একের পর এক অবিশ্বাস্য সব বৃত্তপূরণের গল্প নিয়ে হাজির হবে বিশ্বকাপ ফাইনাল, এই চিত্রনাট্য কি অদৃশ্যে কেউ ঠিক করে রেখেছিলেন?
আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন–একটা বিশ্বকাপ ফাইনালের বিজ্ঞাপনে এর চেয়ে বেশি কিছুর দরকার এমনিতেই পড়ে না। আর্জেন্টিনা লাতিন চ্যাম্পিয়ন, তা-ও টানা দুবারের। স্পেন ইউরো চ্যাম্পিয়ন। ফুটবলে সবচেয়ে দাপুটে দুই মহাদেশের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দুই দল বিশ্ব শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে মুখোমুখি–বিশ্বকাপ ফাইনালে এর চেয়ে বড় গল্প আর কী হতে পারে!
সেখানেও এক বৃত্তপূরণের গল্প দেখুন। লাতিন আর ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন দুই দলের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের ম্যাচ ‘লা ফিনালিসিমা’য় গত মার্চে দুই দলের দেখা হওয়ার কথা ছিল কাতারে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ম্যাচটা কাতারে আয়োজন করা গেল না। ভেন্যু নিয়ে দুই দেশের ফেডারেশন এক জায়গায় একমত হতে না পারায় ম্যাচটাই শেষ পর্যন্ত হলো না! সেই স্পেন আর আর্জেন্টিনাই আজ বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি।
কিন্তু নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে এর চেয়ে অবিশ্বাস্য এক বৃত্তপূরণের গল্প তো সেমিফাইনালের পর থেকেই সংবাদমাধ্যমে-সোশ্যাল মিডিয়ায়-ইউটিউবে ঘুরছে। র্যাফল ড্র-এর মাধ্যমে যে পাঁচ মাসের শিশুকে স্নান করানোর দায়িত্ব পড়েছিল মেসির কাঁধে–যেখানে বার্সেলোনার কোন খেলোয়াড় কোন শিশুকে স্নান করাবেন, সেটাও নির্ধারিত হয়েছে অবু-দশ-বিশ পদ্ধতিতে–১৯ বছর পর সেই ‘শিশু’ই আজ লিওনেল মেসির ইতিহাস গড়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা!
লামিন ইয়ামাল বনাম লিওনেল মেসি–বিশ্বকাপ ফাইনালের জন্য এর চেয়ে বড় বিজ্ঞাপন আর হতে পারত না!
একের পর এক অবিশ্বাস্য সব বৃত্তপূরণের গল্প নিয়ে হাজির হবে বিশ্বকাপ ফাইনাল, এই চিত্রনাট্য কি অদৃশ্যে কেউ ঠিক করে রেখেছিলেন? আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন–একটা বিশ্বকাপ ফাইনালের বিজ্ঞাপনে এর চেয়ে বেশি কিছুর দরকার এমনিতেই পড়ে না। আর্জেন্টিনা লাতিন চ্যাম্পিয়ন, তা-ও টানা দুবারের। স্পেন ইউরো চ্যাম্পিয়ন। ফুটবলে সবচেয়ে দাপুটে দুই মহাদেশের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দুই দল বিশ্ব শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে মুখোমুখি–বিশ্বকাপ ফাইনালে এর চেয়ে বড় গল্প আর কী হতে পারে! সেখানেও এক বৃত্তপূরণের গল্প দেখুন। লাতিন আর ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন দুই দলের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের ম্যাচ ‘লা ফিনালিসিমা’য় গত মার্চে দুই দলের দেখা হওয়ার কথা ছিল কাতারে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ম্যাচটা কাতারে আয়োজন করা গেল না। ভেন্যু নিয়ে দুই দেশের ফেডারেশন এক জায়গায় একমত হতে না পারায় ম্যাচটাই শেষ পর্যন্ত হলো না! সেই স্পেন আর আর্জেন্টিনাই আজ বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি। কিন্তু নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে এর চেয়ে অবিশ্বাস্য এক বৃত্তপূরণের গল্প তো সেমিফাইনালের পর থেকেই সংবাদমাধ্যমে-সোশ্যাল মিডিয়ায়-ইউটিউবে ঘুরছে। র্যাফল ড্র-এর মাধ্যমে যে পাঁচ মাসের শিশুকে স্নান করানোর দায়িত্ব পড়েছিল মেসির কাঁধে–যেখানে বার্সেলোনার কোন খেলোয়াড় কোন শিশুকে স্নান করাবেন, সেটাও নির্ধারিত হয়েছে অবু-দশ-বিশ পদ্ধতিতে–১৯ বছর পর সেই ‘শিশু’ই আজ লিওনেল মেসির ইতিহাস গড়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা! লামিন ইয়ামাল বনাম লিওনেল মেসি–বিশ্বকাপ ফাইনালের জন্য এর চেয়ে বড় বিজ্ঞাপন আর হতে পারত না! একজন ফুটবলে সব জেতার পরও নতুন ইতিহাস লেখার দুয়ারে। এই ৩৯ বছর বয়সেও তার পারফরম্যান্স, গতি-দ্যুতি তাকে ১৯ বছরের বলে ভুল মনে করাচ্ছে। কাতারে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপের দীর্ঘশ্বাস ঘোচানোর পথেই চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিলেন একের পর এক অসাধারণ পারফরম্যান্সে, ফুটবলে সর্বজয়ের গল্প লিখে ফেলেছিলেন সেখানেই। কিন্তু চার বছর পর এসে আবিষ্কার করা গেল, ৩৯-এ এসেও মেসির ধার তো কমেইনি, উল্টো যেন বেড়েছে। আর্জেন্টিনা যে ১৯৬২-র ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের এক ম্যাচ দূরত্বে, তার পুরো রাস্তাটাই তো মেসির হাতে গড়া। অন্যদিকে লামিন ইয়ামাল। মেসি যদি সব জিতেও এখনো শ্রেষ্ঠত্বের সূচকে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকেন, ফুটবলে সাম্প্রতিক অতীত ঘুরে বর্তমানেও সবার সেরা হওয়ার দাবি জানিয়ে থাকেন, ইয়ামাল সেখানে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের প্রতিনিধি। বিশ্বকাপ ফাইনাল আজ কার বিজয় দেখবে? মেসির হাত থেকে ব্যাটনটা আনুষ্ঠানিকভাবে ইয়ামালের হাতে যাবে, নাকি মেসি ঘাড় বাঁকিয়ে বলে বসবেন ‘এখনই নয়’? দুই. বার্সেলোনা সমর্থকেরা পড়েছেন মহাঝামেলায়। মেসি ক্লাবটার সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়, ইয়ামাল সময়ের সেরা। অলিন্দ আর নিলয় যেন! কার মুখে বিশ্বজয়ের আনন্দ দেখবেন তারা, আর কার মুখে বিষাদের ছায়া? দুই দলকেই জিতিয়ে দেওয়ার কোনো রাস্তা থাকলে বার্সেলোনা সমর্থকেরা এক নিমিষে সেটাই বেছে নিতেন নিশ্চিত। বার্সেলোনার হাত ধরে স্পেন এখানেও মেসির জন্য কেমন বৃত্তপূরণের গল্প হয়ে গেছে দেখুন! কৈশোর পেরোনো মেসিকে বার্সেলোনাই আজকের মেসি বানিয়েছে, আর্জেন্টিনা তাকে জাতীয় দলে ডাকার আগে স্পেন মেসির জন্য দুয়ার খুলে অপেক্ষায় ছিল। মেসি জন্মভূমিকেই বেছে নিয়েছেন সেদিন। বারেবার। ক্যারিয়ারের প্রথম দেড় দশকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে যখন রিক্ত ছিলেন মেসি, সেই দেড় দশকে একটা বিশ্বকাপ আর তার দুই পাশের দুই ইউরো জিতে ফেলা স্পেনকে বেছে না নেওয়াই মেসির আজন্মের ভুল ছিল কি না–এ বিতর্ক কী বাজারই না পেয়েছিল তখন! ২০২১-এ আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি প্রথম কোপা আমেরিকা জেতার পর বিতর্কে জল পড়েছে, কাতারে মেসির হাতে বিশ্বকাপ বিতর্কটাকে মাটিচাপাই দিয়ে দিয়েছে চিরতরে। কিন্তু আজ যখন আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয় ও সব মিলিয়ে চতুর্থ বিশ্বকাপের খুব কাছে নিয়ে গেছেন মেসি, তার সামনে দাঁড়িয়ে সেই স্পেন! যে ম্যাচ আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার শেষ হয়ে থাকার জোর সম্ভাবনা, সেখানেই প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে প্রথমবারের মতো মেসি মুখোমুখি স্পেনের। তিন. তার ইতিহাস গড়ার হাতছানি, তার শ্রেষ্ঠত্বের সিঁড়িতে আকাশ চড়ার সম্ভাবনা, তার সম্ভাব্য সমাপ্তি, তার বৃত্তপূরণ–বিশ্বকাপ ফাইনাল মেসিকে কত ভিন্নমুখী আবেগের মুখোমুখি করাবে, তা মেসির মতো অনুভব করা অসম্ভব হলেও অনুমান করাটা খুব কঠিন হয়তো নয়। আর্জেন্টিনাও তার ফুটবলের দুই শ্রেষ্ঠ সন্তানের একজনের সম্ভাব্য শেষ ম্যাচের আগে আবেগে কাঁপছে নিশ্চিত। ইংল্যান্ডের সঙ্গে যে ফকল্যান্ড নিয়ে যুদ্ধে পরাজয়কে আর্জেন্টিনা তার প্রতি অবিচার বলে মনে করে, সেই ‘পর লা মালভিনাস’-এর সঙ্গে তার দুই শ্রেষ্ঠ সন্তান ডিয়েগো ম্যারাডোনা আর লিওনেল মেসির নাম জুড়ে দিয়ে ‘পর এল দিয়েগো, পর লা উলতিমা দে লেও’ গানটাকে বিশ্বকাপজুড়েই নিজেদের প্রেরণা বানিয়ে রেখেছে আর্জেন্টাইনরা। ফকল্যান্ডের জন্য, ডিয়েগোর জন্য, লিওর (মেসি) শেষবারের জন্য…। মেসির বিদায়মঞ্চ হিসেবে শিরোপামঞ্চ ছাড়া আর কোনো কিছুকে মানতে বাধবে আর্জেন্টাইনদের। এত কাছে এসে, ফাইনালে উঠে তো শিরোপামঞ্চ ছাড়া আর কিছুর সম্ভাবনাও তারা মাথায় আনছেন না! কিন্তু সামনে যখন স্পেন–সর্বশেষ ইউরো জয়ের পথে ফ্রান্স-জার্মানি-ইতালি-ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়ার মতো ইউরোপের সেরা সব দলকে নাস্তানাবুদ করে আসা স্পেন, এবার ফাইনালে ওঠার পথে সেমিফাইনালে প্রবল পরাক্রমশালী ফ্রান্সকে নখদন্তহীন বানিয়ে দেওয়া স্পেন, বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত বেলজিয়ামের একবার বাদে কোনো দলকে নিজেদের জাল ছুঁতে না দেওয়া স্পেন, বলের দখলে-খেলোয়াড়দের ছন্দোবদ্ধ নড়াচড়ায় প্রতিপক্ষকে নাচিয়ে বেড়ানো স্পেন–আর্জেন্টিনার কাজটা কতটা কঠিন, তা আলাদা করে বলতে হয় না। আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলতে পারে বটে, তবে সামনে স্পেন বলেই পরীক্ষাটা আর্জেন্টিনার জন্য বেশি কঠিন। আর্জেন্টিনার একজন মেসি থাকতে পারে, তবে স্পেন তাদের ইয়ামালকেও বাকি দশজনের মতো একজন বানিয়ে রাখে বলেই স্পেন আরও ভয়ংকর। সেটা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বুঝেছেন বিশ্বকাপ স্বপ্নের অকালসমাপ্তি দেখে, কিলিয়ান এমবাপ্পে টের পেয়েছেন প্রতিটি সেকেন্ডে…আজ মেসির টের পাওয়ার পালা? নাকি আরেকবার, শেষবারের মতো, মেসি ‘১৯ বছরের মেসি’ হয়ে দেখা দেবেন? ১৯ বছর আগের মতো, ইয়ামালকে ভবিষ্যতের ছোঁয়া দিয়ে বর্তমানটা নিজের করে নেবেন?
একজন ফুটবলে সব জেতার পরও নতুন ইতিহাস লেখার দুয়ারে। এই ৩৯ বছর বয়সেও তার পারফরম্যান্স, গতি-দ্যুতি তাকে ১৯ বছরের বলে ভুল মনে করাচ্ছে। কাতারে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপের দীর্ঘশ্বাস ঘোচানোর পথেই চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিলেন একের পর এক অসাধারণ পারফরম্যান্সে, ফুটবলে সর্বজয়ের গল্প লিখে ফেলেছিলেন সেখানেই। কিন্তু চার বছর পর এসে আবিষ্কার করা গেল, ৩৯-এ এসেও মেসির ধার তো কমেইনি, উল্টো যেন বেড়েছে। আর্জেন্টিনা যে ১৯৬২-র ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের এক ম্যাচ দূরত্বে, তার পুরো রাস্তাটাই তো মেসির হাতে গড়া।
অন্যদিকে লামিন ইয়ামাল। মেসি যদি সব জিতেও এখনো শ্রেষ্ঠত্বের সূচকে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকেন, ফুটবলে সাম্প্রতিক অতীত ঘুরে বর্তমানেও সবার সেরা হওয়ার দাবি জানিয়ে থাকেন, ইয়ামাল সেখানে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের প্রতিনিধি।
বিশ্বকাপ ফাইনাল আজ কার বিজয় দেখবে? মেসির হাত থেকে ব্যাটনটা আনুষ্ঠানিকভাবে ইয়ামালের হাতে যাবে, নাকি মেসি ঘাড় বাঁকিয়ে বলে বসবেন ‘এখনই নয়’?
বার্সেলোনা সমর্থকেরা পড়েছেন মহাঝামেলায়। মেসি ক্লাবটার সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়, ইয়ামাল সময়ের সেরা। অলিন্দ আর নিলয় যেন! কার মুখে বিশ্বজয়ের আনন্দ দেখবেন তারা, আর কার মুখে বিষাদের ছায়া? দুই দলকেই জিতিয়ে দেওয়ার কোনো রাস্তা থাকলে বার্সেলোনা সমর্থকেরা এক নিমিষে সেটাই বেছে নিতেন নিশ্চিত।
বার্সেলোনার হাত ধরে স্পেন এখানেও মেসির জন্য কেমন বৃত্তপূরণের গল্প হয়ে গেছে দেখুন! কৈশোর পেরোনো মেসিকে বার্সেলোনাই আজকের মেসি বানিয়েছে, আর্জেন্টিনা তাকে জাতীয় দলে ডাকার আগে স্পেন মেসির জন্য দুয়ার খুলে অপেক্ষায় ছিল। মেসি জন্মভূমিকেই বেছে নিয়েছেন সেদিন। বারেবার। ক্যারিয়ারের প্রথম দেড় দশকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে যখন রিক্ত ছিলেন মেসি, সেই দেড় দশকে একটা বিশ্বকাপ আর তার দুই পাশের দুই ইউরো জিতে ফেলা স্পেনকে বেছে না নেওয়াই মেসির আজন্মের ভুল ছিল কি না–এ বিতর্ক কী বাজারই না পেয়েছিল তখন!
২০২১-এ আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি প্রথম কোপা আমেরিকা জেতার পর বিতর্কে জল পড়েছে, কাতারে মেসির হাতে বিশ্বকাপ বিতর্কটাকে মাটিচাপাই দিয়ে দিয়েছে চিরতরে। কিন্তু আজ যখন আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয় ও সব মিলিয়ে চতুর্থ বিশ্বকাপের খুব কাছে নিয়ে গেছেন মেসি, তার সামনে দাঁড়িয়ে সেই স্পেন! যে ম্যাচ আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার শেষ হয়ে থাকার জোর সম্ভাবনা, সেখানেই প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে প্রথমবারের মতো মেসি মুখোমুখি স্পেনের।
তিন.
তার ইতিহাস গড়ার হাতছানি, তার শ্রেষ্ঠত্বের সিঁড়িতে আকাশ চড়ার সম্ভাবনা, তার সম্ভাব্য সমাপ্তি, তার বৃত্তপূরণ–বিশ্বকাপ ফাইনাল মেসিকে কত ভিন্নমুখী আবেগের মুখোমুখি করাবে, তা মেসির মতো অনুভব করা অসম্ভব হলেও অনুমান করাটা খুব কঠিন হয়তো নয়। আর্জেন্টিনাও তার ফুটবলের দুই শ্রেষ্ঠ সন্তানের একজনের সম্ভাব্য শেষ ম্যাচের আগে আবেগে কাঁপছে নিশ্চিত। ইংল্যান্ডের সঙ্গে যে ফকল্যান্ড নিয়ে যুদ্ধে পরাজয়কে আর্জেন্টিনা তার প্রতি অবিচার বলে মনে করে, সেই ‘পর লা মালভিনাস’-এর সঙ্গে তার দুই শ্রেষ্ঠ সন্তান ডিয়েগো ম্যারাডোনা আর লিওনেল মেসির নাম জুড়ে দিয়ে ‘পর এল দিয়েগো, পর লা উলতিমা দে লেও’ গানটাকে বিশ্বকাপজুড়েই নিজেদের প্রেরণা বানিয়ে রেখেছে আর্জেন্টাইনরা। ফকল্যান্ডের জন্য, ডিয়েগোর জন্য, লিওর (মেসি) শেষবারের জন্য…।
মেসির বিদায়মঞ্চ হিসেবে শিরোপামঞ্চ ছাড়া আর কোনো কিছুকে মানতে বাধবে আর্জেন্টাইনদের। এত কাছে এসে, ফাইনালে উঠে তো শিরোপামঞ্চ ছাড়া আর কিছুর সম্ভাবনাও তারা মাথায় আনছেন না!
কিন্তু সামনে যখন স্পেন–সর্বশেষ ইউরো জয়ের পথে ফ্রান্স-জার্মানি-ইতালি-ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়ার মতো ইউরোপের সেরা সব দলকে নাস্তানাবুদ করে আসা স্পেন, এবার ফাইনালে ওঠার পথে সেমিফাইনালে প্রবল পরাক্রমশালী ফ্রান্সকে নখদন্তহীন বানিয়ে দেওয়া স্পেন, বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত বেলজিয়ামের একবার বাদে কোনো দলকে নিজেদের জাল ছুঁতে না দেওয়া স্পেন, বলের দখলে-খেলোয়াড়দের ছন্দোবদ্ধ নড়াচড়ায় প্রতিপক্ষকে নাচিয়ে বেড়ানো স্পেন–আর্জেন্টিনার কাজটা কতটা কঠিন, তা আলাদা করে বলতে হয় না।
আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলতে পারে বটে, তবে সামনে স্পেন বলেই পরীক্ষাটা আর্জেন্টিনার জন্য বেশি কঠিন। আর্জেন্টিনার একজন মেসি থাকতে পারে, তবে স্পেন তাদের ইয়ামালকেও বাকি দশজনের মতো একজন বানিয়ে রাখে বলেই স্পেন আরও ভয়ংকর। সেটা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বুঝেছেন বিশ্বকাপ স্বপ্নের অকালসমাপ্তি দেখে, কিলিয়ান এমবাপ্পে টের পেয়েছেন প্রতিটি সেকেন্ডে…আজ মেসির টের পাওয়ার পালা?
নাকি আরেকবার, শেষবারের মতো, মেসি ‘১৯ বছরের মেসি’ হয়ে দেখা দেবেন? ১৯ বছর আগের মতো, ইয়ামালকে ভবিষ্যতের ছোঁয়া দিয়ে বর্তমানটা নিজের করে নেবেন?
একের পর এক অবিশ্বাস্য সব বৃত্তপূরণের গল্প নিয়ে হাজির হবে বিশ্বকাপ ফাইনাল, এই চিত্রনাট্য কি অদৃশ্যে কেউ ঠিক করে রেখেছিলেন?
আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন–একটা বিশ্বকাপ ফাইনালের বিজ্ঞাপনে এর চেয়ে বেশি কিছুর দরকার এমনিতেই পড়ে না। আর্জেন্টিনা লাতিন চ্যাম্পিয়ন, তা-ও টানা দুবারের। স্পেন ইউরো চ্যাম্পিয়ন। ফুটবলে সবচেয়ে দাপুটে দুই মহাদেশের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দুই দল বিশ্ব শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে মুখোমুখি–বিশ্বকাপ ফাইনালে এর চেয়ে বড় গল্প আর কী হতে পারে!
সেখানেও এক বৃত্তপূরণের গল্প দেখুন। লাতিন আর ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন দুই দলের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের ম্যাচ ‘লা ফিনালিসিমা’য় গত মার্চে দুই দলের দেখা হওয়ার কথা ছিল কাতারে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ম্যাচটা কাতারে আয়োজন করা গেল না। ভেন্যু নিয়ে দুই দেশের ফেডারেশন এক জায়গায় একমত হতে না পারায় ম্যাচটাই শেষ পর্যন্ত হলো না! সেই স্পেন আর আর্জেন্টিনাই আজ বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি।
কিন্তু নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে এর চেয়ে অবিশ্বাস্য এক বৃত্তপূরণের গল্প তো সেমিফাইনালের পর থেকেই সংবাদমাধ্যমে-সোশ্যাল মিডিয়ায়-ইউটিউবে ঘুরছে। র্যাফল ড্র-এর মাধ্যমে যে পাঁচ মাসের শিশুকে স্নান করানোর দায়িত্ব পড়েছিল মেসির কাঁধে–যেখানে বার্সেলোনার কোন খেলোয়াড় কোন শিশুকে স্নান করাবেন, সেটাও নির্ধারিত হয়েছে অবু-দশ-বিশ পদ্ধতিতে–১৯ বছর পর সেই ‘শিশু’ই আজ লিওনেল মেসির ইতিহাস গড়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা!
লামিন ইয়ামাল বনাম লিওনেল মেসি–বিশ্বকাপ ফাইনালের জন্য এর চেয়ে বড় বিজ্ঞাপন আর হতে পারত না!
একের পর এক অবিশ্বাস্য সব বৃত্তপূরণের গল্প নিয়ে হাজির হবে বিশ্বকাপ ফাইনাল, এই চিত্রনাট্য কি অদৃশ্যে কেউ ঠিক করে রেখেছিলেন? আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন–একটা বিশ্বকাপ ফাইনালের বিজ্ঞাপনে এর চেয়ে বেশি কিছুর দরকার এমনিতেই পড়ে না। আর্জেন্টিনা লাতিন চ্যাম্পিয়ন, তা-ও টানা দুবারের। স্পেন ইউরো চ্যাম্পিয়ন। ফুটবলে সবচেয়ে দাপুটে দুই মহাদেশের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দুই দল বিশ্ব শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে মুখোমুখি–বিশ্বকাপ ফাইনালে এর চেয়ে বড় গল্প আর কী হতে পারে! সেখানেও এক বৃত্তপূরণের গল্প দেখুন। লাতিন আর ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন দুই দলের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের ম্যাচ ‘লা ফিনালিসিমা’য় গত মার্চে দুই দলের দেখা হওয়ার কথা ছিল কাতারে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ম্যাচটা কাতারে আয়োজন করা গেল না। ভেন্যু নিয়ে দুই দেশের ফেডারেশন এক জায়গায় একমত হতে না পারায় ম্যাচটাই শেষ পর্যন্ত হলো না! সেই স্পেন আর আর্জেন্টিনাই আজ বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি। কিন্তু নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে এর চেয়ে অবিশ্বাস্য এক বৃত্তপূরণের গল্প তো সেমিফাইনালের পর থেকেই সংবাদমাধ্যমে-সোশ্যাল মিডিয়ায়-ইউটিউবে ঘুরছে। র্যাফল ড্র-এর মাধ্যমে যে পাঁচ মাসের শিশুকে স্নান করানোর দায়িত্ব পড়েছিল মেসির কাঁধে–যেখানে বার্সেলোনার কোন খেলোয়াড় কোন শিশুকে স্নান করাবেন, সেটাও নির্ধারিত হয়েছে অবু-দশ-বিশ পদ্ধতিতে–১৯ বছর পর সেই ‘শিশু’ই আজ লিওনেল মেসির ইতিহাস গড়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা! লামিন ইয়ামাল বনাম লিওনেল মেসি–বিশ্বকাপ ফাইনালের জন্য এর চেয়ে বড় বিজ্ঞাপন আর হতে পারত না! একজন ফুটবলে সব জেতার পরও নতুন ইতিহাস লেখার দুয়ারে। এই ৩৯ বছর বয়সেও তার পারফরম্যান্স, গতি-দ্যুতি তাকে ১৯ বছরের বলে ভুল মনে করাচ্ছে। কাতারে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপের দীর্ঘশ্বাস ঘোচানোর পথেই চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিলেন একের পর এক অসাধারণ পারফরম্যান্সে, ফুটবলে সর্বজয়ের গল্প লিখে ফেলেছিলেন সেখানেই। কিন্তু চার বছর পর এসে আবিষ্কার করা গেল, ৩৯-এ এসেও মেসির ধার তো কমেইনি, উল্টো যেন বেড়েছে। আর্জেন্টিনা যে ১৯৬২-র ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের এক ম্যাচ দূরত্বে, তার পুরো রাস্তাটাই তো মেসির হাতে গড়া। অন্যদিকে লামিন ইয়ামাল। মেসি যদি সব জিতেও এখনো শ্রেষ্ঠত্বের সূচকে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকেন, ফুটবলে সাম্প্রতিক অতীত ঘুরে বর্তমানেও সবার সেরা হওয়ার দাবি জানিয়ে থাকেন, ইয়ামাল সেখানে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের প্রতিনিধি। বিশ্বকাপ ফাইনাল আজ কার বিজয় দেখবে? মেসির হাত থেকে ব্যাটনটা আনুষ্ঠানিকভাবে ইয়ামালের হাতে যাবে, নাকি মেসি ঘাড় বাঁকিয়ে বলে বসবেন ‘এখনই নয়’? দুই. বার্সেলোনা সমর্থকেরা পড়েছেন মহাঝামেলায়। মেসি ক্লাবটার সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়, ইয়ামাল সময়ের সেরা। অলিন্দ আর নিলয় যেন! কার মুখে বিশ্বজয়ের আনন্দ দেখবেন তারা, আর কার মুখে বিষাদের ছায়া? দুই দলকেই জিতিয়ে দেওয়ার কোনো রাস্তা থাকলে বার্সেলোনা সমর্থকেরা এক নিমিষে সেটাই বেছে নিতেন নিশ্চিত। বার্সেলোনার হাত ধরে স্পেন এখানেও মেসির জন্য কেমন বৃত্তপূরণের গল্প হয়ে গেছে দেখুন! কৈশোর পেরোনো মেসিকে বার্সেলোনাই আজকের মেসি বানিয়েছে, আর্জেন্টিনা তাকে জাতীয় দলে ডাকার আগে স্পেন মেসির জন্য দুয়ার খুলে অপেক্ষায় ছিল। মেসি জন্মভূমিকেই বেছে নিয়েছেন সেদিন। বারেবার। ক্যারিয়ারের প্রথম দেড় দশকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে যখন রিক্ত ছিলেন মেসি, সেই দেড় দশকে একটা বিশ্বকাপ আর তার দুই পাশের দুই ইউরো জিতে ফেলা স্পেনকে বেছে না নেওয়াই মেসির আজন্মের ভুল ছিল কি না–এ বিতর্ক কী বাজারই না পেয়েছিল তখন! ২০২১-এ আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি প্রথম কোপা আমেরিকা জেতার পর বিতর্কে জল পড়েছে, কাতারে মেসির হাতে বিশ্বকাপ বিতর্কটাকে মাটিচাপাই দিয়ে দিয়েছে চিরতরে। কিন্তু আজ যখন আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয় ও সব মিলিয়ে চতুর্থ বিশ্বকাপের খুব কাছে নিয়ে গেছেন মেসি, তার সামনে দাঁড়িয়ে সেই স্পেন! যে ম্যাচ আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার শেষ হয়ে থাকার জোর সম্ভাবনা, সেখানেই প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে প্রথমবারের মতো মেসি মুখোমুখি স্পেনের। তিন. তার ইতিহাস গড়ার হাতছানি, তার শ্রেষ্ঠত্বের সিঁড়িতে আকাশ চড়ার সম্ভাবনা, তার সম্ভাব্য সমাপ্তি, তার বৃত্তপূরণ–বিশ্বকাপ ফাইনাল মেসিকে কত ভিন্নমুখী আবেগের মুখোমুখি করাবে, তা মেসির মতো অনুভব করা অসম্ভব হলেও অনুমান করাটা খুব কঠিন হয়তো নয়। আর্জেন্টিনাও তার ফুটবলের দুই শ্রেষ্ঠ সন্তানের একজনের সম্ভাব্য শেষ ম্যাচের আগে আবেগে কাঁপছে নিশ্চিত। ইংল্যান্ডের সঙ্গে যে ফকল্যান্ড নিয়ে যুদ্ধে পরাজয়কে আর্জেন্টিনা তার প্রতি অবিচার বলে মনে করে, সেই ‘পর লা মালভিনাস’-এর সঙ্গে তার দুই শ্রেষ্ঠ সন্তান ডিয়েগো ম্যারাডোনা আর লিওনেল মেসির নাম জুড়ে দিয়ে ‘পর এল দিয়েগো, পর লা উলতিমা দে লেও’ গানটাকে বিশ্বকাপজুড়েই নিজেদের প্রেরণা বানিয়ে রেখেছে আর্জেন্টাইনরা। ফকল্যান্ডের জন্য, ডিয়েগোর জন্য, লিওর (মেসি) শেষবারের জন্য…। মেসির বিদায়মঞ্চ হিসেবে শিরোপামঞ্চ ছাড়া আর কোনো কিছুকে মানতে বাধবে আর্জেন্টাইনদের। এত কাছে এসে, ফাইনালে উঠে তো শিরোপামঞ্চ ছাড়া আর কিছুর সম্ভাবনাও তারা মাথায় আনছেন না! কিন্তু সামনে যখন স্পেন–সর্বশেষ ইউরো জয়ের পথে ফ্রান্স-জার্মানি-ইতালি-ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়ার মতো ইউরোপের সেরা সব দলকে নাস্তানাবুদ করে আসা স্পেন, এবার ফাইনালে ওঠার পথে সেমিফাইনালে প্রবল পরাক্রমশালী ফ্রান্সকে নখদন্তহীন বানিয়ে দেওয়া স্পেন, বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত বেলজিয়ামের একবার বাদে কোনো দলকে নিজেদের জাল ছুঁতে না দেওয়া স্পেন, বলের দখলে-খেলোয়াড়দের ছন্দোবদ্ধ নড়াচড়ায় প্রতিপক্ষকে নাচিয়ে বেড়ানো স্পেন–আর্জেন্টিনার কাজটা কতটা কঠিন, তা আলাদা করে বলতে হয় না। আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলতে পারে বটে, তবে সামনে স্পেন বলেই পরীক্ষাটা আর্জেন্টিনার জন্য বেশি কঠিন। আর্জেন্টিনার একজন মেসি থাকতে পারে, তবে স্পেন তাদের ইয়ামালকেও বাকি দশজনের মতো একজন বানিয়ে রাখে বলেই স্পেন আরও ভয়ংকর। সেটা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বুঝেছেন বিশ্বকাপ স্বপ্নের অকালসমাপ্তি দেখে, কিলিয়ান এমবাপ্পে টের পেয়েছেন প্রতিটি সেকেন্ডে…আজ মেসির টের পাওয়ার পালা? নাকি আরেকবার, শেষবারের মতো, মেসি ‘১৯ বছরের মেসি’ হয়ে দেখা দেবেন? ১৯ বছর আগের মতো, ইয়ামালকে ভবিষ্যতের ছোঁয়া দিয়ে বর্তমানটা নিজের করে নেবেন?
একজন ফুটবলে সব জেতার পরও নতুন ইতিহাস লেখার দুয়ারে। এই ৩৯ বছর বয়সেও তার পারফরম্যান্স, গতি-দ্যুতি তাকে ১৯ বছরের বলে ভুল মনে করাচ্ছে। কাতারে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপের দীর্ঘশ্বাস ঘোচানোর পথেই চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিলেন একের পর এক অসাধারণ পারফরম্যান্সে, ফুটবলে সর্বজয়ের গল্প লিখে ফেলেছিলেন সেখানেই। কিন্তু চার বছর পর এসে আবিষ্কার করা গেল, ৩৯-এ এসেও মেসির ধার তো কমেইনি, উল্টো যেন বেড়েছে। আর্জেন্টিনা যে ১৯৬২-র ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের এক ম্যাচ দূরত্বে, তার পুরো রাস্তাটাই তো মেসির হাতে গড়া।
অন্যদিকে লামিন ইয়ামাল। মেসি যদি সব জিতেও এখনো শ্রেষ্ঠত্বের সূচকে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকেন, ফুটবলে সাম্প্রতিক অতীত ঘুরে বর্তমানেও সবার সেরা হওয়ার দাবি জানিয়ে থাকেন, ইয়ামাল সেখানে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের প্রতিনিধি।
বিশ্বকাপ ফাইনাল আজ কার বিজয় দেখবে? মেসির হাত থেকে ব্যাটনটা আনুষ্ঠানিকভাবে ইয়ামালের হাতে যাবে, নাকি মেসি ঘাড় বাঁকিয়ে বলে বসবেন ‘এখনই নয়’?
বার্সেলোনা সমর্থকেরা পড়েছেন মহাঝামেলায়। মেসি ক্লাবটার সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়, ইয়ামাল সময়ের সেরা। অলিন্দ আর নিলয় যেন! কার মুখে বিশ্বজয়ের আনন্দ দেখবেন তারা, আর কার মুখে বিষাদের ছায়া? দুই দলকেই জিতিয়ে দেওয়ার কোনো রাস্তা থাকলে বার্সেলোনা সমর্থকেরা এক নিমিষে সেটাই বেছে নিতেন নিশ্চিত।
বার্সেলোনার হাত ধরে স্পেন এখানেও মেসির জন্য কেমন বৃত্তপূরণের গল্প হয়ে গেছে দেখুন! কৈশোর পেরোনো মেসিকে বার্সেলোনাই আজকের মেসি বানিয়েছে, আর্জেন্টিনা তাকে জাতীয় দলে ডাকার আগে স্পেন মেসির জন্য দুয়ার খুলে অপেক্ষায় ছিল। মেসি জন্মভূমিকেই বেছে নিয়েছেন সেদিন। বারেবার। ক্যারিয়ারের প্রথম দেড় দশকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে যখন রিক্ত ছিলেন মেসি, সেই দেড় দশকে একটা বিশ্বকাপ আর তার দুই পাশের দুই ইউরো জিতে ফেলা স্পেনকে বেছে না নেওয়াই মেসির আজন্মের ভুল ছিল কি না–এ বিতর্ক কী বাজারই না পেয়েছিল তখন!
২০২১-এ আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি প্রথম কোপা আমেরিকা জেতার পর বিতর্কে জল পড়েছে, কাতারে মেসির হাতে বিশ্বকাপ বিতর্কটাকে মাটিচাপাই দিয়ে দিয়েছে চিরতরে। কিন্তু আজ যখন আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয় ও সব মিলিয়ে চতুর্থ বিশ্বকাপের খুব কাছে নিয়ে গেছেন মেসি, তার সামনে দাঁড়িয়ে সেই স্পেন! যে ম্যাচ আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার শেষ হয়ে থাকার জোর সম্ভাবনা, সেখানেই প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে প্রথমবারের মতো মেসি মুখোমুখি স্পেনের।
তিন.
তার ইতিহাস গড়ার হাতছানি, তার শ্রেষ্ঠত্বের সিঁড়িতে আকাশ চড়ার সম্ভাবনা, তার সম্ভাব্য সমাপ্তি, তার বৃত্তপূরণ–বিশ্বকাপ ফাইনাল মেসিকে কত ভিন্নমুখী আবেগের মুখোমুখি করাবে, তা মেসির মতো অনুভব করা অসম্ভব হলেও অনুমান করাটা খুব কঠিন হয়তো নয়। আর্জেন্টিনাও তার ফুটবলের দুই শ্রেষ্ঠ সন্তানের একজনের সম্ভাব্য শেষ ম্যাচের আগে আবেগে কাঁপছে নিশ্চিত। ইংল্যান্ডের সঙ্গে যে ফকল্যান্ড নিয়ে যুদ্ধে পরাজয়কে আর্জেন্টিনা তার প্রতি অবিচার বলে মনে করে, সেই ‘পর লা মালভিনাস’-এর সঙ্গে তার দুই শ্রেষ্ঠ সন্তান ডিয়েগো ম্যারাডোনা আর লিওনেল মেসির নাম জুড়ে দিয়ে ‘পর এল দিয়েগো, পর লা উলতিমা দে লেও’ গানটাকে বিশ্বকাপজুড়েই নিজেদের প্রেরণা বানিয়ে রেখেছে আর্জেন্টাইনরা। ফকল্যান্ডের জন্য, ডিয়েগোর জন্য, লিওর (মেসি) শেষবারের জন্য…।
মেসির বিদায়মঞ্চ হিসেবে শিরোপামঞ্চ ছাড়া আর কোনো কিছুকে মানতে বাধবে আর্জেন্টাইনদের। এত কাছে এসে, ফাইনালে উঠে তো শিরোপামঞ্চ ছাড়া আর কিছুর সম্ভাবনাও তারা মাথায় আনছেন না!
কিন্তু সামনে যখন স্পেন–সর্বশেষ ইউরো জয়ের পথে ফ্রান্স-জার্মানি-ইতালি-ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়ার মতো ইউরোপের সেরা সব দলকে নাস্তানাবুদ করে আসা স্পেন, এবার ফাইনালে ওঠার পথে সেমিফাইনালে প্রবল পরাক্রমশালী ফ্রান্সকে নখদন্তহীন বানিয়ে দেওয়া স্পেন, বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত বেলজিয়ামের একবার বাদে কোনো দলকে নিজেদের জাল ছুঁতে না দেওয়া স্পেন, বলের দখলে-খেলোয়াড়দের ছন্দোবদ্ধ নড়াচড়ায় প্রতিপক্ষকে নাচিয়ে বেড়ানো স্পেন–আর্জেন্টিনার কাজটা কতটা কঠিন, তা আলাদা করে বলতে হয় না।
আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলতে পারে বটে, তবে সামনে স্পেন বলেই পরীক্ষাটা আর্জেন্টিনার জন্য বেশি কঠিন। আর্জেন্টিনার একজন মেসি থাকতে পারে, তবে স্পেন তাদের ইয়ামালকেও বাকি দশজনের মতো একজন বানিয়ে রাখে বলেই স্পেন আরও ভয়ংকর। সেটা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বুঝেছেন বিশ্বকাপ স্বপ্নের অকালসমাপ্তি দেখে, কিলিয়ান এমবাপ্পে টের পেয়েছেন প্রতিটি সেকেন্ডে…আজ মেসির টের পাওয়ার পালা?
নাকি আরেকবার, শেষবারের মতো, মেসি ‘১৯ বছরের মেসি’ হয়ে দেখা দেবেন? ১৯ বছর আগের মতো, ইয়ামালকে ভবিষ্যতের ছোঁয়া দিয়ে বর্তমানটা নিজের করে নেবেন?