রাশিয়া ও ইউক্রেন জানিয়েছে, রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের ওলেশকি শহরে তারা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার তারা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় এ সমঝোতা হয়েছে। এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, আগামী মাসে নতুন করে আলোচনায় বসবেন শান্তি আলোচকেরা।
দুই পক্ষ জানিয়েছে, ২৭ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। এর ফলে মানবিক করিডর দিয়ে ত্রাণ পৌঁছানো এবং বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
সাড়ে চার বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে নতুন আলোচনা আয়োজনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতার মধ্যে জেলেনস্কি বলেছেন, ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকেরা নভেম্বরের প্রথমার্ধে আবুধাবিতে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠকে বসতে সম্মত হয়েছেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানান, দেশ তিনটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আবুধাবি অথবা সুইজারল্যান্ডে পরবর্তী বৈঠক করতে পারে।
জেলেনস্কি আশা প্রকাশ করেছেন, এরপর তিন দেশের নেতাদের মধ্যে বৈঠক হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আগের দফার আলোচনা ফেব্রুয়ারিতে থমকে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী এই সংঘাত অবসানে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। রাশিয়া এখনো দাবি করছে, ইউক্রেনকে পূর্বাঞ্চলীয় দনবাসের পুরো অঞ্চল ছেড়ে দিতে হবে—যার মধ্যে এমন ভূখণ্ডও রয়েছে, যা রাশিয়া সামরিকভাবে দখল করতে পারেনি। অন্যদিকে, বর্তমানে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা কোনো ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে কিয়েভ।
সাম্প্রতিক শান্তি প্রচেষ্টার আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেওয়া কয়েকটি পদক্ষেপকে রাশিয়ার প্রতি পক্ষপাতমূলক বলে মনে করা হচ্ছে।
মতবিরোধের একটি বড় কারণ হলো স্পেসএক্সের স্টারলিংক যোগাযোগব্যবস্থার ওপর আরোপিত সীমাবদ্ধতা। রাশিয়ার আসন্ন হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেন এই ব্যবস্থা ব্যবহার করে থাকে। শুক্রবার ট্রাম্প বলেছেন, ইউক্রেন এখনো স্টারলিংক নিয়ে সমস্যায় থাকলে তিনি তা সমাধান করবেন। প্রয়োজনে স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা বলবেন।
আরেকটি বিতর্কিত বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারে ডিজেল সরবরাহের জন্য রাশিয়াকে সুযোগ দিতে একটি চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। ইউক্রেন এ চুক্তির নিন্দা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে জ্বালানির দাম কম রাখার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক বলেছেন, রাশিয়ার ডিজেলবাহী প্রথম তিনটি ট্যাংকার উত্তর আমেরিকার পথে রয়েছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে রুশ বাহিনীর দখলে থাকা ওলেশকি শহরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সেখানে খাদ্যসংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে বলেছে, “ওলেশকিতে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং নির্ধারিত নিরাপদ পথ দিয়ে বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতির জন্য উভয় দেশ সাময়িকভাবে শহরটিতে সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে।”
রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের টেলিগ্রাম চ্যানেলে বলেছেন, মানবিক কার্যক্রম শুরুর সুযোগ দিতে ২৭ অক্টোবর স্থানীয় সময় ভোর ৪টা (জিএমটি ০১০০) থেকে রুশ সেনারা গোলাবর্ষণ বন্ধ রাখবে।
ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফও এক বিবৃতিতে একই সময় থেকে যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে সম্মত হয়েছে এবং বলেছে, “ওলেশকির বাসিন্দাদের সহায়তা করতে সম্ভাব্য সবকিছু করা হবে।” ইউক্রেনের দাবি, এরই মধ্যে দুবার ড্রোনের মাধ্যমে শহরটিতে খাবার পাঠানো হয়েছে।
ইউক্রেনের মানবাধিকারবিষয়ক ন্যায়পাল দিমিত্রো লুবিনেৎসও বলেছেন, ২৭ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। তিনি রয়টার্সকে জানান, এ অভিযানের অংশ হিসেবে শহরে যাওয়ার সড়কগুলো থেকে মাইন অপসারণ, খাদ্য সরবরাহ এবং বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ করা হবে।
মেলানিয়া ট্রাম্পের কূটনৈতিক উদ্যোগ
দুই পক্ষই বলেছে, সমঝোতা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে মেলানিয়া ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। যুদ্ধ চলাকালে রাশিয়ার নিয়ে যাওয়া ইউক্রেনীয় শিশুদের তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টায় সক্রিয় রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “ওলেশকি যুদ্ধের সম্মুখসারির একটি শহর, যা বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “শহরটিতে এখনো যারা রয়েছে, তাদের অধিকাংশই বয়স্ক। তাদের জরুরি চিকিৎসা, ওষুধ, খাবার ও বিশুদ্ধ পানি প্রয়োজন।”
গত সপ্তাহে পোপ লিও ওলেশকির পরিস্থিতি নিয়ে জেলেনস্কি এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন—দুজনের সঙ্গেই কথা বলেছেন।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা খেরসন শহরের বিপরীতে দিনিপ্রো নদীর অপর পারে অবস্থিত ওলেশকিতে এখন ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার বাসিন্দা রয়েছে। যুদ্ধের আগে শহরটির জনসংখ্যা ছিল ২৪ হাজার।