Advertisement Banner

জার্মানিকে বড় ধাক্কা দিল যুক্তরাষ্ট্র

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
জার্মানিকে বড় ধাক্কা দিল যুক্তরাষ্ট্র
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ইরান যুদ্ধ নিয়ে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জের সাম্প্রতিক মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে জার্মানি থেকে ৫ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পেন্টাগন। গতকাল শুক্রবার মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ৫ হাজার সেনাকে জার্মানি থেকে সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অথবা বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে মোতায়েন করা হবে। একই সাথে বাইডেন প্রশাসনের সময় গৃহীত ইউরোপে একটি ক্ষেপণাস্ত্র-সজ্জিত আর্টিলারি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনাও বাতিল করেছে বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন।

পেন্টাগনের এই সিদ্ধান্তের ফলে ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ২০২২ সালের পর্যায়ে ফিরে যাবে, যা মূলত ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থার সমতুল্য। উল্লেখ্য, গত বছর পেন্টাগন রোমানিয়া থেকে একটি ব্রিগেড সরিয়ে নিলেও সেখানে নতুন কোনো সেনা পাঠায়নি।

প্রকাশ্যে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হলেও, পর্দার আড়ালে প্রতিরক্ষা দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন।

পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, সৈন্য প্রত্যাহারের এই প্রক্রিয়াটি আগামী ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইউরোপে মার্কিন বাহিনীর অবস্থান নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর এবং যুদ্ধক্ষেত্রের প্রয়োজনীয়তা ও পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে প্রকাশ্যে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হলেও, পর্দার আড়ালে প্রতিরক্ষা দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন যে, এই পদক্ষেপটি মূলত জার্মানির প্রতি এক ধরনের ‘শাস্তি’। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ নিয়ে জার্মান চ্যান্সেলরের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চরমভাবে বিরক্ত করেছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ মন্তব্য করেছিলেন যে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে ‘হেনস্থা’ করছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কীভাবে এই সংঘাত শেষ করার পরিকল্পনা করছেন তার স্পষ্টত কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল নেই। মের্জের এই মন্তব্য ট্রাম্পের নজরে আসার পরপরই তিনি তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ জার্মানির কঠোর সমালোচনা করেন। ট্রাম্প লিখেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র জার্মানিতে সেনা উপস্থিতির বিষয়ে পর্যালোচনা করছে এবং খুব দ্রুতই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পরবর্তীতে তিনি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে বলেন যে, জার্মান চ্যান্সেলরের উচিত ইরান নিয়ে নাক গলানোর চেয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে এবং তার নিজের দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা– বিশেষ করে অভিবাসন ও জ্বালানি সংকট সমাধানে বেশি মনোযোগী হওয়া। ট্রাম্পের মতে, জার্মানি ইউক্রেন ইস্যুতে পুরোপুরি অকার্যকর ভূমিকা পালন করেছে এবং ইরানকে পরমাণু হুমকি মুক্ত করে বিশ্বকে নিরাপদ করার মার্কিন প্রচেষ্টায় বাধা দিচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

শুক্রবার এই সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ার সময় একজন সিনিয়র পেন্টাগন কর্মকর্তা স্পষ্ট করেন যে, ইরান যুদ্ধে জার্মানি যথাযথ সহায়তা প্রদানে ব্যর্থ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র হতাশ। তিনি আরও বলেন যে, চ্যান্সেলর মের্জের অলঙ্কারিক বক্তব্যগুলো অত্যন্ত অনুপযুক্ত এবং অসহযোগিতামূলক। পেন্টাগনের এই কঠোর অবস্থান জার্মানির প্রতি তাদের সাম্প্রতিক মনোভাবের একটি বড় পরিবর্তন নির্দেশ করে। অথচ কিছুদিন আগেও পেন্টাগন কর্মকর্তারা জার্মানির সামরিক বাজেট বৃদ্ধি এবং ইউক্রেনকে সহায়তায় অগ্রণী ভূমিকা পালনের প্রশংসা করেছিলেন।

এদিকে ৫ হাজার সেনা প্রত্যাহার করা হলেও জার্মানি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মার্কিন সামরিক ঘাঁটি হিসেবে বহাল থাকবে। বর্তমানে সেখানে ৩০ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যা জাপানের পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং আফ্রিকার সামরিক অপারেশন পরিচালনার জন্য জার্মানির ঘাঁটিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। বিশেষ করে বর্তমান ইরান যুদ্ধে জার্মানির গুরুত্ব আরও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।

তবে প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছেন যে, এই সেনা কমানোর ফলে ল্যান্ডস্টুল বা অন্যান্য চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রমে কোনো সরাসরি প্রভাব পড়বে না।

মধ্যপ্রাচ্যের যেসব ঘাঁটি ইরানের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে, সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া অনেক মার্কিন সেনাকে জার্মানিতে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এছাড়া যুদ্ধে আহত মার্কিন সেনাদের চিকিৎসার জন্য জার্মানির র‍্যামস্টাইন বিমান ঘাঁটির কাছে অবস্থিত ল্যান্ডস্টুল রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে আসা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকা কমান্ড এবং ইউরোপীয় কমান্ডের সদর দপ্তরও জার্মানিতে অবস্থিত, যা দেশটির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। তবে প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছেন যে, এই সেনা কমানোর ফলে ল্যান্ডস্টুল বা অন্যান্য চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রমে কোনো সরাসরি প্রভাব পড়বে না। পুরো বিষয়টি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৫ হাজার সেনা সরিয়ে নেওয়ার এই সিদ্ধান্তটি কেবল কৌশলগত নয়, বরং রাজনৈতিকভাবেও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।

ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রতিফলন হিসেবে মিত্র দেশগুলোর ওপর প্রতিরক্ষা ব্যয়ের চাপ বাড়ানো এবং ভিন্নমতের জন্য কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ধারাটি এখানে পুনরায় স্পষ্ট হয়েছে। যদিও পেন্টাগন দাবি করছে এটি একটি নিয়মিত পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার অংশ, কিন্তু ঘটনার কালানুক্রম ইঙ্গিত দেয় যে বার্লিন ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার ফাটল এখন আরও প্রশস্ত হচ্ছে।

ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই সেনা প্রত্যাহার কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা এখন দেখার বিষয়। জার্মানির বিরোধী দলগুলো এবং ন্যাটো মিত্রদের অনেকে এই পদক্ষেপে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, কারণ ইউক্রেন যুদ্ধের এই উত্তাল সময়ে ইউরোপ থেকে মার্কিন সৈন্য কমানোর সিদ্ধান্ত রাশিয়ার জন্য ইতিবাচক বার্তা পাঠাতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনড় অবস্থান এবং জার্মানির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির টানাপোড়েন বর্তমানে আটলান্টিক পাড়ের এই দুই মিত্রের সম্পর্ককে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। সৈন্য প্রত্যাহারের এই সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এবং এর প্রভাব নিয়ে আগামী মাসগুলোতে বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। পেন্টাগন আপাতত তাদের নির্ধারিত পরিকল্পনায় অটল রয়েছে এবং ইরানের সাথে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই জার্মানি থেকে এই বিপুল সংখ্যক সেনা সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করতে যাচ্ছে। এটি কেবল একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গির একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

সম্পর্কিত