Advertisement Banner

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রবন্ধ

বিশ্বকাপ নিয়ে আগ্রহ এত কম কেন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বিশ্বকাপ নিয়ে আগ্রহ এত কম কেন?
২০২৬ বিশ্বকাপের ফুটবল ট্রাইন্ডোর আদলে তৈরি। ছবি: রয়টার্স

বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে এবার উন্মাদনা কি একটু কম? আমেরিকা, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের এবারের বিশ্বকাপ নিয়ে কারোরই যেন কোনো মাথাব্যথা নেই। অথচ, বিশ্বকাপ ফুটবলকে বলা হয় ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’।

আগে বিশ্বকাপ শুরুর আগেই সব টিকিট বিক্রি হয়ে যেত, কিন্তু এবার হাজার হাজার টিকিট বিক্রিত রয়ে গেছে। মূল দামের চেয়ে দাম কমিয়ে টিকিট বিক্রি হয়েছে এই তো সেদিনও। আমেরিকার শহরগুলো বিশ্বকাপকে সামনে রেখে পর্যটকে ভরে যাওয়ার কথা ছিল, সেই ভিড়ও দেখা যাচ্ছে না। হোটেলগুলোও ফাঁকা। হোটেলগুলো যে বাড়তি আয়ের আশা করেছিল, সেটাও আশানুরূপ নয়। ফিফাই নিজেদের অগ্রিম বুকিং বাতিল করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির কারণে এবার বিশ্বকাপ ফুটবল বর্জনের কথাবার্তাও শোনা যাচ্ছে।

আজ রাত থেকে বিশ্বকাপের খেলা শুরু হলে হয়তো আগ্রহের পারদ বাড়তে পারে। কিন্তু এই ক’দিন আগেও চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল নিয়ে যে উন্মাদনা ছিল, বিশ্বকাপ নিয়ে তার ধারেকাছেও উন্মাদনা দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানের বৈশ্বিক রাজনীতি এখানে হয়তো গভীর কোনো ছাপ ফেলেছে।

আমেরিকানরাও উদাসীন বিশ্বকাপ নিয়ে। অবশ্য আমেরিকানদের উদাসীনতাটা বোধগম্যই। নিজেদের জাতীয় দলটা এমন কোনো আহামরি কিছু নয়, তাদের পারফরম্যান্সও মনে রাখার মতো কিছু নয়। ফুটবল খেলাটা তো আমেরিকায় বিশেষ জনপ্রিয়ও নয়। বিশ্বকাপে আমেরিকা খেলছে বলেই আমেরিকানরা স্রেফ দেশপ্রেম আর জাতীয়তাবাদের জোয়ারে গা ভাসাতে রাজি নয়। টিকেটের আকাশছোঁয়া মূল্য তো একটা বড় ব্যাপারই।

আমেরিকার কথা বাদ দিলেও বাকি বিশ্ব বিশ্বকাপ নিয়ে কেন আগ্রহ দেখাচ্ছে না, এটা বোঝা যাচ্ছে না। বিশ্বকাপ এলেই গোটা দুনিয়া একমাসের জন্য ফুটবল–জ্বরে আক্রান্ত হয়। মেতে ওঠে ফুটবল–উৎসবে। বিশ্বকাপের অবস্থানও যেন আগের জায়গায় নেই। মানুষ এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলের চেয়ে ক্লাব ফুটবল নিয়েই বেশি আগ্রহী বলে মনে হয়।

বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের একটা জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই কালেও এই পরিবর্তনটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের উন্মাদনার ঢেউ চিরদিনই খেলাধুলায় বড় প্রভাব রাখে। এবারও বিশ্বকাপ ফুটবলে সেই উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে এই উন্মাদনাটা এখন ক্লাব ফুটবল–কেন্দ্রিক। বিদেশি করপোরেটদের পৃষ্ঠপোষকতা ও বিপুল অর্থ বিনিয়োগ ব্যবহার করে বিশ্বের নামী খেলোয়াড়দের নিয়ে এসে ক্লাবগুলোর দল সাজানো হয়। কিন্তু জাতীয় দলে তো খেলে নিজ দেশের খেলোয়াড়েরা, সেই দলের নিজস্ব জার্সির রঙ আছে। কিন্তু বর্তমান সময়ের জনতুষ্টিবাদী উন্মাদনার সময়টাকে শুধু জাতীয় দল–কেন্দ্রিক আবেগে আবদ্ধ রাখা যাবে না।

