আমেরিকা যার বন্ধু, তার কি আলাদা করে শত্রু লাগে?

অ্যালেক্স লো
অ্যালেক্স লো
আমেরিকা যার বন্ধু, তার কি আলাদা করে শত্রু লাগে?
প্রতীকী ছবি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ইরানে ইসরায়েল ও আমেরিকার ‘অবৈধ’ ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এই ‘আগ্রাসনে’ চীনকে টেনে এনেছেন কিছু পশ্চিমা সমর্থকগোষ্ঠী। পশ্চিমা বেশকিছু মিডিয়ায় প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে এসব বিশ্লেষক দাবি করছেন, ইরান যুদ্ধে এটাই প্রমাণিত হলো যে, বন্ধু হিসেবে চীন নির্ভরযোগ্য নয়। বলতে গেলে অকেজো। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ইরানের এই বিপদের সময় চীনকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

ইস্যুটি যত সামনের দিকে এগিয়েছে, চীনকে জড়িয়ে এই ‘প্রোপাগান্ডা’ ততই ঝাপসা হয়েছে। ইরান যুদ্ধে কেউই জড়াতে চায় না। এর মধ্যে আমেরিকার ন্যাটো মিত্ররাও রয়েছে, যারা নানা অজুহাত দিচ্ছে। তারা মার্কিন বাহিনীকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিতে চাইছে না। এ নিয়ে কত ‘অভিমান’। ট্রানজিট অপারেশনের জন্য আমেরিকাকে আকাশপথ ব্যবহারে বাধা দিচ্ছে। অনেকে আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতি দিলেও তাতে বিলম্ব হচ্ছে।

মনে রাখতে হবে, ইউরোপীয়রা কয়েক দশকের পারস্পরিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তাসহ একটি আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটের অংশ, যার নাম ন্যাটো। চীনের তেমন কোনো প্রতিশ্রুতি কারও সঙ্গেই নেই, উত্তর কোরিয়া হয়তো একমাত্র ব্যতিক্রম।

চীন তার অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্য করতে এবং তাদের ভৌত ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো তৈরিতে সহায়তা করতে পছন্দ করে। অন্যদিকে, আমেরিকা তার সামরিক খাত সমৃদ্ধ করতে মিত্র ও অংশীদারদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে। আর সেই বোমা আমেরিকা বা ইসরায়েলের শত্রুদের ওপর ফেলার সব আয়োজনও করে দেয়।

এটাই আসল সমস্যা। এ নিয়ে হেনরি কিসিঞ্জারের বহুল প্রচলিত একটি উক্তি আছে, “আমেরিকার শত্রু হওয়া বিপজ্জনক, কিন্তু বন্ধু হলেই সর্বনাশ।”

ওমান থেকে কুয়েত পর্যন্ত–কার্যত সব উপসাগরীয় রাষ্ট্রই এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ইরানের হামলার শিকার হয়েছে। হামলার পর ‘কৌশলগত পদক্ষেপ’ হিসেবে তেহরান তার আরব প্রতিবেশীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। কিন্তু তারা সবাই জানত, ইরান এবং আমেরিকা ও ইসরায়েলের মধ্যে নতুন করে শত্রুতা শুরু হলে তারা মারাত্মকভাবে বিপদে পড়বে। আর এখানেই আসলে আমেরিকার মিত্র হওয়ার অসুবিধা। দেশটি ‘নগ্ন আগ্রাসন’ চালালে আপনি তাদের বন্ধু হওয়ার কারণে বিপদে পড়বেন–এটাই স্বাভাবিক।

গত সপ্তাহে সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রোগ্রাম ‘আমানপোর অ্যান্ড কোম্পানি’র একটি পর্বে সঞ্চালক ক্রিশ্চিয়ান আমানপোর সৌদি আরবের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা প্রিন্স তুর্কি আল-ফয়সালকে আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। এর আগে সৌদি আরবের গোয়েন্দা প্রধান এবং আমেরিকা ও ব্রিটেনে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন প্রিন্স তুর্কি। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, “আপনার কি মনে হয়, আপনাদের দেশে মার্কিন ঘাঁটিগুলো রাখা দীর্ঘমেয়াদী বা কার্যকর কোনো সমাধান? আপনারা কি এখনও আমেরিকা এবং তাদের রক্ষণাত্মক অবস্থানকে বিশ্বাস করতে পারেন?”

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় আমাদের দেশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প কোনো সহায়তা করেননি। তাই সৌদি আরবের কাছে এটি কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয় যে, তিনি আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবেন না...।”

প্রিন্স তুর্কি আল-ফয়সাল বলেন, “এমন রক্তারক্তি এবং ধ্বংসের পুরো বিষয়টি সৌদি আরবের কাছে অত্যন্ত ঘৃণ্য। দেশটি এখন সামাজিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক উন্নয়নের পথে হাঁটছে। আমরা সামরিক সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার বদলে সেই পথেই এগিয়ে যেতে চাই।”

সাম্প্রতিক এই যুদ্ধ শুরু করার পর ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরান তার আরব প্রতিবেশীদের আক্রমণ করছে দেখে তিনি ‘সবচেয়ে বেশি অবাক’ হয়েছেন। কারণ তিনি তাদের নিরপেক্ষ মনে করেছিলেন। কিন্তু প্রিন্স তুর্কি এর পাল্টা জবাবে বলেন, কারও অবাক হওয়া উচিত নয়। কারণ ইরান আগেই এমন হামলার সতর্কবার্তা দিয়েছিল।

প্রিন্স তুর্কি বলেন, “আমি মনে করিয়ে দিতে চাই, সৌদি যুবরাজ এবং অন্যান্য উপসাগরীয় নেতারা আমেরিকাকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা না নিতে অনুরোধ করে আসছিলেন। কারণ আমরা সবাই বিশ্বাস করি, এই হামলা কেবল ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরান এই অঞ্চলে আমেরিকান উপস্থিতির ওপর প্রতিশোধ নেবে। আর এই এলাকা উপসাগরীয় দেশ এবং এমনকি তুরস্ক পর্যন্ত বিস্তৃত।”

ওই অনুষ্ঠানেই বলা হয়, “দীর্ঘদিন ধরে সৌদি নেতা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অন্যান্য আরব নেতারা তাদের জনগণকে বলে এসেছেন, মার্কিন ঘাঁটি রাখার কারণ, এটি আপনাদের রক্ষা করবে। এখন আপনারা হামলার শিকার হচ্ছেন, ইরান আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিল। আমরা আপনাদের জন্য বিশেষ কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেখতে পাচ্ছি না।”

উপসাগরীয় দেশগুলো আমেরিকার সর্বশেষ সেই মিত্র এবং অংশীদার, যারা দেখছে, জাতীয় নিরাপত্তা বাড়ানো বা জনগণকে রক্ষা করার বদলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক তাদের আরও বিপদে ফেলছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ বাদ দিলে, গত ২৫ বছরে ইউরোপীয় বা ন্যাটো সদস্য দেশগুলো যে বড় যুদ্ধগুলোতে জড়িয়েছে, সেগুলোর সবই ছিল আমেরিকান বা ইসরায়েলি যুদ্ধ। যেমন, আফগানিস্তান, ইরাক ও গাজা। এর কোনোটিই সরাসরি ইউরোপীয় স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলেনি।

এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো আমেরিকার মিত্রদের জন্য এগুলোই আসল শিক্ষা। তাদের নিজেদের জিজ্ঞাসা করা দরকার, আমেরিকার সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া কি তাদের জনগণকে রক্ষা করবে, নাকি বিপদে ফেলবে? চীন কিন্তু ইরান, আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া বা গাজার জন্য বিপদ নয়। এ দুই পরাশক্তির মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে তারা কি সত্যিই জড়িয়ে পড়তে চায়? কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখা কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে না?

লেখক: অ্যালেক্স লো ২০১২ সাল থেকে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের একজন কলামিস্ট হিসেবে হংকং এবং চীনের প্রধান ইস্যুগুলো নিয়ে লিখছেন। ২৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে তিনি হংকংয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন।

(লেখাটি সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে নেওয়া)

সম্পর্কিত