ঘটা করে সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে নতুন ঘরোয়া প্রতিযোগিতার। ‘ডি-থ্রি’ নামের এই ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টুর্নামেন্টে তিন ফরম্যাটের জন্য দল দেওয়া হয়েছে ছয়টি। আর এই দলগুলো আগামী তিন বছরের জন্য ড্রাফট থেকে বেছে নিয়েছে নিজ নিজ ফ্র্যাঞ্চাইজির ছয়জন আইকন ক্রিকেটার। বিস্ময়করভাবে কেউই আগ্রহ দেখাননি বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন এবং ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাসের প্রতি।
অথচ শুধুমাত্র টেস্ট খেলা মুশফিক আইকন হয়েছেন। জাতীয় দলের দুই অধিনায়ককে এড়িয়ে শুধু তিনিই নন, আইকন হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন সদ্যই জাতীয় দলে ফেরা মোসাদ্দেক হোসেন বা বাংলাদেশ দলের বাইরে থাকা নাঈম শেখও।
টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন। ছবি : বিসিবি
আর তাই ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে থেকেও কেন আইকন হওয়ার যোগ্য হতে পারলেন না লিটন, নাজমুলরা—সেটা বড় এক প্রশ্ন।
বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল অবশ্য এর একটা ক্রিকেটীয় ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তার মতে, সারা বছরজুড়ে এই দুজন বা তাসকিন আহমেদ, মুস্তাফিজুর রহমানদের মতো ক্রিকেটারদের না পাওয়ার শঙ্কা থেকে তাদের প্রতি আগ্রহ দেখায়নি কেউ।
তামিম খুব একটা ভুল অবশ্য বলেননি। কারণ আগামী বছরের ওয়ানডে বিশ্বকাপ পর্যন্ত বাংলাদেশ দল পার করবে তিন ফরম্যাটেই ব্যস্ত সময়। এর মধ্যে ২০২৭ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ থাকায় অধিনায়ক লিটন এবং টপ অর্ডারের ভরসা নাজমুল সম্ভাব্য সব ম্যাচই খেলতে চাইবেন।
ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক হয়েও আইকন হতে পারেননি লিটন দাস। ছবি : বিসিবি
আর টেস্ট দলেও তারা নিয়মিতই। একজন অধিনায়ক, আর অন্যজন মিডল অর্ডারে সাদা পোশাকে দেশের অন্যতম সেরা। দুজনের গুরুত্ব এতটাই যে, আগামী অক্টোবরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বাইরে থাকা ম্যাচও খেলবেন তারা। আর এক বছর পর এশিয়ান গেমস টি-টোয়েন্টি দলে ফিরেছেন নাজমুল।
অর্থাৎ, তারা তিন ফরম্যাটেই দলের নিয়মিত সদস্য এখন থেকে। আর তাই ডি-থ্রি টুর্নামেন্টের চার দিনের, ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টিতে লিটন বা নাজমুলকে পাওয়া যাবে কমই। তবে অনেকের কাছে এটা যৌক্তিক মনে হয়নি।
এর অন্যতম কারণ বরিশালের আইকন হিসেবে তাওহীদ হৃদয়ের নির্বাচিত হওয়া। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। টেস্ট অভিষেক হয়েছে চলতি বছর। আছেন আফগানিস্তান সিরিজের দলেও। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে 'এ' দলের হয়ে চারদিনের ম্যাচে রেকর্ড ৩৫০ রানের ইনিংস খেলেছেন। আগামী তিন বছরে তাই তাওহীদও সব ফরম্যাটে নিয়মিত হয়ে যেতে পারেন।
ডি-থ্রি প্রতিযোগিতায় ফরচুন গ্রুপের আইকন হয়েছেন তাওহীদ হৃদয়। ছবি : বিসিবি
ছয় ফ্র্যাঞ্চাইজির একটির সঙ্গে যুক্ত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র চরচাকে বলেছেন তাদের আইকন নির্বাচন প্রক্রিয়া, “আমাদের কাছে প্রথম বিষয় ছিল ক্রিকেটারদের কাকে কতটুকু পাব আমরা। আইকন একজনকে নিলাম, আর তাকেই যদি ম্যাচের পর ম্যাচ না পাই, সেটা তো আমাদের জন্য ক্ষতি। আর শান্ত (নাজমুল), লিটনদের আমরা আইকন বানাইনি কারণ তাদের প্রোফাইল সেই মানের মনে করিনি আমরা। জাতীয় দলের অধিনায়ক হওয়া আর তিন বছরের জন্য একটা ফ্র্যাঞ্চাইজির আইকন হওয়ার মাঝে অনেক পার্থক্য আছে।”
চরচা সেই সূত্রের কাছে জানতে চেয়েছিল, তারা কি লিটন বা নাজমুলের ব্যাপারে আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন কি না। তিনি বলেন, “লিটন আর শান্ত এমন দুইটা নাম, যারা অধিকাংশ সময়ই সমালোচনার শিকার হয়। অনলাইনে ট্রল বলেন আর মেমে বা আর যাই বলেন, এই দুজনকে নিয়ে হয় সবচেয়ে বেশি। এই টুর্নামেন্টে এমনিতেই আর্থিকভাবে লাভ হবে না বললেই চলে, তাই আমরা এমন কাউকে নিতে চেয়েছি যিনি ক্রিকেটের জন্য বেশি আলোচনায় থাকবেন।”
একমি গ্রুপ আইকন মোসাদ্দেক হোসেন। ছবি : বিসিবি
একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি এমন চিন্তা করতেই পারে, তাই বলে ছয়টা ফ্র্যাঞ্চাইজিই শান্ত বা লিটনকে এড়িয়ে যাবে? আর সময়টা তিন বছর বলেই প্রশ্নটা জোরাল। মুশফিকুর সবশেষ টি-টোয়েন্টি খেলেছেন বিপিএলে। ওয়ানডে টুর্নামেন্ট বলতে খেলেন কেবল ডিপিএলে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও তার দিন ফুরিয়ে আসছে। অথচ লম্বা সময়ের জন্য তাকে তিন ফরম্যাটের জন্য নিয়েছে একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি।
অন্যদিকে মোসাদ্দেকের নেই মুশফিকুরের মতো সমৃদ্ধ ক্যারিয়ার। ঘরোয়া ক্রিকেটে পরীক্ষিত নাম হলেও জাতীয় দলের দুই অধিনায়ককে বাদ দিয়ে তাকে আইকন হিসেবে নেওয়া চমক জাগানিয়াই। তাছাড়া মোসাদ্দেক এখন সাদা বলের ক্রিকেটে দলের নিয়মিত সদস্য। ফলে তাকেও যে সারা বছর সব ম্যাচে পাওয়া যাবে, ব্যাপারটা তা নয়।
নাঈম শেখ আবার জাতীয় দলে না থাকলেও ঘরোয়া ক্রিকেটে বরাবরই পরীক্ষিত এক নাম। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিনি এখন পর্যন্ত ব্যর্থই। বর্তমানে নেই জাতীয় দলের আশেপাশেও। অন্যদিকে তার ব্র্যান্ড ইমেজ লিটন, নাজমুলদের ধারেকাছেও নেই। তবুও তিনি আইকন!
সেভেন রিংসের আইকন মুশফিকুর রহিম। ছবি : বিসিবি
বোর্ড থেকেই কি দুই অধিনায়ককে আইকন বানিয়ে বাড়তি চাপ না দেওয়ার মতো কোনো বিষয় ছিল? নাকি সাম্প্রতিক সময়ে লিটন, নাজমুল ও মেহেদি হাসান মিরাজের বাংলাদেশের দলের অধিনায়কত্ব নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে চেয়েছে বিসিবি? যেহেতু চারটি ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন বিসিবির পরিচালকরা।
বোর্ডের একটি সংশ্লিষ্ট সূত্র চরচাকে আভাস দিয়েছেন তেমন কিছুরই, “শান্তর কাছ থেকে যেভাবে মিরাজকে অধিনায়ক করা হয়েছে, এরপর শান্ত সহ-অধিনায়ক থাকার পর আবার তাকে টপকে লিটন ওয়ানডে অধিনায়ক হয়েছে, পুরো ব্যাপারটা দলের ওপর প্রভাব ফেলেছে। সামনে বিশ্বকাপ আর টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ, তাই ফ্র্যাঞ্চাইজিকে এটা মাথায় রাখতে বলা হয়েছিল। তবে তাদের আইকন না বানাতে বলা হয়নি। এটা ফ্র্যাঞ্চাইজির সিদ্ধান্ত।”
বিসিবির পক্ষ থেকে সত্যিই এই দুই ক্রিকেটারকে আইকন না বানানোর নির্দেশনা ছিল কি না, সেটা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে একটা দেশের জাতীয় দলের অধিনায়করা যখন ঘরোয়া ক্রিকেট আইকন হতে পারেন না, সেটা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিতেই পারে।