হতে পারে একটা সময় ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলই ছিল উগ্র জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা প্রকাশের প্রধান মঞ্চ। কিন্তু আজকের এই হাইপার-ন্যাশনালিস্ট বা অতি-জাতীয়তাবাদের যুগে সেই উন্মাদনা প্রকাশের জন্য আলাদা কোনো মাধ্যমের আর বিশেষ প্রয়োজন পড়ছে না; কারণ জাতীয়তাবাদ এখন জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবহমান।

অথবা প্রায় দুই দশক আগে ফ্র্যাঙ্কলিন ফোয়ার যে ইঙ্গিত করেছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে সেই আলোকেও দেখা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন, ক্লাব ফুটবলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই যে তীব্র গোষ্ঠীগত উন্মাদনা, তা আসলে উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রাকৃতিক প্রতিষেধক; একই সঙ্গে তা করপোরেট বিশ্বায়নের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিরোধও বটে।

তবে বাস্তবতা হয়তো আরও সরল। ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবল তো এখন বছরজুড়ে মাঠে থাকে। একজন সমর্থকের পক্ষে আসলে কতটা ফুটবল হজম করা সম্ভব? আবেগেরও তো একটা সীমা আছে।

তবুও বিষয়টা একটা ধাঁধার মতোই। এর একটা কারণ হলো, শুরুর দিকে বলা হতো যে এই পপুলিজম আসলে সাধারণ মানুষের সেই ক্ষোভ, যাদেরকে দেশের অভিজাতরা একরকম ফেলে দিয়েছে। এই অভিজাতরা নিজেদের টাকার জোরে আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের দুনিয়ায় এমনভাবে মিশে গেছে, ঠিক যেমন কোনো দেশের ফুটবল তারকারা নিজেদের শিকড় ভুলে গিয়ে অন্য দেশে নামী ক্লাবে খেলতে চলে যায়।

বিশ্বকাপ। ছবি: রয়টার্স
বিশ্বকাপ। ছবি: রয়টার্স

বিশ্বায়নের হাত ধরে ক্লাব ফুটবলের খোলনলচে কীভাবে বদলে গেছে, এই ঘটনাটি তারই এক মোক্ষম উদাহরণ। ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে পরবর্তী কুড়ি বছরে নামী দামী লিগ আর নামজাদা ক্লাবগুলো দুনিয়ার বাঘা বাঘা ফুটবলারদের নিজেদের তাঁবুতে টানতে শুরু করে। আর তারপর সেই ফুটবলের উন্মাদনা ছড়িয়ে দেওয়া হয় বিশ্বজুড়ে।

ব্যবসায়িক দিক থেকে এই চাল বাজিমাৎ করলেও, এর সাংস্কৃতিক প্রভাবটা কিন্তু বেশ অদ্ভুত। যেমন ধরুন, উগান্ডায় জন্মানো ভারতীয় বংশোদ্ভূত নিউইয়র্কের মেয়র সাতসমুদ্র তেরো নদী পারের লন্ডনের আর্সেনালের জয়ে রীতিমতো আত্মহারা হয়ে ওঠেন! এর ফলেই আজকের দিনে ক্লাব ফুটবলের সমর্থক মহল একদম কাটায় কাটায় গ্লোবাল বা বৈশ্বিক হয়ে উঠেছে, যা অনেকের কাছে বেশ খামখেয়ালি বলেও মনে হতে পারে।

সাধারণভাবে মনে হতে পারে, জাতীয় দলগুলোর প্রতি মানুষের আবেগ ও আবেদন একেবারেই অন্যরকম হওয়া উচিত ছিল। এগুলো হতে পারত দেশপ্রেম প্রকাশ কিংবা জাতীয় পরিচয়কে নতুন করে জাগিয়ে তোলার সবচেয়ে বড় মঞ্চ। উদাহরণস্বরূপ, মারিন লো পেনের রাজনৈতিক আবহে ফরাসিদের মাঝে জাতীয় দল নিয়ে যে পরিমাণ উম্মাদনা থাকার কথা ছিল, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো—সবাই কিলিয়ান এমবাপ্পের সমালোচনাতেই বেশি মগ্ন। একইভাবে, লন্ডনের লোকজন এখন ইংল্যান্ড জাতীয় দলের চেয়ে আর্সেনাল, চেলসি কিংবা টটেনহামকে নিয়েই বেশি মেতে থাকে।

এমনটা কেন হচ্ছে? সহজ উত্তর হলো, মানুষের কাছে এখন ক্লাব ফুটবল অনেক বেশি জনপ্রিয়। অনেকেই বলেন ২০১৫ সালে ফাঁস হওয়া ফিফার সেই কুখ্যাত দুর্নীতি ফুটবলের অনেক বড় ক্ষতি করে দিয়েছে। ফিফার বর্তমান সভাপতিও নিজেকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে তুলতে পারেননি।

তার ভুল নেতৃত্বও এই অবস্থার জন্য অনেকাংশে দায়ী। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। রাশিয়া, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রকে আয়োজক করা নিয়ে যে বিতর্ক, সেটি এ ব্যাপারে বড় নিয়ামক ভূমিকা নিয়েছে।

জাতীয় দলের মানও কমেছে। জাতীয় দলের ফুটবলাররা বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেন। দেশের খেলার সময় তারা একত্রিত হন। জাতীয় দলের হয়ে খেলাটা মেসি, এমবাপ্পে, রোনালদোদের মতো তারকাদের কাছে অনেকটাই জাতীয় দায়িত্ব পালন করার মতো ব্যাপার। দারা দায়িত্ব পালন করেই ক্লাবে ফেরত যান। জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরা একত্রে বেশিদিন থাকেন না। তাই খেলার মধ্যে প্রাণ খুঁজে পাওয়া যায় না। পুরো ব্যাপারটিই পানসে ও যান্ত্রিকতায় পরিণত হয়েছে। পুরো ব্যাপারটাই যেন করপোরেট হয়ে গেছে।

খেলোয়াড়দের রাজনৈতিক বক্তব্য সব সময়ই এক ধরনের ঝুঁকি বহন করে, তবে ফ্রান্সের বর্তমান প্রেক্ষাপট সাধারণ সংঘাতকেও ছাড়িয়ে গেছে। যখন জাতীয় দলের প্রাণভোমরা এমবাপ্পে যখন বলেন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের আদর্শিক ফ্রান্সে তাঁর মতো মানুষের ঠাঁই নেই, তখন বিষয়টি চরম উত্তেজনার জন্ম দেয়। তিনি ন্যাশনাল র‍্যালি পার্টি নিয়ে কথাটা বলেছিলেন। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় সেই রাজনৈতিক নেতারাও যেন আদাজল খেয়ে মাঠে নামেন। তারা এমবাপ্পের মতো তারকাকে ‘বিশ্বাসঘাতক অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে তাঁকে জাতীয় গৌরবের ‘অযোগ্য’ প্রমাণের অপচেষ্টা চালান। মূলত, মারিন লো পেনের ‘ন্যাশনাল র‍্যালি’ দলের অভাবনীয় উত্থান এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমবাপ্পের এই সাহসী উদ্বেগ ডানপন্থীদের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে তাঁরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন।

২০২৫-২৬ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন আর্সেনাল। ছবি: রয়টার্স
২০২৫-২৬ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন আর্সেনাল। ছবি: রয়টার্স

এসব এখন আর অস্বাভাবিক কিছু নয়। কট্টর জাতীয়তাবাদী কল্পনার সঙ্গে অভিবাসী কিংবা প্রবাসী বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের নিয়ে গঠিত দল ঠিক যায় না। এই পরিবর্তনের কারণেই হয়তো ২০১৮ সালে বিশ্বকাপে ফ্রান্সের জয়কে উদ্‌যাপন করতে পেরেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। কিন্তু যেসব কট্টরপন্থীরা জাতিগত বিশুদ্ধতার কথা বলেন, তাদের কাছে এর অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এখনকার বিশ্বরাজনীতিতে জাতীয়তাবাদকে ‘আঞ্চলিকতাবাদ’ বলাই শ্রেয়। জনতুষ্টিবাদীরা এখন সংকীর্ণ জাতির কথা বলেন। এই ভাবনা প্রতিক্রিয়াশীল। এটা জাতীয়তাবাদের চেয়ে অনেক বেশি সংকীর্ণ।

বিশ্বায়ন শুধু মানুষের মধ্যে ক্ষোভই তৈরি করেনি, যারা দেশে কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, দেশ থেকে পুঁজি বেরিয়ে যাওয়া ইত্যাদি নিয়ে ক্ষুব্ধ, তাদের কাছে রাষ্ট্র বা নেশন কথাটাই সংকীর্ণ ও ক্ষোভের বিষয়। এককালে যা ছিল দেশপ্রেম ও গর্বের বিষয়, সেটা এখন ক্ষোভের বিষয়। সে কারণে দিন শেষে আর্সেনাল বা পিএসজির মতো ক্লাবগুলোর পক্ষে গলাফাটানোই বেশি আকর্ষণীয়।

মূল লেখা: ডেভিড ওয়ালেস, বিজ্ঞান লেখক ও প্রাবন্ধিক

নিউইয়র্ক টাইমস থেকে অনূদিত

ডেভিড ওয়ালেস-ওয়েলস বিজ্ঞান লেখক এবং প্রাবন্ধিক। নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে অনূদিত

সম্পর্কিত