
টরন্টোয় বজ্রঝড় ও বন্যায় বিপর্যস্ত প্রবাসীসহ হাজার হাজার মানুষ
বজ্রঝড়ে প্রবাসী বাংলাদেশিসহ হাজার হাজার মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
কিছু ঘটনা জীবনে খুব অল্প সময়ের জন্য আসে, কিন্তু চলে যাওয়ার পরও কোথাও থেকে যায়। বহু বছর পর হঠাৎ কোনো গান, কোনো কথা কিংবা কোনো পরিচিত অনুভূতি সেই পুরোনো দরজায় কড়া নাড়ে। তখন মনে হয়, এত বছর পরেও স্মৃতির কিছু গল্প কেন এত স্পষ্ট?
সম্প্রতি সততা নিয়ে ভাবতে গিয়ে ইউরোপে আমার জীবনের শুরুর দিকের একটি ঘটনা হঠাৎ মনে পড়ে গেল। তখন আমি নতুন পরিবেশ, নতুন সংস্কৃতিতে, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য একটি বিভাগের একটি মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তার আচরণে এমন এক ধরনের আন্তরিকতা ছিল, যা আমার কাছে তখন একেবারেই নতুন। সহজে কথা বলত, খোঁজ নিত, হাসত, সময় দিত, খুব স্বাভাবিক ও আপন করে আচরণ করত। আমার কাছে সেই আচরণ ছিল বিশেষ কিছু।
আমি তখনো বুঝতে শিখিনি, একজন পুরুষ ও একজন নারীর মধ্যে বন্ধুত্বও কতটা স্বাভাবিক, কতটা গভীর এবং কতটা আন্তরিক হতে পারে, কোনো প্রেমের সম্পর্কের প্রত্যাশা ছাড়াই।
আমার নিজের সংস্কৃতিগত অভিজ্ঞতায় এমন বন্ধুত্বের সুযোগ খুব বেশি ছিল না, বিশেষ করে সেই সময়ে। ফলে যে সংকেতগুলোকে সে হয়তো নিছক বন্ধুত্বের ভাষা হিসেবে দেখছিল, আমি সেগুলোর মধ্যে অন্য অর্থ খুঁজে নিলাম। তার আন্তরিকতাকে আমি ভালোবাসার ইঙ্গিত হিসেবে পড়লাম। তার বন্ধুত্বকে আমি বিশেষ সম্পর্ক বলে ভাবলাম।
একদিন সাহস করে বলে ফেললাম, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
তারপর যে উত্তর পেলাম, তা আজও মনে আছে।
সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কোথায়? কীভাবে? আমি তো কিছুই অনুভব করছি না। না শরীরে, না মনে।”
আমি যেন এক মুহূর্তে থমকে গেলাম।
ঘটনা কী?
আমি তো এতদিন ধরে অন্য কিছু বুঝে এসেছি!
পরে বুঝলাম, সমস্যাটা তার আচরণে ছিল না। সমস্যাটা ছিল আমার বোঝার মধ্যে। আমি যে সংকেত পড়েছিলাম, সেটি আসলে সেই সংকেত ছিল না। আমি নিজের অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা ও অজ্ঞতার মাধ্যমে তার স্বাভাবিক বন্ধুত্বকে ভালোবাসার ভাষায় অনুবাদ করেছিলাম।
তখন হয়তো মনে হয়েছিল, এতদিন যা দেখেছি সবই অভিনয়। কিন্তু আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, না, সেটি অভিনয় ছিল না। সে তার জায়গা থেকে সম্পূর্ণ সত্য ছিল। ভুলটা ছিল আমার।
আমি জানতাম না, একটি মেয়ের সঙ্গে কীভাবে বন্ধুত্ব করতে হয়। আরও স্পষ্ট করে বললে, আমি জানতাম না যে, একজন নারী একজন পুরুষের প্রতি আন্তরিক, যত্নশীল এবং আপন হতে পারে, অথচ তার মধ্যে প্রেমের কোনো আকাঙ্ক্ষা নাও থাকতে পারে।
আজ ভাবি, আমি সেটা জানবই বা কীভাবে?
