গত ২৩ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের প্রভাবশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) তিন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সদস্যকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তারা চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছিল। তাদের কাছ থেকে ১ লাখ ৬৮ হাজার মিয়ানমার কিয়াত (প্রায় ৯ হাজার ৮০০ বাংলাদেশি টাকা) উদ্ধার করা হয়েছে।
এর ছয় দিন আগে, নাফ নদীর মোহনায় শাহপরীর দ্বীপের কাছাকাছি এলাকা থেকে পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিককে অপহরণ করে আরাকান আর্মি। তারও একদিন আগে, ২০০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি জিম্মির মধ্যে ৭৩ জনকে মুক্তি দিয়েছিল গোষ্ঠীটি।
এই ঘটনাগুলো মিয়ানমারের রাখাইন যুদ্ধের মধ্যে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সংঘটিত নানাবিধ অর্থনৈতিক অপরাধের দুটি দিক সামনে আনে। একটি মুদ্রাপাচার, অন্যটি মুক্তিপণের জন্য অপহরণ। বাস্তবে রাখাইন যুদ্ধ বাংলাদেশের ওপর উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলেছে। তবে এটি এমন একটি বিষয় যা এখন পর্যন্ত যথাযথভাবে পর্যালোচিত হয়নি।
মিয়ানমার ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পায়। এরপর থেকেই দেশটির রাখাইন রাজ্যে এক জটিল সশস্ত্র সংঘর্ষ চলছে। রাখাইন যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়টি শুরু হয় ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর। আরাকান আর্মি আরও দুটি জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে সামরিক জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ১০২৭’ শুরু করে।
এরপর থেকে আরাকান আর্মি (এএ) রাখাইন রাজ্যের ৯০ শতাংশেরও বেশি এলাকা দখল করে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উত্তরের মংডু জেলা, যা ঐতিহাসিকভাবে রোহিঙ্গাদের প্রধান আবাসস্থল এবং দক্ষিণ চীন রাজ্যের পালেতওয়া জনপদ। এর মাধ্যমে রাখাইন জাতীয়তাবাদী এই সংগঠনটি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের পুরো ২৭১ কিলোমিটার এলাকার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে, যা কার্যত মিয়ানমার সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলো থেকে বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী 'দ্য ডিপ্লোম্যাট'-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে আরাকান আর্মি ও এর রাজনৈতিক শাখা ‘ইউনাইটেড লিগ অফ আরাকান’ নিয়ন্ত্রিত এই অঞ্চলটি কার্যত বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রতিবেশী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার বাণিজ্যিক প্রবাহের ওপর তাদের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ খুব বেশি নয়। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে এটি সর্বোচ্চ প্রায় ২২৩.২২ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে এই বাণিজ্য কমে মাত্র ৯০.১ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। রাখাইন রাজ্যে যুদ্ধ তীব্রতর হওয়ার কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থাই এই ধসের প্রধান কারণ।
মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের ৯০ শতাংশেরও বেশি সম্পন্ন হয় রাখাইন রাজ্যের দুটি চেকপয়েন্ট সিত্তওয়ে ও মংডু দিয়ে। বর্তমানে মংডু পুরোপুরি আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে এবং রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তওয়ে অবরুদ্ধ অবস্থায় মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। এর ফলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার বাণিজ্যের নাটাই এখন আরাকান আর্মির হাতে।
মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ শুরু হওয়ায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নেমেছে। আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের নিকটবর্তী নাফ নদী দিয়ে সব ধরনের নৌযান চলাচলের ওপর অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এছাড়া তারা মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ড থেকে আসা বাংলাদেশগামী পণ্যবাহী জাহাজগুলো নির্বিচারে জব্দ করছে এবং সিত্তওয়ে থেকে টেকনাফে পণ্য পাঠাতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কর আদায় করছে। মূলত এই কারণগুলোই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে মন্দার জন্য দায়ী।
ছবি: রয়টার্স২০২৩ সালের নভেম্বরের আগে টেকনাফ স্থলবন্দরে প্রতিদিন প্রায় ৫০টি পণ্যবাহী জাহাজ আসত। কিন্তু আরাকান আর্মি মংডু জেলা দখল করার পর বর্তমানে মাসে গড়ে মাত্র ৩ থেকে ৫টি জাহাজ বন্দরে ভিড়ছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে সাড়ে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা (১২৬.৪৩ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের ১ লাখ ৮৮ হাজার ৯৯৯ টন পণ্য আমদানি করেছিল এবং বিপরীতে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা মূল্যের ২ হাজার ৯৪১ টন পণ্য রপ্তানি করেছিল। তবে ‘অপারেশন ১০২৭’ শুরু হওয়ার পর, ২০২৩ সালের নভেম্বরের এক প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সংকুচিত হওয়ায় বাংলাদেশ সরকার প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিলিয়ন (৩ কোটি) টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। এরপর থেকে আর্থিক ক্ষতির এই পরিমাণ কেবল বেড়েই চলেছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের আমদানি ৬২ শতাংশ কমে মাত্র ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) টাকায় দাঁড়িয়েছে এবং রপ্তানি ৭৬.১ শতাংশ কমে মাত্র ২ কোটি ৪৫ টাকায় টাকায় নেমে এসেছে। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, রাখাইন যুদ্ধের কারণে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নেমেছে।
মিয়ানমারে বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়ি ছোট হলেও, দেশটি থেকে বাংলাদেশ চাল, হিমায়িত মাছ, শুঁটকি, নারিকেল ও আচারসহ আদা, রসুন ও পেঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলা আমদানি করে থাকে।
বিশেষ করে, চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় হলেও ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও উৎপাদন ঘাটতির কারণে বড় পরিমাণের চাল আমদানি করতে হয়। অন্যদিকে, চাল উৎপাদনে সপ্তম দেশ হিসেবে মিয়ানমার বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশে চাল রপ্তানি করছে। গত বছরও বাংলাদেশ মিয়ানমার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১ লাখ টন চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুতরাং, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মিয়ানমার গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু রাখাইন যুদ্ধ এই পারস্পরিক বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
প্রাতিষ্ঠানিক বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটানোর পাশাপাশি রাখাইন যুদ্ধ কালোবাজারি, মাদকপাচার, মানবপাচার এবং মুক্তিপণ আদায়ের মতো অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উসকে দিয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের ওপর শুধু সামাজিক বা রাজনৈতিক নয়, বরং চরম অর্থনৈতিক ব্যয়ও চাপিয়ে দিচ্ছে।
অপারেশন ১০২৭ শুরু হওয়ার পর, জনবল সংকটে থাকা মিয়ানমার সামরিক বাহিনী আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে ফোর কাটস কৌশল প্রয়োগ করেছে। এর ফলে রাখাইন রাজ্যকে খাদ্য, অর্থ, তথ্য ও নিয়োগ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। এই সংকটের মুখে আরাকান আর্মি এখন খাদ্যদ্রব্য, সিমেন্ট, সার, তেল ও ওষুধসহ সব ধরনের পণ্য কালোবাজারের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে সংগ্রহ করছে।
বাংলাদেশ থেকে রাখাইন রাজ্যে পাচার হওয়া পণ্যের পরিমাণ বিশাল, কিন্তু এর বড় অংশই অশনাক্ত থেকে যাওয়ায় এর প্রকৃত হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। এই অবৈধ বাণিজ্যের ফলে বাংলাদেশ সরকার বিপুল পরিমাণ কাস্টমস ও আবগারি শুল্ক হারাচ্ছে।
ছবি: রয়টার্সঅন্যদিকে, রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ মাদক—বিশেষ করে মেথামফেটামিন (ইয়াবা) এবং ওপিয়েটস (আফিম ও হেরোইন) পাচার হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আরাকান আর্মি এই মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। এই মাদকের প্রায় ৮০ শতাংশই উপকূলীয় এলাকা দিয়ে দরিদ্র রোহিঙ্গাদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশে ঢোকানো হচ্ছে। মাত্র কয়েক দিন আগে, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কক্সবাজারে মাদক পাচারকারীদের কাছ থেকে প্রায় ১০ লাখ ইয়াবা জব্দ করেছে।
মাদকের এই অবাধ ও ব্যাপক প্রবাহ বাংলাদেশে প্রায় ৮৩ লাখ মানুষকে মাদকাসক্ত করে তুলেছে, যা দারিদ্র্য এবং সহিংস অপরাধ বৃদ্ধির মতো নানাবিধ আর্থ-সামাজিক সমস্যার জন্ম দিচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্র ও ব্যক্তি উভয়কেই মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনে বিপুল সম্পদ ব্যয় করতে হচ্ছে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদক পাচারের কারণে বাংলাদেশের বছরে বছরে ৪৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ক্ষতি হয় এবং মাদকাসক্তির পরোক্ষ অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও অনেক বেশি।
রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির কর্মকাণ্ডের ফলে দেড় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে, যা আগে থেকেই থাকা ১৪ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী সম্প্রদায়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এটি বাংলাদেশের অস্থিতিশীল অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করেছে এবং এই শরণার্থী সংকটের আর্থ-সামাজিক ক্ষতি অপরিসীম।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে যে, অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাচারে সহযোগিতা করছে আরাকান আর্মি। এভাবে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী মানবিক বিপর্যয় থেকে মুনাফা লুটছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বহন করছে।
ছবি: রয়টার্সনাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর থেকে শত শত বাংলাদেশি জেলেকে অপহরণ এবং তাদের নৌকা ও ট্রলার জব্দের মাধ্যমে আরাকান আর্মি কার্যত এই জলসীমাকে রাখাইন লেক-এ পরিণত করার চেষ্টা করছে। এটি বাংলাদেশকে তার নিজস্ব আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা, সংলগ্ন এলাকা এবং একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে (ইইজেড) অর্থনৈতিক অধিকার প্রয়োগে বাধা দিচ্ছে। এতে দেশ ও নাগরিকদের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি করছে। এছাড়া অপহৃতদের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হচ্ছে, যা এমনিতেই দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের ওপর চরম অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে।
রাখাইন যুদ্ধের সাম্প্রতিক পর্যায়টি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের ওপর বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। এই যুদ্ধের শুরু এবং দীর্ঘসূত্রিতা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত করেছে। একই সাথে, যুদ্ধটি কালোবাজারি, অবৈধ মাদকব্যবসা, মানবপাচার এবং মুক্তিপণভিত্তিক এক ছায়া অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত ও তীব্রতর করেছে।
বাংলাদেশের ওপর এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক ভার এখনো পুরোপুরি পরিমাপ বা নথিভুক্ত করা হয়নি। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থিতিশীলতা ফিরে না আসলে এই ক্ষয়ক্ষতি আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা সীমান্ত অর্থনীতির কাঠামোগত বিপর্যয় ঘটাবে এবং ঢাকার সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সমীকরণকে জটিল করে তুলবে।