কেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ

ডেভিড হার্স্ট
ডেভিড হার্স্ট
কেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ইরান যুদ্ধ নিয়ে কে নিজেদের বেশি বিভ্রান্ত করছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি গ্রোক– তা বোঝা কঠিন। এলন মাস্কের এআই প্ল্যাটফর্ম ভুলভাবে দাবি করেছিল যে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে আগুন লাগার একটি ভিডিও নাকি তেল আবিবের একটি ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। এছাড়াও ইরানে তেলের আগুনের দৃশ্য বলে দেখানো একটি ভিডিওকে, যা ২০১৭ সালে লস অ্যাঞ্জলসের কাছে ঘটে যাওয়া একটি অগ্নিকাণ্ডের ভিডিও বলে ভুল করেছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প একের পর এক বিভ্রান্তিকর পোস্ট করেছেন। কখনো তিনি গণঅভ্যুত্থানের আহ্বান জানিয়েছেন, কখনো ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করেছেন।

কখনো বলেছেন যে তিনি সরাসরি ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনে ভূমিকা রাখবেন। আবার বলেছেন যে ইরানকে ‘পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে’ এবং তিনি লক্ষ্যবস্তুর তালিকা আরও বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

কিন্তু ট্রাম্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পোস্টটি ছিল সাবেক ইরানি সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির হত্যাকে ‘ইরানি জনগণের জন্য তাদের দেশ ফিরে পাওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ’ বলে আখ্যা দেওয়া। এই সুযোগ ইরানি জনগণ গ্রহণ করেনি। বরং বোমাবর্ষণের সময় হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে খামেনির জন্য শোক প্রকাশ করেছে।

এর পাশাপাশি আধুনিক ইতিহাসে একেবারে বিরল ঘটনা–একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা, সম্ভবত ট্রাম্প ও এই অভিযানের ‘মস্তিষ্ক’, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যা চেয়েছিলেন তার ঠিক বিপরীত ফল এনে দিতে পারে। খামেনির হত্যাকাণ্ড হয়তো ইসলামী প্রজাতন্ত্র ও ইরানি বিপ্লবকে নতুন প্রাণ এবং নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

ইরানের লাল রেখা

ইসলামি প্রজাতন্ত্র যখন নিজেকে হুমকির মুখে মনে করে, তখন তারা জাতীয় বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম। কিন্তু খামেনি একই সঙ্গে একজন বাস্তববাদীও ছিলেন। তার শাসনামলে ইরান তাদের শীর্ষ জেনারেল ও পরমাণু বিজ্ঞানীদের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের সরাসরি প্রতিশোধ নেয়নি। আর যখন নিয়েছে, তখন তা ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে, যাতে ঘটনাটি দ্রুত শেষ করা যায়।

অর্থাৎ খামেনির আমলে ইরান তাদের ‘লাল রেখা’ মেনে চলত। যেমন: তারা উপসাগরীয় প্রতিবেশি দেশগুলোতে সরাসরি হামলা করবে না এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ করবে না। কিছু ক্ষেত্রে তাদের মিত্র মিলিশিয়া তা করেছে। বিশেষ করে, ২০১৯ সালে ইরাক থেকে উৎক্ষেপিত ড্রোন সৌদি আরবের দুটি তেল স্থাপনায় হামলা চালায়, যার ফলে সাময়িকভাবে সৌদি তেল কোম্পানি আরামকোর উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসে। কিন্তু সেই হামলার দায় স্পষ্ট ছিল না, এবং ‘অস্বীকারযোগ্যতার সুযোগ’ রাখা হয়েছিল। এর দায় স্বীকার করেছিল হুতি।

ইরান তাদের শীর্ষ জেনারেল কাশেম সুলেমানিকে বাগদাদ বিমানবন্দরে মার্কিন ড্রোন হামলায় হত্যার পরও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর আক্রমণ করেনি। তারা হামলা চালায়নি যখন হিজবুল্লার প্রধান ইসমাইল হানিয়াকে তেহরানে হত্যা করা হয়। তারা প্রতিক্রিয়া দেখায়নি যখন গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ইরানি সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করে। তারা প্রতিক্রিয়া জানায়নি সেই হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার পরেও, যেখানে সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি নিহত হন।

বিপ্লবী চেতনার প্রত্যাবর্তন

খামেনির ইরান ছিল না বিপ্লবী বা অপ্রত্যাশিত। তার মৃত্যু হয়তো সেটাই বদলে দিয়েছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিপ্লবী চেতনা শেষ করার বদলে এটি হয়তো তাকে নতুনভাবে জাগিয়ে তুলেছে। মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে।

উপসাগর জুড়ে তেল ও গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এবং ১৯৭৩ সালের তেল সংকটের থেকেও বড় একটি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করেছে। প্রতিদিন দুই কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ১৯৭৮ থেকে ২০২২ পর্যন্ত যত তেল সরবরাহ বন্ধ হয়েছিল তার সব মিলিয়েও এর সমান নয়।

এটি উপসাগরীয় জাহাজ চলাচল সুরক্ষার মার্কিন প্রতিশ্রুতিকে হাস্যকর করে তুলেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো এখন বিদেশি সামরিক বিশেষজ্ঞ খুঁজছে–রাডার অপারেটর, রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী, নিরাপত্তা দল, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ এবং পাইলট। ইরান কাতারের ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের আগাম সতর্কীকরণ রাডার ব্যবস্থাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এটি সেই ব্যবস্থা যার ওপর অঞ্চলের প্রতিটি থাড এবং প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর নির্ভর করে।

যুক্তরাষ্ট্র এখন দক্ষিণ কোরিয়ায় স্থাপিত প্যাট্রিয়ট সিস্টেম খুলে এনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবস্থা প্রতিস্থাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।

ইরান ড্রোন দিয়ে মানামা, কুয়েত সিটি, দুবাই, দোহা ও রিয়াদে হামলা চালিয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে বিমান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

বৈশ্বিক সংকট

এই যুদ্ধে ইতিমধ্যে ১৪টি দেশ জড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাইপ্রাস এবং আরও তিনটি ইউরোপীয় শক্তি– নরওয়ে, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স– যাদের ঘাঁটি বা দূতাবাসে হামলা হয়েছে। ইরান এখন তাদের যুদ্ধকালীন নেতা আলি লারিজানির দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে। তিনি বলেছিলেন, “আমরা তাদের হৃদয় পুড়িয়ে দেব। আমরা জায়নিস্ট অপরাধী ও নির্লজ্জ আমেরিকানদের তাদের কাজের জন্য অনুতপ্ত হতে বাধ্য করব।”

মার্কিন বোমাবর্ষণ উল্টো ইরানকে আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে খামেনির ছেলে মুজতাবা খামেনিকে নতুন নেতা হিসেবে ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্টভাবে ইরানিদের বলেছিলেন যেন তারা মুজতাবাকে নেতা না বানায়। কিন্তু তাকে বেছে নিয়ে ইরান দেখিয়ে দিয়েছে যে, ট্রাম্প তাদেরকে দমাতে পারবেন না। ৮৬ বছর বয়সী ও অসুস্থ খামেনির বদলে এখন ৫৬ বছর বয়সী এক নেতাকে আনা হয়েছে, যার ইসলামি বিপ্লবি বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে।

এই যুদ্ধ কোথায় গিয়ে শেষ হবে?

এই সংকট যত দিন যাচ্ছে তত বড় হচ্ছে। ফ্রান্স যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে। যুক্তরাজ্য বিমানবাহী রণতরী প্রস্তুত করছে। এগুলোর জন্য কোনো দীর্ঘ পরিকল্পনা ছিল না। সবকিছুই এখন তড়িঘড়ি করা হচ্ছে। ইরান প্রতিদিনের বোমাবর্ষণে গুরুতর ক্ষতি সত্ত্বেও ভেঙে পড়েনি। বরং দেখিয়েছে যে তারা প্রতিরোধ করতে পারে এবং পাল্টা জবাব দিতে পারে।

এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির যে ‘বুদবুদ’ ছিল তা ফাটিয়ে দিয়েছে।

শেষ প্রশ্ন

এই যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে? ধীরে ধীরে তেল ও আর্থিক বাজারের অস্থিরতা বাড়তে থাকবে এবং তা ট্রাম্পকে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করতে পারে। কারণ এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ হস্তক্ষেপগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি ট্রাম্প পিছু হটেন, তাহলে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ভেঙে পড়বে। আর থেমে যাবে নেতানিয়াহুর সেই মসিহীয় হওয়ার স্বপ্ন– যেখানে মধ্যপ্রাচ্য ইসরায়েলের আধিপত্যে থাকবে।

এই যুদ্ধ শেষ করতে ট্রাম্পের দরকার ইরানের পতন। কিন্তু তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং ইরানের টিকে থাকার কৌশল কাজ করছে। এর মধ্যে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হতে পারে– দেশ ধ্বংস হতে পারে, তেলক্ষেত্র পুড়ে যেতে পারে, উপসাগরের সম্পদ নষ্ট হতে পারে এবং হাজার হাজার নিরীহ মানুষ মারা যেতে পারে।

এটাই সেই মূল্য যা অঞ্চলটি দিচ্ছে এক ব্যক্তির অহংকার, আরেক ব্যক্তির মসিহীয় হওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি এবং দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া কিছু না করা ইউরোপের অক্ষমতার কারণে। ব্যর্থতা ও হতাশায় ঘেরা অবস্থায় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু এখন এই পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক দুই ব্যক্তি।

লেখক: মিডিল ইস্ট আই-এর প্রধান সম্পাদক এবং এর সহপ্রতিষ্ঠাতা।

(লেখাটি মিডিল ইস্ট আই-এর সৌজন্যে এবং সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশিত)

সম্পর্কিত