বাংলাদেশে বড় হওয়ার সময় আমার জীবনে সেই ধরনের সামাজিক অভিজ্ঞতার সুযোগ খুব সীমিত ছিল। নারী-পুরুষের সম্পর্ককে আমরা অনেক সময় দুটি মাত্র পরিচয়ে দেখতে শিখি—আত্মীয় অথবা প্রেমিক-প্রেমিকা। মাঝখানে যে একটি বিশাল, সুন্দর এবং সম্মানজনক জায়গা আছে, যার নাম বন্ধুত্ব, সেটি অনেকের জীবনেই অচেনা থেকে যায়।
ইউরোপে এসে সেই অচেনা জায়গাটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। কিন্তু পরিচয় হয়েছিল ভুল পাঠের মাধ্যমে।
আজ মনে হয়, সেই ভুলটিও আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল।
কারণ ভালোবাসা শুধু কাউকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়। ভালোবাসার একটি বড় শিক্ষা হলো, অন্য মানুষটির অনুভূতিকে তার নিজের মতো করে গ্রহণ করা। আমি কাউকে ভালোবাসি বলে তাকেও আমাকে ভালোবাসতে হবে, এমন কোনো অধিকার আমার নেই। আমি কোনো আচরণকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছি, সেটিই যে তার উদ্দেশ্য ছিল, এমনও নয়।
মানুষের প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় অন্যায়গুলোর একটি হয়তো এখানেই, আমরা অনেক সময় অন্যের আচরণের অর্থ নিজের ইচ্ছামতো নির্ধারণ করি। তারপর সেই ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে সম্পর্ক তৈরি করি, প্রত্যাশা তৈরি করি, কখনো অভিযোগও করি।
অথচ মানুষকে বোঝার আগে তাকে তার নিজের জায়গা থেকে বোঝার চেষ্টা করা দরকার।
আজ এত বছর পর সেই মেয়েটির কথা মনে পড়ে আমার কোনো অভিমান হয় না। বরং এক ধরনের কৃতজ্ঞতা অনুভব করি। সে হয়তো তখন না জেনেই আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়ে গিয়েছিল, বন্ধুত্বকে বন্ধুত্ব হিসেবেও গ্রহণ করতে হয়। প্রতিটি আন্তরিকতা প্রেম নয়, প্রতিটি যত্ন কোনো দাবি নয়, প্রতিটি হাসির পেছনে গোপন আকাঙ্ক্ষা থাকে না।
আর সবচেয়ে বড় কথা, অন্যের সততাকে নিজের ভুল বোঝাবুঝির কারণে অভিনয় বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
জীবনে আমরা কত মানুষকে ভুল বুঝি! কারও নীরবতাকে অহংকার ভাবি, কারও দূরত্বকে অবজ্ঞা, কারও হাসিকে প্রলোভন, কারও বন্ধুত্বকে ভালোবাসা। কখনো আবার উল্টোটা হয়, সত্যিকারের ভালোবাসাকে আমরা বন্ধুত্ব ভেবে পাশ কাটিয়ে যাই।
সমস্যা অনেক সময় মানুষের আচরণে যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি আমাদের দেখার চোখে।
তাই আজ সেই পুরোনো স্মৃতির দিকে তাকিয়ে মনে হয়, সেদিন আমি প্রেমে পড়িনি শুধু, আমি একটি সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। একটি নতুন সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। এবং নিজের অজ্ঞতার সঙ্গেও পরিচিত হয়েছিলাম।
হয়তো মানুষের পরিণত হওয়ার পথটা এমনই। প্রথমে আমরা অন্যকে বিচার করি। তারপর বুঝতে শিখি, নিজের বোঝাটাকেও বিচার করা দরকার।
সেই মেয়েটি আমাকে প্রত্যাখ্যান করেনি, সে শুধু আমাকে সত্যিটা বলেছিল। কষ্ট পেয়েছিলাম, অবশ্যই। কিন্তু আজ মনে হয়, সেই কষ্টের মধ্যেও একটি উপকার ছিল। আমি শিখেছিলাম, ভালোবাসা চাওয়া যায়, কিন্তু দাবি করা যায় না। বন্ধুত্ব গ্রহণ করা যায়, কিন্তু তার মধ্যে নিজের কল্পনা চাপিয়ে দেওয়া যায় না। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সত্য কখনো কখনো আমাদের প্রত্যাশা ভেঙে দেয়, কিন্তু সেই ভাঙনই আমাদের বাস্তব মানুষটিকে চিনতে শেখায়।
জীবনের এত বছর পর ফিরে তাকিয়ে তাই মনে হয়, সেদিন আসলে কেউ অভিনয় করেনি।
শুধু আমি সিগন্যালটা ভুল বুঝেছিলাম।
কিন্তু সেই ভুল পড়ার মধ্য দিয়েই হয়তো জীবনের একটি বড় শিক্ষা পেয়েছিলাম, মানুষকে তার নিজের সত্যের মধ্যে দেখতে শেখা, নিজের প্রত্যাশার আয়নায় নয়।
শেষ পর্যন্ত সততা শুধু সত্য কথা বলার বিষয় নয়। সততা হলো নিজের অনুভূতিকে সত্য বলে মেনে নেওয়া, আবার অন্য মানুষের অনুভূতিকেও নিজের ইচ্ছার বাইরে স্বাধীন সত্য হিসেবে গ্রহণ করা।
আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম, সেটি আমার সত্য ছিল। সে আমাকে ভালোবাসেনি, সেটিও তার সত্য। এই দুই সত্যের মধ্যে কোনো প্রতারণা ছিল না, ছিল শুধু অনুভূতির পার্থক্য।
হয়তো সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি এখানেই। আমরা কাউকে ভালোবাসতে পারি, তার প্রতি গভীর টান অনুভব করতে পারি, তার উপস্থিতিকে বিশেষ বলে মনে করতে পারি, কিন্তু তার বিনিময়ে একই অনুভূতি পাওয়ার অধিকার আমাদের নেই। ভালোবাসার মর্যাদা তখনই থাকে, যখন সেখানে স্বাধীনতারও মর্যাদা থাকে।
আজ সেই পুরোনো ঘটনাটির কথা মনে পড়লে তাই আর মনে হয় না যে আমি প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলাম। বরং মনে হয়, আমি সেদিন একটি ভুল ধারণা থেকে মুক্ত হয়েছিলাম। একজন মানুষকে তার নিজের মতো করে দেখতে শেখার প্রথম পাঠটি হয়তো সেদিনই পেয়েছিলাম।
আর সেই পাঠটি শুধু নারী-পুরুষের সম্পর্কের জন্য নয়, জীবনের প্রতিটি সম্পর্কের জন্য প্রযোজ্য। আমরা প্রায়ই মানুষের আচরণকে নিজেদের অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা ও ধারণার ভেতর দিয়ে বিচার করি। তারপর মানুষটির ওপর এমন একটি পরিচয় চাপিয়ে দিই, যা হয়তো তার নিজের নয়। সেখান থেকেই জন্ম নেয় ভুল বোঝাবুঝি, অভিমান, অভিযোগ, এমনকি কখনো সম্পর্কের ভাঙনও।
তাই এখন মনে হয়, মানুষকে বোঝার আগে নিজের চোখকে প্রশ্ন করা দরকার। আমি যা দেখছি, সেটাই কি সত্য? নাকি আমি যা দেখতে চাইছি, সেটাই দেখছি?
সেই মেয়েটি আমাকে কোনো মিথ্যা দেয়নি। সে আমাকে তার বন্ধুত্ব দিয়েছিল। আমি সেই বন্ধুত্বের অর্থ ভুল করেছিলাম। অনেক বছর পর ফিরে তাকিয়ে বুঝতে পারি, তার সততার কাছে আমার সেই ভুলটিই ছিল আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
হয়তো জীবনের পরিণত বয়সে এসে আমাদের প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো পুরোনো ঘটনার কাছে ফিরে তাকানো দরকার। সেখানে হয়তো আমরা অন্য কাউকে দোষ দিয়েছিলাম, অথচ পরে বুঝেছি ভুলটা ছিল আমাদের দেখার পদ্ধতিতে।
সত্য সব সময় আমাদের পছন্দের হয় না। কখনো সত্য কষ্ট দেয়, কখনো অহংকারে আঘাত করে, কখনো আমাদের বহুদিনের বিশ্বাসকে ভেঙে দেয়। কিন্তু সত্যের একটি অদ্ভুত শক্তি আছে, সে শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজের কাছেই ফিরিয়ে আনে।
তাই আজ এত বছর পর আমার উপলব্ধি খুব সরল—ভালোবাসা মানুষকে পাওয়ার নাম নয়, মানুষকে তার সত্যের মধ্যে গ্রহণ করার নাম। আর সততা শুধু অন্যকে সত্য বলা নয়, অন্যের সত্যকে মেনে নেওয়ার সাহসও।
সেদিন আমি সিগন্যালটা ভুল বুঝেছিলাম। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে, মানুষটিকে ভুলভাবে মনে রাখিনি।
আর হয়তো এটাই সেই পুরোনো স্মৃতির সবচেয়ে সুন্দর দিক। জীবনের কিছু ভুল আমাদের ছোট করে না, বরং আমাদের বড় হতে শেখায়। কিছু প্রত্যাখ্যান আমাদের ভেঙে দেয় না, বরং আমাদের প্রত্যাশা আর বাস্তবতার পার্থক্য বুঝতে শেখায়। আর কিছু মানুষ আমাদের জীবনে থেকে না গেলেও, তাদের একটি সত্য কথা বহু বছর পরও আমাদের ভেতরে আলো জ্বালিয়ে রাখতে পারে।
সেই আলোয় দাঁড়িয়ে আজ মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পর্কগুলো হয়তো সেখানেই তৈরি হয়, যেখানে আমরা অন্যকে নিজের মতো করে বানাতে চাই না, বরং তাকে তার নিজের মতো থাকার স্বাধীনতা দিই।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষকে ভালোবাসার সবচেয়ে সৎ উপায় হয়তো তাকে নিজের করে পাওয়া নয়, তার সত্যকে সম্মান করা।
লেখক: সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। বর্তমানে সুইডেনপ্রবাসী

টরন্টোয় বজ্রঝড় ও বন্যায় বিপর্যস্ত প্রবাসীসহ হাজার হাজার মানুষ
বজ্রঝড়ে প্রবাসী বাংলাদেশিসহ হাজার হাজার মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকারে প্রথম বাংলাদেশি নারী ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত
দুই দশকের বেশি সময় আগে এলিজা আজাদ শিক্ষার্থী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। পরবর্তী সময়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান ক্ষমতাসীন দল লেবার পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নিউইয়র্কে প্রায় ৩ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করলেও বাংলাদেশ সোসাইটির সদস্য হয়েছেন প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ। সদস্য হতে ২০ ডলার চাঁদা দিতে হয়েছে। এ হিসাবে সদস্য চাঁদা থেকেই সংগঠনটির আয় হয়েছে প্রায় ৭ লাখ ডলার।

কুয়েতে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আলোচনা ও দোয়া মাহফিল
আলোচনায় বক্তারা বলেন, রাসুল (সা.)–এর দেখানো পথে জীবন পরিচালনা করলেই সমাজে প্রকৃত শান্তি ফিরে আসবে।