ইয়েমেনের হুতিদের একসময় তুলনামূলক বিচ্ছিন্ন একটি ধর্মীয় ও সামরিক সংগঠন হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু তারা এখন ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল নিয়ন্ত্রণ করছে। পাশাপাশি দেশটির উত্তরাঞ্চলের বড় একটি অংশও হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। এর মধ্যে রাজধানী সানাও রয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইয়েমেনে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ আবার তীব্র হয়ে উঠেছে। দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী ইরান-সমর্থিত হুতি বাহিনী এবং সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারপন্থী বাহিনীর মধ্যে চলছে তুমুল লড়াই।
গত সেপ্টেম্বরে হুতিরা লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশমুখে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের একটি অংশ দখল করে। বিশ্বব্যাপী নৌবাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিতে হুতিদের অগ্রযাত্রার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান–সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তাদের শক্ত অবস্থান আরও পাকাপোক্ত হয়।
কিছুদিন পর অক্টোবরের শুরুতে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারপন্থী বাহিনী জানায়, বড় ধরনের পাল্টা অভিযান এবং সৌদি আরবের ব্যাপক বিমান হামলার সহায়তায় তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নজরদারির সুযোগ রয়েছে, এমন কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
এসব হামলার জবাবে হুতিরা প্রতিবেশী সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি স্থাপনা ও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে অন্তত ১৩ জন নিহত হয়। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে এটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। এসব হামলার ঘটনায় হুতিরা এথন সারা বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রে।
হুতিরা কারা?
হুতিরা উত্তর ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী। তারা দেশটির সংখ্যালঘু জায়দি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করে। জায়দিবাদ শিয়া ইসলামের একটি শাখা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হুতিরা নিজেদের ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ বলে ঘোষণা করে। ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও বৃহত্তর পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এই জোটে হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীও রয়েছে।
আনুষ্ঠানিকভাবে আনসার আল্লাহ (আল্লাহর অনুসারী) নামে পরিচিত গোষ্ঠীটি ১৯৯০-এর দশকে আত্মপ্রকাশ করে। এর নামকরণ করা হয়েছে আন্দোলনের প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন আল-হুতির নাম অনুসারে। তার ভাই আবদুল মালিক আল-হুতি ২০০৪ সাল থেকে কার্যত গোষ্ঠীটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে হুতিরা ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর বিরুদ্ধে একাধিক বিদ্রোহে অংশ নেয়। তাদের লক্ষ্য ছিল উত্তর ইয়েমেনে নিজেদের আবাসভূমির জন্য আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন অর্জন করা।
২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সালেহ তার ডেপুটি আবদরাব্বুহ মনসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
প্রেসিডেন্ট হাদির সরকার নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ে। এ সুযোগে হুতিরা প্রথমে উত্তরাঞ্চলীয় সাদা প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ নেয়, পরে ২০১৪ সালে রাজধানী সানাও দখল করে।
২০১৫ সালে তারা পশ্চিম ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে হাদিকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারকে সহায়তা করতে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি জোট ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ করে।
এরপর থেকে চলা সংঘাতে দেড় লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির দুই কোটিরও বেশি মানুষের কোনো না কোনো ধরনের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।
সড়কে সশস্ত্র হুতি যোদ্ধাদের পদযাত্রা। ১২ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
এদিকে ক্রমাগত শক্তি বৃদ্ধি করেছে হুতিরা। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের অনুমান, ২০২৪ সাল নাগাদ তারা সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫০ হাজার যোদ্ধা নিয়োগ করেছিল। ইয়েমেনের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দেশটির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ এই এলাকায় বসবাস করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব কীভাবে জড়িত?
হুতিরা সানা থেকে সরকারকে উৎখাত করার পর সৌদি আরব আশঙ্কা করে, তারা পুরো ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশটিকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের প্রভাবাধীন একটি রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে।
সরকারের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে সৌদি আরব কয়েকটি আরব দেশকে নিয়ে একটি জোট গঠন করে এবং বিমান হামলা শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স এ অভিযানে রসদ ও গোয়েন্দা সহায়তা দেয়।
তবে বছরের পর বছর বিমান হামলা এবং ইয়েমেনের সামরিক বাহিনী ও হুতিবিরোধী মিলিশিয়াদের স্থল অভিযান সত্ত্বেও দখল করা অধিকাংশ এলাকা থেকে হুতিদের সরানো সম্ভব হয়নি।
২০২২ সালে মধ্যস্থতার মাধ্যমে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যার ফলে লড়াই অনেকটাই থেমে যায়। ওই বছর হাদি তার ক্ষমতা নতুন প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের কাছে হস্তান্তর করেন। কাউন্সিলটি এডেনভিত্তিক সরকার পরিচালনা তদারক করে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর কিছুদিন পর হুতিরা ইসরায়েল এবং লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। তারা জানায়, ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
জাহাজ চলাচল সুরক্ষিত রাখতে পশ্চিমা দেশগুলো যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে। হুতিদের সামরিক সক্ষমতা কমানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েল বিমান হামলা চালায়। ইসরায়েলি হামলায় হুতিদের স্বঘোষিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ গোষ্ঠীটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাও নিহত হয়।
২০২৫ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর হুতিরা ইসরায়েলে হামলা স্থগিত করে। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর তারা আবার হামলা শুরু করে।
ইয়েমেনের বিভিন্ন রণাঙ্গনে লড়াই তীব্র হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে হুতি আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে সানায় সমবেত হয়েছে হুতিদের সমর্থকেরা। ৭ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
সাম্প্রতিক উত্তেজনা কীভাবে শুরু হলো?
