Chaarcha Logo
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
Chaarcha logo
সংক্ষেপেকানেক্টম্যাগাজিন

আমরা

আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগবিধিনিষেধ ও শর্তাবলিগোপনীয়তার নীতি
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
Chaarcha logo
সর্বশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
আমরা
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিধিনিষেধ ও শর্তাবলি
  • গোপনীয়তার নীতি
এক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণ

সম্পাদক: সোহরাব হাসান, প্রিন্টার্স বিল্ডিং (লেভেল–১৪), ৫ রাজউক অ্যাভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা–১০০০, বাংলাদেশ

|

স্বত্ব © চরচা

Chaarcha Logo
Advertisement
Advertisement
> ভাবনা

ভোটের মানে কি বদলাবে এবার?

হামিদ রায়হান

হামিদ রায়হান

প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪: ১৩
ভোটের মানে কি বদলাবে এবার?

বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে নানা দ্বিধা ও তর্ক জমে উঠেছে। একই সঙ্গে, জনমনে যে আলোড়ন, তা কেবল রাজনৈতিক নয়, এটা এক গভীর নাগরিক অনুভূতির প্রতিফলন। গ্রাম থেকে শহর, চায়ের দোকান থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-সবখানেই একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে: এবার কি সত্যিই ভোটের মানে বদলাবে? মানুষের প্রত্যাশা খুব জাঁকজমকপূর্ণ নয়। তারা চায় এমন একটি নির্বাচন, যেখানে ভোট দেওয়ার কাজটি আর ভয়, অনিশ্চয়তা কিংবা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভোটাধিকার এখানে আর কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটা সম্মানের প্রশ্ন, অস্তিত্বের প্রশ্ন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement

কিন্তু এ প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব অস্বস্তিকরভাবে দীর্ঘ। অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের যে দাবি নাগরিক সমাজ বারবার তুলে ধরছে, তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা-নির্বাচন মানেই সীমিত প্রতিযোগিতা, প্রশ্নবিদ্ধ ফলাফল ও আস্থার ঘাটতি। মানুষের স্মৃতিতে এখনো টাটকা সেই সব নির্বাচন, যেখানে ভোটের পূর্বেই ফল নির্ধারিত বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। ফলে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে আশার পাশাপাশি এক ধরনের নিঃশব্দ সংশয়ও জমে উঠছে।

রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে এ ফাঁক আরও প্রকট। সাধারণ মানুষ নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনির ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট সংস্কার চায়। কিন্তু ক্ষমতাসীন বাস্তবতায় সংস্কার প্রায়ই প্রতিশ্রুতির স্তরেই আটকে থাকে। জনমত যেখানে কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা বলে, সেখানে ক্ষমতার রাজনীতি চলে ধীরে, হিসেবি পায়ে। সংস্কার যেন নির্বাচন-পূর্ব একটি অস্বস্তিকর শব্দ, যা উচ্চারণ করা হয়, বাস্তবায়ন করা হয় কম।

Advertisement
Advertisement
Advertisement
গণভোট নিয়ে ভজঘটgono-vote-yes-campaign-from-ca

এ প্রেক্ষাপটে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও পরস্পরবিরোধী ও কৌশলনির্ভর। কেউ নির্বাচনকে বৈধতার উৎস হিসেবে তুলে ধরতে চায়, কেউ আবার অংশগ্রহণ না করার হুমকিকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। বিরোধী রাজনীতির এ টানাপোড়েন অংশগ্রহণ সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে। মাঠে রাজনীতি দুর্বল হলে নির্বাচন ক্রমে আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেয়-যেখানে ভোট আছে, কিন্তু প্রতিযোগিতা নেই; প্রক্রিয়া আছে, কিন্তু প্রাণ নেই।

নির্বাচন ব্যবস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনিক সমস্যাগুলো এ সংকটকে আরও ঘনীভূত করে। নির্বাচনী আইন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচনী পরিবেশ-সব মিলিয়ে এমন এক কাঠামো তৈরি হয়, এবং নিরপেক্ষতার প্রশ্ন বারবার উঠছে। এসব সীমাবদ্ধতার ভেতর দিয়েই নির্বাচন এগোয়, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন পেছনে পড়ে থাকে।

এ বাস্তবতার ভেতরেই জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি ফিরে আসে-একটি সময়, যখন রাজপথে উচ্চারিত হয় পরিবর্তনের অঙ্গীকার। সেই আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি ছিল সংস্কার, জবাবদিহি এবং নাগরিক মর্যাদার। এখন প্রশ্ন হলো, আসন্ন নির্বাচন কি সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথ খুলে দিতে পারে, নাকি তা কেবল আরেকটি অধ্যায় হয়ে থাকবে অপূর্ণ আশার ইতিহাসে?

বাংলাদেশ আজ দাঁড়িয়ে আছে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মাঝামাঝি এক অনিশ্চিত সেতুর ওপর। নির্বাচন সেই সেতু পার হওয়ার সুযোগ হতে পারে-যদি তা সত্যিই মানুষের ভোটকে তার প্রকৃত শক্তি ফিরিয়ে দেয়। না হলে, এ নির্বাচনও হয়তো স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে যাবে, যেমন হারিয়ে গেছে অনেক প্রতিশ্রুতি, অনেক আশা।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এখন এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব ভাসছে-আগে নির্বাচন, না আগে সংস্কার? এ প্রশ্নটি যেন কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; এটা সময়, স্মৃতি ও ক্ষমতার মধ্যে আটকে থাকা এক দীর্ঘশ্বাস। রাজপথে, সভাকক্ষে, টেলিভিশনের আলো ঝলমলে স্টুডিওতে-সবখানেই একই কথা ঘুরে ফিরে আসে, কিন্তু উত্তরটি যেন প্রতিবারই ফসকে যায়।

তবে গণভোটে ‘না’ ভোট কি রাষ্ট্রবিরোধী?election

নির্বাচন-পূর্ব সংস্কার নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে এবার তার তীব্রতা আলাদা। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা-এ তিনটি বিষয় একসঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে এমনভাবে, যেন এগুলো আর বিচ্ছিন্ন দাবি নয়, বরং গণতন্ত্রের ন্যূনতম শর্ত।

সাধারণ মানুষের চোখে নির্বাচন মানেই কেবল ব্যালট নয়; এটা একটি আস্থার পরীক্ষা। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি-এমন বিশ্বাস ক্রমে শক্ত হচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এখানে দ্বিমুখী। বক্তৃতায় সংস্কারের কথা বলা হয়, ঘোষণাপত্রে তার প্রতিশ্রুতি থাকে; আবার ক্ষমতার বাস্তবতায় এসে সেই সংস্কারই হয়ে ওঠে অস্বস্তিকর। কেউ বলে, নির্বাচন আগে, সংস্কার পরে। কেউ আবার বলে, সংস্কার ছাড়া নির্বাচন অর্থহীন। এ দ্বন্দ্বের ভেতরেই রাজনীতি এগোয়, কিন্তু সমাধান স্থগিত থাকে।

ভোটের ব্যালট বক্স
ভোটের ব্যালট বক্স

ক্ষমতার ধারাবাহিকতা আর কাঠামোগত পরিবর্তনের টানাপোড়েন এখানে সবচেয়ে স্পষ্ট। ক্ষমতা চায় স্থিতি, পরিচিত কাঠামো, পূর্বানুমেয় ফলাফল। আর সংস্কার চায় ভাঙচুর-পুরোনো অভ্যাসের, প্রতিষ্ঠিত নিয়ন্ত্রণের। ফলে সংস্কার প্রায়ই ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকে, বর্তমানের বাস্তবতা হয়ে ওঠে না। অতীত নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এ সংশয়কে আরও ঘনীভূত করে। মানুষ ভুলে যায়নি সেই নির্বাচনগুলো, যেখানে ভোট হয়েছিল, কিন্তু বিশ্বাস জন্মায়নি। অংশগ্রহণ ছিল, কিন্তু প্রতিযোগিতা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। সেসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বারবার বলা হলেও, বাস্তবে সেই শিক্ষা কতটা প্রয়োগ হয়-সে প্রশ্নের উত্তর অস্পষ্ট।

এ অস্পষ্টতার ভেতরেই সবচেয়ে বড় আশঙ্কা জন্ম নেয়: যদি নির্বাচন হয়ে যায়, তবে কি সংস্কারের কথা আবার চাপা পড়ে যাবে? ইতিহাস বলে, ক্ষমতা স্থিতিশীল হলে সংস্কারের তাগিদ দুর্বল হয়। ফলে অনেকের চোখে নির্বাচন যেন সংস্কারকে স্থগিত করার এক নিরাপদ অজুহাত। এ প্রেক্ষাপটে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি ফিরে আসে এক প্রতিধ্বনির মতো। সেই আন্দোলন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল-জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, নাগরিক মর্যাদার। আজ সেই প্রতিশ্রুতি কোথায় দাঁড়িয়ে? আন্দোলনের ভাষা কি নীতিতে রূপ নিয়েছে, নাকি কেবল স্মৃতিতে আটকে আছে?

বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন গণতন্ত্রের পরীক্ষাparliament house (3)

বাংলাদেশ আজ দাঁড়িয়ে আছে এক সন্ধিক্ষণে, যেখানে নির্বাচন ও সংস্কার পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরস্পরের শর্ত হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে এ সহজ সত্যটিই সবচেয়ে কঠিন। সময় এগোয়, বিতর্ক জমে, আর প্রশ্নটি থেকে যায়-সংস্কার ছাড়া নির্বাচন কি সত্যিই গণতন্ত্র, না কেবল তার ছায়া? বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে নির্বাচন একটি নির্ধারিত দিন হলেও, তার অর্থ ও তাৎপর্য প্রতিবারই নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়ে। আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান যেন একই মানচিত্রে আঁকা হলেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন ভিন্ন দিগন্তে ছড়িয়ে আছে। কেউ একে ক্ষমতার ধারাবাহিকতার উৎস হিসেবে দেখে, কেউ দেখে প্রতিরোধের মঞ্চ হিসেবে, আবার কেউ একে দেখছে প্রবেশদ্বার-রাজনীতিতে নতুন করে জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ হিসেবে।

গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে সরকার
গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে সরকার

এ ভিন্ন অবস্থান থেকেই জন্ম নেয় সংলাপ, বর্জন ও অংশগ্রহণের রাজনীতি। কখনো সংলাপের আহ্বান ওঠে, কখনো তা নিঃশব্দে মিলিয়ে যায়। কখনো নির্বাচনে অংশগ্রহণকে বলা হয় দায়িত্ব, কখনো বর্জনকে বলা হয় প্রতিবাদের শেষ ভাষা। এ টানাপোড়েনের ভেতরেই নির্বাচন এগোয়, কিন্তু তার গণতান্ত্রিক প্রাণ যেন ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে। মাঠের রাজনীতি আর কৌশলগত অবস্থানের ফাঁক এখানে স্পষ্ট। রাজপথে জনসমাগম কমে গেলে কৌশল বাড়ে-ঘোষণা, বিবৃতি, আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা। বাস্তব রাজনীতি তখন আর মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগে থাকে না; তা হয়ে ওঠে হিসাবি, দূরবর্তী। এ দূরত্বই নির্বাচনের প্রতিযোগিতাকে অনেক সময় আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করে।

সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত প্রশ্নটি হলো-লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আদৌ আছে কি না। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ধারণাটি এখন আর তাত্ত্বিক নয়; এটা বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা এক তীব্র দাবি। প্রশাসনিক সুবিধা, প্রচারের সুযোগ, আইনি নিরাপত্তা-সব মিলিয়ে মাঠ যদি সমান না হয়, তবে প্রতিযোগিতা কাগজে থাকলেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব ক্ষীণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নির্বাচনকালীন সরকার ও নিরপেক্ষতার পুরোনো বিতর্ক। কে নির্বাচন পরিচালনা করবে, কোন কাঠামোর অধীনে-এ প্রশ্নগুলো প্রতিবারই ফিরে আসে, কিন্তু সমাধান যেন স্থায়ী হয় না। ফলে নির্বাচন একটি প্রক্রিয়া হিসেবে চলতে থাকে, কিন্তু তার গ্রহণযোগ্যতা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

নির্বাচন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। আইন আছে, প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু প্রয়োগে ঘাটতি। এ ঘাটতির ভেতর দিয়ে প্রকৃত প্রতিযোগিতা কতটা সম্ভব-সে প্রশ্নের উত্তর কেউ নিশ্চিতভাবে দিতে পারে না। অনেক সময় নির্বাচন শেষ হয়, কিন্তু রাজনীতির সংকট শেষ হয় না। এ পুরো প্রেক্ষাপটে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি এক ধরনের নীরব মানদ- হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই আন্দোলন ‘জনগণের ক্ষমতার’ কথা বলেছিল-ক্ষমতা যে কেবল ব্যালটের বাক্সে নয়, নাগরিক সচেতনতায়। প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক দলগুলো সেই প্রতিশ্রুতিকে কতটা ধারণ করছে? নির্বাচন কি সেই জনগণের ক্ষমতাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সুযোগ, নাকি কেবল আরেকটি আনুষ্ঠানিক অধ্যায়?

বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন তাই শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটা একটি পরীক্ষা। প্রতিযোগিতা ও আনুষ্ঠানিকতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এ নির্বাচনই বলে দেবে-রাজনীতি এখনো মানুষের কাছে ফিরে আসতে পারে, নাকি মানুষের কাছ থেকে আরও দূরে সরে যাবে। জুলাই আন্দোলন কোনো হঠাৎ বিস্ফোরণ ছিল না; এটা ছিল দীর্ঘদিন জমে থাকা ক্ষোভ, ক্লান্তি আর আশা-হতাশার এক যৌথ উচ্চারণ। সেই জুলাইয়ের দিনগুলোতে রাজপথে নেমে এসেছিল নানা বয়সের মানুষ-বিশেষ করে তরুণরা-যাদের চোখে ছিল প্রশ্ন, কণ্ঠে ছিল দাবি, আর হৃদয়ে ছিল একটাই আকাঙক্ষা: এ দেশটা কি একটু ভিন্নভাবে চলতে পারে না? সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর থেকে উঠে আসা এ আন্দোলন তাই কেবল একটি প্রতিবাদ ছিল না; এটা ছিল ভবিষ্যৎ কল্পনার এক সাহসী প্রচেষ্টা।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: অবোধ্য রসায়নের বাইশগজ ও বইমেলাshirshendu

আন্দোলনের মূল প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল স্পষ্ট-জবাবদিহি, সংস্কার ও গণতন্ত্র। ক্ষমতা যেন প্রশ্নের ঊর্ধ্বে না থাকে, প্রতিষ্ঠান যেন ব্যক্তি বা দলের অধীন না হয়, আর ভোট যেন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে ওঠে-এ ছিল সেই দিনের ভাষা। জুলাই আন্দোলন মানুষের মনে একটি বিশ্বাস জন্ম দিয়েছিল যে পরিবর্তন সম্ভব, যদি চাপ অব্যাহত থাকে, যদি নাগরিক কণ্ঠ নীরব না হয়।

কিন্তু সময় এগোয়, রাজনীতি তার নিজস্ব গতিতে ফিরে আসে, আর সামনে হাজির হয় আসন্ন নির্বাচন। এখানেই শুরু হয় দ্বন্দ্ব-এ নির্বাচন কি জুলাই আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথ, নাকি সেই স্বপ্নকে সীমাবদ্ধ করে দেওয়ার এক কাঠামোগত বাধা? একদিকে নির্বাচনকে দেখা হচ্ছে সাংবিধানিক সুযোগ হিসেবে, অন্যদিকে আশঙ্কা-এ প্রক্রিয়ার ভেতরেই আন্দোলনের চেতনা ধীরে ধীরে শুষে নেওয়া হবে।

রাজনৈতিক দলগুলো এ আন্দোলনের ভাষাকে গ্রহণ করেছে বেছে বেছে। বক্তৃতায় জুলাইয়ের কথা আসে, স্লোগানে শোনা যায় পরিবর্তনের প্রতিধ্বনি, কিন্তু বাস্তব কৌশলে সেই চেতনা কতটা প্রতিফলিত-তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। অনেক সময় মনে হয়, জুলাই আন্দোলন যেন একটি প্রতীক, যাকে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা যায়, কিন্তু যার দাবি পূরণ করা বাধ্যতামূলক নয়। এ সন্দেহ আরও গভীর হয় নির্বাচন প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতার কারণে। যখন নির্বাচন কাঠামোগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ থাকে, তখন আন্দোলনের নৈতিক শক্তি সেখানে ক্ষয় হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আন্দোলন যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কথা বলেছিল, তা যদি নির্বাচনের মধ্যেই অস্পষ্ট হয়ে যায়, তবে সেই আন্দোলন ইতিহাসে একটি আবেগঘন অধ্যায় হয়ে থাকবে-কার্যকর পরিবর্তনের সূত্র নয়।

সবচেয়ে বেশি দোলাচলে রয়েছে তরুণ ও নতুন ভোটাররা। জুলাই আন্দোলনে যারা প্রথমবার রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছিল তাদের প্রত্যাশা ছিল বড়। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে অনেকেই এখন দ্বিধাগ্রস্ত, কেউ কেউ হতাশ। তারা জানতে চায়-ভোট দিয়ে কি সত্যিই কিছু বদলায়, নাকি পরিবর্তন কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ?

তবু জুলাই আন্দোলনের উত্তরাধিকার একেবারে মিলিয়ে যায়নি। এটা এখনো এক ধরনের নৈতিক মানদণ্ড হয়ে আছে-যার সঙ্গে বর্তমান রাজনীতিকে তুলনা করা হয়, যার আলোয় ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক যাত্রার দিশা খোঁজা হয়। প্রশ্ন হলো, সেই উত্তরাধিকার কি নির্বাচনের ভেতর দিয়ে রূপ পাবে, নাকি নির্বাচনই তাকে আরও দূরের স্বপ্নে পরিণত করবে? বাংলাদেশের সামনে এখন সেই কঠিন মুহূর্ত, যেখানে নির্বাচন আর আন্দোলন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নয়, বরং একে অন্যের অর্থ নির্ধারণ করছে।

জুলাই আন্দোলনের স্বপ্ন যদি সত্যিই বাঁচতে চায়, তবে নির্বাচনকে তার পথ হতে হবে-অন্যথায়, স্বপ্ন আবারও ইতিহাসের পাতায় লেখা এক অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি হয়ে থেকে যাবে।

হামিদ রায়হান: লেখক ও গবেষক

বিষয়: সংস্কারনির্বাচনজুলাই সনদগণভোটত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনভোটঅভ্যুত্থান
সর্বশেষ
  • ১

    সিএমএসএমই খাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনআরবি ব্যাংকের চুক্তি

  • ২

    উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে সিকৃবিতে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত

  • ৩

    ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ভোট ২৯ অক্টোবর

  • ৪

    হত্যা মামলায় আবার গ্রেপ্তার দেখানো হলো কলিমুল্লাহকে

  • ৫

    মনপুরায় মেঘনার পাড়ে হাত-পা ও মুখ বাঁধা অবস্থায় যুবক উদ্ধার

সম্পর্কিত
  • মব দেশে বাড়ছে, বিদেশে কি রপ্তানিও হচ্ছে?

    মব দেশে বাড়ছে, বিদেশে কি রপ্তানিও হচ্ছে?

    আমাদের দেশে মব আর নতুন কোনো বিষয় নয়। বরং দিনকে দিন কিছুটা স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠছে যেন। কখনও বাড়ে, কখনও একটু কমে- কিন্তু মব বিদায় হচ্ছে না কোনোভাবেই। উল্টো যেন মব রপ্তানির দেশে পরিণত হচ্ছে আমাদের এই বাংলাদেশ! ভাবে? চলুন, আলোচনার ভেতরে ঢোকা যাক। শুরুতেই বর্তমানে দেশের ভেতরে মব কি অবস্থায় আছ

  • সাক্ষরতার সংখ্যায় অগ্রগতি, জীবনের পরীক্ষায় কত দূর?

    সাক্ষরতার সংখ্যায় অগ্রগতি, জীবনের পরীক্ষায় কত দূর?

    মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও উন্নয়নের জন্য সাক্ষরতার গুরুত্ব তুলে ধরতে ইউনেসকো ১৯৬৬ সালে ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ঘোষণা করে। বিশ্বজুড়ে এর উদযাপন শুরু হয় ১৯৬৭ সালে; আর স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে।

  • রংপুরে ৪ খুন: ব্যর্থ আসলে কারা?

    রংপুরে ৪ খুন: ব্যর্থ আসলে কারা?

    ২৩ আগস্ট রাতে সাবেক স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর পুরো পরিবারের শেষ হয়ে যাওয়ার খবরটা প্রথম শুনে বুঝিনি যে এই ঘটনা সামনে অনেক চমক তৈরি করে রেখেছে। হত্যা রহস্য উন্মোচনের জন্য গোলকধাঁধা অপেক্ষা করছে–কে জানত? রাতে ঘুমিয়ে সকালে উঠেই শুনি দুই আসামি ধরা পড়েছে, এমনকি হত্যার দায়ও স্বীকার করে নিয়েছেন

  • সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের বিরোধিতা কেন?

    সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের বিরোধিতা কেন?

    গত রোববার জাতীয় সংসদে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস হয়েছে। এর মধ্যে বহুলালোচিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ২০২৬’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল ২০২৬’ নিয়ে পরে আলোচনা করার ইচ্ছা আছে। এখানে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল ২০২৬’ নিয়ে কথা বলব। এই আইনের উদ্দেশ্য–বাবা–মা সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়া