২০২৩ সাল থেকেই ধীরগতি বাংলাদেশের অর্থনীতির। এমনটা বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংকের গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে।
আবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) চলতি ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩.২ শতাংশ করেছে। গত এপ্রিলে সংস্থাটি ৪.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। আজ মঙ্গলবার ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা চলাকালে প্রকাশিত আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে নতুন এই পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়।
এশিয়ান ডেভলমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) পরিসংখ্যানেও বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি দেখানো হয়েছে। তবে আইএমএফ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির যে পূর্বাভাস দিয়েছে , তা বিশ্বব্যাংক ও এডিবির সর্বশেষ পূর্বাভাসের চেয়েও কম।
শুরুতেই আসা যাক, আইএমএফ কী বলছে, সেই আলোচনায়।
বাংলাদেশের অন্যতম ঋণদাতা এই সংগঠন, ২০২৭ অর্থবছরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসে বড় ধরনের পার্থক্য দেখিয়েছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ অর্থবছরে এশিয়ার উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩.২ শতাংশ, আর মূল্যস্ফীতি দাঁড়াতে পারে ১০.৯ শতাংশে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৪.৪ শতাংশ হতে পারে। ভুটানের প্রবৃদ্ধি ৬.৯ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি ৬.৫ শতাংশ, মালদ্বীপের প্রবৃদ্ধি ৩.৮ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি ২.৫ শতাংশ হতে পারে।
নেপাল ও শ্রীলঙ্কার প্রবৃদ্ধি ৩.৭ শতাংশ করে হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। নেপালে মূল্যস্ফীতি ৫.৮ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৫.৪ শতাংশ হতে পারে। এ পূর্বাভাস অনুযায়ী, আলোচনায় থাকা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ এবং প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সবচেয়ে কম।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিনিয়োগ কার্যক্রমে গতি কমেছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি হারিয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর ফলে পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে।
আর্থিক খাতের দুর্বলতা ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে, রাজস্ব ব্যয়ের সীমিত সক্ষমতার কারণে সরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও প্রবাসী আয় শক্তিশালী থাকায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উন্নতি হওয়ায় দেশের বৈদেশিক খাত স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি সরবরাহের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নত হলে এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রম জোরদার হলে ২০২৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩.৯ শতাংশ হতে পারে।
বিশ্ব ব্যাংক বলছে, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ বেশি মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি স্থবির হয়ে পড়েছে এবং নারীরা চাকরি হারিয়েছেন। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও আরও বেড়েছে। খেলাপি ঋণের হার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৩০.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের জুনে ৩৩.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আহরণের হার ৮.৩ শতাংশ, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন হারগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর ফলে প্রয়োজনীয় খাতে সরকারি ব্যয় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপির ৩.৫ শতাংশ থাকা বাজেট ঘাটতি ২০২৬ অর্থবছরে বেড়ে ৩.৯ শতাংশ হয়েছে।
বিশ্ব ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি সহায়তা করে। তবে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই এখনো কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই।
সুবিধাভোগী নির্বাচনের প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করা গেলে এসব কর্মসূচির মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাসের সুফল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে মানুষের প্রয়োজনের প্রতি আরও সাড়াদানকারী করে তুললে সীমিত সরকারি সম্পদ দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর কাছে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছানো যাবে।
সুবিধাভোগী নির্বাচন ও কর্মসূচির আওতাভুক্তির ঘাটতি দূর করতে সরকারের ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি সমন্বিত ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে উপকারভোগী নির্বাচন এবং ধারাবাহিকভাবে নতুন উপকারভোগীদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একীভূত করা এবং বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচন আরও লক্ষ্যভিত্তিক করার পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ডের সমন্বয় করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব হতে পারে।
এডিবির ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক সেপ্টেম্বর ২০২৬’ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৭ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪ শতাংশ হতে পারে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালে ৮.৭ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
এডিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নিচের দিকে রয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় এগিয়ে আছে শুধু আফগানিস্তান ও মালদ্বীপ থেকে। পাকিস্তানের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের সমান। এছাড়া অন্যান্য সবদেশ বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে রয়েছে।
তবে আইএমএফ গোটা বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়েই সতর্ক করেছে। ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য গার্ডিয়ান আইএমএফের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে বলছে, চলতি বছর বিশ্বে মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। জুলাইয়ের পূর্বাভাসেও একই হার ধরা হয়েছিল। ২০২৭ সালে মূল্যস্ফীতি কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে। এর আগে আগামী বছরের জন্য এই পূর্বাভাস ছিল ৪ শতাংশ।
আইএমএফ বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, মূল্যস্ফীতি সাময়িকভাবে বাড়লেই যেন তারা অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া না দেখায়। তবে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
সংস্থাটি বলেছে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তাই পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বালানি বাজারের নতুন অস্থিরতার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে ঘিরে বিনিয়োগের বাজারে বড় ধরনের ধস নামার ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে আইএমএফ। এ ধরনের ঘটনা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।