বাংলাদেশে শান্তি বেড়েছে, কমেছে ভারত ও পাকিস্তানে। বৈশ্বিক শান্তি সূচক বা গ্লোবাল পিস ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী শত সংকট সত্ত্বেও শান্তির মানদণ্ডে এগিয়েছে বাংলাদেশ।
সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে গ্লোবাল পিস ইনডেক্স বা বৈশ্বিক শান্তি সূচক ২০২৬। অস্ট্রেলিয়া-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস’ (আইইপি) প্রতি বছর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত বছরের তুলনায় পৃথিবী এখন আরও বেশি অশান্ত হয়ে উঠেছে। এই সূচকে চলতি বছর ৯৯টি দেশেই সার্বিক শান্তি পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে, যা বিশ্বব্যাপী শান্তি ও স্থিতিশীলতা হ্রাসের টানা ১২তম বছর। তারপরও বাংলাদেশ তিন ধাপ এগিয়ে ১১৭তম অবস্থানে এসেছে। অন্যদিকে ভারত ও পাকিস্তান যথাক্রমে তিন ও ছয় ধাপ পিছিয়ে ১২৭ ও ১৫২তম অবস্থানে রয়েছে।
শান্তি সূচকে দক্ষিণ এশিয়া
বৈশ্বিক শান্তি সূচকের নতুন প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার একটি উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। মূলত অভ্যন্তরীণ সংঘাত বৃদ্ধি, সীমান্ত উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই অঞ্চলের গড় স্কোর ২.৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম অস্থিতিশীল অঞ্চল হিসেবে রয়ে গেছে। ক্রমবর্ধমান জাতিগত সংঘাত, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, সন্ত্রাসবাদ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বৈরী সম্পর্ক ক্রমাগত এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ণ করছে। এর ফলে গ্লোবাল পিস ইনডেক্স ২০২৬-এ দক্ষিণ এশিয়া সবচেয়ে খারাপ পারফর্ম করা অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ এগিয়ে
বৈশ্বিক শান্তি সূচক ২০২৬-এ মূল্যায়িত ১৬৩টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৭তম। এই অবস্থান অনুযায়ী, ভুটান শ্রীলঙ্কা ও নেপালের পর বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার চতুর্থ শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
আঞ্চলিক বেশ কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের তুলনায় ভালো পারফর্ম করা সত্ত্বেও, বাংলাদেশ এমন কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে যা এর সামগ্রিক শান্তি সূচকের স্কোরকে প্রভাবিত করেছে। প্রতিবেদনে দেশের র্যাংকিং বা অবস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলা প্রধান নিয়ামক হিসেবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ, গণবিক্ষোভ এবং অভ্যন্তরীণ উত্তেজনাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পিছিয়েছে ভারত ও পাকিস্তান
ভারতের শান্তি পরিস্থিতির ২.৯ শতাংশ অবনতি রেকর্ড করা হয়েছে এবং বৈশ্বিক তালিকায় দেশটি তিন ধাপ পিছিয়ে ১২৭তম হয়েছে।
মূলত সংঘাত-সংশ্লিষ্ট সূচকগুলোর অবনতির কারণেই শান্তিস্থিতির এই পতন ঘটেছে। প্রতিবেদনে পাকিস্তান ও মিয়ানমারের সাথে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং মণিপুরে চলমান জাতিগত সহিংসতাকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্লোবাল পিস ইনডেক্সে বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তানের থেকে অনেক এগিয়ে। ছবি: গ্লোবাল পিস ইনডেক্স
পাকিস্তানের শান্তি সূচকের স্কোর ৫.৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা দেশটিকে বৈশ্বিক তালিকায় ১৫২তম অবস্থানে নামিয়ে দিয়েছে।
প্রতিবেদনে এই পতনের প্রধান কারণ হিসেবে ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসবাদ, অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের অবনতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০২৬-এ পাকিস্তান প্রথম স্থানে রয়েছে, যেখানে বছরটিতে সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট ১ হাজার ১০০-এরও বেশি মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
আফগানিস্তানের সাথে সীমান্ত উত্তেজনা এবং বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় উগ্রপন্থী বা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দেশটির র্যাংকিং বা অবস্থানের ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় সবশেষ আফগানিস্তান
অন্যদিকে আফগানিস্তান আবারও দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে অশান্তিপূর্ণ দেশ হয়েছে। বৈশ্বিক তালিকায় তাদের অবস্থান ১৫৭তম।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তালেবানের ক্ষমতা সুসংহত করার পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সূচকে কিছু উন্নতি দেখা গেছে। তবে চলমান নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং পাকিস্তান সীমান্তে সংঘর্ষ দেশটির সামগ্রিক স্কোরকে ক্রমাগত প্রভাবিত করেছে।
শীর্ষ দশ ও স্লোভেনিয়া
বৈশ্বিক শান্তি সূচকে শীর্ষ ১০টি দেশ হলো যথাক্রমে–আইসল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, স্লোভেনিয়া, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল, সিঙ্গাপুর, ফিনল্যান্ড ও জাপান।
এখানে সবাইকে অবাক করে প্রথমবারের মতো বিশ্ব শান্তি সূচকের শীর্ষ পাঁচ দেশের তালিকায় জায়গা করে নিয়ে চতুর্থ অবস্থানে এসেছে স্লোভেনিয়া। কম সামরিক ব্যয় এবং উচ্চমাত্রার নাগরিক নিরাপত্তা দেশটিকে এই অবস্থানে এনেছে। স্লোভেনিয়ার মানুষ কমিউনিটিকে খুব গুরুত্ব দেয়। দেশটিতে কর্মজীবনে চমৎকার ভারসাম্য থাকার কারণে এখানে মানুষের মধ্যে একটি মানসিক প্রশান্তি ও স্থিতি কাজ করে, যা মানুষকে যেকোনো ভীতিহীন জীবনযাপনের সুযোগ দেয়।
শান্তি নেই যাদের
অন্যদিকে গ্লোবাল পিস ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী, বৈশ্বিক শান্তি সূচকে ১৬৩টি দেশের মধ্যে তালিকার সবচেয়ে নিচে বা সবচেয়ে অস্থিতিশীল অবস্থায় থাকা পাচঁটি দেশ হলো–ইসরায়েল, ইউক্রেন, ডিআর কঙ্গো, সুদান ও রাশিয়া।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ, তীব্র সামরিক অভিযান এবং ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের জেরে ইসরায়েলে শান্তিস্থিতির ব্যাপক পতন ঘটেছে। ইউক্রেনে গত চার বছর ধরে বিধ্বংসী যুদ্ধ চলছে। এর মধ্যেও তাদের অবস্থান দুই ধাপ এগিয়েছে।
আফ্রিকার দুই অস্থিতিশীল দেশগুলোর মধ্যে ডিআর কঙ্গোতে সাম্প্রদায়িক সংঘাত অনেক বেড়েছে এবং সুদানে বিগত কয়েক বছর ধরেই গৃহযুদ্ধ চলছে।
এদিকে, ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা, তীব্র সামরিকীকরণ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কঠোরতার কারণে বিশ্ব শান্তি সূচকের একেবারে তলানিতে রয়েছে রাশিয়া।