ট্রাম্প আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট

ট্রাম্প আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

কবি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “ক্ষমতা যতই অবাধ হয় ক্ষমতা ততই মানুষকে নীচের দিকে নিয়ে যায়। এই জন্য ক্ষমতাকে যথোচিত পরিমানে বাধা দেবার শক্তি যার মধ্যে নেই তার দুর্বলতা সমস্ত মানুষের শত্রু।”

১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর আমেরিকা বিশ্বে প্রথমবারের আণবিক বোমা নিক্ষেপ করে কয়েক লাখ মানুষকে হত্যা করে। জাপান সম্ভবত ১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বরে মার্কিন জেনারেল ম্যাক আর্থারের কাছে আত্মসর্ম্পন করে। তখন পশ্চিমা বিশ্বে এই ধারনা দৃঢ়মূল হয়ে গেল আমেরিকা ধনসম্পদে তো বটে, এমনকি বিশ্বের একনম্বর সামরিক শক্তি। কিন্তু বাধা সাধল সোভিয়েত ইউনিয়ন। অল্প দিনে আনবিক শক্তির অধিকারী হলো তারা। অবশ্য সোভিয়েত ইউনিয়নের এই অর্জনের বলী হতে হয় আমেরিকার রোজেনবার্গ দম্পতিকে। ধনতান্ত্রিক আমেরিকা উদ্বিগ্ন হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট সরকারের উত্থানে। তাই মনে করা হয় যে, রোজেনবার্গের প্রাণদন্ড প্রদানে বিচারক বিচারের বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব প্রদানের চেয়ে মার্কিনিদের কমিউনিস্ট ভীতিকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবশ্য সোভিয়েত ইউনিয়নের কোন তুলনা হয় না আমেরিকার সঙ্গে। তবে সামরিক শক্তির অগ্রগতি উপেক্ষা করার নয়। যে কারণে আমেরিকার অবস্থান অপ্রতিহত ছিল না। তবে সোভিয়েত ব্লকের পতনের পর আমেরিকা বিশ্বের এখন একনম্বর সামরিক শক্তি। এর প্রথম প্রমাণ হল ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন এর উচ্ছেদ এবং ফাঁসী। অথচ খোমিনির শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দামকে উৎসাহিত করে ইরান আক্রমন করতে। দশ বৎসর এই যুদ্ধ চলেছিল।

ইরানে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে গত কয়েকদিন আগে ট্রাম্প নেতানিয়াহু সে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনিকে নিজগৃহে হত্যা করে এবং বিজয় ডংকা বাজিয়ে উল্লাস করে। অনেকে ট্রাম্প–নেতানিয়াহুর গোয়েন্দা বাহিনী মেধার প্রশংসা করেন। তবে অনেকে অবগত নন যে, এই গোয়েন্দা বীজ বহু আগে বপন করা হয়েছিল ইরানে। ইরানের শাহ সিআইএ এবং ইসরাইলের গোয়েন্দাদের যৌথ সহযোগিতায় সাবাক নামে নিজের দেশে একটি ভয়ংকর গোয়েন্দা বহিনী গড়ে তুলেছিলেন। প্রচলিত বিশ্বাস ৫০–৬০ হাজার মানুষকে হত্যা এবং গুম করেছিল শাহের এই বাহিনী। অবশ্য শাহের পতনের পর নিষ্ঠুরতার সাথে খোমিনি সরকার তাদের নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু একেবারে উৎপাটিত হয়েছে এ রকম মনে করার কারণ নেই। শাহের ছেলে ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন, ফিরে এসে ইরানের জনগণের সেবা করার। তিনি কি অবহিত আছেন যে তার পিতৃদের রাজ্য হারানোর পর পরম বন্ধু আমেরিকার কাছে তার স্থায়ী ঠাই হয়নি।

আমেরিকা এখন বিশ্বের এক নম্বর সামরিক শক্তি হিসেবে পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত। আর এই প্রথম স্থানটি দ্বিতীয়–তৃতীয় স্থানের চেয়ে অনেক উর্ধ্বে এই ক্ষমতার পূর্ণ সদ্যব্যবহার করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কদিন আগে কথিত স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ভেনিজুয়েরায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে সেখানকার তাদের ঘর থেকে হাতকড়া পরিয়ে নিউইয়র্কে আনা হলো বিচার করার জন্য। অভিযোগ মাদক ব্যবসা, যা কিনা মার্কিন সোনার ছেলেদের উচ্ছন্নে নিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন টাইম এবং নিউজ উইক সাপ্তাহিকী ব্যাপকভাবে এই উপমহাদেশে চলত। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার্থীদের জন্য প্রায় বাধ্যতামূলক ছিল এই সাপ্তাহিকী দুটি। আমরা গত শতাব্দীর ষাটের দশকে এই সাপ্তাহিকীতে পড়েছি মার্কিন সোনার ছেলেদের এলএসডি এবং অন্যান্য মাদকে আকৃষ্ট হওয়ার কাহিনী। এতদিন পর সেই অপরাধের দায় এল ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টের ঘাড়ে। আসলে প্রয়োজন ছিল ভেনিজুয়েরার অপরিসীম জ্বালানী তেল হস্তগত করা। সেটিতে এসেছে শতভাগ সাফল্য। ট্রাম্পের এই অবদানের কথা কি করে ভুলবেন মার্কিন নাগরিকেরা।

