ads

ভারত: তরুণরা বললে রাজনীতিকদের শুনতে হবে

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ভারত: তরুণরা বললে রাজনীতিকদের শুনতে হবে
পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে সংসদ ভবনের দিকে মিছিল করছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সমর্থকেরা। নয়াদিল্লি, ২০ জুলাই ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

গত ২০ জুলাই নয়াদিল্লির কেন্দ্রস্থলে ঘটে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি নির্যাতন এবং তার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবকে চিহ্নিত করা গেছে। নয়াদিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট ও তলস্তয় মার্গ ক্রসিং থেকে শুরু করে কনট প্লেস পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় তরুণ ভারতীয়রা শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। কিন্তু সেই ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদের জবাবে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পক্ষ থেকে নেমে আসে চরম নিপীড়ন, যা পরবর্তীতে সারা দেশের যুবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেছে এবং নিজেদের অধিকার, জবাবদিহিতা, সংলাপ ও সংস্কারের নতুন দাবি তুলে ধরতে বাধ্য করেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক রাধা কুমারের নিবন্ধ ‘হোয়েন ইয়ং স্পিক, পলিটিক্স মাস্ট লিসেন’-এ ভারতের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, ছাত্র আন্দোলন এবং আন্দোলন দমনে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহারের বিস্তারিত এক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

Advertisement

আজ শুক্রবার নিবন্ধটিতে লেখক আক্ষেপের সাথে উল্লেখ করেছেন যে, মাত্র এক দশক আগেও যে ভারতকে মানবসম্পদ ও তরুণ জনসংখ্যার শক্তির কারণে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশের জন্য সম্ভাবনাময় দেশ বলা হতো, আজ তা চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) আনুমানিক হিসাব উদ্ধৃত করে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মকে ধীরে ধীরে এক ‘হারানো প্রজন্মে’ পরিণত করা হয়েছে। তথ্যানুসারে, ২০২৪ সালে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার যেখানে ছিল ১৫ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৭.২ শতাংশে। আরও ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে উচ্চশিক্ষিত নারীদের ক্ষেত্রে, যেখানে ২০২৪ সালেই বেকারত্বের হার ছিল ২১ শতাংশ। এই বিপুল পরিমাণ শিক্ষিত ও কর্মক্ষম তরুণদের কর্মসংস্থানে ব্যর্থ হওয়ার দায় কোনোভাবেই কেন্দ্র বা রাজ্য প্রশাসন এড়িয়ে যেতে পারে না। বিশেষ করে এমন একটি কেন্দ্রীয় সরকার যা টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা হয়তো এর পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করবেন। তবে নীতিনির্ধারকদের এই চরম ব্যর্থতা দেশের সামগ্রিক প্রগতির পথকে স্থবির করে দিয়েছে।

শিক্ষা ব্যবস্থার এই গভীর অবক্ষয় নিরসনে ভারতের মতো বিশাল ভৌগোলিক ও জনসংখ্যার দেশে জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা পরিচালনা কতটা যৌক্তিক বা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে দেশের অগণিত শিক্ষাবিদদের সাথে কোনো ধরনের গঠনমূলক আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষার মান উন্নয়ন ও তা সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। বিশেষ করে হিন্দিভাষী অঞ্চলগুলোতে শিক্ষার করুণ দশা ও অপ্রতুলতার বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকে গেছে। তাছাড়া, শিক্ষাকে কীভাবে কর্মসংস্থানের সাথে কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায়, সে বিষয়েও কোনো গভীর বা প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা পরিচালিত হয়নি। সমস্যা সমাধানের জন্য কোনো উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠন না করে প্রশাসন কেবল আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের পুরোনো ও প্রশাসনিক পন্থার ওপর নির্ভর করেছে। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটকে (ইডি) জালিয়াতিতে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা হয়েছে। অথচ শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা অনুসন্ধানে কোনো টেকসই প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

অনুরূপভাবে, নিজেদের দাবি নিয়ে রাজপথে নেমে আসা আন্দোলনকারী তরুণদের মুখোমুখি হতেও কেন্দ্র সরকার একই রকমের কঠোর ও অনমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করেছে। নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, টানা আন্দোলন চলা সত্ত্বেও সরকারের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল গভীর নীরবতা। গণমাধ্যম ও সম্পাদকীয় পাতাগুলো থেকে বারংবার আলোচনার আহ্বান জানানো হলেও কেন্দ্র প্রশাসন দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি কোনো কর্ণপাত করেনি। আন্দোলন শুরু হওয়ার এক মাস পর কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডার সাথে আন্দোলনকারীদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেই আলোচনাও শেষ পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক ফলাফলে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। সরকার যখন একদিকে আলোচনার টেবিলে বসেছিল, অন্যদিকে ঠিক সেই সময়ই রাজপথে আন্দোলনকারীদের ওপর নেমে আসে নজিরবিহীন পুলিশি তাণ্ডব।

সংসদ অভিমুখে পদযাত্রারত ও আন্দোলনস্থলে অবস্থানরত তরুণদের ওপর দিল্লি পুলিশ যে মাত্রায় বলপ্রয়োগ করেছে, তা যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া অজস্র ভিডিও ফুটেজের বরাতে নিবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে যে, পুলিশ তরুণদের ছত্রভঙ্গ করতে ‘শক ব্যাটন’ বা বৈদ্যুতিক লাঠি, কাঁদানে গ্যাস এবং এমনকি পেলেট গান ব্যবহার করেছে। বিশ্বজুড়ে অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে পেলেট গান ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও ভারতে কেবল ‘বিরল থেকে বিরলতম’ পরিস্থিতিতে এর অনুমতির সুযোগ নেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, একটি সাধারণ ও শান্তিপূর্ণ ছাত্র বিক্ষোভ কীভাবে ‘বিরল থেকে বিরলতম’ ঘটনার মানদণ্ডে পড়ে? এর চেয়েও স্তম্ভিত করার মতো বিষয় ছিল, ইউনিফর্ম পরা পুলিশের উপস্থিতিতে সাধারণ পোশাকে থাকা কমান্ডোরা শিক্ষার্থীদের নির্মমভাবে প্রহার করেছে। অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের কোনো বাধা দেয়নি।

ভারতে পুলিশি বর্বরতা কোনো নতুন ঘটনা নয়। তবে গত এক দশকে এই প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে আন্দোলনরত কৃষকদের ওপর পুলিশের গুলি চালনা এবং ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হওয়া এর স্পষ্ট উদাহরণ। এমনকি একই সময়ে আসাম ও মিজোরাম কিংবা হরিয়ানা ও পাঞ্জাব পুলিশের মধ্যে যে সশস্ত্র মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনা ঘটেছে, তা ভারতের প্রশাসনিক ইতিহাসে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও বিরল। ২০ জুলাইয়ের ঘটনায় দিল্লি পুলিশ নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার অনুসন্ধান বা তদন্ত করার পরিবর্তে উল্টো আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ও চরিত্র হননের প্রচারণায় লিপ্ত হয়েছে। আন্দোলনকারীদের ছদ্মবেশী, বিরোধী দলের দাবার ঘুটি বা এজেন্ট হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং বেনামী সূত্রে আন্দোলনকারীদের সাথে পাকিস্তানের যোগসূত্রের মনগড়া গল্পও ছড়ানো হয়েছে। নিবন্ধে যৌক্তিকভাবে প্রশ্ন তোলা হয়েছে– যদি সত্যিই পাকিস্তান ভারতের রাজধানীতে লক্ষাধিক মানুষকে রাস্তায় নামাতে সক্ষম হয়, তবে দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এতদিন কী ভূমিকা পালন করছিল?

এই ধরণের হাস্যকর ও ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় পুলিশ ব্যবস্থার গভীর ব্যাধিকেই উন্মোচিত করে। নিবন্ধে গুরুত্বের সাথে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, গত কয়েক দশক ধরে পুলিশ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। ১৯৭৮ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে গঠিত একাধিক কমিশন পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাব ও নির্দেশ থেকে মুক্ত রাখার জন্য অত্যন্ত কার্যকর ও বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সেই সুপারিশগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিপত্রে বছরের পর বছর ধরে ধুলো জমে পড়ে আছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। যাতে পুলিশকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করে একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা যায়।

রাধা কুমার তার নিবন্ধের শেষাংশে জোর দিয়ে বলেছেন, ২০ জুলাই নয়াদিল্লিতে তরুণদের ওপর ঘটে যাওয়া এই হিংসাত্মক ঘটনা ভারতীয় জনগণের মনে অসন্তোষ ও ক্ষোভের আগুনকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। তরুণদের ভবিষ্যৎ আজ যে সংকটের মুখোমুখি, তা কোনো একক রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়; এটি একটি সার্বজনীন জাতীয় ইস্যু, যা অবিলম্বে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও সুদূরপ্রসারী সরকারি নীতি প্রণয়নের দাবি রাখে। দেশের অর্থনীতি ও সমাজের ভবিষ্যৎ প্রগতি বা পতন সম্পূর্ণ নির্ভর করছে এই তরুণ প্রজন্মের সার্বিক কল্যাণের ওপর, এবং তারা আজ রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে জবাব চাইছে। আন্দোলনরত এক তরুণীর উদ্ধৃতি তুলে ধরে লেখিকা বলেন– “জবাবদিহিতা ছাড়া কোনো কর প্রদান নয়”। ভারতের যুবসমাজ আজ তাদের অধিকার রক্ষায় জেগে উঠেছে; এখন সময় এসেছে প্রবীণ ও চিরাচরিত শাসক ব্যবস্থার তাদের কথা শোনার, তাদের দাবি বোঝার এবং নিজেদের ভুল সংশোধন করার।

সম্পর্কিত