মনিরুল ইসলাম (ছদ্মনাম) বিয়ে করেছেন ছয় মাস আগে। অল্প সময়ের মধ্যেই স্ত্রীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তালাকের সিদ্ধান্তে নেন। তালাকের পর দেনমোহরের পাঁচ লাখ টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন মনিরুল ইসলাম। তার স্ত্রীর পরিবার থেকে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। বিয়ের পরে কাবিননামা স্ত্রীর কাছেই ছিল। ওই কাবিননামায় দেনমোহর লেখা ছিল ২০ লাখ টাকা।
কাবিনানামায় দেনমোহরের অঙ্ক কীভাবে বদলে গেল তা সুরাহা করতে দুই সপ্তাহ ধরে কাজী অফিস আর আইনজীবীর কাছে গিয়েছেন মনিরুল ইসলাম। তার দাবি, জাল কাবিননামা বানিয়ে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছেন তার সাবেক স্ত্রী। শেষ পর্যন্ত কাজী অফিস থেকে আসল কাবিননামা বের করতে সক্ষম হন তিনি।
জাল কাবিননামা বানিয়ে এমন প্রতারণার ঘটনা অহরহ ঘটছে। কীভাবে বানানো হয় এসব জাল কাবিননামা? খোঁজ নিতেই উঠে এল, রাজধানীর খুব পরিচিত একটা জায়গা, নীলক্ষেতের নাম। ঢাকার নীলক্ষেতের কম্পিউটারের দোকানগুলোতে পরিচয় গোপন করে এই প্রতিবেদক জাল কাবিননামা বানানোর চেষ্টা করেছেন। আর তাতেই বেরিয়ে এসেছে চমকপ্রদ সব তথ্য।
সিল-সই সবই নকল
নীলক্ষেতের মোট ছয়টি কম্পিউটারের দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, এখানে জাল কাবিননামা বানানো যায় কি না। জাল কাবিনের কথা জিজ্ঞেস করলে প্রথমে একটু ইতস্তত বোধ করে দোকানের কম্পিউটার অপারেটররা। পরে বিশ্বস্ত মনে হলে পাশে বসিয়ে জানায় জাল কাবিন বানানোর খরচ আর আদ্যোপান্ত।
দোকানের কম্পিউটারে একটি নিকাহনামার নমুনা থাকে। সেখানে নিবন্ধিত কাজীর সিল ও সই তৈরি আছে। একটি দোকানে গিয়ে দেখা গেল, পোস্তগোলা অঞ্চলের কাজীর সই ও সিল দেওয়া একটি সাদা কাগজের নিকাহনামা। আসল নিকাহনামা হয় নীলচে কাগজে। তবে এর ফটোকপিও ব্যবহার করা যায় প্রমাণ হিসেবে। ফটোকপি তৈরির জন্য কম্পিউটারে সাদা নিকাহনামার নমুনা রাখা আছে, যা জাল।
নীলক্ষেতের আল-আমিন কম্পিউটার্স (ছদ্মনাম) ও রয়েল কম্পিউটার্সে (ছদ্মনাম) গিয়ে এরকম সাদা নিকাহনামা পাওয়া গিয়েছে। পোস্তগোলার কাজী কাওসার আহমেদ এর সঙ্গে জড়িত কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু্ই জানেন না। তার সইয়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে বলেন, “হয়তো কাজী অফিসে এসে কেউ ছবি তুলে নিয়ে নকল করেছে।”
নিকাহনামার বাম পাশে সরকারি সিল দিতে হয়। নকল নিকাহনামায় তাও দেওয়া আছে। একটি দোকানের কম্পিউটার অপারেটর বলেন, “আমাদের এখানে চাইলে সব কিছুরই নকল সিল বানানো সম্ভব। যেই এলাকার কাবিননামা লাগবে, সেখানের কাজীর সিলও আমরা বানায়ে দিতে পারব।”
আসল কাবিননামার কাগজেই জাল নথি তৈরি করা যায়। ছবি: চরচা
দাম এলাকা ও কাগজভেদে
নীলক্ষেতের ইমন কম্পিউটার্সে (ছদ্মনাম) গিয়ে জানা যায় খরচের তথ্য। জাল কাবিননামার কাগজের মানভেদে দাম ভিন্ন। কেমন মান তা জানতে চাইলে তিন ধরনের কাগজ বের করে দেখান দোকানের একজন কর্মী। তার দাবি, আসল কাবিননামার কাগজে জাল নথি তৈরি করা যায়। এ কাগজ নাকি আবার কাজীরাই সরবরাহ করেন। এ মানের কাগজে খরচ গুনতে হয় কাবিননামা প্রতি ৬ হাজার টাকা। এর থেকে কম মানের আরও দুই ধরনের কাগজ আছে। যেগুলোর রঙ ভিন্ন। আসল কাবিননামার মতো নয়। তবে কেউ চাইলে কাবিননামা বলে চালিয়ে দিতে পারবে। এগুলোতে খরচ পড়ে যথাক্রমে ৪ হাজার টাকা ও ২ হাজার টাকা।
দোকানের কম্পিউটার অপারেটর বলেন, “একদম অরিজিনালের মতো কাবিননামা চাইলে দামিটা নিতে হবে। কোর্ট-কাছারিতেও কেউ ধরতে পারবে না। আর এমনিতে খুচরা কাজের জন্য কম দামিটা নেয় অনেকে। আমাদেরকে কাজীরাই এসব কাগজ দেয়।”
দামের আরও তারতম্য ঘটে এলাকাভেদে। জাল কাবিননামা বানানোর জন্য নির্দিষ্ট কিছু এলাকার কাজীর সিল ও সকল সই তৈরি করা থাকে। ইমন কম্পিউটার্সে ঢাকার লালবাগ, পোস্তগোলা, দক্ষিণখান ও খিলক্ষেত এলাকার সিল তৈরি করা রয়েছে। কেউ যদি এসব এলাকার কাজীর সই দিয়ে জাল কাবিননামা বানাতে চায়, তাহলে খরচ কম। কিন্তু নিজের পছন্দমতো এলাকার কাজীর স্বাক্ষর দিয়ে কাবিননামা বানাতে চাইলে খরচ বেশি পড়বে।
এক্ষেত্রে যে যেই এলাকার কাজীর সই করা কাবিননামা চান, ওই এলাকার কাজীর নকল সিল বানানো হয়। নকল সইও বানানো হয়। এর জন্য টাকা বেশি দেওয়া লাগে।
কারা বানায় জাল কাবিননামা
পরিচয় গোপন করে দোকানগুলোর কর্মচারীদের সাথে আলাপচারিতায় জানা গিয়েছে নানা তথ্য। কারা এসব জাল কাবিননামা বানায়— এমন প্রশ্নে একজন বলেন, “আমাদের প্রধান কাস্টমার কম বয়সী আর অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকা। তারা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যায়, হোটেলে থাকে। এসবের জন্য অনেক জায়গায় কাবিননামা দেখতে চায়। অবিবাহিত যুগলরা একসাথে থাকার, সময় কাটানোর বৈধতা পায় এই কাবিননামার কারণে। আবার অনেকে নিজের জামাই বা বউরে ফাঁসানোর জন্য কাবিননামা বানায়।”
ঢাকা শহরে অনেক অবিবাহিত যুগল একসাথে থাকার জন্য (লিভ ইন) বাসা ভাড়া পায় না। বাড়িওয়ালারা নিরাপত্তার স্বার্থে অবিবাহিত যুগলকে বাসা ভাড়া দিতে চায় না। বাসা ভাড়া নেওয়ার জন্যও অনেকে জাল কাবিননামা বানায় বলে জানান ওই কম্পিউটার অপারেটর।
জাল কাবিননামা তৈরি এবং এ সংক্রান্ত জালিয়াতির আইনি প্রতিকার নিয়ে আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাইনুল ইসলাম চরচাকে জানান, বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১ এবং ধর্মীয় আইন অনুযায়ী বিয়ে হলেও প্রতারণার উদ্দেশ্যে বর বা কনে উভয় পক্ষই জাল কাবিননামার আশ্রয় নেয়।
জাল কাবিননামা শনাক্তে কাজী অফিসের বালাম খাতা বা মূল রেজিস্টারের সাথে মিলিয়ে দেখার পরামর্শ দেন এই আইনজীবী। কেউ এমন প্রতারণার শিকার হলে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪২৬ ও ৪০৬ ধারায় প্রতারণা মামলা, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৩০(গ) ধারা, মানহানি এবং নারী ভুক্তভোগী হলে ধর্ষণের মামলা দায়েরের আইনি সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কাবিননামা নিবন্ধনের অনলাইন ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে মাইনুল বলেন, “এটা অনলাইন বেসড এখনো হয়নি। সরকারের ভবিষ্যতে একটা চিন্তাভাবনা আছে কিন্তু আমাদের যে ক্লায়েন্টগুলো আসে আমাদের যে মামলা হয় বা আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে এখন আমরা যতটুকু জানি যে এটা আসলে অনলাইনে হয় নাই।”
জাল কাবিননামার বিষয়ে চরচার কথা হয় নীলক্ষেত কাজী অফিসের নিবন্ধক দুলাল হোসেনের সাথে। তিনি ১৮ নাম্বার ওয়ার্ডের কাজী। জাল কাবিননামা বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি সরাসরি জানান, এ ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না। তবে নীলক্ষেতে যে অহরহ জাল কাবিননামা বানানো হচ্ছে, তার প্রমাণ দেখানো হলে তিনি বলেন, “আগে শুনেছিলাম বানানো হয়। তবে এখানে আমাদের কোনো হাত নাই।”
বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১ এবং ধর্মীয় আইন অনুযায়ী বিয়ে হলেও প্রতারণার উদ্দেশ্যে বর বা কনে উভয় পক্ষই জাল কাবিননামার আশ্রয় নেয়। ছবি: চরচা
জাল কাবিননামার যে কাগজ, তা কাজীরা সরবরাহ করে কি না, জানতে চাইলে দুলাল বলেন, “এটা কোনোভাবেই সম্ভব না। আমাদের রেজিস্ট্রি বই থাকে। এ বই থেকে পাতা ছিঁড়ে কাজীদের দেওয়ার কথা না। আর কয় দিন পর থেকে অনলাইনে রেজিস্ট্রার নাম্বার জমা দেওয়া শুরু হবে। এখন কেউ ভুয়া নাম্বার দিয়ে আর জাল কাবিননামা বানাতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।”
নীলক্ষেতে জাল কাবিননামা তৈরি ও জালিয়াতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পুলিশের কাছে নেই বলে চরচাকে জানিয়েছেন নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আইয়ুব। তিনি বলেন, “না, এরকম কোনো কমপ্লেন আমরা পাইনি। আমরা তো ওরকম কোনো ইনফরমেশন দেখতে পাই নাই বা কেউ অভিযোগও করে নাই।”
তবে অনুসন্ধানে পাওয়া জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদি পুলিশের কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “আপনারা দিয়েন, তথ্য প্রমাণ থাকলে আমার হোয়াটসঅ্যাপে দিয়েন, আমরা ব্যবস্থা নেব।”
বিবাহ-তালাক রেজিস্ট্রি অনলাইনে কবে?
জাল কাবিননামার মাধ্যমে প্রতারণা, বাল্যবিয়ে ও গোপন বহুবিবাহ রোধে দেশের বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি অনলাইন ও ডিজিটাল করার পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। নীলক্ষেতের মতো জায়গায় সহজেই সিল-সই নকল করে ভুয়া কাবিননামা তৈরির সুযোগ বন্ধ করতেই এই ডিজিটাল রূপান্তর গ্রহণ করা হচ্ছে। নতুন এই ব্যবস্থায় অনলাইন বিবাহ নিবন্ধনের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন ডাটাবেজের সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা হচ্ছে। এর ফলে নিবন্ধনের সময় বর-কনের বয়স ও পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে ডাটাবেজে যাচাই করা সম্ভব হবে এবং জাল সনদ বানিয়ে কিংবা তথ্য গোপন করে প্রতারণা করা রোধ করা সহজ হবে।
ডিজিটাল নিবন্ধনের এই উদ্যোগটি বাস্তবায়নে সরকার প্রাথমিকভাবে প্রায় ১১ কোটি টাকা খরচে একটি বিশেষ পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করেছে। দেশের ১০টি জেলার ১০টি উপজেলার ১০২টি ইউনিয়নে পরীক্ষামূলকভাবে এই অনলাইন বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দেশের ১০টি জেলার ১০টি উপজেলার ১০২টি ইউনিয়নে পরীক্ষামূলকভাবে এই অনলাইন বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ছবি: চরচা
নির্বাচিত উপজেলাগুলো হলো- গাজীপুরের কালীগঞ্জ, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, শেরপুরের ঝিনাইগাতী, কুড়িগ্রাম সদর, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, নড়াইল সদর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা, সিলেট সদর, কক্সবাজারের চকরিয়া এবং কিশোরগঞ্জ সদর। চুক্তির নির্দিষ্ট মেয়াদ অনুযায়ী আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত এই পরীক্ষামূলক প্রকল্প পরিচালিত হবে। এটি সফল হলে পরবর্তীতে দেশব্যাপী এই অনলাইন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে প্রকল্পটি এখনো সফটওয়্যার ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি পর্যায় রয়েছে, সরাসরি মাঠপর্যায়ে উন্মুক্ত হয়নি। এটি কবে নাগাদ চালু ও বাস্তবায়িত হবে তা জানতে চাওয়া হলে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ড. মো. রেজাউল করিম চরচাকে বলেন, “এ বিষয়ে আমাদের প্রকল্প চলছে। এগুলা তো এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয় নাই, প্রকল্প কার্যক্রম হিসেবে এটা চলছে। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট শেষ হলে পুরোদমে সারাদেশে শুরু হবে।”