আহমদ ছফার পর্যবেক্ষণ বনাম বর্তমান

রাজনীতি: পঞ্চাশ বছর পর কোন পথে বাংলাদেশ?

রাজনীতি: পঞ্চাশ বছর পর কোন পথে বাংলাদেশ?
প্রতীকী ছবি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

১৯৭২। ১৯৯৭। ২০২৫।

এই তিনটি সালের কালক্রমে বাংলাদেশ ভিন্ন ভিন্নভাবে ধরা পড়ে। প্রথমটায় সদ্য স্বাধীন একটি দেশ মোটে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিল। দ্বিতীয়টায় সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে ফিকে হতে শুরু করেছিল। আর তৃতীয়টাই এখন বর্তমান। তাতে দাঁড়িয়ে আমরা বোঝার চেষ্টা করতে পারি ২৫ বছর আগের ফিকে হতে থাকা স্বপ্নটি তারও ২৫ বছর আগের প্রাবল্য আসলে কতটা হারিয়েছে? হারিয়েছে কি ততটাই, যাতে আস্থা হারিয়েই ফেলতে হয়?

আস্থা হারাতে কে বা চায়! চূড়ান্ত হতাশাবাদী মানুষটিও এক না এক পর্যায়ে আশা দেখে সব ঠিক হওয়ার। কারণ আশা পুরোপুরি হারিয়ে ফেললে মানুষের আর গন্তব্য থাকে না, বেঁচে থাকার কার্যকারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই মানুষ আশা দেখে, যেমনটা ১৯৭২ সালের তৎকালীন জাতীয় জীবনের সামগ্রিক ধরনেও কোনো কোনো বুদ্ধিজীবী দেখেছিলেন। কিন্তু তখন ঘুণ চিহ্নিত হলেও নিশ্চিতভাবেই ঘুণ পোকা নিকেশ করায় আমরা মনযোগ দিইনি। তা নইলে স্বাধীনতার ৫০ বছর পর পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে কেন মনে হবে—‘আগে “এটা” করলে আজ “ওটা” হতো না’!

১৯৭২ ও ১৯৯৭—এই দুই কালক্রমের তৎকালীন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে আমরা কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এবং সর্বতোভাবে একজন স্বাধীন চিন্তক আহমদ ছফার শরণাপন্ন হয়েছি। ১৯৭২ সালে তিনি লিখেছিলেন ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’। এর ২৫ বছর পরে এই লেখাটির ধারাবাহিকতা মেনে ছফা লিখেছিলেন একটি ‘সাম্প্রতিক বিবেচনা’। এবার এই দুই লেখার আলোকেই এ দেশের বর্তমান গতিপথের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা যাক।

১৯৯৭ সালে আহমদ ছফা লিখেছিলেন, ‘সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে জাতীয় মধ্যশ্রেণীভূক্ত বুদ্ধিজীবীরা সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতা এই রাষ্ট্রীয় চতুস্তম্ভের জয়ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত করে ফেলেছিলেন।’ সদ্য অর্গল থেকে মুক্ত হওয়া একটি জনপদে এমন উচ্ছ্বাস অস্বাভাবিক নয়। বরং এই চারটি স্তম্ভের পাশাপাশি থাকাটা তৎকালীন দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশকে অন্যতম আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতীয়মান করেছিল। কারণ এই দেশটি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা থেকে উদ্ভূত হয়ে নিজেদের একটি দেশই গড়ে ফেলেছিল। সমস্যা হয়ে যায় এর পর। কারণ এই চতুস্তম্ভকে আমরা ধীরে ধীরে সংবিধানে থাকা ‘সৌন্দর্যবর্ধনকারী’ স্তম্ভই বানিয়ে ফেলেছি আদতে। এটুকু বলতে আপত্তি নেই যে, আমাদের জাতীয় জীবনে এই চার স্তম্ভের সত্যিকারের উপযোগিতা আমরা নিজেরাই ধীরে ধীরে নষ্ট করে ফেলেছি এবং তৈরি করেছি নানামুখী বিতর্ক। এর প্রধান কারণ অবশ্যই সমস্যা সমাধানের বদলে সেগুলোকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রেখে দেওয়া। ফলে স্বাভাবিক যে প্রশ্ন ওঠে, তা হলো জাতীয় মূলনীতি বা চার স্তম্ভ নির্ধারণের কাজটি আসলে কে করেছিল? এই নির্ধারণ প্রক্রিয়াটি কি সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশটির নেতৃত্ব নিজে করেছিল? এ জন্য যথাযথভাবে সম্মতি উৎপাদন হয়েছিল কি? নাকি এটি ছিল কেবলই অনুকরণ, অন্য কোনো দেশ বা সংবিধানের আদলে বা নিতান্তই ‘দক্ষিণ এশিয়ায় একটি আধুনিক রাষ্ট্রের’ তকমা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়?

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য। ছবি: চরচা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনাটি আমাদের দেশের মর্মন্তুদ পথে যাত্রায় ভূমিকা রেখেছে প্রবলভাবে। যেমনটা ছফা বলেছিলেন, ‘একজন বা একাধিক ব্যক্তির হত্যার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের পরিচয় পাল্টে যাওয়ার দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে অধিক নেই। অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই ব্যাপারটিই ঘটেছে।’ এর পরপরই এ দেশের ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ সংবিধানে ধর্মীয় বিষয়আশয় ঢোকে, ঢোকে রাষ্ট্রধর্ম প্রচলনের বিষয়টিও। জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের অগণতান্ত্রিক চেহারার সরকারকে এ জন্য দোষ দেওয়া ভুল কিছু নয়। সমস্যা হলো—যাদের এই সাংবিধানিক ‘রিমিক্স’করণের প্রবল বিরোধিতা করা উচিত ছিল, তারা সময়ে বা সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে প্রবলভাবে। এই ব্যর্থদের তালিকায় বুদ্ধিজীবীরা আছেন, আছেন সচেতন নাগরিক ও বৃহৎ অর্থে জনসমাজও। ফলে এই রাষ্ট্রের স্বর্ণালী ভিত্তিটিতে খাদ মেশে কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ অবশ্যই ‘খেলার সঙ্গে রাজনীতি মেশানো’। অর্থাৎ, কোনো ক্ষেত্রেই আমরা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার ক্ষেত্রে নিজেদের সংবরণ করতে পারিনি। এবং এই এক না পারাই আমাদের সামগ্রিক অর্জনকে নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

যদি প্রশ্ন করা হয়, জন্ম নেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের জনগণের সামগ্রিক ব্যর্থতা কী, তবে অবশ্যই প্রথমে আসবে আমরা কেউ নিজেদের একটি সমগ্রের অংশ মনে করতে পারিনি। যৌথতার কোনো ন্যূনতম ধারণাই আমরা মর্মে ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের ‘যৌথতা’র সাফল্য শুধুই ক্রিকেট–ফুটবলে ম্যাচ জেতাকেন্দ্রিক অনেকটা। ফলে কোনো জাতীয় স্বার্থে এক হওয়ার বিষয়টি আমরা প্রায় বিস্মৃত হয়েছি। এতে আমাদের জাতীয় অর্জনও শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত স্তুতিতে গিয়ে শেষ হয়, আমরা কখনোই যৌথভাবে কৃতিত্ব ভাগাভাগি করতে অভ্যস্ত নই। এই বৈশিষ্ট্যের সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হলো ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান। এতে আওয়ামী লীগের সরকারের পতন হওয়ার কিছুদিন পরই শুরু হয়ে যায় আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে একে–ওকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিযোগিতা। এক পক্ষ বলতে থাকে যে, তাদের ছাড়া আন্দোলন হতোই না। আরেক পক্ষ বলতে থাকে, ‘ধুর, ওরা কী করেছে!’ অথচ, চাইলেই সংশ্লিষ্ট সবাই মিলে যূথবদ্ধভাবে এই আন্দোলনের কৃতিত্ব ভাগাভাগি করে নেওয়া যেত। ঠিক একই কাজটি ঘটেছিল গত শতকের নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও। ফলে যে পরিবর্তন আনতে সেই গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল, তাও অধরা থেকে যায়।

