রাজধানীর ওভারব্রিজ, ফুটপাত কিংবা মেট্রোরেলের ডিভাইডারের নিচে রাতে যাদের শুয়ে থাকতে দেখা যায়, তাদেরকে সাধারণ ভাষায় ‘ভবঘুরে’ বা ‘ভাসমান মানুষ’ বলেই সবাই চেনে। এই জনগোষ্ঠীর ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তা দূর করতে এবং তাদের সমাজে ফিরিয়ে আনার জন্য আছে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র। কিন্তু প্রায় আট দশকের পুরনো এই সরকারি উদ্যোগটি নানা সমস্যায় জর্জরিত। একদিকে ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি, অন্যদিকে তীব্র জনবল সংকট-সব মিলিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোই যেন উদ্ধারের অপেক্ষায় আছে।
আশ্রয়কেন্দ্র শুরু হয়েছিল যেভাবে
বাংলাদেশে ভবঘুরে আশ্রয়কেন্দ্রের ইতিহাস বেশ পুরনো। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং ১৯৪৩ সালের অবিভক্ত বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে ক্ষুধা আর অভাবের কারণে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়। সেই সময়ে ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ এবং পথশিশুদের সুরক্ষায় ১৯৪২ সালে কলকাতায় প্রথম ভবঘুরে নিবাস স্থাপন করা হয়। এরপর ১৯৪৩ সালে করা হয় ভবঘুরে আইন।
সাতচল্লিশের দেশভাগের পর ওই বছরের ১৫ আগস্ট তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কুমিল্লা জেলার চাঁদপুরে শিশু, পুরুষ ও নারীদের জন্য নতুন একটি ভবঘুরে নিবাস খোলা হয়। পরে ১৯৬১ সালে এটি ময়মনসিংহ জেলার ধলা এবং গাজীপুরের পুবাইলে স্থানান্তরিত হয়।
দরিদ্র ও নিরাশ্রয় মানুষকে আশ্রয় দিতে ১৯৭৭ সালে ঢাকার মিরপুর, মানিকগঞ্জের বেতিলা, নারায়গঞ্জের গোদনাইল এবং গাজীপুরের কাশিমপুরে নতুন চারটি আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হয়।
দীর্ঘদিন ১৯৪৩ সালের পুরনো আইনে চলার পর ২০১১ সালে তৎকালীন সরকার ‘ভবঘুরে ও নিরাশ্রয় ব্যক্তি (পুনর্বাসন) আইন, ২০১১’ এবং ২০১৫ সালে এর নতুন বিধিমালা করে।
আইনে ‘ভবঘুরে’ ও ‘নিরাশ্রয়’ ব্যক্তি কারা?
সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, “সমাজে চরম দারিদ্র্য, নদীভাঙন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘরবাড়ি না থাকা, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং বেকারত্বের কারণে মানুষ ভবঘুরে হয়ে পড়ে।”
২০১১ সালের নতুন আইন অনুযায়ী সরকার দুটি স্পষ্ট সংজ্ঞা দিয়েছে।
ভবঘুরে ব্যক্তি হলো এমন কোনো মানুষ, যার থাকার বা রাতে ঘুমানোর নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই; যিনি উদ্দেশ্য ছাড়া রাস্তায় ঘুরে সাধারণ মানুষকে বিরক্ত করেন অথবা নিজে বা অন্যের প্ররোচনায় ভিক্ষা করেন।
তবে যারা কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক দাতব্য কাজের জন্য টাকা বা খাবার তোলেন, তারা এই আইনের অধীনে ভবঘুরে বলে গণ্য হবেন না। আর নিরাশ্রয় ব্যক্তি হলো এমন অসহায় মানুষ, যার নিজস্ব কোনো বাসস্থান নেই, জীবিকা বা ভরণপোষণের ব্যবস্থা নেই এবং যিনি গ্রাম বা শহরে ভাসমান হিসেবে জীবনযাপন করেন ও সরকারের কোনো সাহায্য-ভাতা পান না।
কী অবস্থা আশ্রয়কেন্দ্রের?
সমাজসেবা অধিদপ্তরের গত আগস্ট মাসের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ভবঘুরেদের জন্য বর্তমানে দেশের ছয়টি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে মোট ১৯০০ জন রাখার ব্যবস্থা (আসন) রয়েছে। তবে বর্তমানে ছয়টি কেন্দ্রে নিবাসী রয়েছেন ৮৯০ জন।
ছয়টি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র দেশের পাঁচটি জেলায় অবস্থিত। কেন্দ্রগুলোর মধ্যে একমাত্র অভ্যর্থনা কেন্দ্রটি রাজধানীর মিরপুরে। গাজীপুর জেলায় রয়েছে দুটি আশ্রয়কেন্দ্র-একটি পুবাইলে ও অন্যটি কাশিমপুরে। কাশিমপুরের কেন্দ্রটি নারী ও মা-সহ শিশুদের জন্য। নারায়ণগঞ্জ জেলার গোদনাইলে বালকদের জন্য একটি কেন্দ্র এবং মানিকগঞ্জ জেলার বেতিলায় অন্য একটি কেন্দ্র অবস্থিত (যেটি ভবন পরিত্যক্ত হওয়ার কারণে ২০১৭ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে)। এছাড়া ঢাকা বিভাগের বাইরে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার ধলায় পুরুষ ও বালকদের নির্দিষ্ট কেন্দ্রটি অবস্থিত।
সবচেয়ে সংকটে আছে রাজধানীর মিরপুর অভ্যর্থনা কেন্দ্র। দশমিক ৫২ একর জমির ওপর তৈরি এই কেন্দ্রেই পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক আটক ভবঘুরেদের প্রথম আনা হয়। কিন্তু মিরপুরের প্রধান ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষিত হওয়ায় নিবাসীদের রাখা হচ্ছে অস্থায়ীভাবে তৈরি একটি টিনশেডে।
তবে এটি পুরো চিত্র নয়। নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, মানিকগঞ্জের বেতিলা কেন্দ্রটির ভবন জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ায় ২০১৭ সাল থেকে এর কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ ছয়টির মধ্যে কাগজে-কলমে সক্রিয় কেন্দ্র আছে মাত্র পাঁচটি।
এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের ভবঘুরে কার্যক্রম শাখার প্রধান ব্যবস্থাপক (সহকারী পরিচালক) মো. গোলাম আজম বলেন, “মিরপুরে অফিশিয়াল আসন ২০০টি বলা হলেও মূল ভবন পরিত্যক্ত হওয়ায় একটি প্রকল্পের টিনশেড ঘরে আমরা আপৎকালীন নিবাসী রাখি। সেখানে ১০০ জন রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই মিরপুর অভ্যর্থনা কেন্দ্রে আসার পর আমরা নিবাসীদের প্রাথমিক শারীরিক পরীক্ষা করি এবং দ্রুত পুবাইল, কাশিমপুর, গোদনাইল বা ধলার আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেই।”
বর্তমানে ঢাকার মিরপুরে ৮১ জন, গাজীপুরের পুবাইলে ২৯৭ জন, কাশিমপুরে ২৩৯ জন, নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে ১৮৫ জন এবং ময়মনসিংহের ধলায় ৮৮ জন নিবাসী রয়েছেন।
ডিভাইডারের ওপর পলিথিন দিয়ে অস্থায়ী আবাস তৈরি করা হয়েছে। ছবি: চরচা
কর্মীর পদ খালি পড়ে আছে
সাধারণত মোবাইল কোর্ট আইন, শিশু আইন ২০১৩ এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্দেশে ভবঘুরেদের আটক বা উদ্ধার করে কেন্দ্রে পাঠানো হয়। তারা মূলত ২-৩ মাসের মতো কেন্দ্রগুলোতে অবস্থান করেন। এর মধ্যে স্বজনদের খোঁজ মিললে তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
আইন অনুযায়ী, কেন্দ্রগুলোতে আসা মানুষদের শুধু আটকে রাখা নয়, তাদের স্বাস্থ্যসেবা, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা এবং দর্জিবিদ্যা, হস্তশিল্প, গার্মেন্টস কাজ বা কৃষির মতো বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা। যেন তারা স্বাবলম্বী হতে পারেন। কিন্তু কর্মী সংকটের কারণে এই সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আইনে থাকলেও, শুধুমাত্র গাজীপুরের পুবাইল আশ্রয়কেন্দ্রে অল্প কিছু হাতের কাজ শেখানো হয় নারীদের। অন্যান্য কোনো আশ্রয়কেন্দ্রেই নেই কারিগরি দক্ষতা বা কুটির শিল্প শেখানোর ব্যবস্থা।
অনেকে এখান থেকে কাজ শিখে পোশাক কারখানায় চাকরি করছেন, এমনকি সরকারি খরচে বিয়ের মাধ্যমে পুনর্বাসিত হওয়ার দৃষ্টান্তও আছে। গুরুতর অসুস্থ হলে সরকারি খরচে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় বলে জানান মো. গোলাম আজম।
সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ছয়টি কেন্দ্র পরিচালনার জন্য মোট ১৩৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে আছে মাত্র ৪৩ জন।
সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র নিবাসীদের জন্য খাবার রান্নার জন্য বাবুর্চির কোনো পদ নেই। কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রের নিবাসীর সংখ্যা দুই শতাধিক। নিবাসীদের মধ্যে থেকেই অপেশাদার কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয় রান্নার কাজে।
ঢাকার মিরপুরের কেন্দ্রটি সরেজমিনে দেখতে চরচার এই প্রতিবেদক সেখানে যান। তবে সেখানে দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা তাকে দ্রুত এলাকা ছাড়ার কথা বলেন। পরে যোগাযোগ করা হয়, মিরপুর আশ্রয়কেন্দ্রের পরিচালক আম্বিকা তাহসিনের সঙ্গে। তিনি অধিদপ্তরে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরে ভবঘুরে কার্যক্রম শাখার প্রধান ব্যবস্থাপক গোলাম আজমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মহাপরিচালকের কাছে অনুমতির জন্য আবেদন করার পরামর্শ দেন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর সমাজসেবা অধিপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর চিঠি পাঠানো হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
প্রধান ব্যবস্থাপক মো. গোলাম আজম আশ্রয়কেন্দ্রের বিষয়ে বলেন, “আমাদের কেন্দ্রগুলোতে যারা আসেন, তাদের প্রায় ৭০ শতাংশই মানসিক প্রতিবন্ধী। একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের পেছনে সার্বক্ষণিক একজন সেবাদানকারী বা কেয়ারটেকার প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পদই খালি পড়ে আছে। এমনকি বাবুর্চির কোনো পদই নেই। যার কারণে সুষম খাবারের ব্যবস্থা করাও কষ্টকর। এই অল্প জনবল নিয়ে এতো বিশালসংখ্যক মানুষের যত্ন নেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ।”
ঢাকা শহরে ভবঘুরে ও নিরাশ্রয়দের পুনর্বাসনের জন্য ২০২০ সাল থেকে কাজ করছে আপন ঘর ফাউন্ডেশন নামক একটি বেসরকারি সংস্থা।
ঢাকা শহরের উদ্বাস্তু ও গৃহহীনদের দায়িত্ব কোনো কর্তৃপক্ষই নিতে চায় না। ছবি: চরচা
ভবঘুরে ও নিরাশ্রয়দের জন্য সরকারি উদ্যোগের অপ্রতুলতা নিয়ে আপন ঘর ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ সাইফুল আলম চরচাকে বলেন, “সরকারের উদ্যোগে আশ্রয়কেন্দ্র বানানো হলেও মাফিয়া চক্রের কারণে সেগুলো ঠিকমতো পরিচালিত হচ্ছে না। খোদ সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রাক্তন ডিজি আমাকে এই অক্ষমতার কথা জানিয়েছিলেন। সমাজসেবা থেকে অনুদান হিসেবে আমরা কয়েক দফায় ২৪-২৫ হাজার টাকার মতো পেয়েছি, অথচ আমাদের কেন্দ্রে মাসে খরচ হয় প্রায় ৬ থেকে সাড়ে ৭ লাখ টাকা। মূলত ২০২০ সাল থেকে আমরা ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও খরচে এই প্রজেক্টটি চালিয়ে যাচ্ছি, কারণ রাস্তায় পড়ে থাকা এই অসহায় মানুষগুলো সরকার বা সমাজ- কারোরই অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই।”
অসহায় এসব মানুষের অবস্থা এবং নিজেদের সফলতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “আমরা এমন মানুষও উদ্ধার করেছি, যাদের মাথায় পচন ধরে চোখ, কান ও নাক দিয়ে পোকা বের হচ্ছিল। হাসপাতালগুলো দুর্গন্ধের কারণে অনেক সময় চিকিৎসা না দিয়ে তাদের বের করে দেয়। পরে সিঁড়ির নিচে রেখে বা নিজেদের কেন্দ্রে এনে তাদের চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করতে হয়। এখন পর্যন্ত আমরা ২৬৮ জন ভবঘুরেকে উদ্ধার করেছি এবং চিকিৎসা শেষে ১৮৬ জনকে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছি। এদের মধ্যে এমন অনেক মা আছেন, যারা দীর্ঘ ২৫ বছর রাস্তায় কাটানোর পর সুস্থ হয়ে পুনরায় নিজেদের বাড়ি ফিরতে পেরেছেন।”