Advertisement Banner

ইরান পুড়ছে, রাশিয়া কেন চুপ করে দেখছে

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইরান পুড়ছে, রাশিয়া কেন চুপ করে দেখছে
ইরানকে পুড়তে দেখছে রাশিয়া। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

গত বছর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করেন। এই চুক্তির মাধ্যমে দেশ দুটি একে অপরকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। মস্কো এবং তেহরান এই চুক্তিকে দুই শাসনব্যবস্থার মধ্যে ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের পরিণতি হিসেবে উদ্‌যাপন করেছিল।

তবুও, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে (আট মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার) যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালায়, তখন রাশিয়া মূলত নিষ্ক্রিয় ছিল। পুতিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির হত্যাকে ‘মানবিক নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের সব নিয়মের এক নির্মম লঙ্ঘন’ বলে আখ্যা দেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘তাৎক্ষণিক উত্তেজনা প্রশমন, শত্রুতা বন্ধ এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া আবারও শুরু করার’ আহ্বান জানায়। কিন্তু কোনো বিবৃতিতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করা হয়নি বা ইরানকে রক্ষার জন্য রাশিয়ার হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার কথা তোলা হয়নি।

মস্কো হয়তো চুক্তির প্রতি অক্ষরে অক্ষরে অনুগত থেকেছে। কারণ এতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা নেই-কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পুতিনের যুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীকে সাহায্য করার মতো বাস্তবে কিছুই তারা করেনি। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এবং সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া সম্ভবত ইরানকে লক্ষ্য নির্ধারণের তথ্য এবং উন্নত ড্রোন কৌশল দিয়ে সহায়তা করেছে। কিন্তু এ ধরনের সীমিত সহায়তা বাস্তবে বড় কোনো পার্থক্য তৈরি করার সম্ভাবনা কম।

ইরানের ক্ষেত্রে ক্রেমলিনের এই অসহায়তা একটি পরিচিত ধারা অনুসরণ করে: যখন রাশিয়ার মিত্ররা বিপদে পড়ে, তখন মস্কো কঠোর ভাষায় বিবৃতি দেয়, কিন্তু তেমন কিছুই করে না। ২০২৩ সালের শেষ দিকে রাশিয়া তার মিত্র আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজানের মধ্যে স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করতে ব্যর্থ হয়, ফলে বাকু নাগর্নো-কারাবাখ প্রদেশের ওপর পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এক বছর পরে মস্কো বিদ্রোহী বাহিনীকে দামেস্কে বাশার আল-আসাদের সরকার উৎখাত করতে বাধা দেয়নি।

গত এক বছরের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র (ইসরায়েলের সঙ্গে) ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি ও ক্ষেপণাস্ত্র কারখানায় বোমা হামলা চালিয়েছে; উচ্চপদস্থ ইরানি কর্মকর্তা, সামরিক কমান্ডার ও পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের হত্যা করেছে। লাতিন আমেরিকায় মস্কোর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করেছে। কিন্তু রাশিয়া কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেনি। এই সব ঘটনাই বিশ্বজুড়ে পরিস্থিতি প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে রাশিয়ার শক্তির সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে।

তবুও, ইরানে চলমান যুদ্ধের এমন কিছু অনিচ্ছাকৃত পরিণতি রয়েছে যা রাশিয়ার জন্য লাভের। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, জ্বালানির দাম তত বাড়তে পারে, যা মস্কোকে অতিরিক্ত আয় করতে সাহায্য করবে। যা ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়তা করবে। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ঘোষণা করেছে যে দাম বৃদ্ধির গতি ধীর করার প্রচেষ্টায় তারা সাময়িকভাবে সমুদ্রে থাকা রুশ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করছে। একই সময়ে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন চীন হয়তো রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর আরও বেশি নির্ভরতার প্রয়োজন অনুভব করবে। আর অবশ্যই, ইরানের যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরেকটি বড় বিভ্রান্তি, যা এমন মূল্যবান সম্পদ ও মনোযোগ সরিয়ে নিচ্ছে যা ওয়াশিংটন তার ইউরোপীয় মিত্রদের এবং ইউক্রেনকে দিতে পারত। রাশিয়া হয়তো তার মিত্রদের রক্ষা করতে সক্ষম নয়, কিন্তু কৌশলগত ব্যর্থতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লাভ তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে এখনো দক্ষ।

