সপ্তাহদুয়েক আগের ঘটনা। এক সহকর্মী হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন যেকোনো একটা হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের একটা আইসিইউ বেড। কারণ তার এক প্রবাসী বন্ধুর কয়েক বছরের সন্তানটি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। অবস্থা সুবিধার না। বাঁচাতে হলে প্রয়োজন ইনটেনসিভ কেয়ার সুবিধা। আর সেই জন্যই চলছিল অনুসন্ধান।
কিন্তু প্রয়োজন হলেই তো হলো না। আমাদের দেশে এখন শিশুদের হাম বা ডেঙ্গু থেকে বাঁচাতে এক মরণপণ লড়াই চালাতে হয়। তাই শিশুর আইসিইউ বেড খুঁজে পেতে রাত-দিন এক করে ফেলতে হলো। শেষে একটা উপায় মিলল বটে। আর তা দিয়েই শুরু হলো ওই শিশুটিকে বাঁচানোর লড়াই।
তবে সেই লড়াইয়ে জেতা হলো না। ছোট্ট শিশুটি দিনদুয়েকের মধ্যেই চলে গেল। একেবারেই গেল সবাইকে কাঁদিয়ে। প্রবাসী বাবা বিদেশের মাটিতে কীভাবে সেই শোক সহ্য করলেন, ওই প্রশ্ন ইচ্ছে করেই তুলল না কেউ। কারণ, ওই প্রশ্নটি যে উত্তরহীন, তা যে সবারই জানা।
এটা একটিমাত্র ঘটনা। চলতি বছরে এমন আরও শ দুয়েক ঘটনা আছে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক মিলিয়ে। কারণ, আমাদের দেশে চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ২০০ পার হয়েছে। নিখুঁতভাবে বলতে চাইলে, মোট প্রাণহানি গত শনিবার পর্যন্ত ২১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনসহ শুধু ঢাকা বিভাগেই ডেঙ্গুতে ১০৫ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া খুলনা বিভাগে ৩৭ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ২০, বরিশাল বিভাগে ১৬, চট্টগ্রাম বিভাগে ২১ জন, রাজশাহী বিভাগে ১০ জন, রংপুরে ৪ জন ও সিলেট বিভাগে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও জানাচ্ছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে ৭১ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। চিকিৎসাসেবা শেষে তাদের মধ্যে ৬৬ হাজারের বেশি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। আর কত মানুষ একেবারেই ফিরতে পারেনি, সেই সংখ্যা তো আগেই জানা হলো।
এই যে একেবারেই না ফেরা, জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো–এরা মরে গেছেন একটা মশার কামড়ে। সেই মশা নিয়ন্ত্রণ এবং মশার কামড়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর সঠিক চিকিৎসায় বেঁচে ফিরে আসার দাবি তাদের ছিল। কিন্তু এ দেশে তা মেলেনি। আর তাই দুই শরও বেশি মৃত্যুর কষ্ট চলতি বছরে সংশ্লিষ্ট মানুষদেরকে নিতে হয়েছে।
অথচ, ডেঙ্গু এমন কোনো অভাবিত সংকট নয়, যা এই দেশে হুট করে হাজির হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরেই এমন সংকটময় বাস্তবতা বিদ্যমান। কিন্তু কোনো সরকারই কেন জানি ডেঙ্গুকে নিয়ন্ত্রণে নিতে পারছে না। এ-বিষয়ক নানা শঙ্কাজনক খবর সংবাদমাধ্যমেই আসছে লাগাতার। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহেই সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, দেশের ৬৪ জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়েছে। খোদ সরকারই জানিয়ে দিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হবে। অন্তত ১৫ জেলায় সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। আর জনস্বাস্থ্যবিদ ও কীটতত্ত্ববিদদের একটি অংশ দেড়–দুই মাস আগে থেকে বলে আসছিলেন যে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার ঝুঁকি আছে।
পরিস্থিতি কতটা খারাপ, তা কিছুটা বোঝা যায় বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও আইএফআরসির প্রতিবেদনেও। বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে করা চলতি মাসের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। ডেঙ্গুর গুরুতর রোগী ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ায় হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা, রক্ত সঞ্চালন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর চাহিদা বেড়ে গেছে। বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ডেঙ্গু শনাক্তের দ্রুত পরীক্ষার কিট, স্যালাইন, রোগীর শয্যার পাশে ব্যবহারের আল্ট্রাসাউন্ড যন্ত্র, হেমাটোক্রিট পরীক্ষার সক্ষমতা, রক্তের ব্যাগ এবং অ্যাফেরেসিস কিটের সংকট দেখা দিয়েছে। একই চিত্র উঠে এসেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনেও। রয়টার্স বলছে, বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোয় হাসপাতালগুলোতে চাপ বাড়ছে এবং শয্যার সংকট দেখা দিচ্ছে।
ডেঙ্গুর এই প্রাদুর্ভাব আক্রান্ত মানুষের জীবনে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি নানা ধরনের আর্থিক চাপও তৈরি করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট ও আইএফআরসির প্রতিবেদনে। বলা হচ্ছে, হাসপাতালে ভর্তি, যাতায়াত, রোগীর দেখাশোনা এবং অসুস্থতার কারণে কাজ করতে না পারায় পরিবারের ওপর বাড়তি খরচ ও আয় হারানোর চাপ পড়ছে। অর্থাৎ, ডেঙ্গু সাধারণ মানুষের জীবন যেমন কেড়ে নিচ্ছে, তেমনি করে দিচ্ছে নিঃস্ব।
তো এই পরিস্থিতিতে প্রতিরোধের অবস্থা কেমন? ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বললে বলতে হয় যে, সরকারি তরফে খুব বেশি প্রতিরোধমূলক চিত্র আসলে চোখে পড়ে না। হ্যাঁ, সম্প্রতি ঘটা করে পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতা অভিযান সরকারি তরফে শুরু হয়েছে বটে। কিন্তু এমন উদ্যোগ তখনই নেওয়া হলো, যখন অবস্থা সঙিন হয়ে উঠল। যদিও প্রতিরোধ ও সতর্কতামূলক কর্মকাণ্ড আসলে সংকট ঘনীভূত হওয়ার আগেই সম্পাদন করতে হয়। ‘শিরে সংক্রান্তি’ পরিস্থিতিতে এসব করে খুব বেশি সুফল কখনো মেলে না।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা মনে করেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি এমন উদ্বেগজনক হওয়ার কথা ছিল না। কারণ, ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা যায়। ঢাকার মতো প্রায় একই ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশের জনপদ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা। সেখানে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আছে।
কেন তাহলে ডেঙ্গু এতটা প্রাণসংহারী হয়ে উঠল আমাদের দেশে? জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, মশা নিয়ন্ত্রণের কাজটি ব্যাপক আকারে ও গুরুত্ব দিয়ে করতে হবে। কিন্তু এ দেশে মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য যে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা দেখা যায়, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। সেই সাথে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে টানা কয়েকবছর কাজ করে যেতে হবে। অথচ সেটিই বাংলাদেশে দেখা গেল না।
কিন্তু, বছরসাতেক হলো বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রবল বিস্তার হয়েছে। এখন চলছে ২০২৬ সাল। কিন্তু এত বছরেও আমাদের সাবধান হওয়া আর হলো না। বরং প্রতি বছর পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকেই যাচ্ছে। আক্রান্ত বাড়ছে, মৃত্যু বাড়ছে। আর বাড়ছে আহাজারি।
দেশের আমজনতা তাই ডেঙ্গু নিয়ে একধরনের ভয়ের মধ্যে ঢুকে গেছে। সেটা হলো–এই মশা কামড়াল কিনা, ডেঙ্গু হয়ে গেল কিনা! কারণ, বিত্তের নিচের দিকে থাকা বাংলাদেশের মানুষেরা জানে যে, ডেঙ্গু হয়ে গেলে হয় প্রাণ নিয়ে যাবে, নইলে নিঃস্ব করে দেবে। এবং সেসব ঘটে গেলে বাঁচার কোনো উপায় অন্তত সরকারি তরফে মিলবে না, কেবলই আহা-উহু ছাড়া।
প্রবাদপ্রতীম শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানের লাইন তাই আমাদের মস্তিষ্কে ভীতিজাগানিয়া কোরাসে রূপ নিচ্ছে দিনে দিনে। হেমন্ত গেয়েছিলেন, ‘কে জানে ক’ঘন্টা পাবি রে জীবনটা..’। লিরিকস একটু বদলে তাই যেন আমাদের ক্ষণে ক্ষণে মনে করিয়ে দিচ্ছে–কে জানে ক’ঘন্টা আছে এই জীবনটা!
বর্তমানের এমন অসহায় পরিস্থিতিতে, ডেঙ্গুর ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে এ ধরনের গানে লিপসিং করা ছাড়া, আমাদের আর করারই বা কী আছে?
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা