ads

অটোনমিক নিউরোপ্যাথি কী, হলে কী হয়

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
অটোনমিক নিউরোপ্যাথি কী, হলে কী হয়
প্রতীকী ছবি। ছবি: ম্যাগনেফিক

আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ অনেক কাজই নিজে নিজে বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে থাকে—যেমন হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, হজমপ্রক্রিয়া কিংবা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাটি পরিচালনাকারী স্নায়ুগুলো যেকোনো সময় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এ অবস্থাকে বলা হয় ‘অটোনমিক নিউরোপ্যাথি।’

অটোনমিক নিউরোপ্যাথি কোনো একক রোগ নয়। এটি এমন একটি শারীরিক অবস্থা যেখানে মস্তিষ্ক ও শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান ব্যাহত হয়। এর ফলে হৃদপিণ্ড, রক্তনালী, মূত্রাশয়, পাকস্থলী ও ঘাম গ্রন্থির মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর স্বাভাবিক কার্যকারিতা বিঘ্নিত হয়।

Advertisement

কেন হয় এই রোগ?

অটোনমিক নিউরোপ্যাথির পেছনে রয়েছে নানা ধরনের স্বাস্থ্যগত জটিলতা ও রোগের ইতিহাস। যেমন—

ডায়াবেটিস: এটিই অটোনমিক নিউরোপ্যাথির সবচেয়ে প্রধান কারণ। রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে তা শরীরের স্নায়ুগুলোকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

অটোইমিউন রোগ: যখন শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউন সিস্টেম) ভুলবশত স্নায়ুসহ নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গেই আক্রমণ চালায়। যেমন— শোগ্রেনস সিন্ড্রোম, লুপাস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, সেলিয়াক ডিজিজ কিংবা দ্রুত ছড়িয়ে পড়া জিল্যাঁ-বারে সিন্ড্রোম।

ক্যানসার ও ওষুধের প্রভাব: ক্যানসারের চিকিৎসা (যেমন কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া) কিংবা ক্যানসারের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় (প্যারানিওপ্লাস্টিক সিন্ড্রোম) স্নায়ুর ক্ষতি হতে পারে।

সংক্রমণ: এইচআইভি এবং বটুলিজম ও লাইম ডিজিজ সৃষ্টিকারী ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এটি হতে পারে।

অন্যান্য শারীরিক জটিলতা: শরীরে অস্বাভাবিক প্রোটিন জমা হওয়া (অ্যামাইলয়েডোসিস), পরফায়রিয়া, হাইপোথাইরয়েডিজম এবং নির্দিষ্ট কিছু বংশগত বা জিনগত রোগ।

প্রধান লক্ষণসমূহ

কোন স্নায়ুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে এর উপসর্গ দেখা দেয়:

রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন: হঠাৎ উঠে দাঁড়ালে রক্তচাপ কমে মাথা ঘোরা বা মূর্ছা যাওয়া। এ ছাড়া ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের সময় হৃদস্পন্দন না বাড়া।

মূত্রাশয়ের জটিলতা: প্রস্রাব শুরু করতে কষ্ট হওয়া, ধরে রাখতে না পারা, মূত্রাশয় পূর্ণ হওয়ার অনুভূতি টের না পাওয়া কিংবা প্রস্রাব পুরোপুরি খালি না হওয়া (যা থেকে ইউটিআই হতে পারে)।

হজমপ্রক্রিয়ার সমস্যা: সামান্য খেয়েই পেট ভরা মনে হওয়া, অরুচি, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেট ফাঁপা, বমি বমি ভাব, খাবার গিলতে কষ্ট ও বুক জ্বালাপোড়া।

যৌন সক্ষমতা হ্রাস: পুরুষদের ইরেকটাইল ডিসফাংশন বা বীর্যপাতজনিত সমস্যা এবং নারীদের ক্ষেত্রে যোনির শুষ্কতা ও যৌন অনুভূতি কমে যাওয়া।

অন্যান্য সূক্ষ্ম পরিবর্তন: রক্তে শর্করা কমে গেলে (হাইপোগ্লাইসেমিয়া) হাত-পা কাঁপার মতো আগাম সতর্কবার্তা না পাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া বা একেবারেই না হওয়া এবং আলো থেকে অন্ধকারে গেলে চোখের মণি সহজে মানিয়ে নিতে না পারা।

প্রতিরোধ ও সুরক্ষায় করণীয়

অটোনমিক নিউরোপ্যাথির অনেক মূল কারণ (যেমন জিনগত বা ক্যানসার সংক্রান্ত) এড়ানো সম্ভব না হলেও, জীবনযাত্রার অভ্যাসে পরিবর্তন এনে স্নায়ুর ক্ষতির ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো যায়:

ডায়াবেটিস পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা: রক্তে শর্করার মাত্রা কাঙ্ক্ষিত সীমার মধ্যে রাখা স্নায়ু সুরক্ষার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন: ধূমপান ও মদ্যপান সম্পূর্ণ ত্যাগ করা, সুষম খাবার গ্রহণ করা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা।

নিয়মিত শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখা: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত হালকা ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি করা।

মেডিকেল হিস্ট্রি পর্যবেক্ষণ: অটোইমিউন বা থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে তার দ্রুত ও নিয়মিত চিকিৎসা করা।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

অটোনমিক নিউরোপ্যাথির যেকোনো উপসর্গ দেখা দেওয়া মাত্রই বিলম্ব না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—বিশেষ করে যদি অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থাকে।

আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শ অনুযায়ী, টাইপ-২ ডায়াবেটিস আক্রান্তদের রোগ শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই প্রতি বছর অটোনমিক নিউরোপ্যাথির স্ক্রিনিং করা উচিত। আর টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে রোগ শনাক্তের পাঁচ বছর পর থেকে প্রতি বছর এই পরীক্ষা করানো জরুরি। সচেতনতা ও সময়মতো সঠিক চিকিৎসাই এই জটিলতা থেকে শরীরকে রক্ষা করতে পারে।

তথ্যসূত্র: মায়ো ক্লিনিক

সম্পর্কিত