ইরানে তেলের ডিপোতে হামলা। ছবি: রয়টার্স
ইরানে তেলের ডিপোতে হামলা। ছবি: রয়টার্স

পারস্পরিক স্বার্থের জোট

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মস্কো এবং তেহরান একটি অংশীদারত্ব গড়ে তোলার মধ্যে পারস্পরিক সুবিধা দেখতে পায়। তার আগের কয়েক শতাব্দী ধরে তারা মূলত ককেশাস অঞ্চল এবং ক্যাস্পিয়ান সাগরের আশপাশের ভূখণ্ডের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে মস্কো তার সোভিয়েত যুগের অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ও বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি বিক্রি করতে চেয়েছিল। তখন ইরান ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে বিধ্বস্ত এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় বিচ্ছিন্ন একজন প্রস্তুত ক্রেতা হিসেবে সামনে আসে।

১৯৯০-এর দশক এবং ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে রাশিয়া এমন কিছু সিস্টেম সরবরাহ করে যা আজও ইরানের সামরিক ভাণ্ডারের মূল উপাদান হিসেবে রয়েছে। যেমন: মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান, সু-২৪ স্ট্রাইক এয়ারক্রাফট, কিলো ক্লাস ডিজেল সাবমেরিন, টি-৭২ ট্যাংক এবং এস-২০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। পরে রাশিয়া টর-এম১ স্বল্প-পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাটারি এবং এস-৩০০ দীর্ঘ-পাল্লার ভূমি থেকে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেম পাঠায়। এই স্থানান্তরগুলো ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু এগুলো কখনোই জোট-স্তরের সামরিক একীভূতকরণ গঠন করেনি। রুশ অস্ত্র সরবরাহ ছিল বিচ্ছিন্ন এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার দ্বারা সীমাবদ্ধ। এতে সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যবস্থা যেমন এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—বা সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

এর পাশাপাশি, তেহরানকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও হেলিকপ্টার বিক্রি করলেও রাশিয়া একই সময়ে মিশর, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমান্তরাল নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখে। এই দেশগুলো সবাই ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী কিংবা প্রতিপক্ষ। ইরানি কর্মকর্তারা এ বিষয়টি বুঝতে ব্যর্থ হননি, এবং এর ফলে যে ক্ষোভ তৈরি হয় তা ছিল গভীর। ২০১০ সালে মস্কো পশ্চিমা চাপের কাছে নতি স্বীকার করে ইরানে এস-৩০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ স্থগিত করে এবং জাতিসংঘের সেই নিষেধাজ্ঞাগুলোর সঙ্গে সম্মতি জানায়, যেগুলোর বিরোধিতা তারা ব্যক্তিগতভাবে করেছিল। ওই সময়, রুশ নেতৃত্ব ইরানকে অংশীদারের চেয়ে বরং ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের সঙ্গে আলোচনায় কাজে লাগানোর একটি গুটি হিসেবে বিবেচনা করেছিল। এই সময়টায় মস্কো নিজেকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একজন দায়িত্বশীল স্থায়ী সদস্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মূল্যবান অংশীদার হিসেবে দেখাতে চেয়েছিল।

২০০০-এর দশকের শুরু থেকে রাশিয়া ও ইরান তাদের দুই অর্থনীতির মেরুদণ্ড তেল ও গ্যাস খাতে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু খুব কম সাফল্য পেয়েছে। রুশ তেল কোম্পানিগুলো ইরানে অনুসন্ধান ও উৎপাদনের কিছু সুযোগ বিবেচনা করেছিল, কিন্তু কোনো চুক্তি হয়নি। রুশ রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি গাজপ্রম পারস্য উপসাগরের একটি বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্রের উন্নয়নে অংশ নেওয়ার কথা ভেবেছিল। কিন্তু বাণিজ্যিক শর্তগুলো আকর্ষণীয় ছিল না। সামগ্রিকভাবে এই সময়ে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণও কম ছিল। বছরে প্রায় এক থেকে তিন বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করত। যেখানে মস্কো মূলত ইরানকে শস্য ও পারমাণবিক জ্বালানি বিক্রি করত এবং তেহরান প্রধানত ফল, সবজি ও বাদাম রাশিয়ায় রপ্তানি করত।

২০১৫ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ রাশিয়া ও ইরানকে আসাদ সরকারের সমর্থনে একটি কৌশলগত জোটে নিয়ে আসে। মস্কো এয়ার সাপোর্ট দেয় এবং তেহরান সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়ে ও লেবাননে তেহরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়া হিজবুল্লাহকে আসাদের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিতে উৎসাহিত করে সরকারপন্থী বাহিনীকে শক্তিশালী করে। কিন্তু পুতিনের ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু হওয়ার পরেই মস্কো ও তেহরানের সম্পর্ক একটি অনেক ঘনিষ্ঠ ও আরও ভারসাম্যপূর্ণ অংশীদারত্বে পরিণত হয়।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স

সম্পর্কের বন্ধন

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির পর ক্রেমলিন তার অংশীদারদের কাছ থেকে প্রধানত তিনটি জিনিস চেয়েছিল। সেগুলো হলো- কিয়েভের বিরুদ্ধে তার সামরিক অভিযানে সহায়তা করার ইচ্ছা ও সক্ষমতা, নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং রাশিয়ার বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করা এবং ইউক্রেনকে সমর্থনকারী পশ্চিমা জোটের বিরুদ্ধে চাপ ও প্রতিশোধের হাতিয়ার ব্যবহার করার ক্ষমতা। ইরান ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় এই তিনটি শর্তই পূরণ করেছে। এবং মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার প্রধান অংশীদার হয়ে উঠেছে। ইরানের দিকে মস্কোর এই ঝুঁকে পড়া ইসরায়েলের সাথে তার সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যারা ইউক্রেনের সাথে কিছু সামরিক প্রযুক্তি ভাগ করে নিতে শুরু করেছিল। কিন্তু ক্রেমলিন সিদ্ধান্ত নেয় যে তেহরানের সঙ্গে অংশীদারত্ব সেই মূল্য দেওয়ার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

ইউক্রেন যুদ্ধ ইরান-রাশিয়া নিরাপত্তা সম্পর্কের যুক্তিকে উল্টে দিয়েছে। প্রথমবারের মতো, ইরান রাশিয়ার কাছে অস্ত্রের নিট সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে। এর শুরুর দিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল শাহেদ সিরিজের ‘লয়টারিং মিউনিশন’ (এক ধরনের ড্রোন), যা রুশ বাহিনী ২০২২ সালের শরৎকাল থেকে তাদের ফুরিয়ে আসা সুনির্দিষ্ট-লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ পূরণ করতে মোতায়েন করতে শুরু করে। মস্কো দ্রুত শাহেদ-এর স্থানীয় উৎপাদন শুরু করে, অভ্যন্তরীণ যন্ত্রাংশগুলোকে দেশীয় সরবরাহ শৃঙ্খল এবং নিষেধাজ্ঞা-সীমাবদ্ধ ইলেকট্রনিক্সের উপযোগী করে পুনরায় নকশা করে এবং ইরানের মূল সরবরাহের তুলনায় উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর বিনিময়ে রাশিয়া ইরানকে নতুন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। যার মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু ইয়াক-১৩০ ট্রেইনার জেট এবং এমআই-২৮ অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ডজন খানেক স্পার্টাক সাঁজোয়া যান এবং ছোট অস্ত্র। ইরান সু-৩৫ ফাইটার জেট এবং পোর্টেবল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার চুক্তি করেছে। তবে সেগুলোর সরবরাহের অবস্থা অস্পষ্ট। নিরাপত্তা সহযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি সম্ভবত মহাকাশ, রাশিয়ার উৎক্ষেপণ অবকাঠামো এবং কক্ষপথ বিষয়ক দক্ষতা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০২৩ সালে, তৎকালীন সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম বার্নস সতর্ক করেছিলেন যে, রুশ টেকনিশিয়ানরা সরাসরি ইরানের স্পেস লঞ্চ ভেহিকেল প্রোগ্রাম এবং বৃহত্তর ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন প্রচেষ্টায় কাজ করছেন।

ইরান রাশিয়ার অর্থনীতিকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করতেও সাহায্য করেছে। গত এক দশকে, তেল বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর অবকাঠামো তৈরিতে তেহরান পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছে। ২০১০-এর দশকে ইরান তার তেলের রপ্তানি বাড়াতে ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া বহর তৈরি করেছিল—যা মূলত নিষিদ্ধ তেল বহনকারী ট্যাঙ্কারের একটি নেটওয়ার্ক। এর সাথে বীমা, অর্থ স্থানান্তর এবং একটি নিষিদ্ধ দেশের তেল পরিবহন ও বিক্রয়ের অন্যান্য দিকগুলো পরিচালনার জন্য আনুষঙ্গিক পরিষেবাও তারা গড়ে তুলেছিল। ২০২২ সাল থেকে রাশিয়া ইরানের এই পদ্ধতিগুলো গ্রহণ করেছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা একই অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করছে। মস্কো এরপর থেকে এই অবৈধ বাণিজ্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ইরান সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে তেল রপ্তানি করছে। একদিকে, রাশিয়ার এই ইরানি পদ্ধতি গ্রহণ শ্যাডো ফ্লিট ট্যাঙ্কারের সামগ্রিক সংখ্যা বাড়িয়ে ইরানের উপকার করেছে। এর ফলে এ ধরনের জাহাজ পরিচালনার খরচ কমেছে। কিন্তু অন্যদিকে, রাশিয়া প্রধানত চীন ও ভারতের কাছে তেল বিক্রি করে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে, যারা ছিল ইরানের লক্ষ্যবস্তু।

তা সত্ত্বেও, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে বাণিজ্য দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। যা বছরে প্রায় ২০০ কোটি ডলার থেকে বর্তমানে প্রায় ৫০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। মস্কো ইরানকে অন্যভাবেও সাহায্য করেছে। ২০২৩ সালে ক্রেমলিন ইরানকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সদস্য করার জন্য চূড়ান্ত প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। পরের বছর, মস্কো তেহরানকে ব্রিকস-এর বর্ধিত জোটে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য লবিং করেছিল, যার মূল সদস্য ছিল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। গত বছরের মে মাসে, রাশিয়া ইরান এবং ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের (যার মধ্যে রয়েছে আর্মেনিয়া, বেলারুশ, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান এবং রাশিয়া) মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের আয়োজন করে। ক্রেমলিন কিছু ইরানি প্রক্সিদের, বিশেষ করে হুথি বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়ে তাদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার ইচ্ছাও দেখিয়েছে।

পুড়ছে ইরান। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
পুড়ছে ইরান। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

সুযোগ কাজে লাগানো

তবে তেহরান ও মস্কোর সম্পর্ক যতই গভীর হোক না কেন, পুতিনের প্রভাবের সীমাবদ্ধতা এবং তার অংশীদারদের রক্ষা করার সক্ষমতার অভাব এখন স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতে ইরান যে জিনিসগুলো সবচেয়ে বেশি চায়, রাশিয়ার কাছে সেগুলো রয়েছে। উন্নত যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নির্ভুল মিউনিশন-যেগুলো রাশিয়া অনেক পরিমাণে উৎপাদন করে। কিন্তু এগুলো সবই এমন সম্পদ, যা ইউক্রেনে নিজের যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার দরকার। মস্কো এগুলো ইরানকে দিতে চাইলেও তা যথেষ্ট দ্রুত করতে পারবে না। উদাহরণস্বরূপ, এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ইরানি অপারেটরদের প্রশিক্ষণ দিতেই প্রায় ছয় থেকে আট মাস সময় লাগবে।

ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত রুশ সামরিক বাহিনী এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার পথে দাঁড়ানোর কোনো আগ্রহ না থাকায় মস্কো তেহরানকে কূটনৈতিক নিন্দা ও সংযমের আহ্বান ছাড়া দৃশ্যমানভাবে খুব কম সহায়তাই দিয়েছে। মস্কোকে পেছনে টেনে রাখছে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে ক্রেমলিনের চলমান আলোচনাও। রুশ নেতৃত্ব এই লোকদেখানো প্রক্রিয়া থেকে অন্তত যুক্তরাষ্ট্রের ইউক্রেনকে সমর্থন সীমিত করা এবং রাশিয়াকে লক্ষ্য করে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের গতি ধীর করার ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়ার আশা করছে। এই পরিস্থিতিতে ক্রেমলিন ইরানের জন্য আরও শক্তিশালী ও দৃশ্যমান সমর্থন দেওয়ার ঝুঁকি নিতে পারে না। তেহরানের প্রতি মস্কোর প্রতিশ্রুতি অঞ্চলটিতে তার সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার দিয়েও সীমিত। বর্তমানে ইরানি হামলার মুখে থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোও রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার—বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যা রুশ স্বার্থের জন্য একটি লজিস্টিক ও আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এবং সৌদি আরব, যা ওপেক+ এ ক্রেমলিনের প্রধান অংশীদার।

নিশ্চিতভাবেই, রাশিয়া এমন কিছু সহায়তা দিয়ে থাকতে পারে যা অস্ত্র সরবরাহের মতো সহজে দৃশ্যমান নয়। যেমন: মহাকাশভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি ও রিকনাইসান্সে প্রবেশাধিকার দেওয়া, যা ইরানের লক্ষ্য নির্ধারণ সক্ষমতা উন্নত করতে পারে। এ ধরনের সহায়তা বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি হস্তান্তরের তুলনায় কম দৃশ্যমান চিহ্ন রেখে যায়, ফলে তা অনুসরণ করা কঠিন এবং অস্বীকার করা সহজ, কিন্তু তবুও তা গুরুত্বপূর্ণ।

দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট সম্প্রতি জানিয়েছে, মার্কিন প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে মস্কো গোপনে এসব কার্যক্রমে জড়িত। এই প্রচেষ্টার সঠিক পরিসর ও গভীরতা এই মুহূর্তে নির্ধারণ করা কঠিন। তবে এর প্রভাব অবশ্যই ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনীকে হাজার হাজার রুশ সৈন্য হত্যা করতে সহায়তা করা মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহু বছরের গোয়েন্দা সহায়তা কর্মসূচির তুলনায় অনেক কম।

ইরানে হামলা। ছবি: রয়টার্স
ইরানে হামলা। ছবি: রয়টার্স

মস্কো তেহরানকে সমর্থন দিতে ব্যর্থ হলেও, ইরানে চলমান যুদ্ধের অনিচ্ছাকৃত পরিণতি ও দ্বিতীয় স্তরের প্রভাব থেকে রাশিয়া লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এমন আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর এবং নির্ভুল মিউনিশন ব্যবহার করছে, যেগুলো ইউক্রেনের প্রয়োজন। প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূরপাল্লার আঘাত হানার অস্ত্র সীমিত, এবং যেগুলো ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বরাদ্দ করা হবে, সেগুলো কিয়েভের জন্য আর উপলব্ধ থাকবে না।

উচ্চ জ্বালানি মূল্য রুশ তেল ও গ্যাসকে অপরিহার্য করে তুলবে। রাশিয়ার জন্য আরও বড় লাভ হলো জ্বালানির ক্রমবর্ধমান মূল্য। ২০২৫ সালে ওপেক+ উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তেলের দাম কমে গিয়েছিল। রাশিয়ার কাছে তেল উৎপাদন বাড়ানোর মতো অতিরিক্ত সক্ষমতা খুব বেশি ছিল না। ফলে দামের পতনে যে ক্ষতি হয়েছিল তা তারা উৎপাদনের পরিমাণ বাড়িয়ে পুষিয়ে নিতে পারেনি। এই সিদ্ধান্ত বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ সৃষ্টি করে এবং ক্রেতাদের জন্য রুশ তেলের বিকল্প তৈরি করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তে থাকা নিষেধাজ্ঞার চাপের সঙ্গে মিলিত হয়ে রুশ তেলের ওপর বড় ধরনের মূল্যছাড় আরোপে বাধ্য করেছিল। এখন হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট ঘাটতি তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা রাশিয়া এবং তার সংকটাপন্ন বাজেটের জন্য আয়ের একটি উৎসাহ জোগাচ্ছে।

গত সপ্তাহে বাজারের ওপর চাপ কমানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ আগে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ অপরিশোধিত তেল ভারতের কাছে বিক্রির অনুমতি দিতে ৩০ দিনের একটি লাইসেন্সও দিয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চল এলএনজিরও একটি প্রধান সরবরাহকারী। এই অঞ্চল থেকে রপ্তানি কমে গেলে রাশিয়া তার নিজস্ব এলএনজি বিক্রি করতে সুবিধা পায়, বিশেষ করে এশিয়ায়।

বিশ্বে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
বিশ্বে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহে কয়েক সপ্তাহের বিঘ্ন রাশিয়ার উপকারে আসতে পারে, কিন্তু খুব বেশি নয়। তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম ১০ ডলার বাড়লে রাশিয়া প্রতিদিন প্রায় ৯৫ মিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে, যা স্বল্পমেয়াদে খুব বড় অঙ্ক নয়। কিন্তু যদি এই যুদ্ধ তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর ওপর গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করে, তবে তা দীর্ঘ সময়ের জন্য মূল্য বাড়িয়ে দিতে পারে। ক্রেমলিনের কোষাগার পূরণে সহায়তা করতে পারে। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানের তেল রপ্তানি সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং তেলক্ষেত্র ও টার্মিনালে বোমা হামলা চালায়নি। কিন্তু সংঘাতের ধারাবাহিকতায় তা পরিবর্তিত হতে পারে। যদি মরিয়া ইরান তার প্রতিবেশি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে যতটা সম্ভব ক্ষতি করতে চায়, তবে বিশ্ব তেল ও গ্যাস সরবরাহের ওপর এর প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর উল্লেখযোগ্য ও স্থায়ী ক্ষতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা একসঙ্গে চীনকে অবশেষে রাশিয়া থেকে নতুন স্থলপথের তেল ও গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণে রাজি করাতে পারে। গত এক দশক ধরে, বিশেষ করে ২০২২ সাল থেকে, যখন ইউরোপ রাশিয়ার ওপর তার জ্বালানি নির্ভরতা কমাতে শুরু করে—পুতিন চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংকে এই পদক্ষেপ নিতে রাজি করানোর চেষ্টা করছেন। উচ্চ জ্বালানি মূল্য রুশ তেল ও গ্যাসকে তখন অপরিহার্য করে তুলবে। তখন ইউরোপীয় ও মার্কিন নীতিনির্ধারকদের সামনে কঠিন একটি সিদ্ধান্ত থাকবে- ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ব্যয়ের মধ্যেও রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার চাপ বাড়িয়ে যাওয়া, নাকি তাদের অবস্থান নরম করা।

রাশিয়ার নিজস্ব সিদ্ধান্তগুলো তুলনামূলকভাবে কম জটিল। সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা এবং ইরানে তার অংশীদারদের সাহায্য করার সাম্প্রতিক ব্যর্থতাগুলো একটি বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে তার প্রভাবের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। ইউক্রেনে তার সম্পদ আটকে থাকায় মস্কো তার স্বৈরশাসক বন্ধুদের জন্য বাস্তবিক সহায়তা খুব কমই দিতে পারে। যা অবশিষ্ট থাকে তা হলো একটি সংকীর্ণ লক্ষ্য- যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপমূলক নীতির অনিচ্ছাকৃত পরিণতি থেকে লাভ তুলে নেওয়া।

(লেখাটি ফরেন অ্যাফেয়ার্স ডটকমের নিবন্ধ থেকে অনূদিত। লেখক আলেকজান্ডার গাবুয়েভ বার্লিনে অবস্থিত কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের পরিচালক। নিকোল গ্রাজেউস্কি সায়েন্সেস পো-এর একজন সহকারী অধ্যাপক এবং কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর নিউক্লিয়ার পলিসি প্রোগ্রামের একজন নন-রেসিডেন্ট স্কলার। সের্গেই ভাকুলেনকো কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের সিনিয়র ফেলো।)

সম্পর্কিত