মস্তিষ্ক কীভাবে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের কার্যক্রম চালু বা বন্ধ করে, সেই প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিন বিজ্ঞানী। তারা হলেন- কার্ল ডেইসেরথ, পিটার হেগেম্যান ও জর্জ নাগেল। মস্তিষ্ক কীভাবে স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, তা বোঝার গবেষণায় তাদের উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে উল্লেখ করেছে নোবেল কর্তৃপক্ষ।
কার্ল ডেইসেরথ যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড হিউজেস মেডিকেল ইনস্টিটিউট ও স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে কাজ করেন। পিটার হেগেম্যান জার্মানির হামবোল্ট ইউনিভার্সিটি অফ বার্লিনে এবং জর্জ নাগেল জার্মানির ইউনিভার্সিটি অফ ভুর্জবুর্গে কাজ করেন।
অপটোজেনেটিকস নামের এই পদ্ধতিতে আলো ব্যবহার করে জীবন্ত মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা যায়। নোবেল কমিটি বলছে, এই প্রযুক্তি মস্তিষ্কের রহস্য উন্মোচনের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রথা অনুযায়ী প্রতিবছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার শুরু হয় নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা। প্রথম দিনে ঘোষণা করা হয় চিকিৎসাশাস্ত্রের নোবেল পুরস্কারজয়ীর নাম। এরপর ছয়টি বিভাগে ছয় দিন নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।
রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস ১৯০১ সাল থেকে প্রতিবছর এই পুরস্কার প্রদান করে। সুইডিশ বিজ্ঞানী ও ডিনামাইটের উদ্ভাবক আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর থেকে তাঁর নামে এবং রেখে যাওয়া অর্থে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালে এতে যুক্ত হয় অর্থনীতি।
প্রতিবছর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুর দিবস ডিসেম্বরের ১০ তারিখ বিজয়ীদের হাতে পুরস্কারের অর্থ তুলে দেওয়া হয়। প্রতি ক্ষেত্রে পুরস্কার বিজয়ীরা একটি স্বর্ণপদক, শংসাপত্রসহ একটি ডিপ্লোমা এবং বর্তমানে ১১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার পান।
নোবেল পুরস্কারের জন্য প্রতিবছর ৩০০ জনের একটি তালিকা তৈরি করা হয়। এরপর যাচাই-বাছাই শেষে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
১৯০১ সালে জার্মান জীববিজ্ঞানী এমিল ফন বেরিং ডিপথেরিয়া রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর সিরাম থেরাপি বিষয়ে গবেষণার জন্য প্রথম লোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
১৯২৩ সালে জি. ব্যানটিং সবচেয়ে কম বয়স অর্থাৎ ৩১ বছর চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পান। ১৯৬৬ সালের পেটন রুস সবচেয়ে বেশি বয়স অর্থাৎ ৮৭ বছর বয়সে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পান।
এবারে চিকিৎসায় নোবেল পাওয়া গবেষকদের মধ্যে শুরুতে পিটার হেগেম্যান ও জর্জ নাগেল এককোষী শৈবালে চ্যানেলরোডপসিন নামের একটি বিশেষ প্রোটিন আবিষ্কার করেন। নীল আলো পড়লে ওই প্রোটিনের মধ্যে একটি পথ খুলে যায়, যার মধ্য দিয়ে বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত আয়ন কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে কোষে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়।
পরে কার্ল ডেইসেরথ এই প্রোটিনের জন্য দায়ী জিন ইঁদুরের স্নায়ুকোষে প্রবেশ করান। নীল আলো ব্যবহার করে তিনি ওই স্নায়ুকোষে সংকেত তৈরি করতে সক্ষম হন। ২০০৫ সালে তিনি এই সাফল্য প্রকাশ করেন। দুই বছর পর জীবন্ত ইঁদুরের মস্তিষ্কেও আলো দিয়ে স্নায়ুকোষ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিটি কার্যকর করেন।
এরপর আলো দিয়ে স্নায়ুর সংকেত নিয়ন্ত্রণের এই পদ্ধতি অপটোজেনেটিকস নামে পরিচিত হয়। বিশ্বজুড়ে গবেষণাগারে এখন এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণের সঙ্গে যুক্ত স্নায়ু সংযোগ শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
নোবেল কমিটির ভাষ্য, গবেষকেরা অপটোজেনেটিকস দিয়ে নির্দিষ্ট স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু সার্কিট চিহ্নিত করেছেন, যেগুলো স্নায়বিক ও মানসিক রোগের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক।