ads

ভারতে আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠল যেভাবে

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ভারতে আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠল যেভাবে
পুলিশে নির্যাতনের পরেও আন্দোলনকারীরা পিছু হটতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ছবি: চরচা

কয়েক দিন ধরে ভারতের রাজধানীর কেন্দ্রস্থলের রাস্তা ও পার্কগুলো বিগত বহু বছরের মধ্যে দেখা সবচেয়ে বড় বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে। তরুণ আন্দোলনকারীরা এমন একটি জাতীয় পরীক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছেন, যা তাদের মতে লাখ লাখ প্রার্থীর ন্যায্য সুযোগ ছিনিয়ে নিয়ে তাদের সাথে প্রতারণা করছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে, মূলত জেন-জি প্রজন্মের এই আন্দোলনকারীরা ভারতের পার্লামেন্ট অভিমুখে তাদের দাবি নিয়ে পৌঁছানোর চেষ্টা করে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু বলছে, এই সমাবেশে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের যে অভূতপূর্ব উপস্থিতি দেখা গেছে, তা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বিরোধী আন্দোলনের জনসমুদ্রকেও ছাপিয়ে গেছে। তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যে তারা পুলিশের সহিংসতার মুখোমুখি হন। টিয়ার গ্যাসে ছত্রভঙ্গ করার পাশাপাশি তাদের ওপর বেপরোয়া লাঠিচার্জ করা হয়।

Advertisement

তবে আন্দোলনকারীরা পিছু হটতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যার ফলে নরেন্দ্র মোদির হিন্দু-জাতীয়তাবাদী সরকারের সাথে এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই সরকার বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থেকে যেকোনো ভিন্নমতকে নির্মমভাবে দমন করে আসছে।

আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী দলের দেওয়া তথ্যমতে, গত সোমবারের এই সহিংসতার পর প্রায় ১৫০ জন আহত আন্দোলনকারীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার পর সরকার ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করে দিলেও, পুলিশের এই নির্মম দমনের একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তা তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। অন্যদিকে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, আন্দোলনকারীদের এই সহিংস বিক্ষোভের সময় তাদের ১১৮ জন সদস্য আহত হয়েছেন।

পদযাত্রার আগেই দিল্লি পুলিশ নিষেধাজ্ঞা জারি করে সেটিকে বেআইনি বলে ঘোষণা করেছিল। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু জানিয়েছে, তরুণ অংশগ্রহণকারীরা এটাকে সরকারের ভয় ও হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া একটি অনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন।

তবুও গত মঙ্গলবার আন্দোলনকারীরা যন্তর মন্তরে ফিরে আসেন। ৩০০ বছরের পুরনো এই পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটি একটি বিশাল খোলা পার্ক দ্বারা বেষ্টিত, যার ভেতরে আন্দোলনকারীরা তাদের অস্থায়ী ক্যাম্পটি পুনরায় গড়ে তোলেন, যা এত দিন তাদের মূল কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। পুলিশ ঠিক এর আগের দিনই তাদের সেই ক্যাম্পটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। আন্দোলনকারীদের শরীরে তখনও পুলিশের নির্যাতনের তাজা ক্ষত স্পষ্ট। তবুও তারা দমে যায়নি।

গত সোমবারের সমাবেশে উপস্থিত থাকা এবং আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের প্রত্যক্ষদর্শী সুধীর কুমার মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, “আমরা এখানে বুক ফুলিয়ে, গর্বের সাথে দাঁড়িয়ে থাকব।”

ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। ছবি: রয়টার্স
ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। ছবি: রয়টার্স

একটি স্বনামধন্য মেডিকেল কলেজে ভর্তির পরীক্ষার জন্য টানা এক বছর প্রস্তুতি নেওয়ার পর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা জানতে পারা সুধীর আরও বলেন, “এখানকার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়ই হলো শিক্ষা।” তিনি যোগ করেন, “সারা বছর ধরে প্রস্তুতি নেওয়ার পর পরীক্ষার দিন যখন শুনবেন যে পুরো ব্যবস্থাটাই জালিয়াতিতে ভরা, তখন কেমন মানসিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়—তা আমরা হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছি।”

পার্শ্ববর্তী হরিয়ানা রাজ্য থেকে দিল্লিতে এসেছেন মোহাম্মদ তাজ জানান, পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রাটি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ ছিল। তিনি বলেন,“কিন্তু চোখের পলকে কী যে হয়ে গেল বুঝতে পারলাম না, পুলিশ আমাদের ওপর লাঠিচার্জ করতে শুরু করল। শিশু, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি—কাউকেই তারা রেহাই দেয়নি।”

সন্ধ্যার দিকে আন্দোলনকারীদের ভিড় মূল স্থান ছাড়িয়ে আশেপাশের রাস্তা ও গলিতে ছড়িয়ে পড়ে। এক সুরে সুর মিলিয়ে মুক্তি ও ‘আজাদি’-র স্লোগান দিয়ে তারা গর্জে ওঠেন, “মোদী যখনই ভয় পান, পুলিশকে সামনে নামিয়ে দেন।”

ক্ষোভের শুরু ও আইন অমান্যের আন্দোলন

গত সোমবার পার্লামেন্ট অভিমুখে চালানো এই পদযাত্রাটি আয়োজন করেছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। এটি তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত এমন একটি আন্দোলন, যা মূলত একটি কৌতুক হিসেবে শুরু হলেও পরবর্তীতে লাখ লাখ ভারতীয় তরুণ–তরুণীদের ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশের এক শক্তিশালী রাজনৈতিক মঞ্চে রূপ নেয়।

বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট অভিজিৎ দীপকে মে মাসে দলটির প্রতিষ্ঠা করেন। এর আগে ভারতের প্রধান বিচারপতি দেশের বেকার যুব সমাজকে ‘তেলাপোকার’ সঙ্গে তুলনা করেন। তার এই বক্তব্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেকারত্ব ও মুদ্রাস্ফীতিতে জর্জরিত তরুণদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এভাবেই প্রথমে প্রতিষ্ঠিত হয় সিজেপি।

কঠোর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং স্বনামধন্য মেডিকেল কলেজগুলোর ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বিক্রির অভিযোগকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোর মূল নেতৃত্বে ছিল সিজেপি। এই জালিয়াতির দরুণ লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষায় বসতে হয়েছিল।

ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘ দিন ধরেই প্রশ্নপত্র ফাঁস ও প্রযুক্তিগত বিভ্রাটসহ নানা বিতর্কে জর্জরিত। এটি শিক্ষার্থীদের ওপর মারাত্মক মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে সন্তানদের ভবিষ্যতের পেছনে সর্বস্ব ঢেলে দেওয়া পরিবারগুলোর ওপরও সৃষ্টি করছে তীব্র আর্থিক টানাপোড়েন। এই দুই চরম পরিস্থিতি সহ্য করতে না পেরে ভারতে প্রতি বছরই বহু শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।

সপ্তাহের শেষে ক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে, যখন আন্দোলনের সমর্থনে অনশনরত প্রখ্যাত শিক্ষা সংস্কারক ও পরিবেশবাদী সোনাম ওয়াংচুককে প্রতিবাদস্থল থেকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আন্দোলনকারীরা বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করলে, পুলিশ ওয়াংচুককে চাদর দিয়ে ঢেকে দৃশ্যপট আড়াল করে তুলে নিয়ে যায়।

দ্য হিন্দু জানিয়েছে, গত সোমবার ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি অংমো চিকিৎসাধীন অবস্থায় আটক থাকা অবস্থায় লেখা তার স্বামীর একটি হাতে লেখা নোট শেয়ার করেন। সেখানে উল্লেখ ছিল, সরকার যদি ‘এনইইটি-ইউজি’ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় স্বীকার করে অথবা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা যদি পার্লামেন্টে বিষয়টি উত্থাপন করার আশ্বাস দেন, তবে তিনি অনশন প্রত্যাহার করতে ইচ্ছুক।

আন্দোলন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো মুখ খুলেননি। ছবি: রয়টার্স
আন্দোলন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো মুখ খুলেননি। ছবি: রয়টার্স

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, যিনি সাধারণত সমালোচনার জবাব দিতে অভ্যস্ত নন, আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে এবারও প্রকাশ্যে সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে মঙ্গলবার পার্লামেন্ট বিষয়ক মন্ত্রীর মাধ্যমে তিনি একটি বার্তা পাঠিয়েছেন। মন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান যে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আর কোনো প্রশ্নপত্র ফাঁস না হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানও সোমবারের বিক্ষোভ নিয়ে এখনও প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। গত মাসে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির সঙ্গে আলাপে তিনি সিজেপিকে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বি-টিম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

ভারতের প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধীকে মঙ্গলবার মোদীর বাসভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট পালন ও তার পদত্যাগের দাবি জানানোর পর সাময়িকভাবে আটক করা হয়।

অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের মধ্যেও সংকল্প আরও জোরালো হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তারা জানিয়েছেন যে দাবি না মানা পর্যন্ত তাঁদের এই অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

কারো কারো কাছে শিক্ষামন্ত্রীর পরিবর্তন কিংবা পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এখন আর যথেষ্ট নয়। তারা এখন মোদির পদত্যাগও দাবি করছেন। তালওয়ার নামে এক আন্দোলনকারী বলেন, “আমি শুধু দাঁড়িয়েছিলাম। এ অবস্থাতেই সাদা পোশাকের পুলিশ আমাকে লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করে…যতদিন না মোদি ক্ষমতা ছাড়ছেন, ততদিন এই দেশের কোনো পরিবর্তন হবে না।”

সম্পর্কিত