কামরান রেজা চৌধুরী

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ৩৩ বছর পর প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদে একটি মুলতবি প্রস্তাব আলোচিত হয়েছে। প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রধান ও বিরোধীদলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমান কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘জুলাই জতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে’ প্রস্তাবটি আলোচনার জন্য গ্রহণ করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। সেই সিদ্ধাান্ত অনুসারে ৩১ মার্চ এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রশ্ন হলো–মুলতবি প্রস্তাব আলোচনার বিষয়টি কেন সংবাদ হচ্ছে? কী এই মুলতবি প্রস্তাব? এর মাধ্যমে কী হয়? কী এর তাৎপর্য? এই সকল প্রশ্নের উত্তর জানতে প্রথমেই বলা দরকার মুলতবি প্রস্তাব কী?
সহজভাবে বলতে গেলে, মুলতবি প্রস্তাব একটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব, যা আলোচনার জন্য সংসদ শুরুর দুই ঘণ্টা আগে নোটিশ দেওয়া যায় এবং সংসদের সকল কাজ মুলতবি রেখে প্রস্তাবটি আলোচনা করা যায়। পূর্ব থেকে নির্ধারিত সকল বিষয়ের চেয়ে সেই বিষয়টিই অনেক সময় বেশি প্রাধান্য পায়।
সংসদ সচিবের কাছে নোটিশ পৌঁছানোর পর থেকে তিন দিনের মধ্যে স্পিকারকে সংসদকে জানাতে হয় তিনি প্রস্তাবটি গ্রহণ করছেন কি না। গ্রহণ না করলেও সংসদের অধিবেশনে তাকে ব্যাখ্যা করে সদস্যদের জানাতে হয়।
মুলতবি প্রস্তাবের মাধ্যমে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয় নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে দুই ঘণ্টা আলেচনার পর প্রয়োজনে ভোটাভুটি হয়। প্রস্তাবটি গৃহীত হলে সে বিষয় ব্যবস্থা নিতে সরকার দায়বদ্ধ থাকে। তবে আলোচনা যদি দুই ঘণ্টার বেশি হয়, সেক্ষেত্রে আর ভোটাভুটির প্রয়োজন পড়ে না। আলোচনার মাধ্যমেই বিষয়টি শেষ হয়ে যায়।
তবে ভোটাভুটি না হলেও এই ধরনের আলোচনার মাধ্যমে সরকার; অর্থাৎ, নির্বাহী বিভাগের ওপর একটি চাপ সৃষ্টি হয়। জনমত সরকারের বিপক্ষে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
মুলতবি প্রস্তাবের বিষয়ে কাউল-শখদার সম্পদিত প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রসিডিউর অব পার্লামেন্ট বইয়ে বলা হয়েছে, বিষয়টি এমন হতে হবে যে, সেটি জাতীয় জীবনের সকল কিছুকে প্রভাবিত (অ্যাফেক্ট) করে। সংসদকে জরুরি ভিত্তিতে (ইমেডিয়েটলি) নজর দিতে হবে।
১৯২০ সালে ব্রিটিশ হাউজ অব কমন্সে প্রথমবারের মতো এই ব্যবস্থা চালু করা হয়। সবসময় না হলেও শুরু থেকেই মুলতবি প্রস্তাবকে সরকারের (নির্বাহী বিভাগ) প্রতি সংসদীয় ভাষায় তিরস্কার হিসেবে গণ্য করা হয়। সে কারণেই ক্ষমতাসীন দলগুলো মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলেচনা করতে আগ্রহী হয় না। অনেক সময় স্পিকারও মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণে আগ্রহী হন না।
তবে সব বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাব আনা যায় না। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী-বিধি অনুসারে বিষয়টি সাম্প্রতিক হতে হবে। যে বিষয়ের প্রতিকার আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সম্ভব, সে বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাব আনা যাবে না। বিচার বিভাগীয় অথবা আধা-বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনকারী সংবিধিবদ্ধ কোনো ট্রাইবুনাল অথবা কর্তৃপক্ষের কাছে অথবা কোন কমিশনের অথবা তদন্ত আদালতের কাছে নিষ্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় থাকা বিষয় নিয়ে মুলতবি প্রস্তাব আনা যাবে না।
১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ গঠনের পর থেকে গত ১২টি জাতীয় সংসদে মোট ৩৫টি মুলতবি প্রস্তাব সংসদে আলোচিত হয়। তবে সেগুলোর সবগুলো সংসদ কর্তৃক গৃহীত হয়নি।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন প্রথম জাতীয় সংসদে কোনো মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়নি। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত একদলীয় বাকশাল প্রবর্তন করার পর গুরুত্ব হারায় সংসদ। তবে তা সত্ত্বেও বিএনপির নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় সংসদে সর্বোচ্চ ২২টি মুলতবি প্রস্তাব আলোচিত হয়। জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন তৃতীয় সংসদে চারটি এবং একই দলের নেতৃত্বাধীন চতুর্থ সংসদে (এক দলীয়) পাঁচটি মুলতবি আলোচিত হয়।
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন পঞ্চম জাতীয় সংসদে মোট চারটি মুলতবি প্রস্তাব আলোচিত হয়। সর্বশেষ চারটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করলে বোঝা যাবে মুলতবি কেমন হয়, যদিও বিষয়গুলো নিয়ে অনেকের ভিন্নমত রয়েছে।

১৯৯১ সালের ২৩ এপ্রিল এনডিপি (ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি) সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আনীত মুলতবি প্রস্তাব সংসদে আলোচনার জন্য গৃহীত হয়। এর বিষয়বস্ত ছিল ‘মেহেরপুরে বিএসএফ-এর গুলিতে বিডিআর জওয়ানসহ চার বাংলাদেশি নিহত’ হওয়ার ঘটনা। প্রস্তাবটি সংসদে গৃহীত হয়। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন।
১৯৯২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ‘পাকিস্তানী নাগরিক’ গোলাম আযমের জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের প্রধান হওয়া নিয়ে মুলতবি প্রস্তাব করেন আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য শামসুল হক (ময়মনসিংহ)। একই বছর ২৮ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে মুলতবি প্রস্তাব আনেন ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান রাশেদ খান মেনন (বাকেরগঞ্জ)। প্রস্তাবটি গৃহীত হয় এবং তা সংসদে আলোচিত হয়।
১৯৯৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আরেকটি মুলতবি প্রস্তাব সংসদে গৃহীত হয়ে আলোচিত হয়। প্রস্তাবটি আনেন আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম (যশোর-২)। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ১৯৯৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্র শিবিরের হাতে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর নেতা জোবায়ের চৌধুরী রিমু হত্যা।
এরপর থেকে জাতীয় সংসদে কোনো মূলতুবি প্রস্তাব আলোচিত হয়নি।
২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন অষ্টম সংসদে মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে ক্ষমতাসীন দল এবং প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের মধ্যে সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়।
বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ কমপক্ষে ২১ জনের প্রাণহানির ঘটনা নিয়ে সংসদে মুলতবি আলোচনার জন্য নোটিশ দেন আওয়ামী লীগের একাধিক সংসদ সদস্য। ২০০৪ সালের ২৮ নভেম্বর আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যরা কালো পতাকা, ব্যাজ ধারণ করে ৬২ বিধিতে; অর্থাৎ, মুলতবি আলোচনার জন্য প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে সংসদের ভেতরে স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করেন। সাংবাদিক গ্যালারি থেকে আমি সেই ঘটনা প্রত্যক্ষ করি।
একটি বিচার বিভাগীয় কমিশনে তদন্তাধীন থাকায় বিষয়টি মুলতবি প্রস্তাব আকারে গ্রহণ করেননি স্পিকার মুহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার। কার্যপ্রণালী বিধি অনুসারে তিনি সঠিক ছিলেন। কিন্তু বিষয়টি রাজনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে স্পিকার মুহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকারের কক্ষের একটি আলোচনার ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। সাংবাদিক হিসেবে আমি প্রায়ই উনার কক্ষে গিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম। যেহেতু সংসদ ভেঙে গিয়েছিল, তাই তিনি আমার সঙ্গে খুব খোলামেলা কথা বলতেন।
একদিন আমি তার চেয়ারের সামনে বসেই জিজ্ঞেস করলাম, তিনি কেন সেদিন মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির সংসদ সদস্য রেজাউল বারী ডিনা (বগুড়া), আব্দুল আলীম (জয়পুরহাট) এবং সেলিম রেজা হাবিব (পাবনা)। স্পিকার বললেন, “আমি তো সাবজুডিস ম্যাটারে আলোচনা দিতে পারি না। এটা বিধির লঙ্ঘন হতো।” তখন সঙ্গে সঙ্গে আব্দুল আলীম বলে উঠলেন, “দেখুন স্যার, আমি হাসিনাকে পছন্দ করি না। কিন্তু সে তো বিরোধীদলীয় নেতা। তার উপর গ্রেনেড আক্রমণ তো গ্রহণযোগ্য নয়। ওদের আলোচনা করতে দিলে কী হতো? বড়জোর সরকারকে দোষারোপ করত। রাগ চলে যেত। আপনি সেটা না দিয়ে আন্দোলনের পথ করে দিলেন।”
আব্দুল আলীমের সঙ্গে সুর মিলিয়ে রেজাউল বারী ডিনা বললেন, “স্যার আপনি কিন্তু আলোচনা দিতে পারতেন।”
উত্তরে জমিরউদ্দিন সরকার বললেন, “দেখুন আমার দল না চাইলে স্পিকার হিসেবে আমি যতই উদার হই, দেওয়া যাবে না। দিলে আমি স্পিকার থাকতে পারব? বাংলাদেশের স্পিকারকে পরিবর্তন করতে সিম্পল মেজরিটিই যথেষ্ট।”
জমিরউদ্দিন সরকার সত্য কথাই বলেছিলেন। রাজনীতি ঠিক না হলে সংসদ ঠিক হবে না।
২০২৬ সালে জনগণের ব্যাপক ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় বিএনপি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দুদিন আগে সংসদে বলেছেন, শফিকুর রহমানের প্রস্তাবটি সঠিকভাবে আনা হয়নি। তিনি ভুল বলেননি। তারপরও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি নিয়ে মুলতবি আলোচনা হয়েছে।

অনেকের মতে জুলাই আন্দোলন নিয়ে নেতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত বিএনপির জন্য রাজনৈতিক হঠকারিতা, এমনকি মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বিধায় জামায়াত-এনসিপির সাথে এক হয়ে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ, ২০২৫ নিয়ে আলোচনার জন্য মুলতবি প্রস্তাবে সায় দিয়েছে তারা।
তবে সমালোচনা যাই হোক না কেন, মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বিএনপি এক ধরনের রাজনৈতিক উদারতা দেখিয়েছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি সহনশীল সংসদীয় ধারার সূচনা হতে পারে।
মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করলেই যে তা সরকারের জন্য তিরস্কারমূলক হবে–এমন কথাও সবসময় সঠিক নয়। দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, জনগণের কল্যাণে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনার দরকার হলে সেটি মুলতবি আকারে আলোচনা করলে তাতে ক্ষতি নেই; বরং ভালো। এ ব্যাপারে দরকার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, সহনশীলতা।
দল, মত, রাজনৈতিক বিশ্বাস নির্বিশেষে সকলের একটিই প্রত্যাশা–দেশের সকল রাজনৈতিক সমস্যার ওপর আলোচনা করে সেগুলোর সমাধান খুঁজে বের করার স্থান হোক জাতীয় সংসদ। রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান যেন রাস্তা না হয়। বন্ধ হোক রাজপথের সহিংসতা।
জুলাই সনদের ওপর মুলতবি আলোচনার ফলাফল যাই হোক না কেন, সেটি গ্রহণ করা উচিত সকল রাজনৈতিক দলের। বিএনপির অবস্থান যদি জামায়াত-এনসিপির পছন্দ না হয়, সেক্ষেত্রে তারা সংসদে এবং সংসদের বাইরে জনমত গড়ে তুলতে কাজ করতে পারে। তবে সেটি কোনোক্রমেই জনগণের চলাচলসহ কোনো প্রকার অধিকার খর্ব করে নয়। সহিংসতা, হরতাল, অবরোধ, ব্লকেড ইত্যাদি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এগুলো পুরাতন বন্দোবস্ত।
শেখ হসিনার পতনের পর জামায়াত-এনসিপি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলে আসছে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক আচরণে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের নমুনা মেলেনি। ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় জামায়াত-এনসিপি সংসদের ভেতরে এবং এর লবিতে যে আচরণ করেছে, সেটি পঞ্চম ও অষ্টম সংসদে থাকা বিরোধী দল আওয়ামী লীগের আচরণের আরেকটি সংস্করণ বলা যায়।
জামায়াত-এনসিপিকে মনে রাখতে হবে তাদের রাজনৈতিক আচরণের ওপর নির্ভর করছে তাদের ও দেশের ভবিষ্যৎ।
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ৩৩ বছর পর প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদে একটি মুলতবি প্রস্তাব আলোচিত হয়েছে। প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রধান ও বিরোধীদলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমান কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘জুলাই জতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে’ প্রস্তাবটি আলোচনার জন্য গ্রহণ করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। সেই সিদ্ধাান্ত অনুসারে ৩১ মার্চ এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রশ্ন হলো–মুলতবি প্রস্তাব আলোচনার বিষয়টি কেন সংবাদ হচ্ছে? কী এই মুলতবি প্রস্তাব? এর মাধ্যমে কী হয়? কী এর তাৎপর্য? এই সকল প্রশ্নের উত্তর জানতে প্রথমেই বলা দরকার মুলতবি প্রস্তাব কী?
সহজভাবে বলতে গেলে, মুলতবি প্রস্তাব একটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব, যা আলোচনার জন্য সংসদ শুরুর দুই ঘণ্টা আগে নোটিশ দেওয়া যায় এবং সংসদের সকল কাজ মুলতবি রেখে প্রস্তাবটি আলোচনা করা যায়। পূর্ব থেকে নির্ধারিত সকল বিষয়ের চেয়ে সেই বিষয়টিই অনেক সময় বেশি প্রাধান্য পায়।
সংসদ সচিবের কাছে নোটিশ পৌঁছানোর পর থেকে তিন দিনের মধ্যে স্পিকারকে সংসদকে জানাতে হয় তিনি প্রস্তাবটি গ্রহণ করছেন কি না। গ্রহণ না করলেও সংসদের অধিবেশনে তাকে ব্যাখ্যা করে সদস্যদের জানাতে হয়।
মুলতবি প্রস্তাবের মাধ্যমে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয় নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে দুই ঘণ্টা আলেচনার পর প্রয়োজনে ভোটাভুটি হয়। প্রস্তাবটি গৃহীত হলে সে বিষয় ব্যবস্থা নিতে সরকার দায়বদ্ধ থাকে। তবে আলোচনা যদি দুই ঘণ্টার বেশি হয়, সেক্ষেত্রে আর ভোটাভুটির প্রয়োজন পড়ে না। আলোচনার মাধ্যমেই বিষয়টি শেষ হয়ে যায়।
তবে ভোটাভুটি না হলেও এই ধরনের আলোচনার মাধ্যমে সরকার; অর্থাৎ, নির্বাহী বিভাগের ওপর একটি চাপ সৃষ্টি হয়। জনমত সরকারের বিপক্ষে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
মুলতবি প্রস্তাবের বিষয়ে কাউল-শখদার সম্পদিত প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রসিডিউর অব পার্লামেন্ট বইয়ে বলা হয়েছে, বিষয়টি এমন হতে হবে যে, সেটি জাতীয় জীবনের সকল কিছুকে প্রভাবিত (অ্যাফেক্ট) করে। সংসদকে জরুরি ভিত্তিতে (ইমেডিয়েটলি) নজর দিতে হবে।
১৯২০ সালে ব্রিটিশ হাউজ অব কমন্সে প্রথমবারের মতো এই ব্যবস্থা চালু করা হয়। সবসময় না হলেও শুরু থেকেই মুলতবি প্রস্তাবকে সরকারের (নির্বাহী বিভাগ) প্রতি সংসদীয় ভাষায় তিরস্কার হিসেবে গণ্য করা হয়। সে কারণেই ক্ষমতাসীন দলগুলো মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলেচনা করতে আগ্রহী হয় না। অনেক সময় স্পিকারও মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণে আগ্রহী হন না।
তবে সব বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাব আনা যায় না। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী-বিধি অনুসারে বিষয়টি সাম্প্রতিক হতে হবে। যে বিষয়ের প্রতিকার আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সম্ভব, সে বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাব আনা যাবে না। বিচার বিভাগীয় অথবা আধা-বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনকারী সংবিধিবদ্ধ কোনো ট্রাইবুনাল অথবা কর্তৃপক্ষের কাছে অথবা কোন কমিশনের অথবা তদন্ত আদালতের কাছে নিষ্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় থাকা বিষয় নিয়ে মুলতবি প্রস্তাব আনা যাবে না।
১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ গঠনের পর থেকে গত ১২টি জাতীয় সংসদে মোট ৩৫টি মুলতবি প্রস্তাব সংসদে আলোচিত হয়। তবে সেগুলোর সবগুলো সংসদ কর্তৃক গৃহীত হয়নি।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন প্রথম জাতীয় সংসদে কোনো মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়নি। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত একদলীয় বাকশাল প্রবর্তন করার পর গুরুত্ব হারায় সংসদ। তবে তা সত্ত্বেও বিএনপির নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় সংসদে সর্বোচ্চ ২২টি মুলতবি প্রস্তাব আলোচিত হয়। জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন তৃতীয় সংসদে চারটি এবং একই দলের নেতৃত্বাধীন চতুর্থ সংসদে (এক দলীয়) পাঁচটি মুলতবি আলোচিত হয়।
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন পঞ্চম জাতীয় সংসদে মোট চারটি মুলতবি প্রস্তাব আলোচিত হয়। সর্বশেষ চারটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করলে বোঝা যাবে মুলতবি কেমন হয়, যদিও বিষয়গুলো নিয়ে অনেকের ভিন্নমত রয়েছে।

১৯৯১ সালের ২৩ এপ্রিল এনডিপি (ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি) সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আনীত মুলতবি প্রস্তাব সংসদে আলোচনার জন্য গৃহীত হয়। এর বিষয়বস্ত ছিল ‘মেহেরপুরে বিএসএফ-এর গুলিতে বিডিআর জওয়ানসহ চার বাংলাদেশি নিহত’ হওয়ার ঘটনা। প্রস্তাবটি সংসদে গৃহীত হয়। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন।
১৯৯২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ‘পাকিস্তানী নাগরিক’ গোলাম আযমের জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের প্রধান হওয়া নিয়ে মুলতবি প্রস্তাব করেন আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য শামসুল হক (ময়মনসিংহ)। একই বছর ২৮ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে মুলতবি প্রস্তাব আনেন ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান রাশেদ খান মেনন (বাকেরগঞ্জ)। প্রস্তাবটি গৃহীত হয় এবং তা সংসদে আলোচিত হয়।
১৯৯৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আরেকটি মুলতবি প্রস্তাব সংসদে গৃহীত হয়ে আলোচিত হয়। প্রস্তাবটি আনেন আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম (যশোর-২)। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ১৯৯৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্র শিবিরের হাতে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর নেতা জোবায়ের চৌধুরী রিমু হত্যা।
এরপর থেকে জাতীয় সংসদে কোনো মূলতুবি প্রস্তাব আলোচিত হয়নি।
২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন অষ্টম সংসদে মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে ক্ষমতাসীন দল এবং প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের মধ্যে সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়।
বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ কমপক্ষে ২১ জনের প্রাণহানির ঘটনা নিয়ে সংসদে মুলতবি আলোচনার জন্য নোটিশ দেন আওয়ামী লীগের একাধিক সংসদ সদস্য। ২০০৪ সালের ২৮ নভেম্বর আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যরা কালো পতাকা, ব্যাজ ধারণ করে ৬২ বিধিতে; অর্থাৎ, মুলতবি আলোচনার জন্য প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে সংসদের ভেতরে স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করেন। সাংবাদিক গ্যালারি থেকে আমি সেই ঘটনা প্রত্যক্ষ করি।
একটি বিচার বিভাগীয় কমিশনে তদন্তাধীন থাকায় বিষয়টি মুলতবি প্রস্তাব আকারে গ্রহণ করেননি স্পিকার মুহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার। কার্যপ্রণালী বিধি অনুসারে তিনি সঠিক ছিলেন। কিন্তু বিষয়টি রাজনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে স্পিকার মুহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকারের কক্ষের একটি আলোচনার ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। সাংবাদিক হিসেবে আমি প্রায়ই উনার কক্ষে গিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম। যেহেতু সংসদ ভেঙে গিয়েছিল, তাই তিনি আমার সঙ্গে খুব খোলামেলা কথা বলতেন।
একদিন আমি তার চেয়ারের সামনে বসেই জিজ্ঞেস করলাম, তিনি কেন সেদিন মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির সংসদ সদস্য রেজাউল বারী ডিনা (বগুড়া), আব্দুল আলীম (জয়পুরহাট) এবং সেলিম রেজা হাবিব (পাবনা)। স্পিকার বললেন, “আমি তো সাবজুডিস ম্যাটারে আলোচনা দিতে পারি না। এটা বিধির লঙ্ঘন হতো।” তখন সঙ্গে সঙ্গে আব্দুল আলীম বলে উঠলেন, “দেখুন স্যার, আমি হাসিনাকে পছন্দ করি না। কিন্তু সে তো বিরোধীদলীয় নেতা। তার উপর গ্রেনেড আক্রমণ তো গ্রহণযোগ্য নয়। ওদের আলোচনা করতে দিলে কী হতো? বড়জোর সরকারকে দোষারোপ করত। রাগ চলে যেত। আপনি সেটা না দিয়ে আন্দোলনের পথ করে দিলেন।”
আব্দুল আলীমের সঙ্গে সুর মিলিয়ে রেজাউল বারী ডিনা বললেন, “স্যার আপনি কিন্তু আলোচনা দিতে পারতেন।”
উত্তরে জমিরউদ্দিন সরকার বললেন, “দেখুন আমার দল না চাইলে স্পিকার হিসেবে আমি যতই উদার হই, দেওয়া যাবে না। দিলে আমি স্পিকার থাকতে পারব? বাংলাদেশের স্পিকারকে পরিবর্তন করতে সিম্পল মেজরিটিই যথেষ্ট।”
জমিরউদ্দিন সরকার সত্য কথাই বলেছিলেন। রাজনীতি ঠিক না হলে সংসদ ঠিক হবে না।
২০২৬ সালে জনগণের ব্যাপক ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় বিএনপি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দুদিন আগে সংসদে বলেছেন, শফিকুর রহমানের প্রস্তাবটি সঠিকভাবে আনা হয়নি। তিনি ভুল বলেননি। তারপরও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি নিয়ে মুলতবি আলোচনা হয়েছে।

অনেকের মতে জুলাই আন্দোলন নিয়ে নেতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত বিএনপির জন্য রাজনৈতিক হঠকারিতা, এমনকি মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বিধায় জামায়াত-এনসিপির সাথে এক হয়ে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ, ২০২৫ নিয়ে আলোচনার জন্য মুলতবি প্রস্তাবে সায় দিয়েছে তারা।
তবে সমালোচনা যাই হোক না কেন, মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বিএনপি এক ধরনের রাজনৈতিক উদারতা দেখিয়েছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি সহনশীল সংসদীয় ধারার সূচনা হতে পারে।
মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করলেই যে তা সরকারের জন্য তিরস্কারমূলক হবে–এমন কথাও সবসময় সঠিক নয়। দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, জনগণের কল্যাণে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনার দরকার হলে সেটি মুলতবি আকারে আলোচনা করলে তাতে ক্ষতি নেই; বরং ভালো। এ ব্যাপারে দরকার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, সহনশীলতা।
দল, মত, রাজনৈতিক বিশ্বাস নির্বিশেষে সকলের একটিই প্রত্যাশা–দেশের সকল রাজনৈতিক সমস্যার ওপর আলোচনা করে সেগুলোর সমাধান খুঁজে বের করার স্থান হোক জাতীয় সংসদ। রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান যেন রাস্তা না হয়। বন্ধ হোক রাজপথের সহিংসতা।
জুলাই সনদের ওপর মুলতবি আলোচনার ফলাফল যাই হোক না কেন, সেটি গ্রহণ করা উচিত সকল রাজনৈতিক দলের। বিএনপির অবস্থান যদি জামায়াত-এনসিপির পছন্দ না হয়, সেক্ষেত্রে তারা সংসদে এবং সংসদের বাইরে জনমত গড়ে তুলতে কাজ করতে পারে। তবে সেটি কোনোক্রমেই জনগণের চলাচলসহ কোনো প্রকার অধিকার খর্ব করে নয়। সহিংসতা, হরতাল, অবরোধ, ব্লকেড ইত্যাদি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এগুলো পুরাতন বন্দোবস্ত।
শেখ হসিনার পতনের পর জামায়াত-এনসিপি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলে আসছে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক আচরণে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের নমুনা মেলেনি। ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় জামায়াত-এনসিপি সংসদের ভেতরে এবং এর লবিতে যে আচরণ করেছে, সেটি পঞ্চম ও অষ্টম সংসদে থাকা বিরোধী দল আওয়ামী লীগের আচরণের আরেকটি সংস্করণ বলা যায়।
জামায়াত-এনসিপিকে মনে রাখতে হবে তাদের রাজনৈতিক আচরণের ওপর নির্ভর করছে তাদের ও দেশের ভবিষ্যৎ।
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

মানবপাচারকারীরা প্রায়ই বিপজ্জনক রুট ব্যবহার করে মানুষ পাচার করে থাকে। সমুদ্রপথে বা দুর্গম স্থলপথে যাত্রাকালে অনেকেই প্রাণ হারান। এর সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে সামনে আছে ইতালি পাড়ি দেওয়ার সময় সমুদ্রে ডুবে এই মানুষদের মৃত্যু। সুনামগঞ্জের বাতাস আজ ভারী। অথচ, সঠিক পথে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গেলে তাদের স্বপ্নের