তীব্র জনবল সংকট ও প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাবে দেশের বৃহত্তম সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপের মেরামত ও উৎপাদন কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে। এতে পশ্চিমাঞ্চলে চলাচলকারী ট্রেনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রেলওয়ে কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী কোচের রক্ষণাবেক্ষণ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে ওয়ার্কশপটিকে। এর প্রভাব পড়ছে পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী ট্রেনের কোচগুলোর ওপর।
সম্প্রতি জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে রাজশাহী থেকে নীলফামারীর চিলাহাটিগামী আন্তঃনগর বরেন্দ্র এক্সপ্রেসের একটি কোচের স্প্রিং ভেঙে লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা এই উদ্বেগকে সামনে নিয়ে এসেছে।
রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্য, পশ্চিমাঞ্চলে চলাচলকারী ট্রেনগুলোতে বিভিন্ন ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপে জনবল সংকট থাকায় সময়মতো কোচ মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মেরামতের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেক কোচ দিয়ে ট্রেন চালাতে হচ্ছে বলে জানান তারা।
চিলাহাটি-সৈয়দপুর ও খুলনা-রাজশাহী রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন কোচ পরিদর্শন করে দেখা গেছে, সীমান্ত, রূপসা, বরেন্দ্র ও তিতুমীর এক্সপ্রেসসহ কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেনের কোচে নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে। কোথাও আসন ভাঙা, কোথাও জানালা ক্ষতিগ্রস্ত। কোনো কোনো কোচের ফ্যান ও লাইটিং ব্যবস্থা অকেজো। শৌচাগারের ফিটিংস জরাজীর্ণ হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পানি সরবরাহ লাইনেও ত্রুটি রয়েছে বলে জানা গেছে।
ওয়ার্কশপের কর্মকর্তারা জানান, এসব কোচ দ্রুত মেরামত করা প্রয়োজন হলেও জনবল ও কাঁচামালের সংকটের কারণে সময়মতো কাজ করা যাচ্ছে না।
অকেজো হয়ে পড়ে আছে যন্ত্রপাতি
ওয়ার্কশপ সূত্র জানায়, সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপে থাকা ৭৪৯টি যন্ত্রপাতির মধ্যে প্রায় ৬০০টিই দক্ষ টেকনিশিয়ান ও প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাবে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এসব যন্ত্রপাতির আনুমানিক মূল্য প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
যন্ত্রপাতিগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার না হওয়ায় ওয়ার্কশপের উৎপাদন ও মেরামত সক্ষমতা কমে গেছে। এর ফলে পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেনগুলোতে ভালো কোচের সংকটও বাড়ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
রেলওয়ের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি এক বছর পর পর আন্তঃনগর কোচ, দেড় বছর পর পর মেইল ও এক্সপ্রেস কোচ এবং তিন বছর পর পর পণ্যবাহী ওয়াগন মেরামত করার কথা।
তবে ওয়ার্কশপের নানা সীমাবদ্ধতার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনেক কোচ মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে রেলওয়ে সূত্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রেন পরিদর্শক জানান, কোচের ভার বহনকারী স্প্রিংগুলো প্রতি পাঁচ বছর পর পর পরিবর্তন করার কথা। কিন্তু অনেক সময় ক্ষয় হয়ে যাওয়া স্প্রিংয়ের নিচে প্লেট বা প্যাকিং বসিয়ে সেটির উচ্চতা বাড়িয়ে কোচ চালানো হচ্ছে।
তার ভাষ্য, এ ধরনের প্যাকিং অল্প সময়ের মধ্যেই খুলে যেতে পারে। এতে কোচের ভার বহনের ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ট্রেন চলাচলের সময় অতিরিক্ত ঝাঁকুনি তৈরি হয়।
এ ধরনের অস্থায়ী বা জোড়াতালির মেরামতের কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেন ওই পরিদর্শক।
পুরোনো কোচ, বাড়ছে চাপ
রেলওয়ে সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে জোনের অধীনে ৬৬টি আন্তঃনগর ও ৬০টি মেইল ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনে মোট ৮১৮টি কোচ সংযুক্ত রয়েছে।
এ ছাড়া এই জোনের বিভিন্ন রুটে ৯৫৬টি ব্রডগেজ ও ২০০টি মিটারগেজ পণ্যবাহী ওয়াগন চলাচল করে।
যাত্রীসেবায় ব্যবহৃত কোচগুলোর মধ্যে ২০০৬ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা ৫০টি ব্রডগেজ কোচ, ১০০টি লাল-সবুজ ব্রডগেজ ও ৫০টি মিটারগেজ কোচ রয়েছে। এ ছাড়া ভারত থেকে আনা ১২০টি লাল-সবুজ কোচ রয়েছে।
রেলওয়ে সূত্র আরও জানায়, এই বহরে জার্মানি, ডেনমার্ক ও পাকিস্তান থেকে প্রায় ৪৫ বছর আগে আমদানি করা ৪৪৮টি ব্রডগেজ কোচও রয়েছে।
সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপের ক্যারেজ শপের ইনচার্জ মোমিনুল ইসলাম জানান, পর্যাপ্ত জনবল পাওয়া গেলে ওয়ার্কশপের মেরামত সক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। এতে কোচ আমদানির ওপর নির্ভরতাও কমানো যাবে।
এই কর্মকর্তা বলেন, “প্রয়োজনীয় জনবল থাকলে আমাদের কোচ আমদানি করার কোনো দরকার হতো না। এতে প্রতি বছর রেলওয়ের শত শত কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারত।” ওয়াগন শপও একই ধরনের সমস্যায় ভুগছে বলে জানান তিনি। প্রতি বছর ২৫০ থেকে ৩০০টি ওয়াগন মেরামতের চাহিদা থাকলেও জনবল সংকটের কারণে প্রায় ২০০টি ওয়াগন সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কাঁচামালেরও সংকট
সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপের বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সুফি নূর মোহাম্মদ জানান, দেশের সর্ববৃহৎ এই রেলওয়ে কারখানার বহু পদ শূন্য রয়েছে। তিনি বলেন, “উৎপাদন সচল রাখতে শ্রমিকরা নির্ধারিত কর্মঘণ্টার চেয়ে বেশি সময় কাজ করছেন।” তবে প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সংকটকেও বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য, সময়মতো এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে কাঁচামাল না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
শাহ সুফি নূর মোহাম্মদ বলেন, “বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।” সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার ওবায়দুল ইসলাম জানান, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এসব রুটে চলাচলকারী ট্রেনের বেশ কয়েকটি কোচ মাসের পর মাস অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকে।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, “ফলে আমরা স্বল্প দূরত্বের স্টেশনগুলোর জন্যও টিকিট ইস্যু করতে পারি না। টিকিট না পেয়ে যাত্রীরা বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করেন।” এ কারণে অনেক যাত্রী টিকিট ছাড়াই যাতায়াত করছেন বলে জানান তিনি। এতে সরকার রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
এ ছাড়া যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায়ই ট্রেন চলাচলের সময়সূচি বিপর্যস্ত হচ্ছে বলেও জানান তিনি।লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগের বিভাগীয় ট্রাফিক সুপারিনটেনডেন্ট আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, রেলওয়ের পুরো নেটওয়ার্কজুড়েই জনবল সংকট রয়েছে। তবে সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপের সংকট ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।