হুতি ও সৌদি আরবের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি জুলাই মাসে ভেঙে পড়তে শুরু করে।
হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ‘সামুদ্রিক অবরোধ’ ঘোষণা করে এবং দেশটির বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও লোহিত সাগরে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকার লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে।
তাদের দাবি, ইয়েমেনের হুতিনিয়ন্ত্রিত এলাকার বন্দর ও বিমানবন্দরগুলোতে সৌদি আরবের কথিত অবরোধ এবং ওই মাসে সানা বিমানবন্দরে চালানো একটি বিমান হামলার জবাবেই তারা এ পদক্ষেপ নিয়েছে। বিমান হামলাটির জন্য তারা সৌদি আরবকে দায়ী করে।
এরপর সেপ্টেম্বরে হুতিরা দ্রুত অগ্রসর হয়ে ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লোহিত সাগর উপকূলের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার (৮১ মাইল) এলাকা দখল করে নেয়। এর মধ্যে ছিল বন্দরনগরী মোখা এবং পেরিম বা মায়ুন দ্বীপ।
এই অগ্রযাত্রার ফলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজ ছাড়া আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের জন্য তারা কোনো হুমকি নয় বলে দাবি করে গোষ্ঠীটি।
অক্টোবরে ইয়েমেন সরকার হুতিদের দখলে থাকা সব এলাকা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে নতুন সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়। এরপর সৌদি আরবের ব্যাপক বিমান হামলার সহায়তায় সরকারপন্থী বাহিনী বাব আল-মান্দেবের আশপাশের কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে বলে খবর পাওয়া যায়। তবে ওই এলাকায় নিজেদের কোনো ভূখণ্ড হারানোর কথা অস্বীকার করেছে হুতিরা।
উত্তেজনা বৃদ্ধির পর ইয়েমেনের স্থলযুদ্ধে শত শত মানুষ নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে দুই লাখেরও বেশি মানুষ।
হুতিদের পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আবার বাড়িয়ে দিয়েছে। আরব উপদ্বীপের অপর প্রান্তে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে সীমিত হয়ে পড়ায় সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য বাব আল-মান্দেব গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে উঠেছে।
সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল-গ্যাস স্থাপনায় হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার ঘটনাও উত্তেজনা বাড়িয়েছে। ওই হামলার জন্য ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের দায়ী করা হয়েছিল।
এই উত্তেজনা পশ্চিমা শক্তিগুলোকে আবারও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি হামলায় যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কি না, সে বিষয়ে তিনি ‘সিদ্ধান্ত নেবেন’।
এদিকে সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্য সৌদি যুদ্ধবিমানকে আকাশে জ্বালানি সরবরাহে সহায়তার জন্য একটি সামরিক বিমান মোতায়েনে সম্মত হয়। যুক্তরাজ্য জানায়, এই সহায়তা দেওয়া হবে ‘শুধু প্রতিরক্ষামূলক অভিযানের’ জন্য।
হুতি বাহিনীর অগ্রযাত্রা উদ্যাপন করতে সমর্থকদের সমাবেশ। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
হুতিদের অর্থ ও অস্ত্রের জোগান দেয় কারা?
সৌদি আরব ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর অভিযোগ, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ চলাকালে জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে ইরান হুতিদের কাছে অস্ত্র পাচার করেছে। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।
২০২৪ সালে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সরঞ্জাম, সহায়তা ও প্রশিক্ষণ পাওয়ার ফলে হুতিরা একটি শক্তিশালী সামরিক সংগঠনে রূপ নিয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর ২০২৬ সালের মে মাসে কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ (সিএআর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আগে তেহরান হুতিদের কাছে তৈরি অস্ত্র পাঠাত। এখন ক্রমবর্ধমানভাবে এমন যন্ত্রাংশ পাঠানো হচ্ছে, যেগুলো ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেরাই জোড়া লাগিয়ে অস্ত্র তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে তাদের উন্নততর ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিও দেওয়া হচ্ছে।
তবে হুতিদের অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইরান। দেশটির দাবি, তারা শুধু রাজনৈতিকভাবে হুতিদের সমর্থন দেয়।