পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় চলতি অর্থ-বছরের বাজেটে গবেষণায় কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। গবেষণায় বরাদ্দে নতুন নিয়ম করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এখন থেকে ইউজিসি গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা করে তহবিল দেবে।
এর কারণ হিসেবে ইউজিসি বলছে, গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়ন ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও গবেষকবান্ধব করতে সরকার নতুন এই উদ্যোগ নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা অর্থায়ন ও পরিচালনা সাধারণ নির্দেশিকা ২০২৬-এ প্রকাশ করা হয়। নির্দেশিকায় শিক্ষকদের গবেষণা অনুদান দেওয়ার যোগ্যতায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি তুলেছেন শিক্ষকরা।
গবেষণা বরাদ্দের নতুন নিয়মে কী আছে
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদাভাবে ইউজিসির কাছে গবেষণার জন্য বরাদ্দ চাইতে হবে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা প্রস্তাবনা আহ্বান, প্রস্তাবনা মূল্যায়ন এবং প্রকল্প অনুমোদন করবে। গবেষণা প্রস্তাবনা বিশ্ববিদ্যালয় মূল্যায়ন করবে। প্রস্তাবিত গবেষণা ও এর আনুষঙ্গিক খাতে অর্থায়নের প্রস্তাব ইউজিসিতে পাঠাতে হবে। ইউজিসি প্রস্তাব অনুযায়ী অর্থ দেবে।
গবেষণায় অনুদান প্রদানে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সব কিছু আগের মতো থাকলেও পরিবর্তন আনা হয়েছে শিক্ষকদের ক্ষেত্র। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, পিএইচডি শিক্ষক হবেন ইউজিসির অনুদান পাওয়া গবেষণার মূল গবেষক কিংবা প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর (পিআই)। ওই শিক্ষকের সাথে প্রভাষক এবং সহকারী অধ্যাপক সহযোগী গবেষক অথবা কো-প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর (কো-পিআই) হবেন। একজন পিআই গবেষণা বাবদ সম্মানী পাবেন তার মূল বেতনের সমান এবং কো-পিআই পাবেন ২০ হাজার টাকা।
ইউজিসির নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণায় ৮৫ শতাংশ এবং গবেষণায় শ্রেষ্ঠত্ব পুরস্কার ও বিবিধ খরচে ১৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হবে।
গত ৩ জুলাই নতুন গবেষণা বরাদ্দ ও নির্দেশিকা নিয়ে ইউজিসি একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য গবেষণা বরাদ্দ আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। গবেষণা অর্থায়নের ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের দ্বৈততা বা পুনরাবৃত্তি এড়াতে সরকার গবেষণা প্রকল্পের অর্থায়ন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ এবং গবেষক-বান্ধব করেছে। নতুন প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়, গবেষণার অগ্রাধিকার বা বিষয়ের বৈচিত্র্যের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না বলেও ইউজিসি আশ্বস্ত করে।
গবেষণায় দ্বৈততা পরিহার কীভাবে হবে জানতে চাইলে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মাছুমা হাবিব বলেন, “দেখা যায় কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিষয়ের উপর একইরকম গবেষণা হচ্ছে। এই বিষয়টি পরিহার করতে আমরা নতুন নিয়ম করেছি। গবেষণা প্রস্তাবনাগুলো যেন ইউজিসিতে পাঠানো হয়। এতে করে একইরকম গবেষণা দেখলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে জানাব। যেনো মূল গবেষক অন্য টপিক নিয়ে কাজ করেন।”
তবে, অর্থায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন করলে গবেষণায় দ্বৈততা দূর হবে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন। তিনি চরচাকে বলেন, “গবেষণায় অর্থায়নের পদ্ধতি পরিবর্তন করলেই যে গবেষণার দ্বৈততা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূর হয়ে যাবে এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। গবেষণার পুনরাবৃত্তি কখনো অপচয়, আবার কখনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রয়োজনীয়ও। একই বিষয়ে স্বাধীনভাবে গবেষণা হলে ফলাফল যাচাই, পুনরুৎপাদন এবং ভিন্ন পদ্ধতির তুলনা সম্ভব হয়। তাই সব ধরনের দ্বৈততা দূর করা উচিত এই ধারণাটিও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।”
আগের নিয়মের সাথে নতুন নিয়মের পার্থক্য কোথায় এমন প্রশ্নের জবাবে মাছুমা হাবিব বলেন, “গবেষণার যে তহবিল তা আলাদা করে বণ্টন করা হয়েছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিতে গবেষণার বরাদ্দ অর্থ মন্ত্রণালয় থেকেই আলাদা করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাতে এই বরাদ্দের টাকা অন্য কোথাও ব্যয় না করে। এমনও হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যখাতে গবেষণার টাকা ব্যয় করার সম্ভাবনা থাকতে পারে। তাই আলাদা তহবিলে এই হিসাব রাখবে এবং ছয় মাস পর ইউজিসিতে প্রতিবেদন দাখিল করবে।”
আগে কী নিয়ম ছিল
আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটে গবেষণার বরাদ্দ অর্ন্তভুক্ত ছিল। স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের রির্সাচ সেল শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণা প্রস্তাবনা আহ্বান করত। এরপর প্রস্তাবনা দুজন বিশেষজ্ঞ দিয়ে ব্লাইন্ড পিআর রিভিউ বা মূল্যায়ন করা হতো। প্রস্তাবনা অনুমোদন হলে বরাদ্দ পাওয়া অর্থ সকল গবেষকদের মধ্যে বণ্টন করত। প্রত্যেক শিক্ষক গবেষণা সহকারী হিসেবে একজন শিক্ষার্থী নিতে পারতেন। গবেষণার সম্মানী বাবদ শিক্ষক (মূল গবেষক) পেতেন তার মূল বেতনের সমান অর্থ এবং শিক্ষার্থী (গবেষণা সহকারী) পেতেন ১০ হাজার টাকা। আগে গবেষণার অর্থের হিসাব ইউজিসিতে পাঠানো হতো না।
শিক্ষকদের আপত্তি কোথায়
মূল গবেষক হতে পিএইচডি ডিগ্রি থাকতে হবে এমন নির্দেশনা নিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। গত সোমবার এ নিয়ে মানববন্ধন করেছে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী বলেন, “আগে ইউজিসির গবেষণাতে কো-পিআই ছিল না। গবেষণা সহকারী হিসেবে নেওয়া হতো একজন শিক্ষার্থীকে। ওই শিক্ষার্থীকে ১০ হাজার টাকা সম্মানী দেওয়া হতো। এখন শিক্ষকদের জন্য সহযোগী গবেষক (কো-পিআই) হিসেবে কাজ করে টাকা ২০ হাজার সম্মানী দেওয়াটা অসম্মানের।”
পিএইচডি না থাকলে মূল গবেষক গতে পারবে না এই বিষয়টি বৈষম্য তৈরি করবে উল্লেখ করে পাবনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক আশিকুর রহমান অভি বলেন চরচাকে বলেন, “ইউজিসির নির্দেশিকায় মূল গবেষক হওয়ার ক্ষেত্রে পিএইচডি ডিগ্রির যে শর্ত দেওয়া আছে তা প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক গবেষণার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হবেন। আমার বিভাগে কোনো শিক্ষক পিএইচডি ডিগ্রিধারী না হলেও আমাদের গবেষণা কার্যক্রম থেমে নেই, বরং অনুষদের মধ্যে আমাদের গবেষণাই বেশি। তাই আমরা চাই, দ্রুত এই নীতিমালা বাতিল বা সংশোধন করে তরুণ গবেষকদের গবেষণায় উৎসাহিত করা হোক।”
মূল গবেষকের পিএইচডির চেয়ে অভিজ্ঞতা এবং যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিয়ে কামরুল হাসান মামুন চরচাকে বলেন, “প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে কো-প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর করার বিষয়টিও পদমর্যাদার ভিত্তিতে নয়, গবেষণায় তাদের বাস্তব অবদান ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কোনো তরুণ শিক্ষক যদি শক্তিশালী গবেষণা-রেকর্ড, মৌলিক গবেষণা-প্রস্তাব এবং প্রকল্প পরিচালনার সক্ষমতা প্রদর্শন করেন, তাহলে তাকে পিআই হওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। আবার কোনো জ্যেষ্ঠ শিক্ষক যদি দীর্ঘদিন গবেষণায় নিষ্ক্রিয় থাকেন, তাহলে কেবল পদ বা ডিগ্রির কারণে তাকে পিআই করা যুক্তিসঙ্গত নয়।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক আরও বলেন, “আমার মতে পিআই ও কো-পিআই নির্বাচন হওয়া উচিত ডিগ্রি পদমর্যাদা ও গবেষণা-রেকর্ড এই তিনটির সমন্বিত মূল্যায়নের ভিত্তিতে।”
শিক্ষকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই শর্ত পরিবর্তন করেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও সম্প্রসারণ দপ্তরের পরিচালক ড. মো. কাওসার আহম্মেদ পাটোয়ারী চরচাকে বলেন, “প্রভাষক এবং সহকারী অধ্যাপকেরা আমাদের কাছে আবেদন করে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব ক্ষমতাবলে এবং বিশেষ বিবেচনায় এই শর্ত পরিবর্তন করে সকল শিক্ষককে গবেষণার জন্য আবেদনের সুযোগ দিয়েছে। তবে, পিএইচডি ছাড়া কোনো শিক্ষক কো-পিআই রাখতে পারবেন না।”
ইউজিসির যুক্তি কী?
কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, জানতে চাইলে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, “মূল গবেষক হওয়া ক্ষেত্রে পিএইচডি দেওয়ার কারণ হলো একটা ভালো রিসার্চ যেন হয়। পিআই এর সাথে একজন প্রভাষক এবং সহকারী অধ্যাপককে কো-পিআই করা হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে তাদের রিসার্চটাও ভালো হলো; আবার রিসার্চে কো-পিআই থাকলেও তাদের পদন্নোতিতে তা কাউন্ট করা হবে।”
তবে এ বিষয়ে মাসুমা হাবিব বলেন, “আমরা কোথাও বলিনি পিএইচডি না থাকলে মূল গবেষক বা পিআই হতে পারবে না। আমরা বলেছি, একজন পিএইচডি শিক্ষকের কো-পিআই একজন প্রভাষক কিংবা সহকারী অধ্যাপক হবে পারবে। এই ক্ষেত্রে গবেষণাগুলোর আউটকাম আরও ভালো হবে এবং প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকেরা একজন অভিজ্ঞ শিক্ষকের সাথে থেকে গবেষণা শিখতে পারবে। কারণ পিএইচডি করে আসা একজন শিক্ষক গবেষণায় অনেক অভিজ্ঞ।”