ads

উমর খালিদের পিএইচডি: রাষ্ট্রের মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

উমর খালিদ
উমর খালিদ
উমর খালিদের পিএইচডি: রাষ্ট্রের মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ
আদালতে উমার খালিদ। ছবি: সংগৃহীত

এই থিসিসটি শুধু একটি ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য লেখা হয়নি। বরং মিথ্যা, প্রচারণা এবং আমাদের কণ্ঠ স্তব্ধ করার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহারের বিরুদ্ধে এটি একটি প্রতিরোধ হিসেবে রচিত হয়েছে। পিএইচডি থিসিস লেখার সময় প্রতিবার যখন আমি নিজে সংশয়ে ভুগেছি, তখন নিজেকে মনে করিয়ে দিয়েছি যে আমার তত্ত্বাবধায়ক এবং বহিরাগত পরীক্ষক ছাড়া এটি অন্য কেউ হয়তো কখনোই পড়বে না। তাই চূড়ান্ত সময়সীমার আগেই এটি জমা দেওয়াটা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। থিসিস জমা দেওয়ার আট বছর পর, যার মধ্যে ছয় বছর আমি কারাগারে কাটিয়েছি, বই হিসেবে এর প্রকাশনা আমাকে আনন্দের চেয়ে বেশি শঙ্কিত করছে। কারণ আমি যা লিখেছিলাম তা নিয়ে নিজের ভেতরেই অসন্তুষ্টি ছিল।

তবে পাঠকদের মনে রাখা উচিত যে এই থিসিস এক কঠিন সময়ে লেখা হয়েছিল। এক দশক আগে, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, আমাদের তিনজনকে– অনির্বাণ, কানহাইয়া ও আমাকে– তথাকথিত জেএনইউ (জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়) দেশদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় এবং রাতারাতি ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দেওয়া হয়।

Advertisement

কোনো আদালতে নয়, বরং আবেগপ্রবণ টিভি সংবাদের উত্তপ্ত বিতর্কে এই রায় দেওয়া হয়েছিল। এক দশক পেরিয়ে গেলেও সে মামলার বিচারকাজ এখনো শুরুই হয়নি। সেই শীতের দিনে উত্তেজিত সংবাদ পরিবেশকেরা বিচারক, জুরি ও জল্লাদের ভূমিকা নিয়ে দর্শক-শ্রোতাদের কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দিতেন— ‘জেএনইউ-এর মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ করদাতাদের কষ্টার্জিত অর্থ কেন খরচ করা হবে, যেখানে আমাদের মতো ‘দেশদ্রোহীরা’ সমবেত হয়?’

(২০১৩ সালে পার্লামেন্ট হামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আফজাল গুরুর মৃত্যুদণ্ড বার্ষিকী উপলক্ষে জেএনইউ ক্যাম্পাসে কিছু শিক্ষার্থী একটি সভার আয়োজন করেন। অভিযোগ ওঠে, উক্ত অনুষ্ঠানে ভারতবিরোধী এবং বিতর্কিত স্লোগান দেওয়া হয়েছিল। একটি সংবাদ চ্যানেলে প্রচারিত ভিডিও ক্লিপের ভিত্তিতে বিষয়টি দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি করে। পরে অবশ্য অভিযোগ ওঠে যে ভিডিওটির কিছু অংশ সম্পাদিত ছিল।ঘটনার পরপরই দিল্লি পুলিশ ঔপনিবেশিক আমলের ‘রাষ্ট্রদ্রোহ আইন’ (ধারা ১২৪এ) এবং অন্যান্য ধারায় মামলা দায়ের করে। তৎকালীন জেএনইউ ছাত্রসংসদের সভাপতি কানহাইয়া কুমার, উমর খালিদ এবং অনির্বাণ ভট্টাচার্যকে গ্রেফতার করা হয়।)

জেএনইউতে শ্রেণীকক্ষের পাশাপাশি ধাবা, প্রতিবাদ সমাবেশ ও রাতের জনসভাগুলো থেকেও সমপরিমাণ শিক্ষা পাওয়া যেত। ২০১৫ সালের ‘অকুপাই ইউজিসি’ আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থী বৃত্তির দাবিতে আমরা যেমন ব্যারিকেডে পুরো রাত কাটাতে পারতাম, তেমনি লাইব্রেরিতেও দীর্ঘ সময় ধরে সমান নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াশোনা করতাম। আমাদের গ্রেপ্তারের কয়েকদিন পর, আর কে পুরম পুলিশ স্টেশনের লকআপে যৌথ জিজ্ঞাসাবাদের শেষে আমাদের তিনজনের কাকতালীয়ভাবে দেখা হয়।

সেই সাক্ষাতে আমরা একে অপরকে কথা দিয়েছিলাম যে, সামনে যত কঠিন পরিস্থিতিই আসুক না কেন, আমরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই আমাদের পিএইচডি থিসিস জমা দেব। আমরা জানতাম যে আমাদের কোনো অ্যাকাডেমিক ব্যর্থতা হলে তা বিশেষ করে জেএনইউ এবং সামগ্রিকভাবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে চলমান নেতিবাচক প্রচারণাকে আরও জোরদার করতে ব্যবহার করা হবে। তাই আমাদের পিছিয়ে আসার সুযোগ ছিল না। শুধু নিজেদের জন্য নয়, বরং যে ছাত্র আন্দোলনের অংশ আমরা ছিলাম এবং যে জেএনইউ আমাদের গড়ে তুলেছিল, তার স্বার্থেই আমাদের লড়ে যেতে হত।