মার্কিন ইতিহাস এই সাক্ষ্য দেয় যে, সে দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা রাষ্ট্রের সম্পদ বৃদ্ধি এবং আহরনে সদাসচেতন। Trail of Tears এর কথা বলতে হয়। আমেরিকার পূর্বাঞ্চলে স্বর্ণ আবিস্কার হওয়ার পর শ্বেতাঙ্গ মার্কিনিরা সেনাবাহিনীর সহায়তা নিয়ে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে। তাদেরকে ৮০০ মাইল দূরে পুর্ণবাসনের জন্য জোর করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পথিমধ্যে চার হাজার আদিবাসী প্রাণ হারায়।

আমেরিকা একক সামরিক শক্তি হিসেবে পুনঃঅধিষ্ঠিত হওয়ার পর সে দেশের প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ (জুনিয়র) ২০০৩ সালের ২০ মার্চ ইরাক আক্রমন করলেন এই অজুহাতে যে, সাদ্দামের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে। তার সাথে ছিলেন ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। মোড়লের একজন সাথী লাগে। ইরাক পরাজিত হলো। কিন্তু কোন গণবিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায়নি। তবে ৪৪০০ জন মার্কিন সৈন্য প্রাণ হারিয়েছে। ইরাকের ক্ষয়ক্ষতির উল্লেখের প্রয়োজন নেই। সাদ্দামকে উৎখাত করা হয়েছিল এই অভিযোগ যে তার নিকট গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও

আর ইরানের সরকার পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য হল যে ইরান নিউক্লিয়ার পাওয়ারের অধিকারী হবে যেটা ইসরাইলের জন্য বিপজ্জনক। এ কথা দীর্ঘ দিন ধরে বলে আসছে আমেরিকা ও ইসরাইল। যদিও ইরান অব্যাহতভাবে অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তবে অতি সম্প্রতি ট্রাম্প বলছেন যে, যখন তিনি বুঝবেন যে ইরান আর এই ক্ষমতা অর্জন করতে পারবে না, তখন তিনি যুদ্ধ থামিয়ে দেবেন। ইরানে একটি বিদ্যালয়ে হামলা করে ১৮২ বালিকাকে হত্যা করা হয়। তার প্রতিবাদ তেমন কোথাও লক্ষ্য করা যায়নি। বিশ্ব বিবেক এ ব্যাপারে সম্পুর্ন নিরব। অর্থাৎ এটি একটি কৌশল যুদ্ধ বন্ধ করার। তার আগে ইরানের আর্থিক এবং জনবলের ক্ষতি করা যায়, ততটা করতে হবে ইসরাইলকে নিরাপদ করার জন্য। এরপর ট্রাম্পের টার্গেট কিউবা। অভিযোগ হল যে ভেনিজুয়েলার অপকর্মের সঙ্গী কিউবা। কিউবার যে দুজন আন্তরিক বন্ধু, তাদের ভৌগলিক অবস্থান এমন যে সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি না নিয়ে সহায়তা করা কঠিন। ট্রাম্প এসব বিষয় খুব ভালোভাবে বোঝেন।

এ প্রসঙ্গে একটি কথা বোধ হয় বলা যায়– তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা আর নেই। দুটি যুদ্ধই শুরু হয়েছিল ইউরোপে। পরে ছড়িয়ে পড়ে। রাশিয়া ছাড়া দুটো যুদ্ধের কুশিলবরা এক হয়ে গেছে। তারা আমেরিকাকে গুরু মেনেছে। ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড নিতে চেয়েছিলেন, আপাতত সে ইচ্ছা ত্যাগ করেছেন। ইইউ–র চাপে এ কাজ করেছে বলে মনে হয় না। বিষয়টা অনেকটা মান অভিমানের। কদিন আগে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী একটু শক্ত কথা বলেছিলেন। ট্রাম্প অভিমান প্রকাশ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে বিলাতের প্রধানমন্ত্রী সুর নরম করে ফেললেন।

এ বৎসর নভেম্বরে আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন, কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন যে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদে বিরোধীদের সংখ্যা বাড়বে। তেমনটি হবার নয়। মার্কিন ভোটাররা শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট দেখতে চান। গোটা বিশ্বে ৮–১০টি দেশ ছাড়া আর যেকোনো দেশের প্রধানকে হ্যান্ডক্যাপ পরিয়ে যে নিউইয়র্কে আনার ক্ষমতা রাখেন ট্রাম্প। অতএব তাকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। ট্রাম্পের সহযোগিরাও দৃঢ়চিত্তের। আমেরিকার যুদ্ধ মন্ত্রীর একটা কথাই যথেষ্ট ছিল– তারা যুদ্ধে জয়ী হবেন। কিন্তু দেখা গেল তিনি বিভিন্ন শারীরিক অঙ্গভঙ্গীর মাধ্যমে এবং রূঢ় ভাষায় জানিয়ে দিলেন যে কীভাবে তারা শত্রু নিধন করবেন।

পরিশেষে আমার ইউক্রেনের কথা মনে পড়ল। দেশটির প্রেসিডেন্টের কি কোনো কাজ নেই, সর্বক্ষণ ইইউ দেশগুলোর রাজধানীতে কিংবা হোয়াইট হাউজে ঘোরাফেরা করছেন, তার যে কি দাওয়াই লাগবে, না তিনি বুঝতেছেন, না তার সুহৃদরা।

লেখক: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও কলাম লেখক

সম্পর্কিত