আল হেলাল শুভ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হলেও বিরোধী জোটের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে এখনো আলোচনা চলছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সংসদে সরব থাকলেও মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বিরোধী দল ‘নমনীয়’ কেন ছিল–তা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।
সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয় গত ৩০ এপ্রিল রাতে। এই অধিবেশন শুরু হয় গত ১২ মার্চে। শুরুর দিনই রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে কঠোর অবস্থানে ছিল বিরোধী দল। ওয়াকআউট, উত্তেজনায় বেশ নাটকীয় পরিবেশ তৈরি করেছিল বিরোধী দল। পরে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়েও তারা সংসদে জোরালো কণ্ঠস্বর তোলে। তবে বেশ কিছু ইস্যুতে সরকারি দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে তাদের দাবি ধোপে টেকেনি।
২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরের সংসদে ‘কার্যকর বিরোধী দল’ নিয়ে অনেকেই আশা প্রকাশ করেন। আওয়ামী লীগের সময়ে তিনটি সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে আখ্যা পায়। তাদের ভূমিকা নিয়েও ছিল অনেক সমালোচনা।
বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করলেও পুরো অধিবেশনজুড়ে সংসদ বর্জনের পথ নেয়নি। এ কারণে অনেকে এটিকে ‘সংসদীয় সহনশীলতার ইতিবাচক ইঙ্গিত’ হিসেবেও দেখছেন। তবে ভিন্ন মতও আছে।
সেখানে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিরোধী দল উত্তেজনা, বিতর্ক এবং নাটকীয়তায় জন্ম দেয়। যদিও সংসদে যাওয়ার আগে বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির মো. শফিকুর রহমান বলেছিলেন, তারা সংসদে ‘গতানুগতিক বিরোধীদল’ হিসেবে ভূমিকা রাখতে চান না। বরং একটি ‘গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল’ বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালনের আশা প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট গণভোট সংস্কার প্রস্তাব, সংস্কার পরিষদ গঠন এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়ন নিয়ে জাতীয় সংসদে বিরোধ ও উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। বিরোধী দলের ওয়াকআউটও সংসদ অনেক দিন পরে দেখে।
বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করলেও পুরো অধিবেশনজুড়ে সংসদ বর্জনের পথ নেয়নি। এ কারণে অনেকে এটিকে ‘সংসদীয় সহনশীলতার ইতিবাচক ইঙ্গিত’ হিসেবেও দেখছেন। তবে ভিন্ন মতও আছে।
সংসদে আসন আরও বেশি থাকলে বিরোধীদের ভূমিকা অন্যরকম হতো কি না–জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশে বিরোধী দলের ভূমিকা তো সীমিত। বরং বিরোধীরা সংসদ থেকে বের হয়ে গেলে ক্ষমতাসীনরা খুশি হয়।”
জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতীতের মতো কেবল বর্জন বা সংঘাতের রাজনীতি না করে বিরোধী দল সংসদের ভেতরে থেকেই চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছে। তবে তা খুব বেশি কাজে আসেনি বলেই রাজপথে কর্মসূচি দিতে হয়েছে তাদের।
সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা নাহিদের কাছে এই প্রশ্ন রাখতে ছাড় দেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তোলেন, “তখন (শপথ নেওয়ার সময়) রাষ্ট্রপতি গ্রহণযোগ্য ছিলেন, আর এখন সংসদে এসে তিনি অগ্রহণযোগ্য হয়ে গেলেন?”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, সংসদে বিরোধী দল নমনীয় থাকলেও কার্যকরী ছিল। তিনি বলেন, ‘‘সংসদে বিরোধী দল যথেষ্ট ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। তারা শুরু থেকে সরকারবিরোধী শক্ত অবস্থানে যায়নি। তারা সরকারকে কিছুটা সুযোগ দিয়েছে। আমার মনে হয়, তাদের কাছে যে পয়েন্ট ছিল, এটা দিয়ে তারা অনেক দূর যেতে পারত।”
রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে ‘হৈ চৈ’, তবে আলোচনায় সরব
সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে জামায়াত এবং তাদের মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ভূমিকা ছিল সরব। সংসদ অধিবেশন শুরুর দিকে বিরোধীরা সংসদে উপস্থিত থেকে স্পিকার নির্বাচনে বিএনপির প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় প্রতিবাদ জানিয়ে ওয়াকআউট করে। ওয়াকআউটের আগে সংসদ কক্ষে পোস্টার নিয়ে প্রতিবাদও জানায় তারা। সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতির সামনে দাঁড়িয়ে এ রকম প্রতিবাদ নিকট অতীতে দেখা যায়নি। তবে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় বিরোধী দলের সদস্যরা ঠিকই অংশ নেন।

বিরোধীদের এমন আচরণকে ‘স্ববিরোধী’ বলে আখ্যা দেন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর যে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা, অন্তবর্তী সরকারের তার কাছে শপথ নেওয়া; সংসদের প্রথম অধিবেশনে সেই রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিরোধিতাকেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘স্ববিরোধিতা’ উল্লেখ করে বিরোধীদলের উদ্দেশে প্রশ্নও রাখেন।
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলাম রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছিলেন। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে তিনি এই রাষ্ট্রপতির কাছেই শপথ নিয়েছিলেন। সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা নাহিদের কাছে এই প্রশ্ন রাখতে ছাড় দেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তোলেন, “তখন (শপথ নেওয়ার সময়) রাষ্ট্রপতি গ্রহণযোগ্য ছিলেন, আর এখন সংসদে এসে তিনি অগ্রহণযোগ্য হয়ে গেলেন?”
জুলাই সংস্কার নিয়ে সংসদে ‘সরব’
সংসদে শপথ গ্রহণের দিনই সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি বিএনপি। ওই সময়ই বিরোধী জোট থেকে বলা হয়েছিল, তারা কোনো শপথ নেবেন না। তবে পরে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে জামায়াত ও তার মিত্ররা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন। এরপর থেকে সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের ভূমিকা নিয়ে টানা সমালোচনা করতে তাকে বিরোধী দল। তবে সরকারি দল বারবার বলেছে, তারা সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী সংস্কারের পক্ষে।
পরে সংসদে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে জুলাই সংস্কার নিয়ে আলোচনার জন্য মুলতবি প্রস্তাবের নোটিশ দেয় বিরোধী দল। এ বিষয়ে আলোচনাও হয়। তবে সেখানে ‘সুবিধা’ করতে পারেনি তারা। অধিবেশনের শুরুর দিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা সংবিধান সংস্কার নিয়ে সংসদীয় রীতি-নীতিতে আস্থা রাখতে চান। না হলে রাজপথে আন্দোলনে যাবেন। তবে সংসদে বিষয়টি ‘সুরহা’ না করতে পেরে রাজপথে কর্মসূচি দেন বিরোধীরা।
মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে জর্জরিত জামায়াত
গত ৯ এপ্রিল জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন-২০২২ সংশোধন বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়। এতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর স্থানীয় সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রাখা হয়। যখন বিরোধী দল হিসেবে সংসদে জামায়াত, তখনই সংসদে এই বিল পাস হয়।

এই বিলের ওপর সংসদে কথা বলতে গিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেন, “আল্লাহ ভালো জানেন ৭১ সালের এই চরম সময়ে কার কী ভূমিকা ছিল।” বিল থেকে জামায়াতে ইসলামীর নাম বাদ দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি। তবে এ বিল নিয়ে এনসিপির কোনো আপত্তি নেই বলে স্পিকারকে লিখিতভাবে জানায় দলটি। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনার সময় সরকারি দলের পক্ষ থেকে একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতের কঠোর সমালোচনা করা হয়, যার জবাবও দিয়েছে তারা।
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সংসদে ‘নীরব’ বিরোধীরা
সংসদে যখন অধিবেশন চলছে, তখন দেশে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল অন্তবর্তী সরকারের সময়ে হওয়া মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি। যদিও বিষয়টি নিয়ে সংসদে ‘টু শব্দটি’ও করেনি জামায়াত ও তার মিত্ররা। এ বিষয় নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ওঠে। ওই চুক্তিটি নিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ও সাবেক বিএনপি নেত্রী রুমিন ফারহানা সংসদে প্রশ্ন তুললেও প্রধান বিরোধী দল প্রতিবাদে যায়নি।
ওই চুক্তি নিয়ে বিরোধীদের অবস্থান প্রসঙ্গে অনেকে মনে করেন, ক্ষমতায় গেলে তাদেরও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাস্তববাদী সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, তাই তারা কঠোর অবস্থান নেয়নি। যেখানে বামপন্থী সংগঠনগুলো এর প্রকাশ্য বিরোধিতা করছে, সেখানে প্রধান বিরোধী দল বিষয়টিকে বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেনি, যা বিরোধীদের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
চরচার এক টক শো তে জামায়াত নেতা ও সংসদ নির্বাচনে ঢাকা ৬ আসন থেকে দলীয় প্রার্থী ড. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘‘এটা মজলুমদের সংসদ। সরকারি দল এবং বিরোধী দল দুই পক্ষই।”
রুমিন ফারহানা সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীনের এক টক শো তে বলেন, ‘‘সরকার তেল আনবেন কোথা থেকে, এটার জন্য আমেরিকার অনুমতি লাগবে এবং লাগছে। জামায়াত তো আগেই বলেছে, তারা এই চুক্তিতে ‘হ্যাঁ’ বলেনি। তাহলে দেড় মাস যে সংসদ চলল, তারা এটা তুলল (সংসদে) না কেন?”
রুমিন ফারহানা বলেন, “শেখ হাসিনার জন্য জাতীয় পার্টি যেমন একটু কুসুম কুসুম বিরোধিতা করত, এখনো আমি তার থেকে ব্যতিক্রম কিছু দেখি না।”
চরচার এক টক শো তে জামায়াত নেতা ও সংসদ নির্বাচনে ঢাকা ৬ আসন থেকে দলীয় প্রার্থী ড. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘‘এটা মজলুমদের সংসদ। সরকারি দল এবং বিরোধী দল দুই পক্ষই।”
সংসদের অধিবেশনে জনসম্পৃক্ত বিষয়ের চেয়ে জুলাই সনদ নিয়ে বেশি সময় গেল কি না–এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘না, আমি পুরোপুরি একমত না। সংসদের ভেতরে ও বাইরে আমরা জ্বালানি সংকট নিয়ে কথা বলেছি। সরকারকে বলেছি, আসেন ঐক্যমত হই আমরা। এবং সরকার কিন্তু বিরোধী দলের চাপের কারণেই জ্বালানি সংকট নিয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়েছে।”
মার্কিন চুক্তি নিয়ে নীরব কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘না, আমরা নীরব না। আমরা দেশের পক্ষে যেকোনো চুক্তিকে সাপোর্ট করি। বরং এই চুক্তি তো একদিনে হয়নি। আমাদের অবস্থান বাংলাদেশের স্বার্থের পক্ষে।”
অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘‘রাজনৈতিক দলগুলো কারো না কারো গোলামি করে। বিএনপিও করে, জামায়াতও করে। আওয়ামী লীগও করে। গোলামি থাকবেই। গোলামির বাস্তবতা দিয়েই আমাদের সবকিছু বুঝতে হবে।”
ক্ষমতায় গেলে বিরোধীদেরও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সম্পর্ক’ রাখতে হবে–এ জন্যই কি সংসদে তারা কোনো উচ্চবাচ্য করেনি–এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কী আছে? আপনার মনে আছে, সব দলের নেতাদের নিয়ে ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রে গেল না? সেটাতেই তো বোঝা যায়।”
রাজপথে বিরোধীদের কর্মসূচি প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, ‘‘ওই কর্মসূচিতে কিছু হবে না। এগুলো নরম-গরম কর্মসূচি হচ্ছে। বাংলাদেশে এগুলো (নরম-গরম কর্মসূচি) কাজ করে না।”

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হলেও বিরোধী জোটের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে এখনো আলোচনা চলছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সংসদে সরব থাকলেও মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বিরোধী দল ‘নমনীয়’ কেন ছিল–তা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।
সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয় গত ৩০ এপ্রিল রাতে। এই অধিবেশন শুরু হয় গত ১২ মার্চে। শুরুর দিনই রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে কঠোর অবস্থানে ছিল বিরোধী দল। ওয়াকআউট, উত্তেজনায় বেশ নাটকীয় পরিবেশ তৈরি করেছিল বিরোধী দল। পরে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়েও তারা সংসদে জোরালো কণ্ঠস্বর তোলে। তবে বেশ কিছু ইস্যুতে সরকারি দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে তাদের দাবি ধোপে টেকেনি।
২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরের সংসদে ‘কার্যকর বিরোধী দল’ নিয়ে অনেকেই আশা প্রকাশ করেন। আওয়ামী লীগের সময়ে তিনটি সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে আখ্যা পায়। তাদের ভূমিকা নিয়েও ছিল অনেক সমালোচনা।
বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করলেও পুরো অধিবেশনজুড়ে সংসদ বর্জনের পথ নেয়নি। এ কারণে অনেকে এটিকে ‘সংসদীয় সহনশীলতার ইতিবাচক ইঙ্গিত’ হিসেবেও দেখছেন। তবে ভিন্ন মতও আছে।
সেখানে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিরোধী দল উত্তেজনা, বিতর্ক এবং নাটকীয়তায় জন্ম দেয়। যদিও সংসদে যাওয়ার আগে বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির মো. শফিকুর রহমান বলেছিলেন, তারা সংসদে ‘গতানুগতিক বিরোধীদল’ হিসেবে ভূমিকা রাখতে চান না। বরং একটি ‘গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল’ বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালনের আশা প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট গণভোট সংস্কার প্রস্তাব, সংস্কার পরিষদ গঠন এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়ন নিয়ে জাতীয় সংসদে বিরোধ ও উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। বিরোধী দলের ওয়াকআউটও সংসদ অনেক দিন পরে দেখে।
বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করলেও পুরো অধিবেশনজুড়ে সংসদ বর্জনের পথ নেয়নি। এ কারণে অনেকে এটিকে ‘সংসদীয় সহনশীলতার ইতিবাচক ইঙ্গিত’ হিসেবেও দেখছেন। তবে ভিন্ন মতও আছে।
সংসদে আসন আরও বেশি থাকলে বিরোধীদের ভূমিকা অন্যরকম হতো কি না–জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশে বিরোধী দলের ভূমিকা তো সীমিত। বরং বিরোধীরা সংসদ থেকে বের হয়ে গেলে ক্ষমতাসীনরা খুশি হয়।”
জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতীতের মতো কেবল বর্জন বা সংঘাতের রাজনীতি না করে বিরোধী দল সংসদের ভেতরে থেকেই চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছে। তবে তা খুব বেশি কাজে আসেনি বলেই রাজপথে কর্মসূচি দিতে হয়েছে তাদের।
সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা নাহিদের কাছে এই প্রশ্ন রাখতে ছাড় দেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তোলেন, “তখন (শপথ নেওয়ার সময়) রাষ্ট্রপতি গ্রহণযোগ্য ছিলেন, আর এখন সংসদে এসে তিনি অগ্রহণযোগ্য হয়ে গেলেন?”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, সংসদে বিরোধী দল নমনীয় থাকলেও কার্যকরী ছিল। তিনি বলেন, ‘‘সংসদে বিরোধী দল যথেষ্ট ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। তারা শুরু থেকে সরকারবিরোধী শক্ত অবস্থানে যায়নি। তারা সরকারকে কিছুটা সুযোগ দিয়েছে। আমার মনে হয়, তাদের কাছে যে পয়েন্ট ছিল, এটা দিয়ে তারা অনেক দূর যেতে পারত।”
রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে ‘হৈ চৈ’, তবে আলোচনায় সরব
সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে জামায়াত এবং তাদের মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ভূমিকা ছিল সরব। সংসদ অধিবেশন শুরুর দিকে বিরোধীরা সংসদে উপস্থিত থেকে স্পিকার নির্বাচনে বিএনপির প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় প্রতিবাদ জানিয়ে ওয়াকআউট করে। ওয়াকআউটের আগে সংসদ কক্ষে পোস্টার নিয়ে প্রতিবাদও জানায় তারা। সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতির সামনে দাঁড়িয়ে এ রকম প্রতিবাদ নিকট অতীতে দেখা যায়নি। তবে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় বিরোধী দলের সদস্যরা ঠিকই অংশ নেন।

বিরোধীদের এমন আচরণকে ‘স্ববিরোধী’ বলে আখ্যা দেন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর যে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা, অন্তবর্তী সরকারের তার কাছে শপথ নেওয়া; সংসদের প্রথম অধিবেশনে সেই রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিরোধিতাকেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘স্ববিরোধিতা’ উল্লেখ করে বিরোধীদলের উদ্দেশে প্রশ্নও রাখেন।
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলাম রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছিলেন। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে তিনি এই রাষ্ট্রপতির কাছেই শপথ নিয়েছিলেন। সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা নাহিদের কাছে এই প্রশ্ন রাখতে ছাড় দেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তোলেন, “তখন (শপথ নেওয়ার সময়) রাষ্ট্রপতি গ্রহণযোগ্য ছিলেন, আর এখন সংসদে এসে তিনি অগ্রহণযোগ্য হয়ে গেলেন?”
জুলাই সংস্কার নিয়ে সংসদে ‘সরব’
সংসদে শপথ গ্রহণের দিনই সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি বিএনপি। ওই সময়ই বিরোধী জোট থেকে বলা হয়েছিল, তারা কোনো শপথ নেবেন না। তবে পরে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে জামায়াত ও তার মিত্ররা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন। এরপর থেকে সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের ভূমিকা নিয়ে টানা সমালোচনা করতে তাকে বিরোধী দল। তবে সরকারি দল বারবার বলেছে, তারা সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী সংস্কারের পক্ষে।
পরে সংসদে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে জুলাই সংস্কার নিয়ে আলোচনার জন্য মুলতবি প্রস্তাবের নোটিশ দেয় বিরোধী দল। এ বিষয়ে আলোচনাও হয়। তবে সেখানে ‘সুবিধা’ করতে পারেনি তারা। অধিবেশনের শুরুর দিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা সংবিধান সংস্কার নিয়ে সংসদীয় রীতি-নীতিতে আস্থা রাখতে চান। না হলে রাজপথে আন্দোলনে যাবেন। তবে সংসদে বিষয়টি ‘সুরহা’ না করতে পেরে রাজপথে কর্মসূচি দেন বিরোধীরা।
মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে জর্জরিত জামায়াত
গত ৯ এপ্রিল জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন-২০২২ সংশোধন বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়। এতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর স্থানীয় সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রাখা হয়। যখন বিরোধী দল হিসেবে সংসদে জামায়াত, তখনই সংসদে এই বিল পাস হয়।

এই বিলের ওপর সংসদে কথা বলতে গিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেন, “আল্লাহ ভালো জানেন ৭১ সালের এই চরম সময়ে কার কী ভূমিকা ছিল।” বিল থেকে জামায়াতে ইসলামীর নাম বাদ দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি। তবে এ বিল নিয়ে এনসিপির কোনো আপত্তি নেই বলে স্পিকারকে লিখিতভাবে জানায় দলটি। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনার সময় সরকারি দলের পক্ষ থেকে একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতের কঠোর সমালোচনা করা হয়, যার জবাবও দিয়েছে তারা।
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সংসদে ‘নীরব’ বিরোধীরা
সংসদে যখন অধিবেশন চলছে, তখন দেশে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল অন্তবর্তী সরকারের সময়ে হওয়া মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি। যদিও বিষয়টি নিয়ে সংসদে ‘টু শব্দটি’ও করেনি জামায়াত ও তার মিত্ররা। এ বিষয় নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ওঠে। ওই চুক্তিটি নিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ও সাবেক বিএনপি নেত্রী রুমিন ফারহানা সংসদে প্রশ্ন তুললেও প্রধান বিরোধী দল প্রতিবাদে যায়নি।
ওই চুক্তি নিয়ে বিরোধীদের অবস্থান প্রসঙ্গে অনেকে মনে করেন, ক্ষমতায় গেলে তাদেরও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাস্তববাদী সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, তাই তারা কঠোর অবস্থান নেয়নি। যেখানে বামপন্থী সংগঠনগুলো এর প্রকাশ্য বিরোধিতা করছে, সেখানে প্রধান বিরোধী দল বিষয়টিকে বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেনি, যা বিরোধীদের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
চরচার এক টক শো তে জামায়াত নেতা ও সংসদ নির্বাচনে ঢাকা ৬ আসন থেকে দলীয় প্রার্থী ড. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘‘এটা মজলুমদের সংসদ। সরকারি দল এবং বিরোধী দল দুই পক্ষই।”
রুমিন ফারহানা সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীনের এক টক শো তে বলেন, ‘‘সরকার তেল আনবেন কোথা থেকে, এটার জন্য আমেরিকার অনুমতি লাগবে এবং লাগছে। জামায়াত তো আগেই বলেছে, তারা এই চুক্তিতে ‘হ্যাঁ’ বলেনি। তাহলে দেড় মাস যে সংসদ চলল, তারা এটা তুলল (সংসদে) না কেন?”
রুমিন ফারহানা বলেন, “শেখ হাসিনার জন্য জাতীয় পার্টি যেমন একটু কুসুম কুসুম বিরোধিতা করত, এখনো আমি তার থেকে ব্যতিক্রম কিছু দেখি না।”
চরচার এক টক শো তে জামায়াত নেতা ও সংসদ নির্বাচনে ঢাকা ৬ আসন থেকে দলীয় প্রার্থী ড. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘‘এটা মজলুমদের সংসদ। সরকারি দল এবং বিরোধী দল দুই পক্ষই।”
সংসদের অধিবেশনে জনসম্পৃক্ত বিষয়ের চেয়ে জুলাই সনদ নিয়ে বেশি সময় গেল কি না–এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘না, আমি পুরোপুরি একমত না। সংসদের ভেতরে ও বাইরে আমরা জ্বালানি সংকট নিয়ে কথা বলেছি। সরকারকে বলেছি, আসেন ঐক্যমত হই আমরা। এবং সরকার কিন্তু বিরোধী দলের চাপের কারণেই জ্বালানি সংকট নিয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়েছে।”
মার্কিন চুক্তি নিয়ে নীরব কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘না, আমরা নীরব না। আমরা দেশের পক্ষে যেকোনো চুক্তিকে সাপোর্ট করি। বরং এই চুক্তি তো একদিনে হয়নি। আমাদের অবস্থান বাংলাদেশের স্বার্থের পক্ষে।”
অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘‘রাজনৈতিক দলগুলো কারো না কারো গোলামি করে। বিএনপিও করে, জামায়াতও করে। আওয়ামী লীগও করে। গোলামি থাকবেই। গোলামির বাস্তবতা দিয়েই আমাদের সবকিছু বুঝতে হবে।”
ক্ষমতায় গেলে বিরোধীদেরও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সম্পর্ক’ রাখতে হবে–এ জন্যই কি সংসদে তারা কোনো উচ্চবাচ্য করেনি–এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কী আছে? আপনার মনে আছে, সব দলের নেতাদের নিয়ে ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রে গেল না? সেটাতেই তো বোঝা যায়।”
রাজপথে বিরোধীদের কর্মসূচি প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, ‘‘ওই কর্মসূচিতে কিছু হবে না। এগুলো নরম-গরম কর্মসূচি হচ্ছে। বাংলাদেশে এগুলো (নরম-গরম কর্মসূচি) কাজ করে না।”

তথ্য যাচাইকারী ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব জানিয়েছে, অসুস্থতার মধ্যেই সামাজিকমাধ্যমে চলছে কারিনাকে ঘিরে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের সংঘবদ্ধ প্রচারণা। ফেসবুক এবং এক্স-এ অন্তত ৫৩টি পোস্ট খুঁজে পেয়েছে তারা, যেখানে অসুস্থতার খবরে কারিনা কায়সার এবং তার পরিবারকে নিয়ে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়ানো হয়েছে।