রতিটি নাগরিকের রাষ্ট্রীয় ঠিকানা। সেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সবার সমান প্রবেশাধিকার ও আস্থা থাকা প্রয়োজন। একটি দূতাবাস যদি নিরপেক্ষ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হয়, তাহলে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে; আর যদি রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সেই গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক সেবার সামনে তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ব্যক্তি নয়, পদ্ধতি। রাষ্ট্রদূতেরা কীভাবে নিয়োগ পাবেন, কীভাবে মূল্যায়িত হবেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রকে কী ভাষায় উপস্থাপন করবেন এবং কীভাবে প্রবাসী সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবেন, এসব প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি নির্ধারণ করবে।
সর্বোপরি, সাইদা মুনা তাসনিম, ড. খলিলুর রহমান, নাহিদা সোবহান, নজরুল ইসলাম কিংবা খন্দকার মোহাম্মদ তালহাকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে যে আলোচনা হয়েছে, সেগুলোকে ব্যক্তিগত বিতর্ক হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যবস্থার বিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে প্রত্যাশিত পরিস্থিতি হলো এমন একটি কূটনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে রাষ্ট্রদূতেরা সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করবেন, কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ, প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা এবং পেশাগত নিরপেক্ষতাকেও সমান গুরুত্ব দেবেন। বাংলাদেশের কূটনীতির ভবিষ্যৎ শক্তি অনেকাংশে নির্ভর করবে সেই ভারসাম্য কতটা সফলভাবে রক্ষা করা যায় তার ওপর।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং কলামিস্ট ও কবি
ই মেইল: [email protected]

অভিবাসন অপরাধ দমনে সহযোগিতা জোরদারে একমত ঢাকা ও লন্ডন
চুক্তির আওতায় নথি ও ভিসা জালিয়াতিসহ অনিয়মিত অভিবাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অপরাধ শনাক্ত করা, অপরাধী চক্রের কার্যক্রম ব্যাহত করা এবং এসব অপরাধ মোকাবিলায় দুই দেশ আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।

জিবুতির উপকূলে নৌকাডুবিতে ১০৯ অভিবাসীর মৃত্যু
নৌকাটি জিবুতি থেকে ইয়েমেনের দিকে যাচ্ছিল। বৃহস্পতিবার রাতে অথবা শুক্রবার সকালে এটি ডুবে যায়। এ ঘটনায় ৫২ জন পুরুষ, ৪২ জন নারী ও ১৫ শিশু মারা গেছে। দুর্ঘটনা থেকে ৮০ জনের বেশি বেঁচে ফিরেছে। তবে অন্তত ১১৬ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছে।

জনশক্তি রপ্তানির গণ্ডি ছাড়িয়ে ঢাকা-রিয়াদকে বৃহত্তর কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়তে হবে
বক্তারা বলেন, সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির আওতায় দেশটির পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে বাংলাদেশের কর্মশক্তি উন্নয়নকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে ন্যায্য নিয়োগপ্রক্রিয়া, শ্রমিকদের অধিকার এবং অভিবাসী কর্মীদের উন্নত সুরক্ষা।

রেমিট্যান্স বন্ধের হুমকি দেশবিরোধী: রুহুল কবির রিজভী
শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে ‘জিয়া স্মৃতি পাঠাগার’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে রুহুল কবির রিজভী এসব কথা বলেন।