১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী অবস্থায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল বাংলাদেশের চার জাতীয় নেতাকে। কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যেই স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও তাজউদ্দীন আহমেদের কণ্ঠ। ‘কারাগারে একজন বন্দি নিরাপদ’—রাষ্ট্র এমন ধারণাই দিয়ে থাকে। কারাবন্দিদের নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুযোগ–সুবিধার দায়িত্ব পুরোপুরি রাষ্ট্রের। সেই নিরাপদ কারাগারেই যখন রাজবন্দীদের গুলি করে হত্যা করা হয়, তখন সেই ঘটনা হয়ে যায় রাষ্ট্রের জন্য এক বড় ‘কলঙ্কের ইতিহাস’।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড তাই বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়েই আছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ৩ নভেম্বর— জেলহত্যার দিন।
এমন নৃশংসতার দায়ভার কি শুধু বাংলাদেশই রাষ্ট্র হিসেবে বহন করে চলেছে? দুনিয়ার ইতিহাস কী বলছে? ইতিহাসের পাতায় জেলহত্যার মতো বেশ কিছু ঘটনা আছে। জেলের মধ্যে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে রাজবন্দীদের হত্যার কলঙ্ক বাংলাদেশের মতো বহন করে চলেছে আরও কিছু দেশ।
১৯৭৪ সালে ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবার কারাগারে হত্যা করা হয় ৬০ জন রাজনৈতিক নেতা ও উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাকে। ছবি: সংগৃহীত
১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাসেই ইথিওপিয়ায় জেলের মধ্যে হত্যা করা হয়েছিল ৬০ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের। ইথিওপিয়ার সামরিক জান্তা ডার্গ ক্ষমতা দখল করে দেশটির পূর্ববর্তী সরকারের বহু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছিল। ১৯৭৪ সালের ২৩ নভেম্বর রাজধানী আদ্দিস আবাবার আকাকি কারাগারে কোনো আইন, আদালতের তোয়াক্কা না করে মোট ৬০ জন এমন বন্দিকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করেছিল সেনা সদস্যরা। দেশটির ইতিহাসে ২৩ নভেম্বর দিনটিকে ‘ব্ল্যাক স্যাটারডে’ বলা হয়। কারণ দিনটি ছিল শনিবার। দুনিয়ার ইতিহাসে ইথিওপিয়ার ‘ব্ল্যাক স্যাটারডে’ কে বলা হয় বিচারহীনতার এক কলঙ্কিত অধ্যায়।
এবার আসা যাক পূর্ব ইউরোপের দেশ রোমানিয়ায়। ১৯৪০ সাল। সময়টা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে উত্তাল। তখন রোমানিয়ার উগ্র-জাতীয়তাবাদী দল ‘আয়রন গার্ড’ একটি রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। এই দলটি সে বছরের নভেম্বরেই কারাগারে হত্যাকাণ্ডের নারকীয় এক ইতিহাসের জন্ম দিয়েছিল।
তারা সাবেক প্রধানমন্ত্রী জর্জ আর্জেসানুসহ দেশের ৬৪ জন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা ও সাবেক মন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে জিলাভা সামরিক কারাগারে আটকে রেখেছিল।
রোমানিয়ার সেই কুখ্যাত জিলাভো কারাগার। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ও ইথিওপিয়ার মতো রোমানিয়াতেও নভেম্বর মাসেই জেলে রাজবন্দীদের হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৪০ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বরের মধ্যরাতে। তবে বাংলাদেশ ও ইথিওপিয়ার সঙ্গে রোমানিয়ার জেলহত্যার একটি পার্থক্য আছে। সেখানে আয়রন গার্ডের সশস্ত্র ক্যাডাররাই জেলে ঢুকে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল। কারারক্ষীদের উপস্থিতিতেই তারা একটি একটি করে সেলের তালা খুলে রাজবন্দীদের পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা করে। সেদিন মানবতা, আইনি কাঠামো, সভ্য দুনিয়ার আচার–কানুন সবই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল রোমানিয়ার জিলাভা কারাগারে।
বাংলাদেশের জেল হত্যাকাণ্ডের ঠিক ৫ বছর পরের ঘটনা। ১৯৮০ সালের জুন মাস। সিরিয়ার সে সময়ের একনায়ক হাফেজ আল আসাদকে হত্যা করার একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনী। হত্যা প্রচেষ্টার হোতাদের গ্রেপ্তার করে আটক রাখা হয় পালমিরা মরুভূমির ‘তাদমোর’ কারাগারে।
সিরিয়ার তাদমোর কারাগারে হত্যার শিকার হন বহু রাজনীতিক। ছবি: সংগৃহীত
২৭ জুন, ১৯৮০। হাফেজ আল আসাদের ভাই রিফাত আল আসাদের অনুগত প্রতিরক্ষা বাহিনী হেলিকপ্টারে করে তাদমুর কারাগারে পৌঁছায়। স্বৈরশাসককে হত্যা প্রচেষ্টায় অভিযুক্ত ও হাফেজের বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রায় ৫০০ থেকে এক হাজার রাজনীতিকদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি চালিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পুরো তাদমোর কারাগার সেদিন রক্তে ভেসে গিয়েছিল। বিশ্বে রচিত হয়েছিল জেলহত্যার আরেক নৃশংস ইতিহাস।