“আমি তাকে ফল কেনার জন্য কিছু টাকা চেয়েছিলাম। ছেলে বলেছিল, ১২ তারিখে টাকা পাঠাবে। আমাকে ফল কিনে খেতে বলেছিল। কিন্তু ৯ আগস্ট আগুনে পুড়ে আমার ছেলেটা মারা গেল। আমাকে একা ফেলে চলে গেল। আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। তাকে ছাড়া আমি কীভাবে বাঁচব?”
চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল নওগাঁর শাহিনের মা নারগিস বেগমের। সৌদি আরবের একটি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশি শ্রমিকদের একজন ছিলেন তার ছেলে শাহিন। ছেলের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি মনে করে এভাবেই বিলাপ করছিলেন তিনি।
প্রায় আড়াই মাস ধরে ছেলের মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি।
বার্তা সংস্থা ইউএনবি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
আজ শনিবার সকালে নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকায় শাহিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, নারগিস বেগম কোনোভাবেই নিজেকে সামলাতে পারছেন না।
স্বজন ও প্রতিবেশীরাও সেখানে জড়ো হয়েছেন। তাদের অপেক্ষা, শেষবারের মতো শাহিনের মরদেহ দেখার।
গত ৯ আগস্ট রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকের একজন ছিলেন শাহিন।
উন্নত জীবিকার আশায় চলতি বছরের এপ্রিলে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি। বিদেশযাত্রার খরচ জোগাতে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ করেছিলেন।
শাহিন রেখে গেছেন স্ত্রী, ছয় বছর বয়সী এক ছেলে, আট মাস বয়সী এক মেয়ে এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী মাকে।
পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করার স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছাড়ার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় তার মৃত্যুতে পরিবারটি ভেঙে পড়েছে।
শাহিনের ফুফু নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, শাহিনের বয়স যখন মাত্র চার বছর, তখন তার বাবা মারা যান। এরপর নানা কষ্টের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে সে।
বিয়ের পর পরিবারের জন্য ভালো জীবনের ব্যবস্থা করার আশায় ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে সৌদি আরব যান শাহিন।
তিনি বলেন, “মারা যাওয়ার মাত্র তিন দিন আগে প্রথমবারের মতো আমাদের টাকা পাঠাতে চেয়েছিল সে। বলেছিল, ১২ তারিখে ৩২ হাজার টাকা পাঠাবে। এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য আর বাকি টাকা সংসারের খরচের জন্য। কিন্তু টাকা পাঠানোর আগেই আগুনে পুড়ে মারা গেল সে।”
শাহিনের মামা আবদুস সালাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই শাহিন ছিলেন পরিশ্রমী। বাবার মৃত্যুর পর তার মা অনেক কষ্ট করে তাকে বড় করেছেন।
তিনি বলেন, “পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ার আশায় ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিল সে। যেই সময় বাড়িতে টাকা পাঠানো শুরু করার কথা, ঠিক তখনই প্রাণ হারাল। এখন তার পরিবার সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েছে।”
শোকসন্তপ্ত পরিবারটিকে আর্থিক সহায়তা দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, পরিবারের কোনো খরচ ছাড়াই মরদেহগুলো দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।
গত ৯ আগস্ট রিয়াদের ওই সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি প্রবাসী নিহত হন। তাদের মধ্যে ১২ জনই নওগাঁ জেলার বাসিন্দা।
নিহতদের মধ্যে নয়জনের মরদেহ ২৭ আগস্ট দেশে আনা হয়। বাকি সাতজনের মরদেহ আজ শনিবার দেশে পৌঁছেছে।
এই সাতজনের মধ্যে পাঁচজন নওগাঁর বাসিন্দা। তাদের চারজন আত্রাই উপজেলার এবং শাহিন ছিলেন নওগাঁ সদর উপজেলার।
নওগাঁর নিহত পাঁচজন হলেন পার নওগাঁর মজনু রহমানের ছেলে শাহিন, দুবাই গ্রামের নাজমুল হুদার ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাস প্রামাণিকের ছেলে মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মজনু সরদারের ছেলে মাসিদুল সরদার সজীব এবং সাধনগর গ্রামের আজহার আলীর ছেলে সাগর আলী।
মরদেহগুলো দেশে ফেরায় পরিবারগুলো শেষ পর্যন্ত স্বজনদের দাফন করার সুযোগ পাবে। তবে এই মৃত্যু তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। শাহিনের স্ত্রী ও বৃদ্ধ মা এখন সবচেয়ে বেশি অসহায় অবস্থায় পড়েছেন।