আর এভাবেই আমাদের গোড়া পচে যাওয়ার শুরু। এই ‘শুরু’র আশঙ্কা স্বাধীনতার পর থেকেই যে কিছুটা অনুচ্চারে হলেও ছিল, সেটি আহমদ ছফার বাহাত্তরে লেখা রচনা থেকে স্পষ্ট। সেটিই পরে বাস্তবতা বলে বিবেচিত হলো। গোড়ার পচন ধীরে ধীরে বৃক্ষের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। এ দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ—সবকিছুতেই এখন এই পচনের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনীতির বৈশিষ্ট্য প্রকট হওয়ার আগেই শুরু হয়ে যায় অযথা বিরাজনীতিকরণের সংস্কৃতি। এই বিরাজনীতিকরণের ট্রেন্ড চালু করার পেছনে মূল প্রভাবক অবশ্যই তেইশ–চব্বিশ বছরের পাকিস্তানি আমল। আমাদের বাংলা চিরকালই কারও না কারও শাসনে থেকেছে। তাই হয়তো স্বাধীন হওয়ার পরও নিজেদেরই বাপ–মা–ভাই–বোন বা বন্ধু–স্বজনদের পরাধীন বা দাস করে রাখার সূচনা। একই মনোভাবের কারণেই হয়তো জাতীয় যৌথতা এ অঞ্চলে সৃষ্টি হলো না আদর্শ রূপে।

প্রতীকী ছবি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

স্বাধীনতার পর প্রথম দশকেই এ দেশে গণতন্ত্রের উল্টো যাত্রার শুরু। চালু হয়ে যায় একদলীয় শাসন ব্যবস্থা। এরপর শুরু হয় রাবার স্ট্যাম্প মার্কা গণভোট নেওয়া এবং সামরিক মোড়কে সরকার গঠন প্রক্রিয়া। একপর্যায়ে সেই এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থাটিই দীর্ঘ সময় এ দেশের মানুষকে সহ্য করতে হলো। সেই ‘এক’ থেকে আবার বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর খাপে খাপ মেলাতে কিছু রাজনৈতিক দলও সৃষ্টি হলো। অর্থাৎ, পুরো বিষয়টিই হয়েছে শুধু ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে থাকার উদগ্র বাসনা থেকে, কোনো দেশপ্রেম নয়। বিষয়টি এমন নয় যে, সৃষ্টি যে প্রক্রিয়ায় হয়েছে, আজীবন সেভাবেই থাকবে। কিন্তু দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যদি কোনো ক্ষমতা কাঠামোয় শুধুই টিকে থাকার বাসনা থেকে সৃষ্টি হতে থাকে, তবে সেই ‘গন্ধ’ যেতে সময় লাগে। কারণ প্রাথমিকভাবে কাজটির শুরু হয়েছিল ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতেই, জনসেবার জন্য নয়। অথচ এ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বেশ কয়েকটি সেই প্রক্রিয়া থেকে জাত। সেই সাথে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলটিও যখন নানা কারণে আপস করতে থাকে, শুধুই ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য বাদবাকি সবাইকে প্রান্তে ঠেলে দিতে থাকে অন্যায় উপায়ে, তখন একপর্যায়ে সাধারণ মানুষও রাজনীতিবিরোধী হয়ে উঠতে থাকে। আমাদের দেশে ছাত্ররাজনীতির বিরোধিতা করা অংশটি এখনও বিশাল, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরও। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে সন্তানদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া অভিভাবককূলও ব্যাপক।

এর কারণ প্রথমত, রাজনীতির সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্ক থাকার কথা নয়, এমন জায়গা থেকেই রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি। এর কারণে রাজনীতি তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলছে। দ্বিতীয়ত, রাজনীতির মধ্যে নিদারুণ দুর্বৃত্তপরায়ণ মনোভাব ঢুকে যাওয়া। এ দেশে ছাত্ররাজনীতি যে সাধারণ নাগরিক সমাজের কাছে ধীরে ধীরে ‘অপরাধ’–এর পর্যায়ে অবনমিত হলো, তার মূল কারণ এই দুটিই। এবং এই দুটির জন্য এখন সমগ্র দেশীয় রাজনীতিই ধ্বংসের চূড়ান্ত সীমার দিকে চলে যাচ্ছে। এ দেশে এখন স্রেফ জনসেবা করার প্রাথমিক উদ্দেশ্য নিয়ে কেউ আর রাজনীতি করেন বলে মনে হয় না। বরং এটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে টাকা ছাপানোর মেশিন! চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর উঠতি রাজনীতিকদের ক্ষমতা ও অর্থবিত্তের ‘ফ্লেক্স’ দেখার পর সাধারণের মনে এই বিশ্বাস আরও দৃঢ়ই হওয়ার কথা। এ দেশে তাই রাজনীতি মানেই সীমাহীন ক্ষমতা এবং অগণিত অর্থের খনি বর্গা নেওয়ার সুযোগ কেবল।

কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

আদর্শবাদী রাজনীতির কবর রচনা করার কারণে এই বিরাজনীতির দায় তাই অবশ্যই রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরই যায়। আদর্শিক অবস্থানে টিকে থাকার লিটমাস টেস্টে পাস করতে পারেনি কোনো দলই। ডানপন্থী দলগুলো ধীরে ধীরে এ দেশে শক্তিশালী হয়েছে। সেটা অবশ্যই এখানকার সাংস্কৃতিক ও সঠিক বুদ্ধিজীবীতার শূন্যস্থানেই রাজত্ব বিস্তার করেছে। শুধু মৌলবাদী মতাদর্শ বিলিয়েই ক্ষান্ত হয়নি তারা, সেই সঙ্গে ক্ষমতার স্টেকহোল্ডার হয়েছে এবং ক্ষমতায় আরোহণের সিঁড়ি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে নেওয়ার কারণে ডানপন্থী রাজনীতিকে সমূলে বিনাশ করা এখানে আর সম্ভব নয়। ঠিক এ জায়গাতেই রেসে পিছিয়ে পড়েছে বামপন্থী শক্তি। একবার এক ঘরোয়া আড্ডায় এক বামপন্থী অ্যাকটিভিস্ট বলছিলেন, ‘বামপন্থী আন্দোলনকে এখন আর এ দেশে কেউ পাত্তাই দেয় না।’ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য বামপন্থী দলগুলোর অর্থনৈতিক দুর্বলতা যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী তাদের জনমানসের বৃত্তের বাইরের রাজনৈতিক পন্থা। মার্কস–এঙ্গেলস যতটা না তারা গুলে খেয়েছেন, সেভাবে বিশ্লেষণ করেননি বামপন্থার এদেশীয় মৌলিক উপাদানগুলো। ফলে সম্পৃক্ততা গাঢ় হয়নি কখনোই। এভাবে একেবারে সুর–ছন্দবিহীন এক হেঁড়ে গলার গান হয়ে গেছে বামপন্থী দলগুলোর স্লোগানসমূহ। কেউ কেউ মিটিং–মিছিল বা বিবৃতি দিয়েই কাজ সারছে, কেউ আবার সাম্প্রদায়িক শক্তির কর্মপন্থা অনুসরণ করে অসাম্প্রদায়িক বিপ্লব সাধনের ‘গালগল্প’ শোনাচ্ছে! 

আর যেসব মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দল বরাবরই নিজেদের প্রগতিশীলতার ধারক–বাহক বলে পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে, তারা আবার দুই নৌকাতেই পা রাখে। আগেই বলেছি, স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি বলে বড়াই করা রাজনৈতিক পক্ষও এ দেশে রাজনৈতিক মূলনীতির সঙ্গে আপসকামী। তারা মৌলবাদী শিবিরের সঙ্গেও আঁতাত করে কখনো কখনো। সেটিও ক্ষমতায় যাওয়ার প্রশ্নেই কেবল। ফলে ন্যূনতম নৈতিকতার বাঁধন এখানে টুটে গেছে, নিচে নামাটা এখানে হচ্ছে দড়ি ছেঁড়া লিফটের ‘ফ্রি ফলে’র আদলে। এবং এটা শুধু রাজনীতিতে নয়, বরং হচ্ছে জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে। তাই সরকারি কর্মকর্তারা সাধারণ নাগরিকদের সামনে ক্ষমতার চর্চা করতে তৎপর থাকেন (সেজন্য খেলার ট্রফিও ভাঙেন বা স্যার/ম্যাডাম না ডাকলে রাগ করেন), বলপ্রয়োগকারী সংস্থা প্রযোজ্য ক্ষেত্রের বাইরেও বল প্রয়োগের অভ্যাস ছাড়তে পারে না, ঘুষ না দিয়ে সরকারি দফতর থেকে কাজ করিয়ে নেওয়ার বিষয়টি আমাদের ভাবনারহিত হয়ে যায় ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং এমন পরিস্থিতি হয় সব শাসনেই। তা একদলীয় শাসন, স্বৈরশাসন বা উপদেষ্টাদের শাসন—যাই হোক না কেন।

সুতরাং, বোঝাই যাচ্ছে যে, জন্মের পর থেকেই বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আসলে এক দুষ্টচক্রের মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছে কেবল। এই ঘুরপাকের শেষের কোনো শুরু আর দেখা যাচ্ছে না আদতে। ফলে এই লেখার শিরোনামে করা প্রশ্নের উত্তর জনসাধারণে খুঁজলে হয়তো একটি উত্তরই মিলবে। সেটি হলো—বিপথে!

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত