জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সব ধরনের পরিবহন খরচ, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ সকল পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে।
দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এতে জনমনে উদ্বেগ ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। এ মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সব ধরনের পণ্য পরিবহন, কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অর্থনীতির সবক্ষেত্রে ব্যয় বাড়িয়ে মানুষের নিত্যদিনের জীবনে চাপ সৃষ্টি করেছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
গত রোববার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার, যা সে দিন মধ্যরাতের পর থেকেই কার্যকর হয়েছে। পুনর্নির্ধারিত দাম অনুযায়ী ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটার নির্ধারণ করা হয়। এর আগে এগুলোর দাম ছিল যথাক্রমে ১১৫, ১৩৫, ১৪০ ও ১৪৫ টাকা।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে কথা হয় খুলনা রেল স্টেশন রোডের তানভীর বাণিজ্য ভাণ্ডারের কর্ণধার মো. হাবিবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, “জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে পরিবহন খরচ বেড়েছে। এর ফলে পণ্যের দাম বেড়েছে। এর সম্পূর্ণ চাপ কৃষকের ওপর গিয়ে পড়বে।”তিনি বলেন, “আগে যে পণ্য আনতে ১০ হাজার টাকা খরচ হতো, এখন একই পরিমাণ পণ্য আনতে অতিরিক্ত তিন হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে।”
একই এলাকার আলু ব্যবসায়ী জবেদ এন্টারপ্রাইজের কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা বলেন, “সারা বাংলাদেশের চিত্র একই রকমের। প্রতি গাড়িতে অতিরিক্ত সাত থেকে আট হাজার টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। ফলে প্রতি কেজিতে এক টাকা থেকে দেড় টাকা বেড়েছে।”
নগরীর সোনাডাঙ্গা ট্রাক টার্মিনালে কথা হয় চালক মোবারক মিয়ার সাথে। তিনি বলেন, “ঢাকা থেকে ৩২০ বস্তা চিনি নিয়ে খুলনার বড় বাজারে এসেছি। ঢাকা থেকে খুলনায় আসতে ৮০ লিটার তেল খরচ হয়েছে। এ পরিমাণ তেল কিনতে এক হাজার ৬০০ টাকা বেশি গুনতে হয়েছে। তিনি বলেন, “জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। কিন্তু ভাড়া না বাড়ার কারণে ট্রিপ কমে গেছে। এ রকম চলতে থাকলে পরিবহন ব্যবসা ধ্বংসের মুখে পড়বে।”
কুষ্টিয়া-খুলনা সড়কে চলাচলকারি বাস। ছবি: চরচা
একই এলাকায় কথা হয় ট্রাকচালক মো. হযরত আলীর সাথে। তিনি বলেন, “৩২০ বস্তা ময়দা নিয়ে ঢাকা থেকে খুলনার বড় বাজারে এসেছি। একই পথ পাড়ি দিয়ে আগে মালিকের প্রায় ১০ হাজার টাকা থাকত। এখন সেখানে মাত্র তিন হাজার টাকার মতো থাকে। তাছাড়া রাস্তায় বিভিন্ন স্থানে চাঁদা গুনতে হয়। এ অবস্থায় এখন ভাড়া না বাড়ালে ট্রাক মালিকের আর কিছু থাকবে না।”
বড় বাজারের মোহাম্মাদীয়া বাণিজ্য ভাণ্ডারের কর্মকর্তা মো. মনির মাহমুদ বলেন, “জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। প্রতি কেজি পেঁয়াজে ৫-৭ টাকা এবং রসুনে ৮-১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।”
তিনি বলেন, “জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাসা ভাড়াও বৃদ্ধি পেয়েছে। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। বাড়ির মালিক বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির আগাম নোটিশ দিয়েছেন। এসব খরচ সামাল দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পণ্য বিক্রি করতে হবে।”
সোনাডাঙ্গা পাইকারি বাজারের জীবন শাহ কুমার বাণিজ্য ভাণ্ডারের মালিক আব্দুল মালেক বলেন, “জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রতি কেজি পণ্যের দাম এক টাকা করে বেড়েছে। অর্থাৎ মণে ৪০ টাকা বেড়ে গিয়েছে। পরিবহন খরচ বাড়তি হওয়ার কারণে সব পণ্যের দাম বেড়েছে।”
হানিফ পরিবহনের নগরীর সাতরাস্তা মোড়ের টিকিট কাউন্টারের বিক্রেতা ইয়াছিন খান বলেন, “গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে পরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। এখন খুলনা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকায় যেতে ৭৩০ টাকা এবং খুলনা থেকে ফেরি পারাপার হয়ে ঢাকার গাবতলী যেতে ৭৯০ টাকা খরচ হবে প্রতি যাত্রীর।”
তিনি বলেন, “কিছু যাত্রী শুরুতে পিড়াপিড়ি করে, কিন্তু যখন পরিস্থিতি বুঝতে পারে তখন আর কিছু বলে না।”
কথা হয় আহমেদ আলীর সাথে। তিনি খুলনার একটি কলেজের সাবেক শিক্ষক ছিলেন। তিনি বলেন, “ক্ষমতায় আসার ছয় মাসের মধ্যে দুই বারের মতো জ্বালানি তেলের দাম বাড়াল সরকার।”
আহমেদ আলী বলেন, “বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে পেট্রোলের দাম ১২৫ টাকা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সেটি কমিয়ে ১১৬ টাকায় নিয়ে আসে। এই সরকার ক্ষমতায় আসার ছয় মাসের মধ্যে তা ১৬০ টাকায় পৌঁছাল। এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়।”
তিনি আরও বলেন, “মানুষের আয় বাড়েনি, কিন্তু ব্যয় বেড়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের মাসিক আয়ের পরিমাণ বাড়লেও বাড়েনি সাধারণ মানুষের আয়। ফলে বেশি চাপ পড়বে তাদের ওপর। কারণ জ্বালানি তেলের ওপর মানুষের অর্থনীতির একটি বড় বিষয় জড়িত রয়েছে।”