তবে সেদিন রাতে আমি বুঝতে পারিনি যে পরবর্তী দিনগুলোতে গবেষণা চালানো কতটা কঠিন হয়ে উঠবে। প্রথমদিকে আমি চাইবাসা, রাঁচি, পাটনা ও কলকাতার আর্কাইভ ও রেকর্ড রুমে কিছুটা কাজ করেছিলাম। তবে বেশির ভাগ ফিল্ডওয়ার্ক পরবর্তী সময়ের জন্য পরিকল্পনা করা ছিল। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির পর সংবাদমাধ্যমের সেই তীব্র বিতর্কের কারণে ফিল্ডওয়ার্কের জন্য সহজে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ আমার আর ছিল না। পরবর্তীতে যখন আমি লেখার প্রুফ সংশোধন করছিলাম, তখন বুঝতে পারছিলাম যে উপাদানভিত্তিক তথ্যের ঘাটতির কারণে কিছু জায়গায় বর্ণনা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোনো যুক্তির অভাবে নয়, বরং সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করার মতো যথেষ্ট প্রাথমিক নথিপত্রের অভাবে।

তা সত্ত্বেও এই গবেষণার পেছনে একটি কনসেপ্টুয়াল ফ্রেমওয়ার্ক রয়েছে, যা পাঠকরা অনুধাবন করতে পারবেন বলে আশা করি। চলতি শতাব্দীর প্রথম দশকের শেষের দিকে আদিবাসীদের ইতিহাসের প্রতি আমার আগ্রহ জন্মায়, যখন তাদের জল-জঙ্গল-জমিন হাতছাড়া হওয়ার বিরুদ্ধে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে উঠছিল। একই সঙ্গে এই আন্দোলন আদিবাসী অঞ্চলগুলোতে উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও বিকেন্দ্রীকরণ সম্পর্কিত আলোচনাকে মূলধারায় নিয়ে এসেছিল।

সেই সময়ে লেখালেখি, চলচ্চিত্র কিংবা সামাজিক আন্দোলনের বিভিন্ন বর্ণনায় আদিবাসীদের প্রায়শই এক শান্ত ও আদর্শিক সম্প্রদায় হিসেবে উপস্থাপন করা হতো, যারা প্রকৃতি এবং একে অপরের সঙ্গে সম্প্রীতিতে বাস করে এবং যাদের স্বার্থ গ্রামসভার মাধ্যমে সবচেয়ে ভালো রক্ষিত হয়। তাদের দেখা হতো শিকারি পুঁজিবাদীদের বিরুদ্ধে নিজেদের যৌথ সম্পদের এক বীরত্বপূর্ণ রক্ষক হিসেবে।

তবে ঔপনিবেশিক অতীত কিংবা বর্তমানের আদিবাসী অঞ্চলগুলোর সংঘাতকে কেবল লোভী বহিরাগত এবং নির্দোষ স্থানীয় অধিবাসীদের লড়াই হিসেবে সরলীকরণ করা যায় না। আদিবাসীরা সব সময় রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেনি। বরং তাদের একটি অংশ নিজেদের সামাজিক অবস্থান উন্নত করতে রাষ্ট্রের সঙ্গে সাগ্রহে সহযোগিতা বা অংশীদারত্ব করেছে। এই কাজের মাধ্যমে আমি সেই সামাজিক সহযোগিতার ভিত্তিগুলো অন্বেষণ করার চেষ্টা করেছি। ঔপনিবেশিক এবং পরবর্তী সময়ের সরকারগুলোকে কোন ধরনের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার কারণে স্থানীয় কর্তৃত্বের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য করেছিল এবং এই সংযুক্তি কীভাবে পরবর্তীতে স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোকে পুনর্গঠিত করেছিল, তা-ই ছিল আমার পর্যালোচনার বিষয়।

আমি এই কাজের নানা সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন। শ্রমের ইতিহাস পরীক্ষা করা, নৃবিজ্ঞান সংক্রান্ত ফিল্ডওয়ার্ক করা এবং ঝাড়খণ্ড গঠনের আন্দোলনকে আরও ব্যাপকভাবে দেখার ইচ্ছা ছিল আমার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেসব উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা বাদ দিতে হয়। দিল্লি হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত আমি থিসিসটি জমা দিতে সক্ষম হই। এই থিসিসটি কেবল একটি ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য লেখা হয়নি, বরং এটি একটি প্রতিরোধ– মিথ্যা, প্রচারণা এবং আমাদের স্তব্ধ করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহারের বিরুদ্ধে। সর্বোপরি, একটি স্যাঁতসেঁতে পুলিশ লকআপে তিন ‘দেশদ্রোহী’ তরুণ নির্ধারিত সময়ে পিএইচডি শেষ করার যে প্রতিশ্রুতি একে অপরকে দিয়েছিল, সেই কথা রাখার জন্যই এটি রচিত হয়েছে।

লেখক: সমাজসেবী ও সাবেক ছাত্রনেতা, যাকে দেশদ্রোহী তকমা দিয়ে ২০১৬ সাল থেকে বিনাবিচারে কারাগারে আটকে রেখেছে নরেন্দ্র মোদি সরকার।

(এই লেখাটি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার সৌজন্যে প্রকাশিত)

সম্পর্কিত