১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমণের নেতৃত্ব দেন এক তরুণী–প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। ১৯১১ সালে চট্টগ্রামে জন্ম হওয়া এই তরুণী বেথুন কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলেছিলেন তিনি। সফল আক্রমণের পর ধরা পড়ার অপমান এড়াতে পটাশিয়াম সায়ানাইড পান করে আত্মাহুতি দেন। আজ তার ৯৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। স্বাধীন বাংলাদেশে এই বীরকন্যাকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অভাব আজও চোখে পড়ার মতো। এর পেছনে রয়েছে জটিল রাজনৈতিক, সামাজিক ও ইতিহাসচেতনার সংকট।
যে স্বপ্ন এখনো অধরা
২০০৭ সালে এক অনুষ্ঠানে ইতিহাসবিদ সৈয়দ আনোয়ার হোসেন মন্তব্য করেন, প্রীতিলতার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই–কারণ তিনি যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে তার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয় না। প্রীতিলতা শহীদ হন ১৯৩২ সালে; বাংলাদেশ স্বাধীন হয় ১৯৭১-এ; অর্থাৎ, ৩৯ বছর পর। নতুন রাষ্ট্রের ইতিহাসের কেন্দ্রে তিনি নন, প্রান্তে।
স্বপ্নের রাষ্ট্র এখনো প্রতিষ্ঠিত না হলেও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে স্বাধীন ভূখণ্ডের জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন প্রীতিলতা। সে ভূখণ্ড তিন ভাগ হয়ে স্বাধীন হয়েছে পরে, যার পেছনে তার ব্রিটিশবিরোধী সেই সংগ্রামের অবদানও রয়েছে। কিন্তু তার স্বীকৃতি সেভাবে নেই। তাকে স্মরণে তেমন কোনো কর্মসূচি নেই।
কিন্তু যে রাষ্ট্রের স্বপ্নে তিনি প্রাণ দিলেন, সেই রাষ্ট্র কি তাকে স্মরণ করার দায় এড়াতে পারে?
ইতিহাসের পুরুষতান্ত্রিক ফ্রেম
ইতিহাস মূলত পুরুষের চোখে লেখা। নারীর রাজনৈতিক শ্রম সেখানে প্রায়ই গৌণ। প্রীতিলতার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। ২০১০ সালের বলিউড ছবি ‘খেলেঁ হম জি জান সে’-তে তাকে বিপ্লবী হিসেবে নয়, প্রেমিকার আবরণে দেখানো হয়েছে। এমনকি মাস্টারদা সূর্য সেনও প্রথমে নারীদের সরাসরি যুদ্ধে ব্যবহারের বিরুদ্ধে ছিলেন। তিনি মনে করতেন, নারীরা মূলত সহানুভূতিশীল ও পর্দার আড়ালের সহকারী হিসেবেই ভূমিকা রাখতে পারবেন।
অস্ত্রধারী বিপ্লবীকে প্রেমিকার ফ্রেমে বন্দি করা কি ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা নয়?
সাম্প্রদায়িকতার ছায়া
প্রীতিলতার দল অনুশীলন সমিতির আদর্শ ছিল হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী–বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ ছিল কেন্দ্রে এবং মা কালীর নামে শপথ নেওয়া ছিল বিপ্লবে দীক্ষা নেওয়ার অন্যতম প্রধান উপায়। মুসলমানদের প্রবেশাধিকার ছিল না। বাংলাদেশে যেহেতু মুসলিম-বাঙালি পরিচয় জাতীয়তাবাদের মূল, সেহেতু এই সাম্প্রদায়িক অনুষঙ্গ তাকে ‘অপর’ হিসেবে চিহ্নিত করে। কেউ কেউ এই কারণ দেখিয়ে তার স্বীকৃতির বিরোধিতাও করেন।
সাম্প্রদায়িক অনুষঙ্গের অজুহাতে একজন শহীদের অবদান মুছে ফেলা কি অন্যায় নয়?
পাঠ্যবই থেকে স্ক্রিন–সবখানেই অনুপস্থিতি
পাঠ্যবইয়ে প্রীতিলতার পূর্ণাঙ্গ জীবনী নেই। কোনো ডকুমেন্টারি বা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও তৈরি হয়নি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার হল’ থাকলেও অনেক শিক্ষার্থী এ নামের পেছনের ইতিহাস জানেন না। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি প্রায় অচেনা।
তবে একেবারে অন্ধকার নয়। প্রতি বছর ২৪ সেপ্টেম্বর কিছু সংগঠন–বিশেষত চট্টগ্রামভিত্তিক সাংস্কৃতিক ও গবেষণা সংস্থা তার স্মরণে আলোচনা সভা আয়োজন করে। কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তার জীবনী নিয়ে লেখালেখি হয়। কিন্তু এসব উদ্যোগ বিচ্ছিন্ন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির বাইরে।
রাজনীতির হাতিয়ার
বাংলাদেশে ইতিহাস প্রায়ই রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পরস্পরকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মুছে ফেলার অভিযোগ করে। এই বিতর্কে ১৯৩০-এর বিপ্লবীদের স্থান হয় না। ফলে প্রীতিলতা রাষ্ট্রীয় আখ্যানের বাইরে পড়ে থাকেন।
রাজনৈতিক স্বার্থে ইতিহাস ভাঙাগড়া করলে সত্যিকারের সংগ্রামী থাকবেন কে?
মানচিত্রের বিভাজন
প্রীতিলতার প্রতি এই অনাদরের গভীরে রয়েছে উপনিবেশোত্তর বিবর্ণতা–ইতিহাসের রঙ উঠে যাওয়া, স্মৃতির ফ্যাকাশে হয়ে পড়া। ১৯৩২ সালে অবিভক্ত বাংলার চট্টগ্রামে তার আত্মাহুতি। ১৯৪৭-এর দেশভাগে বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয়। তার রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলো পশ্চিমবঙ্গে থেকে যায়। ১৯৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীন হয়, কিন্তু ইতিহাসের কেন্দ্রে স্থাপিত হয় মুক্তিযুদ্ধের আখ্যান। ১৯৩২-এর চট্টগ্রাম বিদ্রোহ এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ—দুটোই ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই। কিন্তু প্রথমটি হয়ে পড়ে পূর্ব-ইতিহাস।
দেশভাগের মানচিত্র কি তবে আমাদের স্মৃতিকেও ভাগ করে দিল না?
দ্বৈত মানদণ্ড
মুক্তিযুদ্ধের ‘বীরাঙ্গনা’ ধারণা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়, অথচ প্রীতিলতার মতো ঔপনিবেশিক-বিরোধী নারী বিপ্লবী আড়ালে থেকে যায়। এই দ্বৈত মানদণ্ড উপনিবেশোত্তর সমাজের গভীর সমস্যা। গবেষক পোউলোমি সাহা তার ‘অ্যান এম্পায়ার অব টাচ’ (কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১৯) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, উপনিবেশোত্তর প্রেক্ষাপটে নারীর রাজনৈতিক শ্রম একইসঙ্গে ক্ষমতায়ন ও বিবর্ণতার শিকার হয়।
বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি আছে, প্রীতিলতার নেই–এই বৈষম্য কি আমাদের লজ্জা নয়?
ইতিহাস-রাজনীতি
রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে প্রীতিলতা থাকেন না। কারণ, তিনি ১৯৭১-এর আখ্যানের বাইরে। পাঠ্যবইয়ে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীদের জীবনী অন্তর্ভুক্তির দাবি উঠলেও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে নতুন প্রজন্ম জানেন না, আর এই অজ্ঞতাই বিবর্ণতাকে স্থায়ী করে।
১৯৭১-এর বাইরে যারা স্বাধীনতার বীজ বুনেছেন, তাদের ভুলে যাওয়া কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না?
সাইকোপলিটিকস: স্মৃতির অদৃশ্য শাসন
উপরে বর্ণিত সব কারণের গভীরে রয়েছে আরও একটি স্তর–সাইকোপলিটিকস। দার্শনিক বিয়ং-চুল হান তার সাইকোপলিটিক্স: নিওলিবারালিজম অ্যান্ড নিউ টেকনোলজিস অব পাওয়ার (২০১৭) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আজকের ক্ষমতা আর চাবুক নিয়ে শাসন করে না–সে শাসন করে মনকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাকে কিছু নিষিদ্ধ করতে হয় না; সে কেবল ভুলিয়ে দেয়, উদাসীন করে তোলে, বিনোদনে ডুবিয়ে রাখে।
প্রীতিলতার ক্ষেত্রে ঠিক তা-ই ঘটেছে। রাষ্ট্র তাকে নিষিদ্ধ করেনি–কেবল পাঠ্যবই থেকে, টিভি থেকে, আলোচনা থেকে তাকে ঝরে পড়তে দিয়েছে। মানুষ নিজেই তাকে ভুলে গেছে, নিজের অজান্তে। এই স্বেচ্ছা-বিস্মরণই সাইকোপলিটিক্যাল শাসন। ক্ষমতা যখন ইতিহাসকে মুছে ফেলে, তখন আর প্রতিবাদ হয় না। কারণ, কেউ জানেই না কী মোছা হলো।
যে ইতিহাস শাসক মুছেছে, তা জানার ইচ্ছাও যদি না থাকে–তবে শাসন কি সফল হয়নি?
স্মৃতি ফিরিয়ে আনার লড়াই
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা চলে গেছে, কিন্তু তার সৃষ্ট বিভাজন–ধর্ম, জাত, লিঙ্গ এখনো আমাদের ইতিহাসচেতনাকে কলুষিত করছে। প্রীতিলতার স্মৃতি ফিরিয়ে আনা মানে কেবল একজন নারীকে স্মরণ করা নয়। এর মানে উপনিবেশোত্তর বিবর্ণতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। এমন একটি ইতিহাস গড়া, যেখানে লিঙ্গ, ধর্ম ও অঞ্চল নির্বিশেষে সব সংগ্রামীর স্থান সমান।
প্রীতিলতার স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে হলে পাঠ্যবইয়ে তার পূর্ণাঙ্গ জীবনী অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তার সংগ্রামের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা দরকার। ডকুমেন্টারি ও চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রয়োজন। তাকে স্মরণ ও তার আদর্শকে জীবিত রাখার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পাশাপাশি নাগরিক সমাজেরও দায় আছে।
প্রীতিলতা কেবল নারী বিপ্লবী নন–তিনি সাম্রাজ্যবাদ ও পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক। তিনি তার জীবন দিয়ে দেখিয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোটা লিঙ্গ, ধর্ম বা বয়সের অপেক্ষা করে না।
প্রীতিলতার স্মৃতি ফিরিয়ে আনা কি উপনিবেশোত্তর বিবর্ণতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়?
জেনজির জন্য প্রীতিলতা: উত্তরাধিকারের পাঠ
বাংলাদেশের জেনারেশন জেড বা জেনজির জন্য প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার কেবল ইতিহাসের একটি নাম নন, তিনি এক অমর উত্তরাধিকার। মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি প্রমাণ করেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে বয়স, লিঙ্গ বা ধর্ম কোনোটিই বাধা নয়। আজকের তরুণ প্রজন্ম যখন সাম্প্রদায়িকতা, লিঙ্গবৈষম্য ও রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত, তখন প্রীতিলতার জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। তার আত্মাহুতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কেবল উপহার নয়, তা অর্জন করতে হয়। জেনারেশন জেড যদি প্রীতিলতাকে ভুলে যায়, তবে তারা তাদের নিজেদের ইতিহাস ও সম্ভাবনাকেই ভুলে যাবে। প্রীতিলতা আমাদের গর্ব, আমাদের প্রেরণা, এবং আমাদের লড়াইয়ের অংশ।
“চলো যাই, চলো যাই, চলো যাই যুদ্ধে”, কাজী নজরুল ইসলামের এই আহ্বান আজও আমাদের জাগিয়ে তোলে। প্রীতিলতার আত্মাহুতির ৯৪ বছর পরও শোষণ নিশ্চিহ্ন হয়নি, স্বাধীনতা সম্পূর্ণ হয়নি। তার সংগ্রামের লক্ষ্য ছিল এমন এক সমাজ, যেখানে লিঙ্গ, ধর্ম ও শ্রেণি নির্বিশেষে সবার মুক্তি হবে। সেই মুক্তি এখনো অধরা। প্রীতিলতাকে স্মরণ করা মানে তাই কেবল ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে নাম উচ্চারণ করা নয়; এর মানে হলো তার অসমাপ্ত সংগ্রামকে আমাদের সময়ের লড়াইয়ের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া। প্রীতিলতার আত্মাহুতি কোনো বিমূর্ত ইতিহাস নয়।
ভাবুন তো—একুশ বছর বয়সী এক তরুণী, যার হাতে বই থাকতে পারত, প্রেমের চিঠি থাকতে পারত, ভবিষ্যতের স্বপ্ন থাকতে পারত; সেই হাতে তিনি তুলে নিয়েছিলেন আগ্নেয়াস্ত্র। আর যখন পরাজয় নিশ্চিত, তখন তিনি বেছে নিয়েছিলেন মৃত্যু—ধরা পড়ার অপমান নয়। আজ আমরা তার নাম ভুলে গেছি, তার আত্মত্যাগকে পাঠ্যবইয়ের একটি পাদটীকায় পরিণত করেছি। কিন্তু প্রতিবার যখন আমরা অন্যায়ের কাছে নতজানু হই, যখন আমরা সাম্প্রদায়িকতার কাছে মাথা নত করি, যখন আমরা নারীর ক্ষমতাকে অবহেলা করি—তখন আমরা প্রীতিলতাকে আবার হত্যা করি। তার স্মৃতি ফিরিয়ে আনা মানে শুধু ইতিহাস পড়া নয়; এর মানে হলো তার মতো সাহসী হওয়া।
লেখক: ডা. সানজিদা শাহরিয়া: চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার