কয়েক বছর ধরে মোস্তাফিজুর রহমান একটু খারাপ করলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি লাইন ভাইরাল হয়ে ওঠে—‘মুস্তা ইজ নেভার কামিং ব্যাক’। যদিও বাঁহাতি এই পেসার ভালো করলে আবার সেটাই বিখ্যাত এই মন্তব্যের বক্তাকে নেতিবাচকভাবে শুনিয়ে দেওয়া হয়। তবে এশিয়ান গেমসে দুই ম্যাচে মোস্তাফিজ যে বোলিং করেছেন, সেটা দেখে আপাতত তার সেরা ছন্দে ফিরে আসা নিয়ে কিঞ্চিৎ সংশয় তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সংযুক্ত আরব আমিরাতের ত্রিদেশীয় সিরিজ বা দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের আগে মোস্তাফিজকে একটু তাড়াহুড়ো করেই মাঠে নামিয়ে দিয়েছে কি না, সেই প্রশ্নটা জোরাল হচ্ছে। সঙ্গে বাতাসে ভাসছে মোস্তাফিজের নতুন করে চোট পাওয়ার শঙ্কায় গা বাঁচিয়ে বোলিং করার গুঞ্জনও।
এশিয়ান গেমসের ক্রিকেট ইভেন্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের সেমিফাইনাল ম্যাচ বৃষ্টির কারণে নেমে এসেছিল ১৩ ওভারে। জাপানের উইকেটের আচরণ দেখে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, এখানে মোস্তাফিজ তার ট্রেডমার্ক স্লোয়ার, কাটার দিয়ে বেশ কার্যকর হবেন। অধিনায়ক লিটন দাসও সেই ভরসাতেই চতুর্থ ওভারে আক্রমণে আনেন তাকে।
সাইম আইয়ুব লেগ সাইডে শক্তিশালী, সেটা জেনেও মোস্তাফিজ প্রথম ডেলিভারি করেন হাফ ভলি, যা সহজেই ছক্কা মারেন পাকিস্তান ওপেনার। মাত্র এক বল বাদেই ওভার দ্য উইকেটে এসে বল করলেন আর বাজে লেংথে, এবং আরেকটি ছক্কা মারেন সাইম।
এশিয়ান গেমসের আগে অনুশীলনে মোস্তাফিজুর রহমান। ছবি : বিসিবি
দশম ওভারে এসে আরও বাজে বোলিংয়ে মোস্তাফিজ হজম করেন ২৫ রান। আবদুল সামাদ ছক্কার পর টানা চার বলে হাঁকান চারটি বাউন্ডারি। এই ওভারটি দেখলে একটা জিনিস স্পষ্ট হবে, তা হলো - মোস্তাফিজের কিছু একটা হয়তো সেদিন ঠিক ছিল না।
সেদিন তিনি যেরকম এলোমেলো বোলিং করেছেন এবং তার শক্তির জায়গা স্লোয়ার, কাটারেও যেভাবে বেদম মার খেয়েছেন, সেটা দেখে ধারণা করা হচ্ছিল, প্রায় চার মাস পেশাদার ক্রিকেট না খেলার কারণে মোস্তাফিজের বোলিংয়ে একটা জড়তা রয়ে গেছে। আর সেটারই প্রভাবই পড়েছে তার বোলিংয়ে।
আরও একটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জাপানে যাওয়ার পর বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচটি বৃষ্টিতে ভেসে যায়। খেলোয়াড়দের থাকতে হয়েছিল একরকম টেন্টের মতো হাউসে। সেখানে ছিল না অনুশীলনের সুযোগ। বৃষ্টির কারণে মাঠে গিয়ে সেভাবে দৌড়াদৌড়ির সুযোগও ছিল না। একরকম হোটেলবন্দী জীবনযাপন করার পর, সরাসরি লম্বা সময় কোনো ধরনের স্বীকৃত ক্রিকেট না খেলে মোস্তাফিজ দুই ওভার খারাপ বোলিং করতেই পারেন—এমনটা ধরেই নেওয়া হচ্ছিল।
এশিয়ান গেমসের দুই ম্যাচে ৭ ওভারে ৮৪ রান দেন মোস্তাফিজুর রহমান । ছবি : যুক্তরাষ্ট্র ক্রিকেট বোর্ড
তবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আরও মলিন রূপে দেখা যায় মোস্তাফিজকে। তিন ওভার বোলিং করে ২টি উইকেট পেলেও রান দেন ৪৩। তবে এই ম্যাচে সবচেয়ে দৃষ্টিকটু দিক ছিল, একটি ওভার করতে তার লেগে যায় মোট ১১টি ডেলিভারি। এর মধ্যে দুটি ছিল নো-বল, একটি ওয়াইড। সেই ওয়াইড বলটি ছিল বাউন্সার, যেটিতে চারও হজম করেন তিনি।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ইতিহাসের ১১তম সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি একজন বোলারের এমন নবিশ পারফরম্যান্স বিস্ময়করই। কেননা একজন আনাড়ি বোলারও যখন দেখবেন ব্যাটসম্যান উইকেটের অফ স্টাম্পের বাইরে চলে যাচ্ছেন, তখন তাকে স্লটে ডেলিভারি দিয়ে নিজের বিপদ বাড়াবেন না। কিন্তু শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচে ঠিক সেই কাজটাই করেছেন মোস্তাফিজ।
এই দুই ম্যাচ দেখার পর একরকম স্পষ্ট হয়ে যায়—কিছু একটা ঠিক নেই। অর্থাৎ মোস্তাফিজের বোলিংয়ে কোনো একটা জায়গায় সম্ভবত একটা সুর কেটে গেছে। তার প্রভাবটাই দেখা গেছে এশিয়ান গেমসের ক্রিকেট ইভেন্টে।
মোস্তাফিজের জন্য অবশ্য এটা নতুন কিছু নয়। ২০১৬ সালে কাঁধে চোট পাওয়ার পর তার বোলিং অ্যাকশনে ছোট একটা পরিবর্তন আনতে হয়েছিল। আর সেরা ফর্মে ফিরতেও লেগেছিল বেশ কিছুটা সময়।
সেই সময়ে জাতীয় দলের পেস বোলিং কোচ ও সাবেক ওয়েস্ট ইন্ডিজ পেসার কোর্টনি ওয়ালশ বলেছিলেন, অনেক ক্ষেত্রে বোলিং অ্যাকশনে সামান্যতম পরিবর্তন আনা হলেও একজন বোলার সেই আগের ছন্দ ফিরে পান না। কখনো কখনো সেই ছন্দ ফিরে পেতে দুই থেকে তিন বছরও লেগে যায়।
আইএলটি২০-তে আগামী আসরে দুবাই ক্যাপিটালসের হয়ে খেলবেন মোস্তাফিজুর রহমান। ছবি : দুবাই ক্যাপিটালস
গত কয়েক বছরে অবশ্য মোস্তাফিজ বাংলাদেশ দল থেকে শুরু করে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট—সব জায়গাতেই নিজেকে প্রমাণ করে চলেছেন। সম্প্রতি আইএলটি-টোয়েন্টিতেও তাকে দলে ধরে রেখেছে দুবাই ক্যাপিটালস।
কিন্তু বাংলাদেশের দলের হয়ে এশিয়ান গেমসে টানা দুই ম্যাচে মোস্তাফিজ যেরকম এলোমেলো বোলিং করলেন, সেটা তার গোটা ক্যারিয়ারেই খুব কম দেখা গেছে। কিন্তু কেন এমন হলো?
সেই জুনে জিম্বাবুয়ে সফরে চোট পাওয়ার পর থেকেই মাঠের বাইরে ছিলেন মোস্তাফিজ। এই সময়ে মোস্তাফিজ জাতীয় দলের বাইরে থাকলেও একাকী অনুশীলন করে গেছেন বিসিবির একাডেমি মাঠে। সেখানে তার সঙ্গে স্থানীয় কোচরা কাজ করেছেন।
একাডেমি মাঠে নিরিবিলি পরিবেশে যারা মোস্তাফিজের অনুশীলন দেখেছেন, তাদের চোখে পড়েছে তার অ্যাকশনের জায়গায় কিছুটা পরিবর্তন। অনুশীলনের সময় তার রানআপ থেকে ফলো-থ্রু, ডেলিভারির পুরো প্রক্রিয়ায় একটুখানি হাতের জায়গাটা থামিয়ে ডেলিভারি করছিলেন তিনি।
এশিয়ান গেমসেও এরকম কোনো কিছু তিনি চেষ্টা করেছেন কি না, অথবা চোট থেকে এখনো পুরোপুরি সেরে ওঠার প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যথা অনুভব করছিলেন কি না—সেটা এখনো স্পষ্ট নয়।
চরচা বিসিবির মেডিকেল বিভাগের কাছে এই বিষয়ে জানতে চেয়েছিল। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, মোস্তাফিজ ফিট হওয়ার পরই তাকে এশিয়ান গেমসে ক্রিকেট ইভেন্টে খেলার জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রায় তিন সপ্তাহের মতো ফুল রিদমে বোলিং করেছেন বলেই তাকে খেলার জন্য সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেছেন, “দুইটা ম্যাচ খারাপ যেতেই পারে। এটার সঙ্গে ফিটনেসের সম্পর্ক নেই। মোস্তাফিজের ফিটনেস নিয়ে কোনো সমস্যা ছিল না। মেডিকেল বিভাগের কাছ থেকে গ্রিন সিগন্যাল পেয়েই আমরা তাকে দলে নিয়েছি।”
তবে দলীয় একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, চোট থেকে ফেরার পর মোস্তাফিজ একটু সাবধানী বোলিং করার চেষ্টা করছেন। নতুন করে চোট পেয়ে ছিটকে গেলে আগামীতে ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট মিস করতে পারেন, এমন চিন্তাও তিনি করতে পারেন বলে ধারণা দল সংশ্লিষ্টদের।
তবে বিষয়টি যেহেতু নিশ্চিত নয়, তাই এটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার আপাতত সুযোগ নেই।
যেটা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো - তিন মাসেরও বেশি সময় আগে পাওয়া চোটের প্রভাব যদি এখনো থেকে থাকে, তাহলে বোলিংয়ে পুরো রিদমে ফিরতে মোস্তাফিজের আরও কত সময় লাগবে?
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের ব্যর্থতার পেছনে অনেকেরই দায় থাকতে পারে। অধিনায়ক লিটন দাসের পাশাপাশি টপ অর্ডারই ব্যর্থ। বলতে গেলে পুরো দলই দুই ম্যাচে নিজেদের সেভাবে মেলে ধরতে পারেনি। তবে মোস্তাফিজ যে এত বাজে বোলিং করবেন, নজিরবিহীনভাবে লাইন-লেংথ হারিয়ে ফেলবেন—সেটা কেউই ভাবতে পারেনি।
তাই বড় প্রশ্ন—মোস্তাফিজের বোলিং অ্যাকশনে কি কোনো পরিবর্তন আনা হয়েছে? নাকি দলের ভেতর থেকে যে কথাটা শোনা যাচ্ছে, সেটাই সত্যি? আবার চোট পাওয়ার ভয় থেকেই মোস্তাফিজ নিজের স্বাভাবিক বোলিংটা করতে পারেননি?