Advertisement Banner

আরেকটি ‘তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার’ বিসিবি নির্বাচন?

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
আরেকটি ‘তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার’ বিসিবি নির্বাচন?
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। ছবি: বিসিবি

তামিম ইকবাল এডহক কমিটির দায়িত্ব নিয়েই বেশ কয়েকবার আশ্বাস দিয়েছেন একটি বিতর্কমুক্ত নির্বাচনের। আরেক সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলামও গত বছর একই সুরে কথা বলেছিলেন। কিন্তু এরপর যা ঘটেছিল, তা দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের হতাশই করেছে। রাজনৈতিক পরিচয়, সরকারি প্রভাব ও নানা বিতর্কের মধ্য দিয়ে এমন একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের জন্ম হয়েছিল, যা বিসিবির ইতিহাসেরই অংশ হয়ে গেছে। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ভেঙে যায় সেই বোর্ড। তার স্থলাভিষিক্ত হওয়া তামিম প্রথম দিন থেকেই বলে আসছেন, এবার এমন কিছু হবে না। কিন্তু নির্বাচনের আগের চিত্র যেন ভিন্ন কিছুরই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

তামিমকে প্রধান করে গঠিত এডহক কমিটিকে একজন সংসদ সদস্য কটাক্ষ করে ‘বাপের দোয়া’ ক্রিকেট বোর্ড নামে আখ্যায়িত করেছিলেন। বিষয়টি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকেও এ নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তবে তাতেও বিতর্ক থামেনি। অবশ্য হওয়ার কথাও নয়। দেশের মানুষ এখন কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করলে সেটি তাদের মন থেকে সরানো সহজ নয়।

শুরুতে অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো মাত্র তিন মাসের জন্যই দায়িত্ব পালন করতে এসেছেন তারা। কিন্তু খুব দ্রুতই পরিস্থিতি বদলে যায়। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে ইসরাফিল খসরু, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের ছেলে সৈয়দ ইবরাহিম আহমেদ এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের ছেলে মির্জা ইয়াসির আব্বাস নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলে আলোচনা নতুন মোড় নেয়। হেভিওয়েট এই প্রার্থীদের অংশগ্রহণ স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন যেন আরও বাড়িয়ে দেয়।

এখানে উল্লেখ্য, গত অক্টোবরের নির্বাচনে তামিমসহ মোট ১৫ জন প্রার্থী দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ইসরাফিল খসরুও। সে সময় তিনি সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, “সরকারের একটি গোষ্ঠী এই নির্বাচনে নগ্নভাবে হস্তক্ষেপ করছে। আমরা নির্বাচনের কোনো পরিবেশই দেখছি না। পুরো প্রক্রিয়াটাই অস্বচ্ছ। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকলে সমঝোতার কোনো প্রশ্নই আসে না।”

এবারের পরিস্থিতি কেমন? এই প্রশ্নে চরচাকে একজন কাউন্সিলর বলেন, “আগে বিসিবি নির্বাচনে কাউন্সিলরদের কী উপহার দেওয়া হচ্ছে, সেটা তিনি আর আল্লাহই জানতেন। এবার এতটাই প্রকাশ্যে হচ্ছে যে রীতিমতো দেন-দরবার চলছে উপহার নিয়ে। এটাই নাকি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের চিত্র!”

তিনি কতটা সঠিক বা ভুল, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বিসিবির একাধিক সূত্রও একই ধরনের তথ্য দিয়েছে। তাদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব ও ভোটের হিসাব-নিকাশ এবারও নির্বাচনের বড় অংশ হয়ে উঠেছে।

এমনও গুঞ্জন রয়েছে, পরিচালক পদপ্রত্যাশী একজন নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ভোট সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। জনে জনে ফোন করে প্রস্তাবও দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বচ্ছ নির্বাচনের আলোচনায় এমন গুঞ্জন নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর।

অবশ্য বিসিবির অতীত নির্বাচনগুলোতেও এমন অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু অন্তত ভোটাভুটিতে একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার আশা তো করা যেতেই পারে। বাস্তবে সেখানেও হতাশ হওয়ার কারণ রয়েছে। ১৮৪ জন কাউন্সিলরের তালিকার দিকে তাকালেই দেখা যায়, বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অনেক মুখই সেখানে উপস্থিত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিবির এক কর্মচারী চরচাকে বলেন, “আগে নির্বাচন হলে নিশ্চিত জিতবে এমন প্রার্থীরও কিছুটা দুশ্চিন্তা থাকত। এবার দেখেন, কারও কোনো হেলদোল নেই। কারণ, সবকিছু ঈদের আগেই ঠিক হয়ে গেছে।”

একদিকে এডহক কমিটির ১১ সদস্যের মধ্যে ৭ জনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাব ও ভোটের সমীকরণ—সব মিলিয়ে আরেকটি পূর্বনির্ধারিত নির্বাচনের আশঙ্কাই প্রবল হয়ে উঠছে। অথচ তামিম বোর্ডে এসেছেন বলেই অনেকের আশা ছিল, তিনি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশাকে পূরণ করছে না।

বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান তামিম সংগঠক হিসেবে এখনও অনভিজ্ঞ। তবুও বিসিবির দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই ক্রিকেটার থেকে মাঠকর্মী—সবার জন্যই কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। স্বল্প সময়েই দেখিয়েছেন, সদিচ্ছা থাকলে বিসিবির অংশ হয়ে পরিবর্তন আনা সম্ভব।

সমস্যা হলো, যেভাবে রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে একটি বড় অংশ পরিচালনা পর্ষদে জায়গা করে নিতে যাচ্ছে, তা তামিমের ভাবমূর্তির জন্য খুব একটা সুখকর হবে না। সম্ভবত বিসিবির ইতিহাসে এটাই হতে যাচ্ছে প্রথম পরিচালনা পর্ষদ, যেখানে সাবেক ক্রিকেটারদের উপস্থিতি থাকবে সবচেয়ে কম।

রাজনৈতিক পরিচয়ে বিসিবিতে অতীতেও অনেকে পরিচালক হয়েছেন। তবে তাদের বড় পরিচয় ছিল ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে। ফলে মাঠ ও মাঠের বাইরের ক্রিকেট নিয়ে তাদের কাজের মূল্যায়ন করার সুযোগ ছিল। কিন্তু এবার যাদের পরিচালক হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তাদের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ই বেশি আলোচিত।

এই যখন নির্বাচনী মাঠের চিত্র, তখন ফলাফল কী হতে পারে, তা অনুমান করা কঠিন নয়। নির্বাচন কমিশনের অধীনে ৭ জুন অনুষ্ঠিত হবে বহুল আলোচিত এই নির্বাচন। আইনি দিক থেকে তাই প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকবে না।

কিন্তু দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা এই নির্বাচন থেকে কী পেতে যাচ্ছেন? প্রশ্নটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। কারণ আমিনুলের পর তামিমও যে তাদের প্রত্যাশাকে ক্রিজে যাওয়ার আগেই ‘টাইমড আউট’ করে দিলেন।

সম্পর্কিত