যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। অবশ্য এখনো প্রেসিডেন্ট পদে বহাল তিনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের খবর বলছে, এরই মধ্যে বিরোধী ডেমোক্র্যাট পার্টি সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের কাছে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারাতে যাচ্ছে রিপাবলিকানরা।
ফলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর আগের মতো নির্বিঘ্নে কাটবে না বলে মত বিশেষজ্ঞদের। এখন প্রশ্ন, কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর ট্রাম্পের সামনে কী অপেক্ষা করছে?
ট্রাম্পের ক্ষমতার লাগামে টান পড়বে?
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট সরকার পরিচালনা করলেও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা থাকে কংগ্রেসের হাতে। এমনটা বলছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ওয়েবসাইট ইউএসএ ডট জিওভি। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের সমন্বয়ে গঠিত এই কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ এত দিন ছিল রিপাবলিকানদের হাতে। ফলে ট্রাম্পের নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়নি।
কিন্তু এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। এনবিসি নিউজের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ২৫৫টি আসন পেতে পারে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
এনবিসি নিউজ বলছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারার অর্থ এই নয় যে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি নির্বাহী আদেশ দিতে পারবেন, পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে পারবেন এবং প্রশাসনের মাধ্যমে আগের মতোই কাজ চালাতে পারবেন। তবে নতুন আইন পাস, বাজেট অনুমোদন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে তাকে ডেমোক্র্যাটদের বাধার মুখে পড়তে হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত, অভিশংসনের উদ্যোগ?
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য গার্ডিয়ান বলছে, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর ডেমোক্র্যাটদের হাতে আসবে গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোর নেতৃত্ব। এর মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড, তার পরিবারের ব্যবসা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং অভিবাসন নীতি নিয়ে তদন্ত করতে পারবেন তারা।
প্রয়োজনে প্রশাসনের কাছে নথিপত্র চাইতে, সরকারি কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করতে এবং সাবপোনা জারি করতে পারবেন কংগ্রেসের কমিটিগুলো। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের নিয়মিত জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
এমনকি ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসনের দাবিও উঠতে পারে। এর আগে ২০১৯ ও ২০২১ সালে প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হয়েছিলেন তিনি। তবে দুইবারই সিনেটে প্রয়োজনীয় ভোট না পাওয়ায় ক্ষমতা থেকে সরানো যায়নি তাকে।
দ্য গার্ডিয়ান বলছে, এবারও ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসনের প্রস্তাব পাস করাতে পারলেও প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরাতে সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন। তাই অভিশংসন আর ক্ষমতাচ্যুত হওয়া এক বিষয় নয়।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণে কী বদলাবে?
দ্য গার্ডিয়ান বলছে, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্পের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বাধা তৈরি হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত এবং ফেডারেল আদালতের বিচারকদের নিয়োগে সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
ফলে ট্রাম্পের মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ আটকে দেওয়া বা বিলম্বিত করার সুযোগ পাবেন ডেমোক্র্যাটরা। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আইন ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে হোয়াইট হাউসকে তাদের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
আটকে যেতে পারে ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনা
বিশ্লেষকরা বলছেন, ডেমোক্র্যাটরা স্বাস্থ্যসেবা, শুল্কনীতি ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে পারেন। তাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে মেডিকেইডে ট্রাম্পের ব্যয় সংকোচনের সিদ্ধান্ত বাতিল, সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইনের ভর্তুকি বাড়ানো এবং শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
তবে প্রেসিডেন্ট কোনো বিলে ভেটো দিলে সেটি বাতিল করতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন। ফলে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ট্রাম্পের সব সিদ্ধান্ত সহজে বদলে দিতে পারবেন না।
সামনে ২০২৮ সালের হিসাব
নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হবে ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি। এর পর থেকেই শুরু হবে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের নতুন রাজনৈতিক লড়াই। তবে ডেমোক্র্যাটদের জন্যও এটি বড় পরীক্ষা। শুধু ট্রাম্পের বিরোধিতা নয়, দ্রব্যমূল্য, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর মতো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপও থাকবে তাদের ওপর।
সব মিলিয়ে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদ হারাননি, কিন্তু কংগ্রেসে নিজের দলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। ফলে তার দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছর হতে যাচ্ছে রাজনৈতিক দর-কষাকষি, তদন্ত ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ভরা। আর এই লড়াইয়ের প্রভাব পড়তে পারে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও।