রাষ্ট্র ক্ষমতায় এতদিন যে ফ্যাসিবাদ ছিল, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তার অবসান ঘটার কথা। কিন্তু ফ্যাসিবাদ তো কেবল রাষ্ট্র ক্ষমতার চৌহদ্দিতে সীমিত থাকে না। এটা নানা মোড়কে ও রূপে আবির্ভূত হয়। এখনো হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পনেরো মাস পরও সমাজশক্তির বিভিন্ন স্তরে ফ্যাসিবাদ কীভাবে জেঁকে বসেছে, ক্ষেত্র বিশেষে আরও পাকাপোক্ত হয়েছে, সেটা চারপাশে চোখ মেললেই দেখা যায়।
ফ্যাসিবাদকে যখন আইনের শাসনের বদলে জবরদস্তি বা মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে মোকাবিলা করা হয়, তখন নতুন ফ্যাসিবাদের আবির্ভাব ঘটে। এ ক্ষেত্রে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের মন্তব্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রোববার নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে তিনি লিখেছেন ‘‘মজলুম জালিম হচ্ছে, ফ্যাসিবাদবিরোধীরা ফ্যাসিবাদী হচ্ছে। পুরা পরিস্থিতি হতাশা ও ক্ষুব্ধতার।’’
মাহফুজ আলম নিজে উপদেষ্টা হয়েও জুলুম ও সহিংসতা থামাতে পারছেন না। সরকার আক্রমণকারী ও আক্রান্তের মাঝখানে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। কোথাও কোথাও তাদের ভূমিকা আক্রমণকারীর পক্ষে যায়।
মানিকগঞ্জে জনপ্রিয় পালাকার ও বাউল শিল্পী আবুল হোসেনের বক্তব্য খণ্ডিত করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে একটি মহল তার বিরুদ্ধে ধর্মাবমাননার অভিযোগ এনেছে। তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে। এটা ন্যায়বিচারের জন্য হলে আপত্তির কিছু থাকবে না। কিন্তু সংঘবদ্ধ সহিংসতার হাত থেকে রক্ষা করতে যদি সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়ে থাকে, সেটা আইনের চূড়ান্ত বরখেলাপ।
এর আগেও ধর্মাবমাননার কথিত অভিযোগে অনেক নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাসের পর মাস তারা কারাগারে থেকেছেন। কিন্তু মামলার সুরাহা হয়নি। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রামু, নাসিরনগরের ঘটনা স্মরণ করতে পারি। যাদের নামে ফেসবুকে ধর্মাবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছে, তারা মোবাইল ফোনই ব্যবহার করেন না। সরকার বদল হয়েছে, কিন্তু জুলুমের ধরন বদলায়নি।
গত ২৫ অক্টোবর উপদেষ্টা মাহফুজ আলম মাজার সংস্কৃতি: সহিংসতা, সংকট ও ভবিষ্যৎ ভাবনা শীর্ষক সেমিনারেও শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, “সবাই সংঘাতের জন্য মুখিয়ে আছে এবং আপনারা অবশ্যই এটা অল্প কয়েক মাসের মধ্যে দেখতে পাবেন। যদি এর সঙ্গে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ যুক্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”
মানিকগঞ্জের ঘটনার মধ্য দিয়ে সেই শঙ্কাই বাস্তবে রূপ নিল ধারণা করি।
মাহফুজ আলম বলেছেন, মাজারসহ যত মতাদর্শের মানুষের বসবাস বাংলাদেশে রয়েছে, সবার মধ্যে যদি সংলাপের সুযোগ না থাকে, তাহলে তা রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হবে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদ চলে গেলেও সামাজিক ফ্যাসিবাদ রয়ে গেছে।
এক সময়ের মজলুম জনগোষ্ঠীর জালিম হয়ে যাওয়ার বহু উদাহরণ আছে। সাতচল্লিশের আগে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানেরা ছিল সংখ্যালঘু মজলুম। দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানে সেই মুসলমানেরাই জুলুমবাজ হয়ে ওঠে। একাত্তরে যেই বাঙালি জনগোষ্ঠী পাকিস্তানিদের হাতে নির্যাতিত হয়েছে, স্বাধীনতার পর তারাই অন্য জাতিগোষ্ঠীর অধিকার অস্বীকার করে বসে।
প্রতীকী ছবি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরিতথ্য উপদেষ্টা যখন তাসাওফপন্থী, ফকির, বাউলসহ সকল ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর সব ধরনের জুলুম বন্ধ করারও আহ্বান জানান তখন তার মধ্যে অসহায়ত্ব প্রকাশ পায়। তিনি সরকারে থেকেও তাসাউফপন্থীদের সুরক্ষা দিতে পারছেন না। মাজার, পিরের দরগায় হামলা বন্ধ করতে পারছেন না। অতি সম্প্রতি ওলামা মাশায়েকদের সমাবেশ থেকে আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণার দাবি উঠেছে, যে সমাবেশে বিএনপি ও মওদুদীর আদর্শে দীক্ষিত জামায়াতের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। এর পেছনেও ভোটের হিসেব নিকেশ কাজ করেছে।
শান্তিপূর্ণ সভা সমাবেশ করার অধিকার সব নাগরিকের আছে। আবুল হোসেনের মুক্তির দাবিতে যেসব ভক্ত অনুসারী মিছিল করলেন, তারা কারও ওপর হামলা করেননি। কিন্তু যারা তার বিচারের দাবিতে মিছিল করলেন, তারা তাদের ওপর চড়াও হলেন। আবার আক্রান্তদের বিরুদ্ধে মামলাও করলেন। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ফ্যাসিবাদেরই লক্ষণ।
এ বিষয়ে সরকারের অন্যান্য উপদেষ্টা নিরব থাকলেও মাহফুজ আলম নিজের মতো করে প্রতিবাদ করেছেন। এর আগেও তিনি বিভিন্ন ইস্যুতে খোলাখুলি নিজের মত প্রকাশ করেছেন। জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সখ্য নিয়ে খবর প্রকাশিত হলে তথ্য উপদেষ্টা ছোট্ট একটি মন্তব্য করেছিলেন, “আরেকটি ছায়া মওদুদীবাদী দলের প্রয়োজন নেই।” তার এই মন্তব্য নিয়ে এনসিপিতে তোলপাড় শুরু হয় এবং এরপর থেকে জামায়াতে ইসলামী থেকে তারা যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে চলে। অন্তত আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণার সমাবেশে গরহাজির থেকে ভোটের রাজনীতি থেকে দলটি নিজেদের দূরে রাখতে পেরেছে। তবে শেষ পর্যন্ত এনসিপির নির্বাচনী জাহাজ কোন কূলে ভেড়ে সেটা এখনো পরিষ্কার নয়।
স্বাধীনতার পর নকশালদের বিরুদ্ধে সরকারের ঘোড়া দাবড়ানোর ঘোষণার জবাবে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেছিলেন, নকশাল কারও গায়ে লেখা থাকে না। তার কথাটি একটু ঘুরিয়ে বলা যায়, ফ্যাসিবাদও কারও গায়ে লেখা থাকে না। মানুষ নিজের আচরণ দিয়েই প্রমাণ করে, সে আইনের শাসনে বিশ্বাসী না ফ্যাসিবাদী ধ্যানধারণা লালন করে।
সোহরাব হাসান: সম্পাদক, চরচা