গণভোট নিয়ে ভজঘট

গণভোট নিয়ে ভজঘট
গণভোট নিয়ে সরকারের প্রচার। ছবি: প্রেস উইং

বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নজিরিবহীনভাবে দুটি ভোট একসঙ্গে হতে যাচ্ছে। একটি হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আরেকটি গণভোট।

অনেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ সরকারের গণভোট আয়োজনকে সংবিধান বহির্ভূত কাজ বলে চিহ্নিত করেছেন। তাদের দাবি, সরকার যতই নিজেকে গণঅভ্যুত্থানের ফসল দাবি করুক না কেন, তারা যে সংবিধানের অধীনে শপথ নিয়েছে, সেই সংবিধান লঙ্ঘন করতে পারে না। গণভোট করতে হলে আগে জাতীয় সংবিধানে এর পক্ষে আইন করতে হবে।

গণভোট বা নির্বাচনে সরকার কোনো পক্ষ নয়, ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত মাত্র। কিন্তু গণভোটে তারা একটি পক্ষ নিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস থেকে শুরু করে তার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার শুরু করেছেন। ডিসি–এসপিসহ সরকারের কর্মকর্তারাও এর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও প্রচার চালানোর কথা বলা হয়েছে।

গণভোটে জুলাই সনদে সাক্ষরকারী দলগুলো ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাবে, এটাই সবাই ধরে নিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বেশ কয়েকটি দল মাঠেও নেমেছে। তবে সেই প্রচারের সঙ্গে দলীয় প্রার্থীর ঢাউস সাইজের ছবিও শোভা পাচ্ছে। যদিও ২২ জানুয়ারির আগে আনুষ্ঠানিক প্রচারে নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞা আছে।

‘হ্যাঁ’–‘না’ ভোটের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এক নয়। বিএনপি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গণভোট আয়োজনের কথা বলেছিল, যা ছিল খুবই যুক্তিযুক্ত। বামদলগুলো গণভোটের বিরোধিতা করেছে। আর জামায়াত চেয়েছিল নির্বাচনের আগে গণভোট হোক। সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে আপসরফা হিসেবে একই দিন গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করে।

সমস্যার শুরুও এখান থেকে। বিএনপির নেতারা বলেছেন, গণভোটের পক্ষে প্রচারের দায়িত্ব সরকারের, বিএনপির নয়। এনসিপি ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালালেও তারা জুলাই সনদে সই করেনি। ফলে হারাধনের এক ছেলের মতো জামায়াতে ইসলামী গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষের প্রধান প্রচারক।

একদিনে গণভোট ও সংসদ নির্বাচন হওয়ায় দ্বিতীয়টির দিকেই রাজনৈতিক দলগুলোর বেশি নজর থাকবে। গণভোট নিয়ে নেতা-কর্মীরা খুব মাথা ঘামাবেন বলে মনে হয় না। এসব চিন্তা থেকেই সরকার গণভোটের পক্ষে জোয়ার আনতে সরকার জোর প্রচার চালাচ্ছে। সেটা তারা আইনগতভাবে পারেন কি না, সে প্রশ্ন তুলেছেন আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, এখানে সরকারের কোনো পক্ষ হওয়ার কথা নয়। রেফারির ভূমিকা পালন করার কথা। তারপরও তারা পক্ষ হয়েছেন। একই সঙ্গে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যামে কেবল জুলাই অভ্যুত্থানকারীরা নয়, সরকারের উপদেষ্টাদের কেউ কেউ সেফ এক্সিট খুঁজছেন।

গণভোটের পক্ষে প্রচার চালানোর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে সরকার বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মন্তব্যে বলা হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের ওপর আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের প্রকাশ্য সমর্থন একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নিরপেক্ষতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। এ উদ্বেগ আলোচনার যোগ্য হলেও বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেট এবং আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার আলোকে মূল্যায়ন করলে এ ধরনের সমালোচনার ভিত্তি নেই। বাংলাদেশের এ সংকটময় সময়ে নীরবতা নিরপেক্ষতার প্রতীক নয়; বরং তা দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অভাবই ফুটিয়ে তোলে।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ বলেছেন, অর্ন্তবর্তী সরকার আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার এক নয়। এর মাধ্যমে তারা স্বীকার করে নিলেন যে, গণভোটে সরকারের পক্ষ বা বিপক্ষ নেওয়া আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

গণভোট আয়োজনের অর্থই হলো জনগণ এর পক্ষে ‘হ্যাঁ’ বলতে পারে, আবার বিপক্ষে ‘না’ বলতে পারে। সেখানে ভোটারকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আবার সরকার যদি নিজেই হ্যাঁ-এর পক্ষে প্রচার চালায়, তাহলে কেউ না-এর পক্ষে কথা বলতে ১০ বার ভাববে। না-এর পক্ষে গেলে তিনি হেনস্তা বা মব ভায়োলেন্সের শিকার হলেও হতে পারেন।

বাংলাদেশে অতীতে যে তিনটি গণভোট হয়েছে, তার দুটি হয়েছে সেনা শাসনকে বৈধতা দিতে। প্রথমটি ১৯৭৭ সালের জিয়াউর রহমানের পক্ষে সমর্থন আছে কি না, জানতে চাওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয়টিতে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পক্ষে সমর্থন নিতে। আর দুই গণভোটেই ভোটারের উপস্থিতি যাই হোক না কেন হ্যাঁ-এর পক্ষে দেখানো হয়েছিল যথাক্রমে ৯৮ ও ৮৭ শতাংশ।

এ বারের গণভোটে কী হবে? অন্তর্বর্তী সরকার আরেকটি প্রহনমূলক গণভোট না চাইলে তিলকে তাল দেখাবেন না। তারপরও কেন তারা হ্যাঁ-এর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে? একটা কারণ হতে পারে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর তারা ভরসা রাখতে পারছে না।

আরেকটি প্রশ্ন, আগামী নির্বাচনে যদি এমন দল জয়ী হয়, যারা জুলাই সনদের সবকিছু অবনত মস্তকে মেনে নেয়নি, যারা বিভিন্ন বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট তথা আপত্তি জানিয়েছে, তারা তো গণভোট পুরোপুরি মেনে নিতে বাধ্য থাকবে না।

এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, যদি গণভোটে ভোটার উপস্থিতি ৫০ শতাংশের কম হয়, তাহলে সেটা নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। অনেকে এর বিপরীতে ১৯৯১ সালের গণভোটের উদাহরণ টানতে পারেন। সেই গণভোটে ভোট পড়েছিল ৩৫ শতাংশ। দুই গণভোটের মধ্যে চরিত্রগত ফারাক আছে। সেই গণভোট হয়েছিল জাতীয় সংসদে সংসদীয় পদ্ধতির পক্ষে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের পর। বলা যায়, এটা ছিল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

কিন্তু এবারের গণভোট পরিবর্তনের পক্ষে। সরকার বা কোনো কর্তৃপক্ষ আগে থেকে বলে দিতে পারে না, আগামী জাতীয় সংসদে কোন আইন পাস হবে কিংবা হবে না। জনপ্রতিনিধিরাই ঠিক করবেন কোন আইন জনকল্যাণের পক্ষে, কোন আইন বিপক্ষে।

সরকারের নীতিনির্ধারকেরা গণভোটকে সংস্কার ও পরিবর্তনের পক্ষে দাবি করলেও বাস্তবে কতটা পরিবর্তন হয়েছে, তাও প্রশ্ন সাপেক্ষ। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, সরকার মৌলিক পরিবর্তনের ধারে কাছেও যায়নি। অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, সরকার সংস্কারের পক্ষে কথা বলে এখন নিজেরাই উগ্রবাদের কাছে বন্দী হয়ে পড়েছে।

এখন কেউ যদি উগ্রবাদের কাছে বন্দী হওয়া কিংবা মৌলিক সংস্কার করতে না পারা সরকারের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে সেটা কোনোভাবে দেশদ্রোহী বা গণবিরোধী কাজ হতে পারে না।

লেখক: সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত