দেশের সড়ক-মহাসড়ক থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার অলিগলি দাপিয়ে বেড়ানো অটোরিকশা বা ইজিবাইকের আড়ালে নীরবে চলছে এক বিপর্যয়। দেশে বর্তমানে কোনো নিবন্ধন ছাড়াই চলাচল করছে প্রায় ৪০ লাখ অটোরিকশা। এই বিপুলসংখ্যক যানের চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড বা সীসাযুক্ত ব্যাটারি মেয়াদ শেষে পরিণত হচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্যে। উন্মুক্ত পরিবেশে কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই অবৈধভাবে চলছে এসব ব্যাটারি রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য করার কাজ।
কোনো ধরনের প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম ছাড়াই খালি হাতে ব্যাটারি ভাঙা, সীসা গলানো ও পোড়ানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো করছে শিশু, নারী ও বয়স্ক শ্রমিকরা। বাতাসে সীসা ও ক্ষতিকর ভারী ধাতু মিশে যাওয়ার এই প্রক্রিয়ার সরাসরি শিকার হচ্ছে দেশের মানুষ, যার ভয়াবহ প্রমাণ মেলে আইসিডিডিআর,বির তথ্যে। সংস্থাটির এক গবেষণার তথ্য জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ শিশুর রক্তে বিষাক্ত সীসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
উন্মুক্ত পরিবেশে অবৈধভাবে ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ
দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির অবৈধ রিসাইক্লিংয়ের কাজ। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) এবং ইউনিসেফের যৌথ গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকা, সাভার, কামরাঙ্গীরচর, কেরানীগঞ্জ, জিঞ্জিরা, আশুলিয়া ও মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকাসহ সারা দেশে অন্তত ১১০০টির বেশি অবৈধ ও ভাসমান কারখানা গড়ে উঠেছে, যেখানে সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে ব্যাটারি ভাঙার কাজ চলছে।
এসডোর গবেষণার তথ্য বলছে, একটি সাধারণ লেড-অ্যাসিড ব্যাটারিতে ১৪ থেকে ২১ কেজি পর্যন্ত সীসা থাকে। বারবার অবৈজ্ঞানিক উপায়ে রিসাইকেল করার ফলে একটি ব্যাটারির আয়ুষ্কাল কমে যায় এবং প্রতিবারই দূষণ ছড়ায়। এসব কারখানায় শ্রমিকেরা খালি হাতে হাতুড়ি দিয়ে ব্যাটারি ভাঙে এবং উন্মুক্ত স্থানে সাধারণ চুলায় সীসা গলায়। এ ধরনের উন্মুক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত রিসাইক্লিংয়ের কারণে সীসার ক্ষুদ্র কণা ধোঁয়া হিসেবে বাতাসে মিশে যাচ্ছে, যা শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করছে এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার বায়ুকে চরমভাবে বিষাক্ত করে তুলছে।
কেবল বায়ুদূষণই নয়, যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব অবৈধ ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানাগুলো মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানির জন্যও এক ভয়াবহ নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আইসিডিডিআর,বি এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন সময়কার জরিপ ও বায়োমনিটরিং টেস্টের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এসব কারখানার আশপাশের মাটি ও পানিতে বিপজ্জনক মাত্রায় সীসা ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি রয়েছে। ব্যাটারি ভাঙার পর এর ভেতরে থাকা অত্যন্ত ক্ষতিকর অ্যাসিড কোনো ধরনের শোধন ছাড়াই সরাসরি মাটিতে, নর্দমায় বা পাশের জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হয়। ফলে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা চিরতরে নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানি মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে।ব্যাটারিতে থাকা ক্ষতিকর ভারী ধাতু যত্রতত্র ফেলার কুফল ও পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নাদিরুজ্জামান মণ্ডল চরচাকে বলেন, “ব্যাটারিতে সীসা থাকে, ক্যাডমিয়াম থাকে, বিশেষ করে সীসার পরিমাণটা বেশি থাকে।
নিয়ম মেনে যদি এটা রিসাইকেল না করা হয়, ডিসপোজ না করা হয়, তা শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির সাথে মিশে যায় যায়। প্রকৃতিতে সীসা চলে আসলে মাটি, পানি ইত্যাদিতে পুরোটা ছড়িয়ে যায়। সেখান থেকে শস্যের মধ্যে চলে আসে, মাছের মধ্যে চলে আসে, সবমিলিয়ে আমাদের ফুড চেইনে সীসা, ক্যাডমিয়াম, লিথিয়ামের মতো ক্ষতিকর ভারী ধাতু চলে আসে।”
খাদ্যের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত এসব ক্ষতিকর ধাতু মানবদেহে প্রবেশ করায় ক্যানসারের মতো মারাত্মক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “বেশির ভাগ ভারী ধাতুই কার্সিনোজেনিক; অর্থাৎ, ক্যানসার উৎপাদন করে। এজন্যই আমাদের এখন দেখবেন ঘরে ঘরে ক্যানসার, এটা মহামারি আকার ধারণ করে গেছে। রোগ হলো তারপরে চিকিৎসা করব, এটা একটা বড় সমস্যা। রোগ হওয়ার আগেই আটকানো দরকার। এই জনসচেতনতার বিষয়গুলা শুরুতেই জানা দরকার, স্কুল লেভেলে বইপুস্তকেই থাকা দরকার।”
রিসাইকেল কীভাবে করার কথা?
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) ও ব্যাসেল কনভেনশন লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড তৈরি করেছে। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী বর্জ্য লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি পরিবেশসম্মতভাবে ব্যবস্থাপনার তিনটি ধাপ আছে। সেগুলো হলো–নিরাপদ সংগ্রহ, সঠিক পরিবহন ও বিজ্ঞানসম্মত রিসাইক্লিং। সংগ্রহের সময় ব্যাটারি কোনোভাবেই ভাঙা বা ফুটো করা যাবে না। অ্যাসিড নিষ্কাশনের কাজ কেবল অনুমোদিত কারখানাতেই করতে হবে। সংরক্ষণের জায়গাটি হতে হবে আচ্ছাদিত, বাতাস চলাচলের সুবিধাযুক্ত। শর্ট সার্কিট ও অ্যাসিড ছিটকে পড়া রোধে ব্যাটারির ক্যাপ ও টার্মিনাল ঢেকে রাখতে হবে এবং কর্মীদের অ্যাসিড-প্রতিরোধী সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই) পরিধান নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবহনের জন্য ব্যাটারিগুলোকে প্যালেটের ওপর সোজা করে সাজিয়ে, স্তরগুলোর মাঝে পুরু কার্ডবোর্ড ব্যবহার করে প্লাস্টিক র্যাপ দিয়ে শক্তভাবে বাঁধতে হবে। ভাঙা বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাটারিগুলো বিশেষ পলিথিন ব্যাগ বা তরল-অভেদ্য পাত্রে রেখে পরিবহন করতে হবে। পরিবহন কাজে ‘ক্ষয়কারক’ পদার্থের সতর্কতা চিহ্নযুক্ত অনুমোদিত যানবাহন ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। যান চলাচলের রুট হিসেবে ঘনবসতিপূর্ণ বা সংবেদনশীল এলাকা এড়িয়ে চলতে হবে।
সর্বশেষ ধাপে, ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের কাজ কেবল আধুনিক প্রযুক্তি ও বিষাক্ত গ্যাস নিষ্কাশন ব্যবস্থাসম্পন্ন নিবন্ধিত কারখানায় সম্পন্ন করতে হবে। ব্যাটারির সালফিউরিক অ্যাসিডকে রাসায়নিকভাবে প্রশমিত করে ফিল্টার কেক তৈরি করতে হবে। তারপর সেটিকে ল্যাব পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে মাটিতে পুঁতে ফেলা বা শোধন করতে হবে। শ্রমিকদের সীসার বিষক্রিয়া থেকে বাঁচাতে প্রতিদিন পোশাক পরিবর্তন, রেসপিরেটর ব্যবহার ও শাওয়ার নেওয়ার মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা আবশ্যক।
ব্যাটারি প্রক্রিয়াজাতকরণে কাজ করছেন শ্রমিকরা। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে ব্যাটারি রিসাইকেল নীতিমালায় কী আছে
লেড-এসিড ব্যাটারি সুষ্ঠুভাবে পুনঃব্যবহারোপযগী করা বা ধ্বংস করার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো এসওপি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং সিস্টের) বা নীতিমালা নেই দেশের কোনো আইনে। তবে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১-এ ই-বর্জ্য প্রস্তুতকারক ও সংযোজনকারীর কিছু দায়িত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি যেহেতু ই-বর্জ্যের আওতাধীন, সেহেতু দায়িত্বগুলো এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
বিধিমালায় বলা হয়েছে ই-বর্জ্য উৎপাদনকারী পণ্য প্রস্তুতকারক ও সংযোজনকারীকেই উক্ত পণ্য পুনঃব্যবহারোপযোগী বা ধ্বংস করার জন্য সংগ্রহ করতে হবে। মেরামতকারী, চূর্ণকারী বা পুনঃব্যবহার উপযোগীকরণকারী বরাবর ই-বর্জ্য সরবরাহ করার দায়িত্বও তাদের নিতে হবে। পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়–এমনভাবে ই-বর্জ্য সংরক্ষণ, মজুত, পরিবহন আর চূর্ণ করার দায়িত্ব নেবে ই-বর্জ্য চূর্ণকারীরা। ই-বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকারীকে আন্তর্জাতিক মান বা সরকারের জারি করা নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
প্রত্যেক ই-বর্জ্য প্রস্তুতকারক, সংযোজনকারী, বড় আমদানিকারক, ব্যবসায়ী, মজুতকারী, পরিবহনকারী, মেরামতকারী, সংগ্রহ কেন্দ্র, চূর্ণকারী, পুনঃব্যবহারোপযোগীকরণকারী, নিলাম বিক্রেতা এবং রপ্তানিকারককে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন গ্রহণ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১ এ।
নিয়ম কাগজে আছে বাস্তবে নেই
এসডো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ২০২৪-২০২৫ সালের পর থেকে প্রশাসনের নজরদারি এড়াতে এবং আইনি পদক্ষেপের ভয়ে এসব ভাসমান কারখানা নির্দিষ্ট এলাকা থেকে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশের আনাচে-কানাচে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা অনুযায়ী লেডযুক্ত ব্যাটারি প্রস্তুতকারক ও সংযোজনকারীকে তা পুনঃব্যবহারোপযোগী বা ধ্বংস করার জন্য সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু আইনের কথা কাগজে-কলমে থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর কোনো দৃশ্যমান প্রয়োগ নেই।
এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা ইপিআরে ব্যাটারি যুক্ত করা প্রয়োজন উল্লেখ করে চরচাকে বলেন, “এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ব্যাটারি রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়াকে একটি নিয়মতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। আইনের কঠোর বাস্তবায়ন, ব্যাটারি আমদানির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট শুল্কনীতি প্রণয়ন এবং সঠিক পরিসংখ্যান বা ডেটাবেজ তৈরি করতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। দেশে ব্যাটারি আমদানির সুনির্দিষ্ট কোনো ডেটাবেজ বা এইচএস কোড না থাকায় সরকার যেমন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি দূষণকারীদের চিহ্নিত করতেও ব্যর্থ হচ্ছে।”
দেশে হাতেগোনা মাত্র চার-পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে ও পরিবেশের নিয়ম মেনে ব্যাটারির সীসা রিসাইক্লিং করলেও শত শত অবৈধ কারখানা যত্রতত্র পরিবেশ দূষণ করে চলেছে বলে চরচাকে জানিয়েছেন রহিমা আফরোজ ব্যাটারির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মেজর (অব.) এ কে এম নিয়ামুল হক। তিনি বলেন, “প্রত্যেকটা জেলায় কিছু নির্দিষ্ট এলাকা তৈরি করতে হবে। সরকার থেকে সার্কুলার করে দেওয়া উচিত যে, এসব নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে কেউ সীসা রিসাইকেল করতে পারবে না। নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে ঢোকালে ভ্যাট-ট্যাক্স নেওয়া যাবে, সরকার রাজস্ব পাবে এবং নজরদারিও করা যাবে। মানুষ কর্মসংস্থানের জন্য যেখানে সুযোগ পায় ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাই এদের হঠাৎ করে বন্ধ না করে নির্দিষ্ট জায়গায় এনে কাজে লাগালে সরকারও লাভবান হবে।”
অন্যদিকে বিদেশ থেকে ব্যাটারি আমদানির ক্ষেত্রেও কঠোর নজরদারির তাগিদ দিয়েছেন নিয়ামুল হক। পুরনো ও অকেজো লিথিয়াম ব্যাটারি দেশে প্রবেশ করছে কি না, সে বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “ইমপোর্টারদের বিএসটিআই সার্টিফিকেট নিতে হবে, তাহলে ভালো ব্যাটারিটাই দেশে ঢুকবে। ভালো ব্যাটারির জায়গায় যদি খারাপ ব্যাটারি ঢোকে, ১৫-২০ বছর লাইফের ব্যাটারি দেখা যাবে এক বছর পরই নষ্ট হয়ে যাবে। পরিবেশ অধিদপ্তর লাইসেন্স দেওয়ার সময় ব্যাটারি অ্যাসোসিয়েশনের মেম্বারশিপ বাধ্যতামূলক করলেও পরে তা চেক করে না। পরিবেশ অধিদপ্তর, বিএসটিআই, শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সবার সম্মিলিত সমন্বিত উদ্যোগ না হলে এটা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।”
ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে শিশু ও গর্ভবতী নারী। ছবি: সংগৃহীত
সীসার বিষক্রিয়ায় হুমকিতে শিশু ও গর্ভবতী নারী
সীসার বিষক্রিয়া কেবল সরাসরি দূষণের শিকার হওয়া ব্যক্তিদেরই ক্ষতি করছে না, বরং এটি মায়ের শরীর থেকে অনাগত সন্তানের শরীরেও প্রবেশ করে আন্তঃপ্রজন্মগত বিপর্যয় ডেকে আনছে। গর্ভবতী নারীরা যখন সীসা দূষিত এলাকার বাতাসে শ্বাস নেন, তখন এই ক্ষতিকর ধাতু তাদের রক্তে মিশে যায় এবং তা সরাসরি ভ্রূণের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। গর্ভাবস্থায় শিশুর স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের গঠন যখন একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে, ঠিক তখনই সীসার অনুপ্রবেশ তাদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ফেলে। ফলে মাতৃগর্ভে থাকার সময় থেকেই একটি শিশু শারীরিক ও মানসিকভাবে স্থায়ী ক্ষতির শিকার হয়, যা জন্মের পর তার স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাকে বাধাগ্রস্ত করে।দেশে সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিয়ন্ত্রিত ও অনিরাপদ পুনর্ব্যবহারের কারণে পরিবেশ ও মানবদেহে সীসা দূষণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন আইসিডিডিআর,বি-র গবেষক ও বিজ্ঞানী ড. মাহবুব উল আলম। চরচাকে তিনি বলেন, “অনিয়ন্ত্রিত রিসাইক্লিংয়ের ফলে ক্ষতিকর সীসা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে, যা মাটি ও আশপাশের পরিবেশ দূষিত করার পাশাপাশি শিশু, গর্ভবতী নারীসহ সব বয়সী মানুষের রক্তের সীসার মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ওপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। গর্ভবতী মায়ের রক্তে সীসার মাত্রা বৃদ্ধি পেলে তা বাচ্চার শরীরে পৌঁছাতে পারে। ফলে শিশুর বুদ্ধিমত্তা, মানসিক বিকাশ, আইকিউ এবং সার্বিক কগনিটিভ ডেভেলপমেন্ট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
সীসা দূষণের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতির কথা উল্লেখ করে মাহবুব উল আলম বলেন, “মানবদেহের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ; যেমন–হার্ট, লিভার, কিডনি ও মস্তিষ্কে সীসার সরাসরি ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। ফলে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি থাকে। শরীর প্রতিনিয়ত সীসার সংস্পর্শে এলে (ক্রনিক এক্সপোজার) বয়সবৃদ্ধির সাথে সাথে হৃদরোগের মতো জটিল ব্যাধির ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যায়।”
কর্তৃপক্ষ যা বলছে
সীসা ও ব্যাটারির অবৈধ রিসাইক্লিংয়ের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মুহাম্মদ সোলায়মান হায়দার। তিনি চরচাকে জানান, অবৈধ ভাটি বা কারখানার খবর পাওয়ামাত্রই তারা ঘটনাস্থলে অভিযান চালান এবং ব্যবহৃত ও ভাঙা ব্যাটারি জব্দ করে নিজেদের কার্যালয়ে নিয়ে আসেন। তবে এই অবৈধ কারবারিদের পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ, তারা এক স্থানে বাধার মুখে পড়লে অন্য কোনো গোপন স্থানে গিয়ে পুনরায় ভাটি বসিয়ে এই কাজ শুরু করে।
সোলায়মান হায়দার বলেন, “যেখানেই এ ধরনের খবর পাওয়া যায়, আমরা লোক পাঠাই। কোনোভাবেই তাদের এসব ভাটি পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।”
অবৈধ ব্যাটারি ভাঙার সাথে জড়িতদের আটকের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের এই শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, অপরাধীদের হাতে-নাতে আটক করার সুযোগ খুব কমই পাওয়া যায়। তিনি বলেন, “আমরা তো আর একা যেতে পারি না, ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ নিয়ে যেতে হয়; তারা টের পাওয়ামাত্রই পালিয়ে যায়।”
ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ে হুমকির মুখে পরিবেশ। ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীতে অবৈধ ব্যাটারি ভাঙা ও সীসা পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের কার্যক্রম গোপনীয়তার সাথে পরিচালিত হচ্ছে জানিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীব চরচাকে বলেন, “সিটি করপোরেশন বিভিন্ন জায়গায় অবৈধভাবে এই কাজগুলো করা হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গোপনীয় স্থানে তারা এই কাজগুলো করে থাকে। কোনো সাইনবোর্ড বা নেমপ্লেট থাকে না এসব কারখানার বাইরে। মোটাদাগে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্যও নেই যে, ঠিক কোন জায়গায় এগুলো করা হয়।”সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় দাবি করে ডিএসসিসির এই কর্মকর্তা জানান, “কারো মাধ্যমে তথ্য পেলে আমরা সাথে সাথে ব্যবস্থা নেই। মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল এলাকায় কিছু ইনফরমাল মার্কেটে ওরা ব্যাটারি পুড়িয়ে কালো ধোঁয়া সৃষ্টি করে পরিবেশের ক্ষতি করছিল, আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেটদের সাথে নিয়ে এগুলো বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়েছি। আমাদের আন্তরিকতার অভাব নেই। কিন্তু তথ্যের অভাবে আমরা সবসময় জানতে পারি না কোথায় কী হচ্ছে। জানতে পারলেই আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাই।”