চরচা ডেস্ক

বর্তমানে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের মধ্যকার শীর্ষ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতির এক নতুন ও নাটকীয় মোড় নিয়েছে। বর্তমানে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের ওপর ওয়াশিংটনের নির্ভরতা অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা একটি তথাকথিত অবৈধ ও উস্কানিমূলক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে চোরাবালিতে আটকে গেছে, তা থেকে পরিত্রাণ পেতে বেইজিং এখন ওয়াশিংটনের জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার অনলাইনে প্রকাশিত ইউনিভার্সিটি অফ আলবার্টার চায়না ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং ম্যাকটাগার্ট রিসার্চ চেয়ার ইমেরিটাস ওয়েনরান জিয়াং-এর নিবন্ধে এমনটাই বলা হয়েছে।
১৩ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত নির্ধারিত এই সম্মেলনে ট্রাম্পের বেইজিং সফরকে ওয়াশিংটন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখলেও বেইজিংয়ের অবস্থান এখানে বেশ পরিমিত ও কৌশলগত। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সফরকে কেবল একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে না দেখে বরং বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ‘কৌশলগত নির্দেশনা’ এবং ‘যোগাযোগে’র একটি অংশ হিসেবে অভিহিত করেছে। এই সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভাষা থেকেই বোঝা যায় যে, ক্ষমতার ভারসাম্য এখন আর আগের মতো নেই।
কয়েক দশক ধরে চলা মার্কিন আধিপত্যের বিপরীতে আজ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে চীনের সহযোগিতার ওপর তাদের ভাগ্য নির্ভর করছে। এই সংকটের মূলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক হঠকারিতা। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী এমন এক অচলাবস্থার মধ্যে পড়েছে যা কেবল ব্যয়বহুলই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী এবং ক্লান্তিকর। ইরানের পাল্টা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক মহাবিপর্যয়ের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। কয়েক ডজন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ সেখানে অবরোধ কার্যকর করার চেষ্টা করলেও এর ফলে জাহাজ চলাচলের পথ পরিবর্তন করতে হচ্ছে, যা মুদ্রাস্ফীতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ওয়াশিংটনের এই শোচনীয় অবস্থায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের মতো কট্টরপন্থীরাও এখন চীনের কাছে ধরণা দিচ্ছেন। তারা প্রকাশ্যে বেইজিংকে অনুরোধ করছেন যাতে চীন তার প্রভাব খাটিয়ে ইরানকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে রাজি করায়।

ট্রাম্প প্রশাসনের এই নীতিতে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। একদিকে তারা প্রযুক্তি এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক বিষয়ে চীনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে চলেছে। অন্যদিকে নিজেদের তৈরি করা সংকট থেকে উদ্ধার পেতে বেইজিংয়ের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছে। মার্কিন নীতিনির্ধারকদের এই হাহাকার তাদের মরিয়া ভাবকেই ফুটিয়ে তোলে।
মার্কিন প্রশাসন প্রচার করার চেষ্টা করছে যে, চীন নিজেই জ্বালানি আমদানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল বিধায় এই সমস্যা সমাধানে বেইজিংয়েরই বেশি তাড়া থাকা উচিত। কিন্তু ওয়েনরান জিয়াং তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। চীন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে জ্বালানি মজুতকরণ, সরবরাহ ব্যবস্থার বৈচিত্র্যকরণ এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জন করেছে। ফলে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা চীনের জন্য কোনো বড় বিপর্যয় ডেকে আনেনি, বরং বেইজিং এই পরিস্থিতিকে একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছে যাতে তারা সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত অবস্থান এখন অত্যন্ত সুদৃঢ়। তারা ওয়াশিংটনকে উদ্ধার করতে কোনো তাড়াহুড়ো দেখাচ্ছে না। বরং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন এবং বেইজিং এখন একটি ‘গ্র্যান্ড বারগেইন’ বা বড় ধরনের দরকষাকষির প্রস্তুতি নিচ্ছে। বেইজিংয়ের লক্ষ্য কেবল হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া নয়, বরং এর বিনিময়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন বহুমুখী নিরাপত্তা কাঠামো প্রতিষ্ঠার দাবি তুলতে পারে। ইরান ইতিমধ্যেই যুদ্ধ সমাপ্তির একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে যা ট্রাম্প প্রশাসন প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু ওয়াশিংটন আশা করছে যে চীন এই অচলাবস্থা নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করবে।
তবে চীনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবল মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি নয়, বরং তাদের জাতীয় স্বার্থের মূলবিন্দু তাইওয়ান। ট্রাম্প যখন ঘরোয়া রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক সংকট থেকে দৃষ্টি সরাতে এই সম্মেলন থেকে বড় কোনো চমক বা ছবি তোলার সুযোগ খুঁজছেন, সি চিনপিং তখন অনেক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন।
বেইজিং এবার তাইওয়ান প্রশ্নে কোনো আপস করবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগের প্রশাসনগুলোর মতো কেবল ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা সমর্থন না করার’ মৌখিক প্রতিশ্রুতিতে চীন এবার সন্তুষ্ট হবে না, বরং তারা চাইবে যুক্তরাষ্ট্র যেন সরাসরি তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে।

ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্কের দোহাই দিয়ে বেইজিংকে প্রভাবিত করার চেষ্টা এবং তাইওয়ানকে একটি দরকষাকষির গুটি হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা সম্পর্কেও চীন সচেতন। ট্রাম্প হয়তো হরমুজ প্রণালি বা কৃষিপণ্য ক্রয়ের বিনিময়ে তাইওয়ান ইস্যুতে কিছু ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করতে পারেন। কিন্তু চীন এতটা নির্বোধ নয়। তাইওয়ান চীনের একটি মূল জাতীয় স্বার্থ এবং এখানে কোনো সাময়িক সমঝোতা তাদের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের পরিপন্থী।
বেইজিংয়ের নেতৃত্বের কাছে ট্রাম্পের বিশ্বাসযোগ্যতা অত্যন্ত নগণ্য। তারা জানে যে ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতিগুলো যে কোনো সময় তার রাজনৈতিক স্বার্থে বদলে যেতে পারে। তাই সি চিনপিংয়ের প্রশাসন ট্রাম্পের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক দেখালেও কাঠামোগতভাবে তার ওপর নির্ভর করবে না। চীনের মূল উদ্দেশ্য হলো সামনের মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের একটি স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা যাতে তারা তাদের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের পথ সুগম রাখতে পারে।
এর বাইরেও এই সম্মেলনে চীনের আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো জাপানের ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণ। টোকিও যেভাবে তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে এবং তাইওয়ান সংকটে হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছে, চীন চাইবে ওয়াশিংটন যেন তাদের এই মিত্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। বৈশ্বিক পর্যায়ে চীন এখন নিজেকে একটি দায়িত্বশীল ও স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হরমুজ সংকট নিরসনের আহ্বান জানাচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে তারা একটি উস্কানিমূলক যুদ্ধবাজ শক্তি হিসেবে চিত্রিত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের একপাক্ষিক আধিপত্যের যুগ এখন হরমুজ প্রণালির সংকটের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার পথে। কৌশলগত ধৈর্য ও শক্তিশালী অবস্থানের কারণে এই সম্মেলনে চীন অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। চূড়ান্তভাবে, এই সম্মেলনটি কেবল চীন-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য নয়, বরং ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হবে।
ট্রাম্পের প্রয়োজনীয়তা যেখানে আকাশচুম্বী, সেখানে সি চিনপিংয়ের ধীরস্থির এবং আত্মবিশ্বাসী পদচারণা বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের সংকেত দিচ্ছে। আল জাজিরার এই বিশ্লেষণে লেখক স্পষ্টভাবে বুঝিয়েছেন যে, আগুনের সূত্রপাত চীন করেনি, কিন্তু সেই আগুন নেভানোর চাবিকাঠি এখন বেইজিংয়ের হাতে এবং তারা তা ব্যবহার করবে সম্পূর্ণ নিজেদের শর্তে।

বর্তমানে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের মধ্যকার শীর্ষ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতির এক নতুন ও নাটকীয় মোড় নিয়েছে। বর্তমানে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের ওপর ওয়াশিংটনের নির্ভরতা অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা একটি তথাকথিত অবৈধ ও উস্কানিমূলক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে চোরাবালিতে আটকে গেছে, তা থেকে পরিত্রাণ পেতে বেইজিং এখন ওয়াশিংটনের জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার অনলাইনে প্রকাশিত ইউনিভার্সিটি অফ আলবার্টার চায়না ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং ম্যাকটাগার্ট রিসার্চ চেয়ার ইমেরিটাস ওয়েনরান জিয়াং-এর নিবন্ধে এমনটাই বলা হয়েছে।
১৩ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত নির্ধারিত এই সম্মেলনে ট্রাম্পের বেইজিং সফরকে ওয়াশিংটন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখলেও বেইজিংয়ের অবস্থান এখানে বেশ পরিমিত ও কৌশলগত। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সফরকে কেবল একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে না দেখে বরং বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ‘কৌশলগত নির্দেশনা’ এবং ‘যোগাযোগে’র একটি অংশ হিসেবে অভিহিত করেছে। এই সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভাষা থেকেই বোঝা যায় যে, ক্ষমতার ভারসাম্য এখন আর আগের মতো নেই।
কয়েক দশক ধরে চলা মার্কিন আধিপত্যের বিপরীতে আজ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে চীনের সহযোগিতার ওপর তাদের ভাগ্য নির্ভর করছে। এই সংকটের মূলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক হঠকারিতা। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী এমন এক অচলাবস্থার মধ্যে পড়েছে যা কেবল ব্যয়বহুলই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী এবং ক্লান্তিকর। ইরানের পাল্টা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক মহাবিপর্যয়ের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। কয়েক ডজন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ সেখানে অবরোধ কার্যকর করার চেষ্টা করলেও এর ফলে জাহাজ চলাচলের পথ পরিবর্তন করতে হচ্ছে, যা মুদ্রাস্ফীতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ওয়াশিংটনের এই শোচনীয় অবস্থায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের মতো কট্টরপন্থীরাও এখন চীনের কাছে ধরণা দিচ্ছেন। তারা প্রকাশ্যে বেইজিংকে অনুরোধ করছেন যাতে চীন তার প্রভাব খাটিয়ে ইরানকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে রাজি করায়।

ট্রাম্প প্রশাসনের এই নীতিতে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। একদিকে তারা প্রযুক্তি এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক বিষয়ে চীনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে চলেছে। অন্যদিকে নিজেদের তৈরি করা সংকট থেকে উদ্ধার পেতে বেইজিংয়ের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছে। মার্কিন নীতিনির্ধারকদের এই হাহাকার তাদের মরিয়া ভাবকেই ফুটিয়ে তোলে।
মার্কিন প্রশাসন প্রচার করার চেষ্টা করছে যে, চীন নিজেই জ্বালানি আমদানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল বিধায় এই সমস্যা সমাধানে বেইজিংয়েরই বেশি তাড়া থাকা উচিত। কিন্তু ওয়েনরান জিয়াং তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। চীন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে জ্বালানি মজুতকরণ, সরবরাহ ব্যবস্থার বৈচিত্র্যকরণ এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জন করেছে। ফলে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা চীনের জন্য কোনো বড় বিপর্যয় ডেকে আনেনি, বরং বেইজিং এই পরিস্থিতিকে একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছে যাতে তারা সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত অবস্থান এখন অত্যন্ত সুদৃঢ়। তারা ওয়াশিংটনকে উদ্ধার করতে কোনো তাড়াহুড়ো দেখাচ্ছে না। বরং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন এবং বেইজিং এখন একটি ‘গ্র্যান্ড বারগেইন’ বা বড় ধরনের দরকষাকষির প্রস্তুতি নিচ্ছে। বেইজিংয়ের লক্ষ্য কেবল হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া নয়, বরং এর বিনিময়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন বহুমুখী নিরাপত্তা কাঠামো প্রতিষ্ঠার দাবি তুলতে পারে। ইরান ইতিমধ্যেই যুদ্ধ সমাপ্তির একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে যা ট্রাম্প প্রশাসন প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু ওয়াশিংটন আশা করছে যে চীন এই অচলাবস্থা নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করবে।
তবে চীনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবল মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি নয়, বরং তাদের জাতীয় স্বার্থের মূলবিন্দু তাইওয়ান। ট্রাম্প যখন ঘরোয়া রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক সংকট থেকে দৃষ্টি সরাতে এই সম্মেলন থেকে বড় কোনো চমক বা ছবি তোলার সুযোগ খুঁজছেন, সি চিনপিং তখন অনেক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন।
বেইজিং এবার তাইওয়ান প্রশ্নে কোনো আপস করবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগের প্রশাসনগুলোর মতো কেবল ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা সমর্থন না করার’ মৌখিক প্রতিশ্রুতিতে চীন এবার সন্তুষ্ট হবে না, বরং তারা চাইবে যুক্তরাষ্ট্র যেন সরাসরি তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে।

ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্কের দোহাই দিয়ে বেইজিংকে প্রভাবিত করার চেষ্টা এবং তাইওয়ানকে একটি দরকষাকষির গুটি হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা সম্পর্কেও চীন সচেতন। ট্রাম্প হয়তো হরমুজ প্রণালি বা কৃষিপণ্য ক্রয়ের বিনিময়ে তাইওয়ান ইস্যুতে কিছু ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করতে পারেন। কিন্তু চীন এতটা নির্বোধ নয়। তাইওয়ান চীনের একটি মূল জাতীয় স্বার্থ এবং এখানে কোনো সাময়িক সমঝোতা তাদের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের পরিপন্থী।
বেইজিংয়ের নেতৃত্বের কাছে ট্রাম্পের বিশ্বাসযোগ্যতা অত্যন্ত নগণ্য। তারা জানে যে ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতিগুলো যে কোনো সময় তার রাজনৈতিক স্বার্থে বদলে যেতে পারে। তাই সি চিনপিংয়ের প্রশাসন ট্রাম্পের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক দেখালেও কাঠামোগতভাবে তার ওপর নির্ভর করবে না। চীনের মূল উদ্দেশ্য হলো সামনের মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের একটি স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা যাতে তারা তাদের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের পথ সুগম রাখতে পারে।
এর বাইরেও এই সম্মেলনে চীনের আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো জাপানের ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণ। টোকিও যেভাবে তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে এবং তাইওয়ান সংকটে হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছে, চীন চাইবে ওয়াশিংটন যেন তাদের এই মিত্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। বৈশ্বিক পর্যায়ে চীন এখন নিজেকে একটি দায়িত্বশীল ও স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হরমুজ সংকট নিরসনের আহ্বান জানাচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে তারা একটি উস্কানিমূলক যুদ্ধবাজ শক্তি হিসেবে চিত্রিত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের একপাক্ষিক আধিপত্যের যুগ এখন হরমুজ প্রণালির সংকটের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার পথে। কৌশলগত ধৈর্য ও শক্তিশালী অবস্থানের কারণে এই সম্মেলনে চীন অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। চূড়ান্তভাবে, এই সম্মেলনটি কেবল চীন-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য নয়, বরং ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হবে।
ট্রাম্পের প্রয়োজনীয়তা যেখানে আকাশচুম্বী, সেখানে সি চিনপিংয়ের ধীরস্থির এবং আত্মবিশ্বাসী পদচারণা বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের সংকেত দিচ্ছে। আল জাজিরার এই বিশ্লেষণে লেখক স্পষ্টভাবে বুঝিয়েছেন যে, আগুনের সূত্রপাত চীন করেনি, কিন্তু সেই আগুন নেভানোর চাবিকাঠি এখন বেইজিংয়ের হাতে এবং তারা তা ব্যবহার করবে সম্পূর্ণ নিজেদের শর্তে।