যুক্তরাষ্ট্রের মেইন অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা ৬৩ বছর বয়সী টড কক্স। অতীতে দুবার রিপাবলিকান দলের সিনেটর সুসান কলিন্সকে ভোট দিয়েছিলেন তিনি। তবে এবাবের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তিনি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ট্রয় জ্যাকসনকে ভোট দিয়েছেন।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে কক্স জানিয়েছেন, স্থানীয় কোনো বিশেষ সমস্যা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র কোন পথে এগোচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কক্সের মতো আরও অনেক মার্কিন নাগরিকই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যে কারণে নির্বাচনের ফল আসতে শুরু করার পর দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকানরা। এরইমধ্যে ৫৩টি আসন পেয়ে সিনেটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে ট্রাম্প বিরোধীরা। প্রতিনিধি পরিষদেও ২২৩ আসনে জয় পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের এই ভরাডুবি নিয়ে ইতোমধ্যে নানা মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের সঙ্গে ডেমোক্রেটিক পার্টির আগামী দুই বছরের এক বড় ধরনের রাজনৈতিক সংঘাতের পথ তৈরি করল।
মার্কিন নাগরিকরা কী বলছেন?
আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পাশাপাশি খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ট্রাম্পের শাসনামল নিয়ে হতাশা দেখা গেছে।
কক্স দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, “বর্তমান প্রশাসনের আমলে মানুষ আরও সহানুভূতিশীল হয়েছে, এমনটা বলা যায় না। এখানে অনেক মানুষকে হেনস্তা করা হচ্ছে। এর সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টিও জড়িত। ইরানে যুদ্ধ চলছে, অথচ এমন যুদ্ধের কোনো প্রয়োজন ছিল না। আইনের শাসনকেও উপেক্ষা করা হচ্ছে। মনে হচ্ছে, তারা আইনকে কোনো পাত্তাই দিচ্ছে না।”
দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভোটাররা জানিয়েছেন, জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ, ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধ এবং অভিবাসীদের বিরুদ্ধে তার প্রশাসনের কঠোর অভিযান–এসব বিষয় ভোটে প্রভাব ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াটারভিলের কোলবি কলেজের ৫৫ বছর বয়সী অধ্যাপক ম্যাপল রাজসা বলেন, “পোর্টল্যান্ডে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার (আইসিই) অভিযান নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। এখন মনে হচ্ছে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।” তবে এখনো ট্রাম্পের দলের প্রতি অনেক ভোটারের সমর্থন রয়েছে।
মেইনের ৬৩ বছর বয়সী এক ভোটার নিজের নাম প্রকাশ না করে বলেন, “আমি সব পদে রিপাবলিকান প্রার্থীদের ভোট দিয়েছি। বিভিন্ন ইস্যু সম্পর্কে আমার খুব বেশি জানা নেই। তবে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ছেড়ে দিতে আমি এখনো প্রস্তুত নই। ইরানের যুদ্ধকেও আমার কাছে প্রকৃত যুদ্ধ বলে মনে হয় না। আমরা কী হারিয়েছি? কয়েক ডজন মানুষ। এসব যুদ্ধে তো শত শত, হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। আর ইরানের হাতে যদি পারমাণবিক বোমা থাকে, তাহলে এমনিতেই পারমাণবিক যুদ্ধ হবে।”
যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া অঙ্গরাজ্যের ডেস মইনেস শহরের একটি প্রেসবিটেরিয়ান গির্জার ভোটকেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন স্বতন্ত্র ভোটার স্টেসি। তিনি নিজের পুরো নাম প্রকাশ না করে তিনি বলেন, ব্যালটে সব পদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন তিনি। তবে সাধারণত এমনটা করেন না।
স্টেসি বলেন, “আমি কোনো রিপাবলিকান প্রার্থীকে ভোট দিতে চাইনি।” তার ভাষ্য, রিপাবলিকানরা অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও তা পূরণ করেনি। তাদের মধ্যে সাধারণ বুদ্ধি-বিবেচনারও অভাব রয়েছে। বিশেষ করে তরুণ পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা তার ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
আবার কিছু ভোটার স্থানীয় সমস্যাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী অঙ্গরাজ্য মিশিগানের ডিয়ারবর্ন এলাকার ৬০ বছর বয়সী সোনা বলেন, মিশিগানের অবস্থা একেবারে খারাপ। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে দুই দলই এই অঙ্গরাজ্যে জোর প্রচার চালিয়েছে। সোনা রিপাবলিকান প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন।
অন্যদিকে, নিউ হ্যাম্পশায়ারের ছোট শহর রচেস্টারের ভোটার রেবেকা কনরস দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, তিনি মঙ্গলবার ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি ট্রাম্পকে একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন।
রেবেকা বলেন, “ট্রাম্প সবকিছু ওলটপালট করে দিচ্ছেন। আমি চাই, অর্থনীতিতে আবার স্বস্তি ফিরে আসুক। যেন প্রতি গ্যালন জ্বালানি তেল সাড়ে তিন ডলারের কমে কিনতে পারি। আমরা প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করি, তারপরও আর্থিকভাবে এগোতে পারছি না।”
