অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস অঙ্গরাজ্যে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইল্ডকেয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি আরও কঠোর করেছে প্রাদেশিক সরকার। গত এক বছরে বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনায় শত শত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বেশ কয়েকজন কর্মীকে, বাতিল হয়েছে একাধিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন। এমন পরিস্থিতিতে এই খাতে পড়াশোনা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ, পেশাগত দায়িত্ব এবং স্থায়ী বসবাসের সম্ভাবনা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
নিউ সাউথ ওয়েলস সরকারের গত ২২ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অঙ্গরাজ্যের আর্লি লার্নিং কমিশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে চাইল্ডকেয়ার সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের বিরুদ্ধে মোট ৮৭৬টি নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ ধরনের ব্যবস্থা বেড়েছে ১০৮ শতাংশ।
একই সময়ে শিশুদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত ৫৩ জন শিক্ষাকর্মী, অন্য কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ৮টি চাইল্ডকেয়ার সেবার অনুমোদন বাতিল এবং আরও ১০টির কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে।
প্রায় ৯ হাজার পরিদর্শন, জরিমানা ৩ লাখ ডলারের বেশি
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কমিশন ৮ হাজার ৭৭৬টি পরিদর্শন পরিচালনা করেছে। এর ৭১ শতাংশই ছিল পূর্বঘোষণা ছাড়া।
বিভিন্ন আইন ও বিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় চাইল্ডকেয়ার সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোট ৩ লাখ ২৪ হাজার ২৯০ অস্ট্রেলীয় ডলার জরিমানা করা হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রকাশিত তথ্যে কর্মীদের যোগ্যতা, শিশুদের নিরাপত্তা, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার যথাযথ প্রতিবেদন এবং অভিভাবকদের প্রয়োজনীয় তথ্য জানানোর ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে।
সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় কর্মীদের যোগ্যতাসংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনাকারী সংস্থাকে ১৭ হাজার ২২০ অস্ট্রেলীয় ডলার জরিমানা করা হয়। অন্য একটি ঘটনায় শিক্ষাকর্মীর বিরুদ্ধে অনুপযুক্ত আচরণের অভিযোগ যথাসময়ে কর্তৃপক্ষকে না জানানোর কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর ২০ হাজার ৬১০ ডলার জরিমানা করা হয়েছে।
তবে সব নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা একই ধরনের বা একই মাত্রার অপরাধের জন্য নেওয়া হয়নি। এসব ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ম মেনে চলার নির্দেশনা, জরিমানা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে অনুমোদন স্থগিত বা বাতিলের সিদ্ধান্ত রয়েছে।
নিউ সাউথ ওয়েলসের ডেপুটি প্রিমিয়ার ও শিক্ষামন্ত্রী প্রু কার জানিয়েছেন, শিশুদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না। চাইল্ডকেয়ার পরিচালনাকারীদের অবশ্যই শিশুদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
চাইল্ডকেয়ার পেশায় শুধু পড়াশোনাই নয়, প্রয়োজন ধৈর্য ও দায়িত্ববোধ
অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সৈয়দ আবিদ আহমেদ চাইল্ডকেয়ার বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে এই খাতে কর্মরত রয়েছেন। পড়াশোনা ও বাস্তব কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, শিশুদের যত্ন নেওয়ার পেশাটিকে বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে এর দায়িত্ব অনেক বেশি।
এই প্রতিবেদককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার পর চাইল্ডকেয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের নিরাপত্তা, কর্মীদের আচরণ এবং নিয়ম মেনে কাজ করার বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।
তার অভিজ্ঞতায়, চাইল্ডকেয়ার কর্মীদের দায়িত্ব শুধু শিশুদের দেখাশোনা কিংবা খেলাধুলায় সহায়তা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নির্ধারিত সময়ে খাবার দেওয়া, বিশ্রামের ব্যবস্থা করা, শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা, শিশুদের আচরণ ও বিকাশ পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডের নথি সংরক্ষণ করতে হয়।
আবিদের মতে, এই পেশায় কাজ করার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো ধৈর্য ধরে প্রতিটি শিশুর প্রয়োজন ও আচরণ বোঝা।
সব শিশু একইভাবে কথা শোনে না কিংবা একইভাবে নির্দেশনায় সাড়া দেয় না। বয়স, আচরণ ও বিকাশের পার্থক্য বিবেচনা করে প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদাভাবে কাজ করতে হয়। শিশুদের আস্থা অর্জন এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সহায়তা করার জন্যও সময় প্রয়োজন।
অস্ট্রেলিয়ায় শিশুদের একটি প্লেগ্রাউন্ডে খেলাধুলায় ব্যস্ত শিশুরা। ছবি: লেখক
তিনি আরও জানান, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী তা নথিবদ্ধ করতে হয়। গুরুতর ঘটনায় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা এবং প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্বও পালন করতে হয়।
তার মতে, এসব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি মানসিক প্রস্তুতি, সতর্কতা এবং দায়িত্বশীল মনোভাব অত্যন্ত জরুরি।
শুধু পিআরের আশায় পেশা বেছে নেওয়া কতটা যুক্তিসংগত
অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী বসবাসের সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বিভিন্ন পেশাভিত্তিক কোর্সে ভর্তি হন। আর্লি চাইল্ডহুড এডুকেশনও তাদের আগ্রহের একটি ক্ষেত্র।
তবে সৈয়দ আবিদ আহমেদের পর্যবেক্ষণ, শুধু স্থায়ী বসবাসের সুযোগের কথা ভেবে চাইল্ডকেয়ার পেশা বেছে নিলে বাস্তব কর্মপরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অসুবিধা হতে পারে।
তার মতে, শিশুদের প্রতি আন্তরিকতা, ধৈর্য এবং তাদের বিকাশে ভূমিকা রাখার আগ্রহ না থাকলে এই পেশায় দীর্ঘদিন কাজ করা সহজ নয়।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আবিদ বলেন, কোর্সে ভর্তি হওয়ার আগে পেশাটির বাস্তব দায়িত্ব সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। কারণ পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিকল্পনা এবং নিয়মিত নথিপত্র সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হয়।
চাকরি ও স্থায়ী বসবাসের সুযোগ নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ছে বলেও তার পর্যবেক্ষণ। তার মতে, শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতা অর্জন করা জরুরি।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কী বার্তা
অস্ট্রেলিয়ায় চাইল্ডকেয়ার ও আর্লি চাইল্ডহুড এডুকেশন বিষয়ে পড়তে আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কোর্স নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।
কারণ চাইল্ডকেয়ার এডুকেটর এবং আর্লি চাইল্ডহুড টিচার একই পেশাগত পদ নয়। দুটি পেশার শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা মূল্যায়ন এবং দায়িত্বের ধরনে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
একইভাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোর্স সম্পন্ন করা বা চাকরি পাওয়া মানেই অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী বসবাসের নিশ্চয়তা নয়।
দক্ষ অভিবাসনের ক্ষেত্রে যোগ্য পেশা, দক্ষতা মূল্যায়ন, ইংরেজি ভাষার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, পয়েন্ট এবং সংশ্লিষ্ট ভিসার শর্ত বিবেচনায় নেওয়া হয়।
তাই শুধু স্থায়ী বসবাসের সম্ভাবনা দেখে কোর্সে ভর্তি না হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি, পেশাগত যোগ্যতা, চাকরির বাজার এবং সরকারি অভিবাসন নীতি সম্পর্কে আগে থেকে খোঁজ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
নিউ সাউথ ওয়েলস সরকার জানিয়েছে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিদর্শন, অভিযোগ তদন্ত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারি একদিকে শিশু ও অভিভাবকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগ, অন্যদিকে চাইল্ডকেয়ার কর্মীদের জন্য পেশাগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের গুরুত্বও সামনে এনেছে।
বাংলাদেশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সৈয়দ আবিদ আহমেদের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে, এই পেশায় সফল হওয়ার জন্য শুধু কোর্স বা সনদ অর্জন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শিশুদের প্রতি আন্তরিকতা, ধৈর্য, দায়িত্ববোধ এবং বাস্তব কর্মদক্ষতা।
শিশুদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে গড়ে ওঠা এই কর্মপরিবেশে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে হলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের পেশার সম্ভাবনার পাশাপাশি এর বাস্তব দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি।