আগামী জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রথম ধাপের ভোট আয়োজনের লক্ষ্য নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। জুনের মধ্যে পাঁচ ধাপে দেশের প্রায় ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে রমজানের আগে অন্তত তিন ধাপে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০টি ইউপিতে ভোট নিতে চায় কমিশন।
আগামীকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় ইসির ১৩তম কমিশন সভায় নির্বাচনের ধাপ ও সময়সূচি নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে। সভা শেষে রোডম্যাপ ঘোষণা করবে ইসি।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ চরচাকে বলেন, “আগামীকাল ইউপি নির্বাচনের রোডম্যাপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আপনাদের (সাংবাদিকদের) জানিয়ে দেব। পাঁচ ধাপে ইলেকশন করার বিষয়ে আলোচনা হবে।”
দীর্ঘ বিরতির পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। সর্বশেষ ২০২১ সালে নূরুল হুদা কমিশন ৪ হাজার ৫০১টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন আয়োজন করে। ২০২৪-এর জুলাইয়ে ১৯৫টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলেও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মুখে নির্বাচন বাতিল করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েই সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়র, জেলা ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের অপসারণ করে এবং সেখানে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। নাগরিক সেবা ব্যাহত হবে–এই ভাবনা থেকে তখন যদিও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের অপসারণ করা হয়নি; তবে আওয়ামী লীগপন্থী চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা গা ঢাকা দেওয়ায় কার্যত ইউনিয়ন পরিষদগুলোও নির্বাচিত সদস্যহীন অবস্থায়ই ছিল।
এ অবস্থায় ইউপিসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন আয়োজনের সময়সূচি নির্ধারণে সরকারের সঙ্গে আলোচনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার সূচি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে কমিশনকে।
এর আগে নভেম্বর থেকে ইউপি নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা পুনর্বিবেচনা করা হয়। এবার জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে পাঁচ ধাপে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা করছে ইসি।
রমজানের আগেই আড়াই হাজার ইউপিতে ভোট
আগামী বছরের রমজানের আগে অন্তত তিন ধাপে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে ইসির। প্রথম ধাপের ভোট হতে পারে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে। দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে জানুয়ারির শেষে এবং তৃতীয় ধাপ ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। ফাইল ছবি
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ চরচাকে বলেন, “তিনটা (ধাপ) ঈদের আগে হবে, মোটামুটি দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার।” জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রথম ধাপের ভোট আয়োজনের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “ফার্স্ট উইকে না, আমরা সেকেন্ড উইকে নির্বাচন শুরু করব।”
প্রথম তিন ধাপে কোন কোন এলাকার ইউপিতে ভোট হবে, সে বিষয়ে কমিশন সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান এই নির্বাচন কমিশনার। তিনি বলেন, “তিনটা বেল্ট যেখানে সুবিধা হবে, কালকে আমরা এটা ঠিক করব।”
আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। রহমানেল মাছউদ বলেন, “আমার ধারণা, জুনের মধ্যে আমরা শেষ করে দিতে পারব।”
দেশে প্রায় ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ২৭২টি ইউপিতে আইন অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে এর আগে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। প্রসঙ্গত, বাকি ৩০৮টি আসনে সীমানা ও আইনি জটিলতা আছে।
ভোটের ৩৫ দিন আগে তফসিল
পাঁচ ধাপে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনার পাশাপাশি ভোটের আগে তফসিল ঘোষণার সময়ও নির্ধারণ করতে যাচ্ছে ইসি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি ধাপের ভোটের অন্তত ৩৫ দিন আগে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা তফসিল ঘোষণা করবেন।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “পাঁচ ধাপে ভোট সম্পন্ন করার রোডম্যাপ। সে অনুযায়ী ভোটের আগে ৩৫ দিন হাতে রেখে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা তফসিল ঘোষণা করবেন।”
অর্থাৎ, প্রতিটি ধাপের ভোটের জন্য আলাদা তফসিল ঘোষণা করা হবে। সেক্ষেত্রে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রথম ধাপের ভোট আয়োজন করতে হলে তার ৩৫ দিন আগে, অর্থাৎ ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বা দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতেই তফসিল ঘোষণা করতে হবে।
এর আগে নভেম্বর থেকে ইউপি নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা করেছিল ইসি। সেপ্টেম্বরে প্রাক্-প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে সাত ধাপে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল। তখন প্রথম ধাপের সম্ভাব্য ভোটের তারিখ ছিল ১২ নভেম্বর।
পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষা, শিক্ষকদের পরীক্ষাসংক্রান্ত দায়িত্ব এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নভেম্বর-ডিসেম্বরে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা থেকে সরে আসে কমিশন। সরকারের পক্ষ থেকেও নির্বাচনের উপযুক্ত সময় নির্ধারণের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
এক উপজেলায় একসঙ্গে সব ইউপিতে ভোট
ইউপি নির্বাচনে এলাকাভিত্তিক ভোট আয়োজনের পরিকল্পনাও করছে ইসি। একটি উপজেলায় একই সময়ে সব ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে যেসব ইউপিতে মেয়াদ বা আইন-সংক্রান্ত জটিলতা আছে, সেগুলো ব্যতিক্রম হিসেবে বাদ থাকতে পারে।
এলাকাভিত্তিক নির্বাচনের পরিকল্পনা তুলে ধরে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এক উপজেলায় সব একসঙ্গে শেষ করব। শুধু ওইটুকু বাদ থাকবে, যেটার এখনো মেয়াদ শেষ হয়নি। এ রকম ব্যতিক্রম থাকলে সেটা বাদ থাকবে।”
ইউপি নির্বাচনে এলাকাভিত্তিক ভোট আয়োজনের পরিকল্পনাও করছে ইসি। ছবি: উইকিমিডিয়া
ভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে কোন উপজেলা বা অঞ্চল দিয়ে নির্বাচন শুরু হবে, তা কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। প্রথম তিন ধাপে কোন এলাকার নির্বাচন হবে, সে বিষয়ে সোমবারের সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন এই নির্বাচন কমিশনার।
“উপজেলা বাছাই করতে গিয়ে সদর উপজেলা হলে সদর উপজেলার সব ইউপিতে ভোট হবে। যেখানে সদর উপজেলা নেই, সেখানে কাছাকাছি অন্য এলাকা নেব”–বলেছেন আব্দুর রহমানেল মাছউদ। তাদের পরিকল্পনার ভিত্তি নিয়েও একটা ধারণা দিলেন, “আমরা চেষ্টা করব, যে (ইউপিগুলোর) সময় হয়নি, সেই জায়গায় (উপজেলা) যদি ১২টা (ইউপি) থাকে…অনুমান করে বলছি, ১০টা করা যায়, দুইটা করা যায় না–তাহলে দুইটা বাদ দেব। আর যদি বলা হয়, ১০টাতেই করা যায়…তাহলে এই পদ্ধতিতে আমরা এগোব।”
এর আগে ইসির পরিকল্পনায় ভৌগোলিক অবস্থান, আবহাওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা ও ধর্মীয় উৎসব বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলা হয়েছিল। অঞ্চলভেদে ভোটের সময় নির্ধারণের এই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনায় সুবিধা নিশ্চিত করা।
পৌরসভা ভোটের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা
ইউপি নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণের পাশাপাশি কাছাকাছি সময়ে পৌরসভা নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টিও বিবেচনা করছে ইসি। আগামীকাল ১৩তম কমিশন সভায় এটিও আলোচ্যসূচিতে রয়েছে। আব্দুর রহমানেল মাছউদ চরচাকে বলেন, “স্থানীয় সরকারের বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর আলোচনাও হবে। ইউপি ভোটের পরে বা কাছাকাছি সময়ে পৌরসভা নিয়ে আলোচনা হবে।”
দেশের ৩৩০টি পৌরসভার ৩২০টিই বর্তমানে নির্বাচন উপযোগী। সীমানা নির্ধারণ, ভোটার তালিকা ও আইনি জটিলতায় বাকি ১০টির ক্ষেত্রে নির্বাচন থমকে আছে। সর্বশেষ ২০২০ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২১ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও এপ্রিলে ছয় ধাপে পৌরসভাগুলোতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।