এই মার্কিন নাগরিক আরও বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর কিছু নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি থাকা জরুরি। তিনি এমন জনপ্রতিনিধি চান, যারা প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন।
রেবেকা বলেন, “প্রেসিডেন্টের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার পায়ে চুমু খাবেন–এমন জনপ্রতিনিধি আমি চাই না।”
আলাস্কায় ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী মেরি পেলটোলাকে ভোট দিয়েছেন ২৭ বছর বয়সী চাউনিস ক্যার। তার কাছে এই ভোট দেওয়া ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, “আলাস্কাসহ সারা বিশ্বে অনেক খারাপ ঘটনা ঘটছে। চারদিকে সহিংসতা চলছে। আইসিই অভিযান চালাচ্ছে, খুব খারাপভাবে মানুষকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। আমি আশা করি, এই ভোটের মধ্য দিয়ে আমরা এসব সহিংসতা থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করতে পারব।”
হুয়ানিটা কুপাও মেরি পেলটোলাকে ভোট দিয়েছেন। তিনি বলেন, জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, জীবনযাপনও কঠিন হয়ে পড়েছে। আলাস্কার তুষারাচ্ছন্ন দুর্গম এলাকায় চলাচলের জন্য তার ট্রাকের প্রয়োজন হয়। প্রতি দুই সপ্তাহে ট্রাকে জ্বালানি ভরতে তার ১২০ ডলার খরচ হয়। আর্থিক সংকটের কারণে তাকে আবার মা-বাবার সঙ্গে থাকতে হচ্ছে।
ট্রাম্পকেও পছন্দ করেন না ৩০ বছর বয়সী কুপা। তিনি বলেন, “ট্রাম্প ঘৃণা ও বর্ণবাদ ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তার নেতৃত্ব দেওয়ার ধরন খুবই জঘন্য। বিশেষ করে নারীদের এবং মানুষের জীবন নিয়ে তিনি যেভাবে কথা বলেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়।”
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের মনোভাব নিয়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) পরিচালিত বিস্তৃত জরিপে দেখা গেছে, অর্থনীতি নিয়ে ট্রাম্পের ভূমিকার প্রশংসা করা ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম।
দেশজুড়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার মনে করেন, ট্রাম্পের নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বিপরীতে, মাত্র ১০ জনের মধ্যে মাত্র তিনজন মনে করেন, এসব নীতির ফলে অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। একইভাবে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার মনে করেন, ট্রাম্পের শুল্কনীতি জাতীয় অর্থনীতি অথবা তাদের নিজ নিজ এলাকার অর্থনীতির ক্ষতি করেছে।
এপি বলছে, ট্রাম্পের সামগ্রিক অগ্রাধিকার এবং নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা সম্পর্কেও ভোটারদের মনোভাব বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নেতিবাচক। অর্ধেকের বেশি ভোটার মনে করেন, ট্রাম্প শক্তিশালী নেতা নন, তাদের মতো সাধারণ মানুষের স্বার্থে তিনি লড়াই করেন না, তার অগ্রাধিকার সঠিক নয়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে কার্যকর দায়িত্ব পালনের মতো মানসিক সক্ষমতাও ট্রাম্পের নেই।
প্রায় ১০ জনের মধ্যে ছয়জন ভোটার মনে করেন, দেশের স্বার্থের চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেন ট্রাম্প। বিপরীতে, প্রায় ১০ জনের মধ্যে চারজন মনে করেন, তিনি দেশের স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
নির্বাচনের ফল নিয়ে ট্রাম্প কী বলছেন?
নিজের প্রথম মেয়াদের শেষ দুই বছর ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদের মুখোমুখি হতে চলেছেন ট্রাম্প। তিনি রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে নির্বাচনের শেষ কয়েক সপ্তাহে জোরালো প্রচার চালিয়েছেন। কারণ, ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতা দখল করলে কী পরিণতি হতে পারে, তা তিনি জানেন।
তবে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনাকে কখনো কখনো গুরুত্বহীন বলেও উড়িয়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। বিরোধী পক্ষকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে সামনে রেখে নিজের দলের সমর্থন সুসংহত করা এবং তহবিল সংগ্রহ বাড়ানোর সুযোগ সম্পর্কেও তিনি সচেতন।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের প্রভাব ছিল। তার দাবি, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের খারাপ ফলের পেছনে ইরান যুদ্ধের ভূমিকা ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “এর পেছনে ইরানও একটি কারণ ছিল।”
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে ফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও বলেন, ‘মানুষ সম্ভবত জ্বালানির দামের স্বল্পমেয়াদি প্রভাব মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না।’
এর আগে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমি অবশ্যই নির্বাচনের ফল মেনে নিতে প্রস্তুত।”
ট্রাম্প আরও বলেন, “আমরা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করব। তাদের সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় আছি। আশা করি, আমরা কোনো না কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারব।”