দেশজুড়ে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অব্যাহত প্রাণহানি, জীবিকা এবং অবকাঠামোগত ক্ষতি কমাতে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও জরুরি প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করছে বাংলাদেশ।
বাজেট নথির বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, চলতি অর্থবছরে ‘কাজের বিনিময়ে টাকা’ (ক্যাশ ফর ওয়ার্ক) কর্মসূচির জন্য এক হাজার ৫১০ কোটি টাকার বেশি এবং গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষাণাবেক্ষণে এক হাজার ৪৫৪ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দিয়েছে সরকার।
জরুরি প্রস্তুতি, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো তৈরি, সামাজিক সুরক্ষা, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সাড়া প্রদানের কৌশল একসূত্রে গেঁথে একটি পূর্ণাঙ্গ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায় প্রায় ২০ লাখ গ্রামীণ শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে, যার এক-তৃতীয়াংশই নারী।
এছাড়া, ‘ভিজিএফ’ ও ‘কাবিখা’ কর্মসূচির মাধ্যমে পাঁচ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি খাদ্যশস্য বিতরণ করা হয়েছে। একই সাথে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১১ লাখের বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্রের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ
বর্তমানে ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৫০টি ঘূর্ণিঝড় ও দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়নের কাজ বাস্তবায়ন করছে সরকার। পাশাপাশি নদীভাঙন ও প্লাবনপ্রবণ এলাকাগুলোতে আরও ৪৪৪টি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলেছে, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয়ের সক্ষমতা বহুগুন বাড়িয়ে দেবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জলাবদ্ধতা হ্রাস, সেচ সুবিধার উন্নতি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। একই সঙ্গে মাটির ক্ষয় রোধ ও পরিবেশগত স্থায়ীত্ব নিশ্চিতে বৃক্ষরোপণ অভিযান চালানো হচ্ছে। নতুন মেয়াদের প্রথম ছয় মাসের (১৮০ দিনের) কর্মসূচির অধীনে এক হাজার ৫০০ কিলোমিটার খাল, নদী ও ড্রেনেজ নালা খনন এবং এক লাখ চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে মন্ত্রণালয়।
জরুরি সাড়া প্রদান ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ
যেকোনো বড় ধরনের দুর্যোগে কেন্দ্রীয় সমন্বয়ের জন্য ‘জাতীয় জরুরি অপারেশন সেন্টার (এনইওসি)’ স্থাপনের লক্ষ্যে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং প্রকল্প নির্মাণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
ভূমিকম্পসহ অন্যান্য জরুরি উদ্ধার অভিযানের সুবিধার্থে প্রায় ৫২১ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম এবং ১১টি ‘অ্যারিয়াল প্ল্যাটফর্ম ল্যাডার’ ক্রয় করা হয়েছে। সম্ভাব্য বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে আরও আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
নিচু ভূমির ভৌগোলিক গঠন, বিস্তৃত নদ-নদী, ঘনবসতি এবং বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে।
আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন
তথ্য যাতে দ্রুত তৃণমূলের মানুষের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য আগাম সতর্কবার্তা ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি জোরদার করা হচ্ছে। ‘ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি)’ আওতায় শতভাগ ওয়্যারলেস যোগাযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। জরুরি কার্যক্রমে গতি আনতে ৭৮ হাজার ১০০ স্বেচ্ছাসেবকের তথ্য সংবলিত একটি অনলাইন ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে।
বর্তমানে টোল-ফ্রি নম্বর ‘১০৯০’-এ কল করে যে কেউ যেকোনো সময় আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানতে পারছেন। প্রযুক্তির ব্যবহারে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং নদীভাঙন পর্যবেক্ষণের আধুনিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত জুন মাসে সংসদে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, ভূকম্পন ও নগর দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে রাজধানী ঢাকায় ৪৪৫টি সাইক্লোন/ভূমিকম্প আশ্রয়কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে ২৫৬টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীনে ১৮৯টি স্থান রয়েছে।
মন্ত্রী আরও জানান, ঢাকায় বড় ধরনের দুর্যোগে তাৎক্ষণিক সহায়তা দিতে এক লাখ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত করার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত স্বেচ্ছাসেবী ডাটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার স্বেচ্ছাসেবকদের যুক্ত করা হচ্ছে।
বহুমাত্রিক ঝুঁকির মুখে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ প্রতি বছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, খরা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের মতো নানা দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। বর্ষাকালে নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হওয়া এ দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা।
২০২৬ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত ভয়াবহ বর্ষাকালীন বন্যা ও পাহাড়ধসের ঘটনায় দেশজুড়ে এই চ্যালেঞ্জের মাত্রা আবারও ফুটে ওঠে। জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, সে সময় দেশের সাতটি জেলায় প্রায় ১২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং ২২ জুলাই পর্যন্ত ৫৯ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। ওই দুর্যোগে প্রায় ৭৪ হাজার ৪৭৯টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়, ২৭ হাজার সাত হেক্টর ফসলি জমি নষ্ট হয় এবং দুই লাখ ৬৬ হাজারের বেশি গবাদিপশু প্রভাবিত হয়।
জাতিসংঘের হিসাবে, জুলাইয়ের ওই দুর্যোগে প্রায় চার লাখ ৩৬ হাজার মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজন ছিল। কেবল গবাদিপশু ও মৎস্য খাতেই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় এক কোটি ৭৩ লাখ মার্কিন ডলারে (১৭.৩ মিলিয়ন ডলার)।
তবে আগাম প্রস্তুতির গুরুত্বও ওই ঘটনায় স্পষ্ট হয়। জরুরি মুহূর্তে চট্টগ্রাম বিভাগে এক হাজার ৭০০টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়, যেখানে ১৭ হাজার মানুষ সাময়িকভাবে আশ্রয় নিতে পেরেছিলেন।
উপকূলীয় জেলাগুলো বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের চরম ঝুঁকিতে থাকে। অন্যদিকে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অনাবৃষ্টির কারণে খরা ও পানির সংকট দেখা দেয়। আবার চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ি এলাকায় অতিবৃষ্টির কারণে হঠাৎ পাহাড়ধসের ঝুঁকি দেখা যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাতের নিয়ম পরিবর্তিত হওয়ায় এই ঝুঁকিগুলো দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার, উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষা ও দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ সরকার অব্যাহত রেখেছে। আবহাওয়ার চরম ভাবাপন্ন পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর পাশাপাশি সরকারি সংস্থা, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যকার সমন্বিত উদ্যোগকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।